বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

নির্মম ইতিহাসের
সামনে ৫৬ ইঞ্চি ছাতি
হিমাংশু সিংহ

‘ক্ষমা চাইছি’। শব্দ মাত্র দুটি। কিন্তু তার ব্যাপ্তি অনেক। প্রবল পরাক্রান্ত মোদিজির গলায় গুরুপরবে এমন অপরাধবোধের বিস্ফোরণ শোনা যাবে কস্মিনকালেও ভাবেনি গেরুয়া শিবির থেকে দেশের আম জনতা। কিন্তু আচমকা ওই দুটি শব্দই মুহূর্তে যেন বদলে দিল ভারতীয় রাজনীতির চলতি ধারাপাত। শুরু হয়ে গেল উল্টি গিনতি। দেশের কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়ে নিজের সরকারের আইনকেই ঠান্ডা ঘরে পাঠানোর ঘোষণা করলেন নরেন্দ্র মোদি। ফিরে এল আট বছর আগের মর্মান্তিক স্মৃতি। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩’র সর্দারজি যেন ১৯ নভেম্বর ২০২১’র গুজরাতির দর্পচূর্ণ দেখে বলছে, ‘এবার দ্যাখ কেমন লাগে।’ সেদিন আমাদের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ছিলেন আমেরিকায়। প্রেসিডেন্ট ওবামার সঙ্গে তিনি দেখা করতে যাওয়ার ঠিক আগে দিল্লিতে ঝড় বয়ে গিয়েছিল। তাঁর অনুপস্থিতিতে সেদিন সরকারের আনা অর্ডিন্যান্স ছিঁড়ে ফেলেছিলেন রাহুল গান্ধী। আর গেরুয়া শিবির থেকে ছুটে এসেছিল বিদ্রুপের তির। অরুণ জেটলি আজ আর জীবিত নেই, তিনি সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে ‘লেমডাক’ প্রধানমন্ত্রী মনমোহনের ইস্তফাও চেয়েছিলেন। ঝাঁপিয়ে পড়েছিল গোটা বিজেপি দলটাই। দেশে ফেরার আগেই টলমল হয়েছিল গদি। আর আজ সেই ঘটনার মধুর প্রতিশোধ ও পুনরাবৃত্তির মুহূর্তে ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতি বিলক্ষণ বুঝতে পারছেন, ইতিহাসের মার কতটা নির্মম ও ভয়ঙ্কর হতে পারে!
তাঁর মনগড়া সাফল্যের একতরফা মনোলগ শুনতে শুনতে আমরা ক্লান্ত। ১৫ লক্ষ টাকা সবার অ্যাকাউন্টে দেওয়ার ঢাক ফেঁসে গিয়েছে কবেই। তার সঙ্গে এক শতাংশ কালো টাকা উদ্ধার করতে না পেরেও নোট বাতিলের ‘সাফল্য’ ফেরি করা। কর ব্যবস্থা আগের মতোই জটিল থাকলেও জিএসটির ‘সাফল্য’। সিএএ আইন পাশ হয়েও আজ পর্যন্ত কার্যকর করা যায়নি, সেই ‘সাফল্য’। ঘটা করে কাশ্মীর ভাগ করেও উগ্রপন্থা একচুল খতম হয়নি সেই অতুলনীয় ‘কীর্তি’, কিছুই বারবার বলেও সত্যি করতে পারেননি তিনি। ব্যর্থ তাঁর মার্কেটিং কৌশল। আর এবার কৃষি আইনটাই বাতিল। লেবার কোড নিয়েও শ্রমিক শ্রেণি ফুঁসছে। আসলে এক এক করে দেশের মানুষ যখন তাঁর চাতুরিটা ধরে ফেলেছে, তখন তিনি এবার আত্মরক্ষার জন্য ক্ষমা চাওয়ার রাস্তায়। মাত্র সাত বছরেই তাঁর সব দখলের ‘অট্টহাসি’ যে এভাবে ভুল স্বীকারের ট্র্যাজিক মূর্ছনায় বদলে যাবে কে জানত! মোদি জাতির উদ্দেশে ভাষণে বুকের ছাতি ফোলাবেন, তাঁর পূর্বসূরিদের অপদার্থতা তুলে ধরবেন, শত্রুর চোখে চোখ রেখে চরম শিক্ষা দেবেন, সার্জিকাল স্ট্রাইকের সাতকাহন বর্ণনা করবেন, এটাই দস্তুর। কিন্তু সীমান্তে নয়, মোদির স্বপ্নের সেই সর্বগ্রাসী ‘রাফাল’ উড়ান মুখ থুবড়ে পড়ল সিংঘু, তিকরির কৃষক ভাইদের অদম্য জেদের সামনে। বিরোধীদের সাহায্য ছাড়াই জিতল মানুষ। ঐতিহাসিক আন্দোলনের বর্ষপূর্তির ঠিক এক সপ্তাহ আগে। শুধু বিতর্কিত তিনটি আইন প্রত্যাহারই নয়, এই একটা ঘটনা চরম শিক্ষা দিয়ে গেল। শিক্ষাটা গণতন্ত্রের এবং অবশ্যই মানুষকে নিয়ে চলার শিক্ষা। প্রমাণ হল মানুষের জন্য আইন, কারও ইগো চরিতার্থ করার জন্য নয়। আইনের জন্য মানুষ নয়। যতই সংসদের সিলমোহর থাক, বিরোধীরা খতম হয়ে যাক না কেন, এদেশে এখনও শেষ কথা বলে খেটে খাওয়া কৃষক, শ্রমিকরাই। তাঁরা বিরুদ্ধে চলে গেলে সর্বশক্তিমানকেও মাথা নিচু করে নতমস্তকে মেনে নিতে হয়, সরকার উল্টে যায়। ভারতীয় রাজনীতির মহান শিক্ষা এটাই। দুঃখ একটাই, মোদিজির এই কঠিন উপলব্ধি এল অনেক দেরিতে। জরুরি অবস্থার দাগ লাগা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জন্মদিনে। তার আগে অবশ্য কৃষকদের খলিস্তানি, মাওবাদী, আন্দোলনজীবী—কিছুই বলতে বাদ রাখেনি সরকারের মাথারা।
ওই যে কথায় আছে, ঠেলার নাম বাবাজি। বিধানসভা ভোট শিয়রে। চব্বিশের লড়াইও আর বেশি দূরে নেই। জোট করে বিরোধীরা লড়লে গেরুয়া শক্তির ভিত কেঁপে যেতে বাধ্য। প্রয়োজন শুধু একজন জয়প্রকাশ নারায়ণের। যোগীরাজ্যে আসন কমলে, দিল্লিতে ক্ষমতায় থাকাই কঠিন হবে। আর এই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লে কেউ তাঁকে ক্ষমা করবে না। সঙ্ঘ পরিবারও নয়। এই উপলব্ধি থেকেই দ্রুত তাঁর জনসমর্থন কমার স্রোতের মুখে বালির বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা করলেন বিতর্কিত আইনটাই তুলে নিয়ে। 
কিন্তু একটু কী দেরি হয়ে গেল না। প্রধানমন্ত্রীর এই পিছু হটা যে কৃষকদের প্রতি সমবেদনা থেকে নয়, সম্পূর্ণ ভোট পাটিগণিতের প্রয়োজনে তা আজ সূর্যের আলোর মতোই পরিষ্কার। এখানেই তিনি সম্পূর্ণ ‘এক্সপোজড’। কৃষকদের মধ্যেও ঘোষণা নিয়ে নানা সংশয়। তাই সংসদে আইন প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা দিল্লির সীমানা ছাড়তে রাজি নন। তুলতে রাজি নন আন্দোলনও। খোদ প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসেও অন্নদাতা কৃষকরা আজ ভরসা রাখতে পারছেন না। এটা মোটেই সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতার পক্ষে ভালো বিজ্ঞাপন নয়। ব্যক্তিগতভাবে নরেন্দ্র মোদির পক্ষে তো নয়ই।
আসলে মোদি ও অমিত শাহ চাপে পড়ে গিয়েছেন বাংলার বিপর্যয়ের পর থেকেই। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করেও বাংলায় ভরাডুবি হয়েছে। ‘দিদি দিদি’ কটাক্ষের জবাব দিয়েছে বাঙালি। অন্য কোনও বড় রাজ্যেও চমকপ্রদ জয় আসেনি বহুদিন। এবার তাই যে কোনও মূল্যে উত্তরপ্রদেশে তাঁর জয় প্রয়োজন। জয় প্রয়োজন হিন্দি বলয়ের অন্য রাজ্যেও। কিন্তু পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশের বিস্তীর্ণ অংশে নানা কারণে বিদ্রোহের পরিস্থিতি। বিশেষ করে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের গ্রাউন্ড পরিস্থিতি একদম ভালো নয়। অক্সিজেনের অভাবে দ্বিতীয় ঢেউয়ে প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা এখনও তাড়া করে ফিরছে বহু পরিবারকে। সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকা খরচ করা জাতীয় এক্সপ্রেসওয়েতে যতই তিনি রাজার মতো প্রকাণ্ড সি-১৩০ জে হারকিউলিস বিমানে নামুন না কেন, মাটির গন্ধ কিন্তু মোটেই শান্ত থাকতে দিচ্ছে না গেরুয়া শিবিরকে। আর দল ও সরকারের সেই আশঙ্কা থেকেই প্রধানমন্ত্রী আজ এতটা ডিফেন্সিভ। গত সাত দিনে এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পরপর প্রকল্প উদ্বোধন করেও তাই তিনি নিশ্চিত নন। বিরোধীরা দুর্বল হলেও, দেশ প্রায় কংগ্রেস মুক্ত হলেও মানুষের শেষ রাতের মার তাই নরেন্দ্র মোদিকে ভাবাচ্ছে। আর সেই ভাবনা থেকেই ক্ষমা চাওয়া, গাফিলতি মেনে নেওয়া। 
শুধু প্রধানমন্ত্রীই নন, বড় কোনও বিপর্যয়ের শঙ্কা থেকেই ভুল স্বীকার করতে শুরু করেছে সঙ্ঘ পরিবারও। কলকাতায় এসে আরএসএস প্রধান সার্টিফিকেট দিয়ে গিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর সরকারকে। যদিও মোহন ভাগবতের ওই সার্টিফিকেটের আজ আর তেমন প্রয়োজনই নেই বাংলার জননেত্রীর। কারণ রাজ্যের মানুষই গত ২ মে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সার্টিফিকেট দিয়ে দিয়েছে তাঁকে ও তাঁর সরকারকে। সেই সুবাদেই তিনি হ্যাটট্রিক করেছেন। পরপর তিনবার নির্বাচিত হয়ে আজ বাংলার জনপ্রিয়তম মুখ্যমন্ত্রী। আর মোদি অমিত শাহ এবং সর্বোপরি কেন্দ্রীয় সরকারের সমস্ত এজেন্সিকে কাজে লাগিয়েও কিচ্ছু করতে পারেননি। নির্বাচনী যুদ্ধে ৪৮ শতাংশ মানুষের সমর্থন পেলে আর কোনও সংগঠন কিংবা রাজনৈতিক দলের অনুকম্পার প্রয়োজন হয় না। গণতন্ত্রে মানুষই সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক, এই ধ্রুব সত্যটা ধুরন্ধর শাসক ভুলে গেলেই বিপদ উপস্থিত হয়। গেরুয়া দলেরও তাই হচ্ছে। ক্ষমতার দম্ভে নৈনিতালে সলমন খুরশিদের বাড়িতে আগুন লাগাল কারা? এতদ্বারা হিন্দুত্বের কতটা গৌরব বাড়ানো গেল। ভরসন্ধ্যায় একটা বড় শহরের উপকণ্ঠে একদল ধর্ম উন্মাদের ওই তাণ্ডবের বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত সঙ্ঘ পরিবার, বিজেপি কিংবা সরকারের উচ্চতম মহল থেকে কড়া প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল না কেন, তা রীতিমতো রহস্যজনক। তাহলে কি ধরে নিতে হবে একদল উচ্ছৃঙ্খল হিন্দু ধর্মের ভেকধারীর হাতেই আজ দেশের ভার। যদি তাই হয় তাহলে ক্ষমা চেয়েও কিন্তু লাভ হবে না। মানুষ প্রতিরোধে নামবেই। আর এই প্রতিরোধে দল, নেতা, রং কেউ দেখবে না। নরেন্দ্র মোদির সামনে তাই বড় চ্যালেঞ্জ। দলীয় অ্যাজেন্ডাকে দূরে ঠেলে মানুষের অগ্রাধিকারের দিকে তাঁকে নজর দিতে হবে। অন্যথায় একবার নয়, বারবার হাতজোড় করে দাঁড়াতে হবে প্রধানমন্ত্রীকে। ৫৬ ইঞ্চি ছাতির পক্ষে সেই অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর হবে না। আর মনমোহন সিং তো এখনও আশা করে আছেন, একদিন ইতিহাস তাঁর প্রতি সদয় হবেই!

21st     November,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021