বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

দয়া করে মহামারী নিয়ে
অহেতুক ভয় দেখাবেন না
হিমাংশু সিংহ

আমাদের মিডিয়ার একটা দুর্নাম আছে। নিন্দুকরা বলে, যদি হয় পাঁচ, আমরা দেখাই পঁচিশ। প্রবল ঝড়ে মাঝসমুদ্রে যদি উল্টে যায় সাতটা নৌকা, আমরা বেমালুম বলি সত্তর। মৃতের সংখ্যাতেও হার মানতে রাজি নই, ভাবটা এমন সবার আগে থাকব। পথ দেখাব। কম্পিটিশনের যুগ বলে কথা। কনফার্মেশনের থোড়াই কেয়ার। আগেপিছে কিছু না ভেবে এই এগিয়ে থাকাটাই যেন আজকের ‘ব্রেকিং মিডিয়ার’ যুগে ষোলোআনা দস্তুর। কিন্তু এগিয়ে থাকার আর এগিয়ে রাখার নয়া ‘ভ্যারিয়েন্ট-এর প্রধান গুণ যদি হয় শুধু ভয় দেখানো, তাহলে কি তাকে সুস্থ লক্ষণ বলা চলে? বিশেষত আজকের ডিজিটাল দুনিয়ায়। যখন সারা দেশে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা সাকুল্যে দশ হাজার, তখন ৩৫ হাজার কিংবা তারও বেশি সংক্রমণের শঙ্কা শুনিয়ে মানুষকে আরও ভীত, আরও একটু সন্ত্রস্ত ও বিষণ্ণ করেই মহান কর্তব্য শেষ! এ কেমন আহ্লাদ! আমরা যখন কোনও সুরাহা করতে পারব না, হাসপাতাল খুলতে পারব না, অক্সিজেন, ওষুধ সরবরাহ করতে পারব না, তখন সতর্ক করার নামে অহেতুক মানুষকে ভয় দেখানো কেন? দরজা খুলতে পারি না, অথচ বন্ধ করার দু’শো আয়োজন! যাবতীয় নেগেটিভ চিন্তাকে সামনে এনে মানুষের মনের গোলাপি পাপড়িটাকেই কখন অজান্তে আমরা নির্মমভাবে ছিঁড়ে ফেলি। এটাই কি আধুনিক গণমাধ্যমের পবিত্র কাজ!
এখন যেমন মহামারীর তৃতীয় ঢেউ নিয়ে সতর্ক করার নামে শুরু হয়েছে অতিরঞ্জিত প্রচার। সরকার বলছে, সংক্রমণ কিছুটা বাড়লেও এটা এখনও কোনও ঢেউ নয়। আমরাও দেখছি হাসপাতালে যাওয়া কিংবা মৃত্যুর হার অনেকটা কমেছে, তখন গেল গেল এই প্রচার আবার কেন? সব বন্ধ হয়ে গেলে লাভ কার? আমাদের রাজ্যে ২৩টা জেলার মধ্যে কসমোপলিটন কলকাতা ছাড়া আর কোথাও এখনও তেমন সংক্রমণ বাড়েনি। বেশ খানিকটা দূরে দ্বিতীয় স্থানে উত্তর ২৪ পরগনা। রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই হাসপাতালগুলিকে আবার কোভিড শয্যা ও ওষুধের জোগান বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। সবরকম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আমরা কিন্তু থামছি না। ক্রমাগত ভয় দেখাচ্ছি। দেখিয়েই যাচ্ছি। মানুষকে আরও অসহায় অবস্থার মুখে ফেলছি। কিন্তু একবারও ভেবে দেখছি না, আবার সবকিছু বন্ধ হলে মানুষের জীবন জীবিকাটাই যে স্তব্ধ হয়ে যাবে। রাস্তায় একটাও মানুষ না 
থাকলে সামান্য ফুচকাওয়ালাটার ঘরে যে অনাহার শুরু হবে। ট্রেনটা না চললে বাদামওয়ালা ভাইটার ডাল-ভাত জোটাবে কে? সেদিকে নজর দেওয়ার সময় কোথায় আমাদের। ব্যাপারটা এমন, আপনি বাঁচলে বাপের নাম! 
আমাদের হাতে গরম পরিসংখ্যান বলছে, গত দু’বছরে যত মানুষ করোনায় প্রাণ হারিয়েছে, তার চেয়ে বেশি লোক কাজ হারিয়ে রোজগার হারিয়ে মারা গিয়েছে, কিংবা অর্ধমৃত হয়ে কোনওরকমে বেঁচে আছে। আর এর উল্টোদিকে শুধু ভয় তাড়াতে কত কোটি টাকার জিঙ্ক আর ভিটামিন সি বিক্রি হয়েছে তার হিসেব কে রাখে? বুঝে না বুঝে মুঠোমুঠো জিঙ্ক আর অন্যান্য ওষুধ খেয়েছে মানুষ। এখন আবার যখন রোগটা একটু ফিকে হচ্ছে তখন টিকাওয়ালাদের চাপ বাড়ছে। তৃতীয় ঢেউয়ের নিরন্তর প্রচার কি তাদের মুখ চেয়েই? বাণিজ্য আর অর্থনীতির এই সাপলুডো খেলায় মানুষ যে কোণঠাসা। পৃথিবীজুড়েই এই একই অবস্থা। আবার যদি সব বন্ধ হয়, অমূলক আশঙ্কায় ঝাঁপ ফেলে দেয় ব্যবসায়ীরা, বিক্রিবাটা বন্ধ হয়, তাহলে এই সব হারানো শিরদাঁড়া বেঁকে যাওয়া লোকের সংখ্যাটা মহামারীতে মৃত্যুর চেয়ে কয়েকগুণ হয়ে যাবে। এই কঠিন সত্যটা কেউ আমরা ভেবে দেখছি না। নিরাপদ দূরত্ব থেকে শুধু ভয় দেখিয়ে কর্তব্যপালনের নাটক করছি মাত্র! কিন্তু করোনার বিপদের চেয়ে লকডাউনের ক্ষতি কিন্তু কোনও অংশে কম নয়। এই সার সত্যটা সমাজের প্রতিষ্ঠিত উচ্চবিত্তদের চেয়ে অনেক বেশি হাড়ে হাড়ে বুঝেছে গরিব অসংগঠিত মানুষ। রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়া মৃত্যু যন্ত্রণার চেয়ে কম কীসে। বাধ্য হয়ে দু’মুঠো জোটাতে পেশা বদল করতে হয়েছে কত শত মানুষকে তার হিসেব কে রাখে? তাই মানুষকে আর ভয় দেখিয়ে মারবেন না, পারলে একটু স্বস্তি দিন।
এটা ঠিক, গত জুলাই মাসের পর মনে হচ্ছিল ভ্যাকসিন আর কিছু কড়া অনুশাসনেই পৃথিবী ভাইরাস থেকে মুক্তির দিকে এগচ্ছে। ডেল্টা, ডেল্টা প্লাস কিংবা ওমিক্রন কিছুই আর মানবজাতিকে বিপন্ন করতে পারবে না। পুজো আর দিওয়ালির পরও সংক্রমণ তেমন আর না বাড়ায় হারানো আত্মবিশ্বাসটা একটু একটু করে ফিরছিলও। জিএসটির পরিসংখ্যানই জানান দিচ্ছিল, দু’বছর ধরে টানা ঝিমিয়ে পড়া ব্যবসা বাণিজ্য একটু একটু করে আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। জিডিপি দীর্ঘ সময় সঙ্কুচিত হয়ে নেগেটিভ থাকার পর আবার ইতিবাচক দিকে মোড় নিয়েছে। এই সব ঘটনা থেকেই আশার একটা রুপোলি রেখা দেখা যাচ্ছিল, আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। সমীক্ষা বলছিল, মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি) মানে সোজা কথায় অর্থনীতির স্বাস্থ্যের সূচক খুব শীঘ্রই আবার সাত শতাংশ ছাড়াবে। কিন্তু ডিসেম্বরের শেষ পর্বে এসে আবার যেন তাল একটু কাটার উপক্রম। হিসেব বলছে, গত দু’সপ্তাহে সংক্রমণ কিছুটা বেড়েছে। সতর্কতার প্রয়োজন আছে নিশ্চয়। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও বলতে হবে, প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউয়ের তুলনায় এবারের সংক্রমণ মোটেই আহামরি কিছু নয়। তার উপর যাদের ডবল ভ্যাকসিন নেওয়া আছে তাদের বিপদ অত্যন্ত কম। ভাইরাসের মারণক্ষমতাও কমেছে। প্রত্যেক দিনের পরিসংখ্যান থেকেই এটা পরিষ্কার। আর সার্স কোভ টু’-এর নতুন রূপভেদ ওমিক্রনে বড় কোনও বিপদ হচ্ছে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখন রোগটা উপসর্গহীন। কলকাতার নবনির্বাচিত মেয়র বলেছেন ৮৩ শতাংশ ক্ষেত্রেই এখন রোগটা উপসর্গহীন। হাসপাতালে প্রায় কাউকে যেতেই হচ্ছে না। ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই সামান্য জ্বর- সর্দির পর এমনি এমনি সেরে যাচ্ছে। ওমিক্রনে আবার অনেক ক্ষেত্রে স্বাদ গন্ধও যাচ্ছে না। সামান্য আইসোলেশনেই দ্রুত সেরে যাচ্ছে। ইদানীং আরটিপিসিআরে নেগেটিভও হচ্ছে ১৪ দিনের অনেক কম সময়ে। এখনও পর্যন্ত এই নয়া ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত ৪০০ জনেরও বেশি রোগী সেরেও উঠেছেন। তাই পারলে সতর্ক করুন, মাস্ক-স্যানিটাইজার পরা রাস্তায় বাধ্যতামূলক করার উপর জোর দিন।  ওইটুকুতেই হবে। কিন্তু দয়া করে ভয় দেখিয়ে আতঙ্কিত করে মানুষের পেটের ভাত কেড়ে নেওয়ার চিরস্থায়ী 
ব্যবস্থা করবেন না। খুব প্রয়োজন হলে ছোট ছোট কন্টেইনমেন্ট জোন করুন। কিন্তু খুব প্রয়োজন ছাড়া স্কুল কলেজ সহ কোনওকিছুই বন্ধ করা অনুচিত। মুখ্যমন্ত্রীও সেই কথাই বলেছেন। এই মুহূর্তে স্কুল কলেজ বন্ধ হলে ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সিদের টিকাকরণও ধাক্কা খেতে বাধ্য। 
এই পরিস্থিতিতেই আমরা নতুন বছরে প্রবেশ করেছি। একটা নতুন বছর সঙ্গে নিয়ে আসে অনেক প্রত্যাশাকে। যাবতীয় হতাশা ভুলে সেই নতুন আশার রঙে মনটাকে সবুজ করে ফেলতে হয়। নতুন করে জীবনের হিসেব ঝালিয়ে নেওয়ার জন্যও এটাই আদর্শ সময়। পুরনো ভুলচুক, ব্যর্থতা আর সম্পর্কের মানবজমিন পেরিয়ে আবার নতুন করে নিজেকে মেলে ধরার এটাই আদর্শ সময়। সেই সঙ্গে যাবতীয় মলিনতা মুছে ফেলে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোরও সেরা মুহূর্ত। কিন্তু বছরটাই যদি শুরু হয় নতুন করে ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে তাহলে মন থেকে ইতিবাচক চিন্তাগুলোও রাতারাতি উবে যেতে বাধ্য। এবারও বর্ষবরণের প্রথম চ্যালেঞ্জ ভয়কে দূরে সরিয়ে বিধি মেনে নিজে সুস্থ থাকা, পাশের মানুষকে সুস্থ রাখা। আর অবশ্যই কাজের মধ্যে থাকা। সেইসঙ্গে গত দু’বছরের পুনরাবৃত্তি যেন আর না হয়, সেদিকে নজর রাখা। 
আজ বছরের শুরুতে যখন এই লেখা লিখছি তখন প্রার্থনা একটাই, কুড়ি ও একুশের পর বাইশ সালটাকেও যাতে ভয় আর আতঙ্ক কোনওভাবে পেড়ে ফেলতে না পারে। এই অনিশ্চিত সময় নিয়ে আসে একদিকে ক্ষুধা, অনাহারের সঙ্গে কাজ হারানোর নিরন্তর ভ্রুকুটি। অশিক্ষা। আরও দারিদ্র। যে গ্রামে পানীয় জল, বিদ্যুৎই পৌঁছয়নি অনলাইন শিক্ষা সেখানে কতটা সহজলভ্য সেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। শহরের অট্টালিকায় বসে সেই শোচনীয় অবস্থার উপলব্ধি কখনও সম্ভব নয়। তাই আমরা উত্তর দিতে গিয়ে বলি, স্কুল কলেজ বন্ধ হয়েছে তো কী হয়েছে, ডিজিটাল মাধ্যম তো সচল রয়েছে! কিন্তু এসবই আসলে তো দায় এড়ানোরই অক্ষম চেষ্টা। এখনও এদেশের কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষের কাছে ডিজিটাল শিক্ষা মানে তো সোনার পাথরবাটি ছাড়া আর কিছুই নয়।
নতুন বছরে তাই ভাইরাস মুক্ত এক পৃথিবীর আবাহন করুন। আগামী বছর যখন আমরা তেইশ সালকে বরণ করব আমরা তখন যেন সবচেয়ে নেগেটিভ মিডিয়াও মানুষকে আর নতুন করে ভয় দেখাতে না পারে। ব্যবসা বাণিজ্য স্বাভাবিক হয়ে যায়। ছেলেমেয়েরা স্বাভাবিকভাবে স্কুলে যায়। কেউ আর মহামারীর কারণে ব্যবসা কম হয়েছে বলে চাকরি না হারায়। সর্বশক্তিমানের কাছে এই একটাই প্রার্থনা। পৃথিবী শান্ত হোক, মানুষ আবার দুঃখ কষ্ট অতিক্রম করে নিজেকে খুঁজে পাক।

2nd     January,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ