বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

নেহরুকে অপমান ও
এক প্রচারসর্বস্ব সরকার
সমৃদ্ধ দত্ত

১৯৩২ সালে ভারতীয় ক্রিকেট টিম ব্রিটেনে গিয়েছিল প্রথমবার অফিসিয়াল টেস্ট ম্যাচ খেলতে। তখন রীতি ছিল ভালো পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে টিমে প্লেয়াররা স্থান পেলেও, ক্যাপ্টেন এবং ভাইস ক্যাপ্টেন হবেন কোনও রাজপরিবারের সদস্যই। অর্থাৎ কোনও দেশীয় রাজ্যের রাজা অথবা যুবরাজ।  এই রীতি অনুযায়ী ১৯৩২ সালের সেই বিদেশ ট্যুরে যাওয়া টিমের ক্যাপ্টেন হয়েছিলেন পোরবন্দরের মহারাজা নটবরসিংজি। আর ভাইস ক্যাপ্টেন পদ পেয়েছিলেন লিম্বদির মহারাজা ঘনশ্যামজি। এই দুই রাজ্যের ভৌগোলিক অবস্থানই বর্তমান গুজরাতের অন্তর্গত। দুই মহারাজা ভারতীয় ক্রিকেট টিমে চান্স পাবেন এরকম ভালো কি খেলতেন? মোটেই নয়। তাঁরা ছিলেন মাঝারি মানের ক্রিকেটার। নামে প্রথম অফিসিয়াল টেস্ট সিরিজ হলেও সেটি ছিল একটিমাত্র ম্যাচেরই সিরিজ। সেই টেস্ট ম্যাচ হবে লর্ডসে। সুতরাং, এই ম্যাচে ভারতীয় টিমে যিনি ক্যাপ্টেন হবেন, ইতিহাসে তাঁর নামটি ঢুকে যাবে। সেই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ক্যাপ্টেন নটবরসিংজি এবং ভাইস ক্যাপ্টেন ঘনশ্যামজি কী করলেন? তাঁরা দুজনে মিলেই স্থির করলেন, তাঁরা নয়, দলের নেতৃত্ব দেবেন একজন প্রকৃত ভালো প্লেয়ার। যিনি রাজপরিবারের কেউ নয়। সাধারণ ভারতবাসী। তাঁর নেতৃত্বেই ভারতীয় টিম খেলবে। তাঁরা নিজেরাও। সেই  ম্যাচে ভারতীয় টিমের নেতৃত্বে এভাবেই নিয়ে আসা হয়েছিল কোট্টারিয়া কোঙ্কাইয়া নাইডুকে। যাঁকে ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাস চেনে সি কে নাইডু নামে। ভারতীয় ক্রিকেটের এক রূপকথা তিনি নিজেই। মহারাজেরা ব্যক্তিগত ইগোকে সরিয়ে রেখে উপলব্ধি করেছিলেন যে, ওই ম্যাচে দেশের নেতৃত্ব এমন কারও হাতে থাকা উচিত, যিনি নিজেই একজন উন্নত ক্রিকেটার, খেলাটা বোঝেন এবং নেতৃত্বপ্রদানে যোগ্য। তাই নিজেদের সরিয়ে নিয়ে এগিয়ে দিয়েছিলেন সি কে নাইডুকে। (তথ্যসূত্র:‘ক্রিকেট ইন্ডিয়া, টেলস আনটোল্ড, কন্ট্রোভার্সিস অ্যান্ড কনট্রিবিউশন’, লেখক—রাজু মুখার্জি)। এই কাহিনির আড়ালে থাকা নীতিবাক্যটি হল, নিজেরা যতই ক্ষমতাবান হই, নির্দিষ্ট কর্তব্যপালনে এবং সাফল্য পেতে আমার থেকে যোগ্যতর কাউকে বাছাই করতে দ্বিধা না করা। আর সেক্ষেত্রে নিজেকে প্রচার ও গুরুত্বের আলো থেকে সরিয়ে নেওয়া। এজন্য মনের জোর দরকার, উদারতা দরকার, আত্মবিশ্বাস দরকার। 
কাহিনিটি মনে পড়ে গেল সম্প্রতি জওহরলাল নেহরুর জন্মদিনে ভারতের পার্লামেন্টে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও প্রথম সারির মন্ত্রী, লোকসভার স্পিকার, রাজ্যসভার চেয়ারম্যানের উপস্থিত না হওয়া নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের প্রেক্ষিতে। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী কেউ দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীকে স্বাধীনতার ৭৫ বর্ষের উৎসবের আবহেও শ্রদ্ধা জানাতে গেলেন না। সরকারের এক রাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়া কেউ ছিলেন না সরকারি তরফে। জওহরলাল নেহরুকে উপেক্ষা করা, তাঁকে তাচ্ছিল্য করা, তাঁর গুরুত্বকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার যে অ্যাজেন্ডা গত সাত বছর ধরে চলছে, এটা তারই একটি অঙ্গ হিসেবে দেখছেন সমালোচকরা। ঠিক এই প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, জওহরলাল নেহরুকে অপমান করা যতটা সহজ, তাঁর মতো হতে পারা কি অত সহজ? নরেন্দ্র মোদির সবথেকে পরিচিত বৈশিষ্ট্য যেটা দেখা যায়, সেটি হল, তিনি কোনও কৃতিত্বই অন্য কেউ নিয়ে নিক, এটা পছন্দ করেন না। তাই লক্ষ্য করা যায়, সরকারের যে কোনও বৃহৎ প্রকল্প কিংবা সাফল্যের ঘোষণা সর্বদাই প্রধানমন্ত্রী মোদি করে থাকেন টিভিতে এসে অথবা কোনও মঞ্চে। অন্য কোনও মন্ত্রীকে কোনও বড়সড় ঘোষণাই করতে দেখি না আমরা। আর সমালোচকদের তিনি কখনও গুরুত্ব দেন না। মনে করেন শত্রু। 
উপরে বর্ণিত কাহিনিতে পোরবন্দর এবং লিম্বদির মহারাজাদের মনোভাবের সঙ্গে নেহরুর মনোভাবের সাদৃশ্য পাওয়া যায় ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের পূর্ববর্তী একমাস ধরে স্বাধীন দেশের প্রথম মন্ত্রিসভা গঠনের সময়।  নতুন ভারতের নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী যে হবেন জওহরলাল নেহরু, সেটা আগেই স্থির হয়েছে। কিন্তু সরকারের মন্ত্রী কারা হবেন? সবাই কংগ্রেসের? নাকি কংগ্রেস বিরোধীরাও স্থান পাবেন? এই জল্পনা যখন তুঙ্গে, তখন কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, নেহরু যাঁদের নিজের মন্ত্রিসভায় সংযুক্ত করলেন, তাঁদের অনেকেই রাজনীতিগতভাবে চরম নেহরু বিরোধী। ভীমরাও আম্বেদকর। বিভিন্ন ইস্যুতে লাগাতার কংগ্রেসের চরম সমালোচক। মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে তিক্ততা চরমে। কিন্তু ভারতের আইন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে তাঁকে ছাড়া আর কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা নেহরু একবারও ভাবেননি। তিনি হলেন আইনমন্ত্রী। 
একইভাবে মন্ত্রী হলেন জাস্টিস পার্টির সম্মুগম চেট্টি। তামিল এই নেতা কংগ্রেসের তীব্র  প্রতিপক্ষ। অথচ তাঁকেই নেহরু অর্থমন্ত্রীর পদ দিয়েছিলেন। হিন্দু মহাসভার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে নেহরুর সম্পর্ক কেমন ছিল সেকথা সর্বজনবিদিত। সেসব মনে রাখেননি নেহরু। তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কেই দিয়েছিলেন শিল্প মন্ত্রকের ভার। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের সঙ্গে নেহরুর যতটা মিত্রতা, ততই ছিল ইগোর লড়াই বহু ইস্যুতে। কিন্তু নেহরু প্যাটেল সম্পর্কে বলেছিলেন, সরকারের সবথেকে শক্তিশালী স্তম্ভ। কমবেশি ৬০০ দেশীয় রাজ্যকে ভারতে অন্তর্ভুক্ত করার দায়িত্ব কাকে দিলে সবথেকে মসৃণভাবে কাজ সম্পন্ন হবে? প্যাটেল। নেহরু জানতেন। তাঁকেই দিয়েছিলেন। উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধানে কখনও অসম, কখনও পশ্চিমবঙ্গ, কখনও পাঞ্জাবে কাকে যেতে হচ্ছে? প্যাটেলকে। যুগান্তকারী আইন সংশোধন হিন্দু কোড বিলের কৃতিত্ব কার? আম্বেদকরের। নেহরু সেই কৃতিত্ব দাবি করেননি। সেই কারণে প্রত্যেক মন্ত্রীর ছিল নিজস্ব অস্তিত্ব এবং পরিচিতি। কিন্তু আজ? 
রাত ১২ টা থেকে ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট বাতিল হয়ে যাবে। এই সিদ্ধান্ত কার ঘোষণা করার কথা? অর্থমন্ত্রীর। কে করেছিলেন।? প্রধানমন্ত্রী। মাস্ক কীভাবে পরতে হবে, দিনে কবার হাত ধুতে হবে, কীভাবে দুই গজের দূরত্ব রাখতে হবে সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং পালন করার ক্ষেত্রে, এসব কে বলবেন আমাদের? স্বাস্থ্যমন্ত্রী কিংবা স্বাস্থ্য সচিব। অথচ টিভিতে এসে এসে কে বলেছেন? প্রধানমন্ত্রী। ২০ লক্ষ কোটি টাকার আর্থিক প্যাকেজ দেওয়া হবে কোভিডকালে জীবিকা সঙ্কট থেকে দেশবাসীকে সুরাহা দেওয়ার জন্য। এই ঘোষণা কোন মন্ত্রীর করা স্বাভাবিক ছিল? অর্থমন্ত্রী। কিন্তু কে করলেন? প্রধানমন্ত্রী। কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। কার করার কথা এই ঘোষণা? কৃষিমন্ত্রীর। কে করেছেন? প্রধানমন্ত্রী। মহাকাশ বিজ্ঞান, গবেষণা, বাণিজ্যকে এবার সরকারের একচ্ছত্র অধিকার থেকে খুলে দেওয়া হবে বেসরকারিকরণের দরজা। এই ঘোষণা বিজ্ঞান মন্ত্রক করতেই পারে। আদতে কে করেছেন? প্রধানমন্ত্রী। ভ্যাকসিন কীভাবে তৈরি হচ্ছে, কবে পাওয়া যাবে? ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারী কোম্পানির উৎপাদন ইউনিটে পরিদর্শন করার কথা কার? স্বাস্থ্য‌মন্ত্রীর। অবশেষে ভ্যাকসিন কবে থেকে শুরু হচ্ছে? কে বলবেন আমাদের? স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কিন্তু এসব আমরা কার কাছে শুনেছি? প্রধানমন্ত্রীর কাছে। কিন্তু ব্যর্থতার জন্য কাকে সরিয়ে দেওয়া হয়? স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে। 
কেন্দ্রীয় সরকার নয়। বিজেপি সরকার নয়। এনডিএ সরকার নয়। ভারত সরকারের নাম আদতে মোদি সরকার। আমরাও সক঩লে সেভাবেই বলি। আর সেটা বলাও সঙ্গত। কারণ, এই সরকারে মোদিই সব। তাঁর নামে ভোট হয়। তিনিই ভোটে জেতেন। কিন্তু গণতন্ত্রে সরকার পরিচালনার একটি নিয়ম আছে। একটি ফরম্যাট আছে। যোগ্য ব্যক্তিদের যোগ্য স্থানে বসিয়ে সর্বোৎকৃষ্ট কাজ আদায় করে নেওয়ার লক্ষ্য‌ হওয়া সুপ্রশাসন।  কিন্তু কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় সেরকম নজির নেই। স্পষ্ট বুঝিয়ে দেওয়া হয় যে, এখানে সবকিছু একজনের নিয়ন্ত্রণে। তিনি কোনও কৃতিত্ব ছাড়তে চান না। কোনও দায়িত্বও সমানভাবে বিলিবণ্টন করেন না।  
জওহরলাল নেহররু জন্মদিনে অসৌজন্য দেখালে কিংবা ইতিহাস থেকে নেহরুর নাম মুছে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও জওহরলাল নেহরুর বিশেষ ক্ষতিবৃদ্ধি হবে না। কারণ, ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনি ভারত নির্মাণের ভিত্তিটি স্থাপন করে গিয়েছেন। জীবনযাপনের ডানদিকে বাঁদিকে তাকালে সেসবের প্রমাণও পাওয়া যায় অবিরত। তিনি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টে সওয়ার হয়ে শুধুই হাততালিবান্ধব জীবন যাপন করেননি। 
নিছক প্রোপাগান্ডা আর স্লোগান নির্ভর সরকার চালানোর অভ্যাস হলে কী হয়? সেটা দিল্লির ডাক্তাররা টের পাচ্ছেন। করোনা যোদ্ধা ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মান জানানোর জন্য ২০২০ সালের মে মাসে আকাশে ওড়া যুদ্ধবিমান থেকে ফুল ছড়ানো হয়েছিল। গোটা দেশবাসী সেই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানায়। ওই সম্মান পাওয়ার ঠিক দেড় বছর পর দিল্লির হিন্দু রাও হাসপাতালের  ডাক্তার এবং নার্সিং স্টাফেরা এখন আন্দোলন করছেন কেন? কারণ, তাঁরা বেতন পাচ্ছেন না মাসের পর মাস! 

19th     November,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021