বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

জিডিপি নয়, অনেক বেশি
দুশ্চিন্তার কারণ বৈষম্য
মৃণালকান্তি দাস

দুর্ভিক্ষের সময়ে যে অভুক্ত মানুষরা বেঁচে গিয়েছিলেন, সেই সময়টা এখনও বেঁচে রয়েছে তাঁদের দুঃস্বপ্নের মধ্যে। অগণিত নামগোত্রহীনের মৃত্যু দিয়ে তৈরি হয়েছে তাঁদের জীবনবোধ। ইতিহাস তাকে উপাদান করতে চায়নি। কিন্তু সেই ইতিহাস যদি ফিরে আসে গোটা দুনিয়ায়? এমনই অশনি সঙ্কেত শুনিয়েছেন রাষ্ট্রসঙ্ঘের ‘ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম’ (ডব্লিউএফও)-র প্রধান ডেভিড বিসলি।
দুর্ভিক্ষ কী ভয়ঙ্কর, জানে বাংলার মানুষ। ‘অশনি সংকেত’ উপন্যাসে না খেতে পেয়ে মরা মতি মুচিনীর রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহ হয়ে উঠেছিল দুর্ভিক্ষের হাতছানি। একটু একটু করে দুর্ভিক্ষ এগিয়ে আসছে, তার ইশারা দিয়ে গিয়েছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তখন যাঁরা বেঁচে ছিলেন, তাঁরা জলাজমি, খাল, বিল, পুকুর ঘেঁটে কোনও রকমে কচুশাক, মেটে আলু, ডুমুরসেদ্ধ, গুগলি-গেঁড়ি, মোটা ভাত আর খুদকুঁড়ো খুঁটে খেয়ে দিন কাটিয়েছেন। বিভূতিভূষণের ভাষায়, ‘চাউলের দাম আগুন হইয়া উঠিতেছে দিন দিন। আমাদের এই ক্ষুদ্র টাউনের আশেপাশের পল্লীগ্রাম হইতে দলে দলে ক্ষুধারত নরনারী হাঁড়ি ও মালসা হাতে ফ্যান ভিক্ষা করিবার জন্য ছুটিয়া আসিতে লাগিল। ক্রমে এমন হইল ফ্যানও অমিল। লোক দু-একটি করিয়া মরিতে শুরু করিল।’ তখন কচু আর জামরুল পাতা খেয়েও বাঁচতে চেয়েছে খিদের জ্বালায় পুড়তে থাকা মানুষ। উলঙ্গ ছেলেমেয়েরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে ফ্যানের জন্য, এঁটো পাতা চেটে খায়, সামান্য খাবার নিয়ে রাস্তার কুকুরের সঙ্গে কাড়াকাড়ি করে...।
গরিব, নিপীড়িত, সর্বহারা মানুষের একমুঠো খাবারের জন্য চিৎকারের সেই ইতিহাস আজও কাঁদিয়ে তোলে। অথচ, সেই সময় মজুতদার, আড়তদার, সুদখোর, ধনীদের কাছে মজুত প্রচুর খাদ্য রসদ। দুর্ভিক্ষের পিছনে রাজনীতিও তো কম নেই। ১৯৪২ সালে বাংলার গভর্নর হার্বার্ট ‘বাড়তি চাল’ জোর করে কিনে নেওয়ার নীতি নিয়েছিলেন। অ্যাসেম্বলিতে হিন্দু নেতারা আপত্তি তুললেন, শুধুমাত্র মুসলিম লিগের অনুগত লোককে কেন চাল কেনার দায়িত্ব দেওয়া হল? অতএব, নিয়োগ হল আরও চার জন দালাল। একজন হিন্দু মহাসভার ঘনিষ্ঠ, একজন এক দলিত নেতার মনোনীত, একজন কংগ্রেসি মুসলিম। চতুর্থজন স্রেফ টাকা আর সংযোগের জোরে চাল কেনার বরাত জোটালেন। ১৯৪১ সালের শেষ থেকেই যেখানে চালের দাম চড়ছে, দ্রুত সেখানে কেন রপ্তানির জন্য চাল কেনা হবে, সে প্রশ্নে তৎকালীন নেতারা কেউ সরব হননি। জনাকতক চালের মজুতদার গোটা ব্যবস্থাটা নিয়ন্ত্রণ করছিল। নেতারা দালালদের কাছে মাথা বিকোলে মানুষের দশা কী হয়, তার সাক্ষী ছিল এই বাংলা।
দুর্ভিক্ষের অশনি সঙ্কেতের কথা শুনিয়েছেন নোবেলজয়ী ডেভিড বিসলিও। তাঁর কথায়, ‘মানব সভ্যতা এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে। এমন পরিস্থিতি আমরা অনেকেই জীবদ্দশায় দেখিনি। বিশ্বের ২৭ কোটি মানুষ খাদ্যসঙ্কটের মুখে পড়তে চলেছেন। করোনা মহামারীর জেরে অর্থনৈতিক সঙ্কট, জলবায়ুর পরিবর্তন ও যুদ্ধ-সংঘাতের কারণে তিনবেলা 
ন্যূনতম খাবারও জুটছে না তাঁদের। ডেভিড বিসলি ধনকুবেরদের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের অভাবে মৃত্যুমুখে দাঁড়িয়ে থাকা ওই মানুষদের বাঁচাতে 
বছরে অন্তত ৪৯০ কোটি ডলার সাহায্য প্রয়োজন। বিশ্বে অন্তত দু’হাজার বিলিয়নেয়ার (অন্তত একশো কোটি ডলারের মালিক) রয়েছেন। তাঁদের মোট ধনসম্পদ, বার্ষিক আয় যোগ করলে ৮ লক্ষ কোটি ডলারেরও বেশি। এই মহামারী পরিস্থিতিতেও অনেকে কোটি কোটি ডলার উপার্জন করেছেন। এবার তাঁরা সাহায্যে এগিয়ে আসুন। চাইলেই বিশ্বে চরম ক্ষুধা নির্মূল করতে পারেন তাঁরা।’
রাষ্ট্রসঙ্ঘের এই কর্তার দাবি খুব ভুল নয়। গত জুন মাসে ‘ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজ’-এর রিপোর্টে লেখা হয়েছে, মহামারী পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পরে মার্কিন কোটিপতিদের মোট ধনসম্পদ অন্তত ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে (৫০ হাজার কোটি ডলার)। আমাজন-মালিক জেফ বেজোসের কথাই ধরুন। রিপোর্ট বলছে, আমেরিকায় লকডাউন শুরু হওয়ার ১১ সপ্তাহের মধ্যে বেজোসের ৩৬২০ কোটি ডলার ধনসম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফেসবুক-স্রষ্টা মার্ক জুকেরবার্গেরও সম্পত্তি বেড়েছে ৩০১০ কোটি ডলার। টেসলার সিইও এলন মাস্কের ১৪১০ কোটি ডলারের সম্পদ-বৃদ্ধি হয়েছে। শুনলে অবাক হবেন, দিন কয়েক আগে ছ’ঘণ্টার মতো ফেসবুকের পরিষেবায় বিঘ্ন ঘটে, আর এতেই নাকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটির কর্ণধার মার্ক জুকেরবার্গের ক্ষতি হয়েছে ৬০০ কোটি ডলার। ব্লুমবার্গের হিসেব, বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার প্রতিষ্ঠাতা এলন মাস্কের সম্পদ এখন ২৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর ২ শতাংশ, মানে ৫৭৮ কোটি ডলার। যা দিয়ে মিটতে পারে ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষের খাদ্যসঙ্কট। অথচ, এই বিশ্বেই ৩০০ কোটি মানুষ সবচেয়ে সস্তার খাবারও কিনে খেতে পারেন না। আর ফি বছর ক্ষুধা ও ক্ষুধাজনিত রোগব্যাধিতে ভুগে প্রাণ হারান ৯০ লাখ মানুষ। এটাই বাস্তব!
নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন ভারতের দিকে তাকান। আজ দেশের এক শতাংশ ধনীর হাতে দেশের ৫১.৫৩ শতাংশ জাতীয় সম্পত্তি! দেশের এক শতাংশ ধনীর এক দিনের আয় ২২০০ কোটি টাকা। আমাদের দেশে কোভিডের ছোবল অসাম্যের অসুখকে কতটা বাড়িয়ে দিয়েছে, তা ধরা পড়েছিল অক্সফ্যামের রিপোর্টে। যেখানে দেখা গিয়েছিল, করোনাকালে প্রতি সেকেন্ডে দেশের ধনীতম ব্যক্তি মুকেশ আম্বানির সম্পদ যে পরিমাণে বেড়েছে, তার সমান আয় করতে একজন অদক্ষ শ্রমিকের লাগবে তিন বছর। আর আম্বানি এক ঘণ্টায় যা রোজগার করেছেন, সেই অঙ্ক ছুঁতে ১০,০০০ বছর। একইভাবে গত এক বছরে আদানি গোষ্ঠীর উল্কার মতো উত্থান হয়েছে। বিশেষ করে, কোভিডকালে আদানি গোষ্ঠীর প্রায় সবকটি সংস্থার শেয়ার ফুলেফেঁপে উঠেছে। ২০২১ সালের গোড়া থেকে প্রথম পাঁচ মাসে গৌতম আদানির সম্পত্তি দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই ভয়াবহ সময়েই তিনি তরতর করে উপরে উঠে ব্লুমবার্গ বিলিয়নেয়ার ইনডেক্সে বিশ্বের ১৫তম ধনী হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। অথচ, উল্টো চিত্রে, এই সময়কালে ভারতীয়রা ৬৬ হাজার কোটি টাকা খুইয়েছেন। কারণ, করোনাকালে চিকিৎসা বাবদ খরচ ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তার উপর রয়েছে সার্বিক মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, রোজগার কমে যাওয়া।
তাকিয়ে দেখুন আশপাশে, করোনা মধ্যবিত্তের জীবনকে একেবারে তছনছ করে দিয়েছে। কারও চাকরি চলে গিয়েছে, অর্ধেক হয়ে গিয়েছে কারও বেতন, আর যাঁদের এখনও সে সব হয়নি, তাঁদের মধ্যে অনেকেই আসন্ন সর্বনাশের সম্ভাবনায় সিঁটিয়ে রয়েছেন। মধ্যবিত্তদের একটা সামান্য অংশ অবশ্য আছেন, যাঁদের চাকরি চলে যাওয়ার বা মাইনে কমার ভয় নেই, তাঁদের সিংহভাগই সরকারি চাকুরে। ধাক্কাটা ভারতীয় মধ্যবিত্তদের উপর যতটা পড়েছে, অন্য কোনও দেশে ততটা পড়েনি। করোনার প্রকোপে সাড়ে তিন কোটি নিম্নবিত্ত মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে নেমে গিয়েছেন। করাল বেকারত্ব, নতুন করে কর্মহীনতা, হাতে অর্থের অপ্রতুলতা, জিনিসপত্রের লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি— এ সবই নিম্ন আয়ের মানুষদের ভাগ্য আক্ষরিক অর্থেই ধোঁয়াচ্ছন্ন রেখেছে।
একসময় দেশ যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ প্রত্যক্ষ করেছিল, যার জেরে প্রাণ গিয়েছে কোটি কোটি দেশবাসীর, সে দুর্ভিক্ষ অস্তমিত। অবশ্যই আমাদের পূর্বজদের তুলনায় আমরা অনেক ভালো আছি। কিন্তু, তারপরও প্রশ্ন জাগে, দুর্ভিক্ষ দূর হয়েছে ঠিক, কিন্তু আজও ভারত সবচেয়ে ক্ষুধার্ত দেশগুলোর অন্যতম, এ দেশে অপুষ্টির বীভৎস কায়া, শিশুমৃত্যুর সংখ্যা বিরাট। আরও বিরাট অসাম্যের বিস্তার। সেই কবে বিভূতিভূষণ ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাস লিখেছিলেন। ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে ক্ষুধা, অভাব, দারিদ্র, বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু, কী নেই? বিভূতিভূষণের দুর্গা আর হরিহর মারা গিয়েছিল প্রায় না খেতে পেয়ে, বিনা চিকিৎসায়। প্রবল বৃষ্টিতে ভিজে ক্রমে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত দুর্গাকে ফুটো চাল দিয়ে পড়া বৃষ্টিতে রাতভর ভিজতে হয়েছে। নোনতা বিস্কুট চেয়ে জুটেছে শুধু নিমছাল সিদ্ধ। কাশীতে গিয়ে বাড়ির স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে বুকে ঠান্ডা লেগে মৃত্যু হয় হরিহরের। তার আগে একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায় সে, সঠিক পথ্য বা খাদ্য জোটে না। প্রতিটি মৃত্যুর মধ্যেই মিশে থাকে নিরুপায়তা আর নৃশংসতা। আর নিজের মানসম্মান খুইয়ে শুধুমাত্র পেটের ভাত জোগাতে রাঁধুনির কাজ নিতে বাধ্য হয়েছিলেন সর্বজয়া। সেই সময় আর এই সময়ের পার্থক্য কি? এটাই তো প্রকৃত ভারতের ছবি!
এ বছরের বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের ক্রমতালিকা বলছে, খিদের জ্বালায় জ্বলছে মোদির ভারত। বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে আরও নেমে গিয়েছে দেশ। ২০২১ সালে বিশ্বের ১১৬টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান হয়েছে ১০১। এক বছর আগেও ভারত ছিল এই তালিকার ৯৪ নম্বরে। ক্ষুধার্ত ভারতকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছে প্রতিবেশী পাকিস্তান, বাংলাদেশ, এমনকী নেপালের মতো দেশও। কে মানতে চায় তার ব্যর্থতার কথা? ক্ষুধা সূচকের রিপোর্ট প্রকাশক সংস্থাকেই পাল্টা নিশানা করেছে মোদি সরকার। বলেছে, যে পদ্ধতিতে ওই রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে, তা সঠিক নয়। এ দেশের সরকারকে কে বোঝাবে, জিডিপি নয়, অনেক বেশি দুশ্চিন্তার কারণ বৈষম্য-ক্ষুধা-অপুষ্টি। কে বোঝাবে, চারপাশের অসহায় মানুষগুলির পাশে দাঁড়ানো দেশের সরকারের দায়িত্ব। এই দেশ তো শুধু কয়েকজনের নয়, ১৪০ কোটি ভারতবাসীর!

18th     November,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021