বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

প্রভাবশালী ধনীরা
জবাবদিহির ঊর্ধ্বে
পি চিদম্বরম

ধনীরা প্রভাবশালী হয় এবং প্রভাবশালীরা ধনী হয়। একবার প্রভাবশালী এবং ধনী হয়ে গেলে, স্পষ্টতই তারা জবাবদিহির ঊর্ধ্বে চলে যাবে। এটাই হয়েছে আজেকর বিপদ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর জন শেরম্যান (প্রথম অ্যান্টিট্রাস্ট অ্যাক্ট, ১৮৯০—সাধারণভাবে যেটিকে শেরম্যান আইন হিসাবে উল্লেখ করা হয়) বলেছিলেন, ‘আমরা যদি একজন রাজাকে রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে সহ্য না করি তবে আমাদের উৎপাদন, পরিবহণ এবং জীবনের প্রয়োজনীয় যে-কোনও জিনিসের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কোনও রাজাকে সহ্য করা উচিত নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভেঙে টুকরো হয়ে গিয়েছে স্ট্যান্ডার্ড অয়েল এবং এটি অ্যান্ড টি। আলিবাবা, টেনসেন্ট এবং দিদি-র বিরুদ্ধে কঠোর হয়েছে চীন। মাইক্রোসফট, গুগল এবং ফেসবুকও অনেক দেশে এমন উত্তাপেরই মুখোমুখি। কেন? কারণ, তারা অতিকায়, অত্যন্ত ধনী এবং জবাবদিহির ঊর্ধ্বে চলে গিয়েছে।
আমরা যেমন একজন রাজাকে শাসক হিসেবে সহ্য করব না, তেমনি রাজা হয়ে উঠতে চাওয়া একজন শাসককেও আমাদের সহ্য করা উচিত নয়। অনেক দেশ তাদের রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী পদে নেতাদের অবস্থানের মেয়াদ বেঁধে দিয়েছে। কারণ, তাঁরা যাবতীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারেন।

গণতান্ত্রিক এবং ধনী
রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে প্রকৃত ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার একটি উপায় খুঁজে পেয়েছেন ভ্লাদিমির পুতিন। জি জিনপিং তাঁর ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছেন। তাঁর পদে থেকে যাওয়ার মেয়াদের সীমা তুলে দিয়েছেন। আগামী বছর তাঁর থার্ড টার্ম ক্ষমতালাভের প্রস্তুতি সারা হয়ে গিয়েছে। যে-কোনও সংজ্ঞা অনুসারে, উভয় দেশই গণতান্ত্রিক নয়। এমনকী, তারা ধনী দেশের পর্যায়ভুক্তও হয়ে যায়নি।
মাথাপিছু আয়ের নিরিখে বিশ্বের শীর্ষ দশটি ধনী দেশ হল: ১. লুক্সেমবার্গ, ২. আয়ারল্যান্ড, ৩. সুইজারল্যান্ড, ৪. নরওয়ে, ৫. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ৬. আইসল্যান্ড, ৭. ডেনমার্ক, ৮. সিঙ্গাপুর, ৯. অস্ট্রেলিয়া এবং ১০. কাতার। কাতার একটি রাজতন্ত্র। প্রয়োজন বোধে গণতন্ত্র বেছে নিয়েছে সিঙ্গাপুর। বাকি আটটি দেশ পূর্ণ গণতন্ত্র। আমি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের নাম বলতে পারব। একটু চেষ্টা করলে বলতে পারব অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানেরও নাম। কিন্তু বাকি আটটি দেশের কোনওটিরই প্রেসিডেন্ট বা প্রাইম মিনিস্টারের নাম বলতে পারি না। এর থেকে নীতিশিক্ষাটি বেরিয়ে আসে যে—শান্ত, সংযত এবং প্রচারের আড়ালে রয়ে যাওয়া নেতাদের নেতৃত্বেও একটি দেশ ও তার জনগণ ধনী এবং গণতান্ত্রিক হতে পারে। আমার জানা মতে, এই নেতাদের কেউই অহঙ্কার বা ঔদ্ধত্য প্রকাশের ঘটনায় কখনও অভিযুক্ত হননি।

জবাবদিহির কথা ভাবুন 
যেখানে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কিংবা সংসদ ও মিডিয়ার প্রতি অবজ্ঞা, সেখানে গণতন্ত্র সুস্থভাবে অবস্থান করতে পারে না। ‘আমি সব জানি’ বা ‘আমিই ত্রাণকর্তা’ এমন বাগাড়ম্বরের কোনও জায়গা নেই। এই ‘গুণাবলি’ তখনই ভর করে যখন একটি রাজনৈতিক দল অতিকায় ও অত্যধিক ধনী হয় এবং জবাবদিহির ঊর্ধ্বে উঠে যায়। বিজেপি নিজেকে বিশ্বের বৃহত্তম দল বলে দাবি করে এবং আমরা জানি যে, এটাই ভারতের সবচেয়ে ধনী পার্টি। লোকসভায় মোট ৫৪৩টি আসনের মধ্যে বিজেপির দখলে ৩০০টি এবং রাজ্য বিধানসভাগুলিতে সর্বমোট ৪০৩৬টি আসনের মধ্যে ১৪৩৫টি তাদের দখলে। দেশের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে বিজেপি ১৭টিতে ক্ষমতাসীন দল। এই ব্যাপারটা দলটিকে অতিকায় করে তুলেছে। বিজেপি বেশ ধনীও বটে। অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রাইটস অনুসারে জানানো যায়, ২০১৯-২০ সালে ‘নিন্দিত’ নির্বাচনী বন্ড এবং অজানা উৎসগুলি থেকে সমস্ত রাজনৈতিক দলের তরফে মোট সংগ্রহের পরিমাণ ৩,৩৭৭ কোটি টাকা। তার মধ্যে শুধু বিজেপির একার সংগ্রহ ২,৬৪২ কোটি টাকা! পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা ভোটের লাস্ট রাউন্ডে বিজেপি ২৫২ কোটি টাকা খরচ করেছিল। তার মধ্যে ১৫১ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল শুধু পশ্চিমবঙ্গেই! 
গত সাতবছরে বিজেপি আরও জবাবদিহির ঊর্ধ্বে চলে গিয়েছে। দলটি সংসদে বিতর্ক এড়িয়ে যায়। সংসদীয় কমিটিকে দিয়ে যাচাই পর্ব এড়িয়ে এবং প্রায়ই দুই কক্ষে বিতর্ক ছাড়াই বিল পাশ করে নেয়। প্রধানমন্ত্রী নিয়ম করে সংসদ ও মিডিয়াকে এড়িয়ে চলেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সমাজকর্মী, সাংবাদিক ও ছাত্রদের বিরুদ্ধে সিবিআই, ইডি, আয়কর, এনআইএ এবং এখন এনসিবি-কে ব্যবহার করার ব্যাপারে সরকারের কোনও কুণ্ঠা নেই।
অতিকায়, অত্যধিক ধনী এবং জবাবদিহির ঊর্ধ্বে উঠেও বিজেপি একের পর এক ভোটে জিতেছে। যেখানে তারা হেরেছে, সেখানে কিছু বিধায়ক কিনেছে এবং বশংবদ রাজ্যপালদের সহায়তায় সরকার গড়েছে। তবে তার জন্য কোনওরকম বিবেকদংশন অনুভব করেনি। বরং তারা গর্বভরে এই নোংরা খেলাটির নাম দিয়েছে—অপারেশন লোটাস!

ভয় কেবল পরাজয়ের
তিনটি কৃষি আইন পাশ এবং আইনগুলির পক্ষ নিয়ে একগুঁয়ে সওয়ালের ক্ষেত্রে তারা চূড়ান্তরকম অহঙ্কার ও ঔদ্ধত্য দেখিয়েছিল। আইনগুলি প্রথমে অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে আনা হয়েছিল। পরে সংসদের মাধ্যমে আইনে রূপান্তরিত হয়েছিল, বিতর্ক এড়িয়ে গিয়েই। কৃষকরা ১৫ মাস ধরে আন্দোলন করলেও সরকার তাঁদের দাবির প্রতি কর্ণপাত করেনি। আলোচনার জন্য কৃষকদের আমন্ত্রণ করার ভিতরে কোনও আন্তরিকতা ছিল না, এবং আলোচনাটিও হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক নাটক। কৃষক ও তাঁদের সমর্থকদের গালমন্দ এবং বদনাম (‘খালিস্তানি, দেশদ্রোহী’) করার বহরটা শালীনতার সীমা অতিক্রম করে গিয়েছিল। পুলিসি অভিযান হয়ে উঠেছিল নির্মম। সুপ্রিম কোর্টের প্রতি প্রতিক্রিয়াটি ছিল অবজ্ঞাসহকারে বিরোধে প্রবৃত্ত হওয়ার মতো। যতক্ষণ না গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং সার্ভেগুলির রেজাল্ট উপরমহলকে চমকে দিল ততক্ষণ পর্যন্ত সরকার ছিল আত্মতুষ্টিতে ভরপুর এবং একেবারে ফিটফাট! 
এটা পরিষ্কার যে মোদি সরকারের একটাই ভয়—নির্বাচনে হেরে যাওয়া। ৩০টি বিধানসভা আসনের উপনির্বাচনের ফলাফল প‍্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পেট্রল এবং ডিজেলের দাম কমানো হয়েছিল। ওই ভোটে বিজেপি জিতেছিল মাত্র সাতটি আসনে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন ছাড়াই কৃষি আইনগুলি আকস্মিকভাবে প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মোদি। এর মধ্যে স্পষ্ট ইঙ্গিতটি হল, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, মণিপুর এবং গোয়ায় (যেখানে আজ তাঁর পার্টি শাসনক্ষমতায় রয়েছে) ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করেন তিনি। পাঞ্জাবে সাফ হয়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছেন। তাঁর মন্ত্রীদের মুখে প্রধানমন্ত্রীর ‘স্টেটসম্যানশিপ’-এর বানানো প্রশংসা এটাই খোলসা করে দিল, কী ভয়ানক ‘ডাম্ব চিয়ারলিডার’ হয়ে উঠেছেন তাঁরা: যখন আইনটি পাশ করলেন শ্রীমোদি তখন ছিলেন একজন ‘স্টেটসম্যান’ বা রাষ্ট্রনায়ক এবং শ্রীমোদি ‘বিগার স্টেটসম্যান’ বা বৃহত্তর রাষ্ট্রনায়ক হয়ে উঠলেন যখন আইনটি তিনি বাতিল করলেন!
ভারতে গণতন্ত্র তবু টিকে থাকতে পারে, বিজেপি ভোটে হেরে যাওয়ার আশঙ্কা যতক্ষণ করবে। আরও ভালো হয় ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাদের প্রকৃত পরাজয় হলে, ঘটনাটি কিছু অহঙ্কার ও ঔদ্ধত্য ঝেড়ে ফেলতে বিজেপিকে সাহায্য করতে পারে।
লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। 
মতামত ব্যক্তিগত

29th     November,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021