বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

ত্রিপুরায় তৃণমূলকে ‘শূন্য’
প্রমাণে মরিয়া বিজেপি
তন্ময় মল্লিক

তৃণমূল কংগ্রেস ত্রিপুরায় দাঁত ফোটাতে পারবে না, এটা প্রমাণ করাই ত্রিপুরা বিজেপির একমাত্র লক্ষ্য। তাই ত্রিপুরায় পুরসভা নির্বাচন ঘিরে বিজেপি যে সন্ত্রাস শুরু করেছে, তা লাগাম ছাড়াবে পুরভোটের দিন। ২৫ নভেম্বর। তার মহড়াও শুরু করে দিয়েছে। আসলে ত্রিপুরা দখলের পর বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতার যে ভূত মাথায় চড়ে বসেছে তা বিজেপির ঘাড় থেকে কিছুতেই নামছে না। পঞ্চায়েত ভোটে ৯৬ শতাংশ আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে হাসির খোরাক হয়েছিল বিজেপি। তা সত্ত্বেও তারা যে বিন্দুমাত্র বিচলিত নয়, তার হাতেগরম প্রমাণ পাওয়া গেল পুরভোটের সূচনালগ্নেই। লেঠেল বাহিনীর দাপট দেখিয়ে ভোটের আগেই সাত সাতটি পুরসভা কব্জা করে নিল। বিরোধীরা এক তৃতীয়াংশ আসনে প্রার্থীই দিতে পারল না। এই অবস্থায় নির্বিঘ্নে ভোটদান ত্রিপুরাবাসীর কাছে অলীক স্বপ্ন। অথচ এই বিজেপিই কথায় কথায় বাংলায় সন্ত্রাস ও ছাপ্পা ভোটের অভিযোগ তোলে। গণতন্ত্রের কথা বলে। একেই বলে, ভূতের মুখে রাম নাম।
শুধু ত্রিপুরায় নয়, এরাজ্যেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভোটে জেতার চল ছিল এবং আছে। ’৭২ সালে ছাপ্পা, রিগিং শব্দটির সঙ্গে বিশেষভাবে পরিচয় ঘটেছিল বঙ্গবাসীর। সৌজন্যে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়। সিপিআইয়ের সঙ্গে জোট করে কংগ্রেস একতরফা ভোট করিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। তবে, কংগ্রেস রিগিং, ছাপ্পা শুরু করলেও ঠান্ডা মাথায় চমকে ও ফন্দি এঁটে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভের বিষয়টিকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল বামেরা। যার পোশাকি নাম ‘সায়েন্টিফিক রিগিং’। ভোটার তালিকায় জল মেশানো দিয়ে শুরু, শেষ হতো একেবারে গণনায়। 
’৭৭ সালে ক্ষমতালাভের পরের বছরই বামফ্রন্ট সরকার পঞ্চায়েত ভোট করিয়েছিল। তখন কংগ্রেস নেতারা মাথা বাঁচাতেই ব্যস্ত। তাই মাথা তোলার অবকাশ ছিল না। কিছু পঞ্চায়েতে সাইকেল প্রতীক নিয়ে নির্দল প্রার্থীরা জয়ী হলেও তার সংখ্যাটা ছিল নগণ্য। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতার সেই শুরু। ৯০ এর দশকের গোড়া থেকেই  বাড়তে থাকে জুলুমবাজি, সন্ত্রাস ও রিগিংয়ের দাপট। জনবিচ্ছিন্নতা যত বেড়েছে, চমকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতার থিওরি বামেদের কাছে ততই জনপ্রিয় হয়েছে। তবে, তা পঞ্চায়েত এলাকার মধ্যেই ছিল সীমাবদ্ধ। শহরের শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মেপে চলত বামেরাও। কিন্তু, বিজেপি এসবের ধার ধারে না। তাই ত্রিপুরায় সাতটি পুরসভায় বিরোধী কোনও দলকেই প্রার্থী দিতে দেয়নি।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতার দায় শুধু বামেদের ঘাড়ে চাপিয়ে হাত ধুয়ে ফেললে সত্যকে গোপন করা হবে। এরাজ্যে বামেদের জুতোয় পা গলিয়েছিল তৃণমূলও। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রায় ৩৩ শতাংশ আসন তৃণমূল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেছিল। তার জন্য তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিল তৃণমূল। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বহু তৃণমূল সমর্থকও জোরজবরদস্তির রাজনীতি মেনে নিতে পারেননি। 
পঞ্চায়েত ভোটে মস্তানির খেসারত পরের বছর লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলকে দিতে হয়েছিল। মমতার নেতৃত্বে রাজ্যজুড়ে প্রচুর উন্নয়নমূলক কাজ হওয়া সত্ত্বেও প্রায় অর্ধেক আসন তৃণমূলের 
হাতছাড়া হয়েছিল। তখনই তৃণমূল নেতৃত্ব বুঝেছিল, গাজোয়ারি রাজনীতি মানুষের নাপসন্দ। তাই নিজেদের দ্রুত সংশোধন করে মানুষের আস্থা 
অর্জনের জন্য উন্নয়ন ও সামাজিক প্রকল্পকেই হাতিয়ার করেছিল। ফলও পেয়েছে হাতেনাতে। 
দিন যত যাচ্ছে, ততই বাড়ছে মমতা সরকারের জনপ্রিয়তা। ‘ফাউল’ না করলে জনপ্রিয়তার গ্রাফ নিম্নমুখী হওয়ার কোনও জায়গা নেই।
ত্রিপুরায় বিজেপির ক্ষমতা দখলের মেয়াদ সাড়ে তিন বছরের মতো। যে সমস্ত প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছিল, তার প্রায় কিছুই পূরণ হয়নি। এরাজ্যে বিধানসভা ভোটের প্রচারে এসে ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমাদের রাজ্যের মানুষ পাঁচ বছরের জন্য বিজেপিকে ক্ষমতায় বসিয়েছেন। কিন্তু, তিন বছরের বিজেপি শাসনে রাজ্যবাসী এতটাই বিরক্ত যে এখনই তাঁরা এই সরকারের অবসান চাইছেন। একটা প্রতিশ্রুতিও পালন করেনি।’
তারপর সাত মাস কেটে গিয়েছে। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। পেট্রল, ডিজেল, রান্নার গ্যাস সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিসের দাম হু-হু করে বেড়েছে। ত্রিপুরায় রয়েছে ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’। যে কোনও সমস্যা বিদ্যুৎ গতিতে সমাধানের আশ্বাস দিয়েছিলেন বিজেপি নেতারা। কিন্তু ঘটছে তার উল্টো। ফলে বিজেপির উপর ত্রিপুরাবাসীর  ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে মানুষ ভোট দিতে পারলে শাসক দলের পরিণতি যে ভয়াবহ হবে, সেটা বিজেপি নেতারা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছেন। তাই পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাস কায়েম করছে।
ত্রিপুরায় তৃণমূল কংগ্রেস নতুন দল। তাদের পক্ষে রাজ্যের সব পুরসভায় প্রার্থী দেওয়ার ক্ষমতা নাও থাকতে পারে। কিন্তু, সিপিএম সে রাজ্যে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল। এখনও সেখানে তারাই বিরোধী দল। তাই সিপিএম প্রার্থী জোগাড় করতে পারেনি, বিজেপির এমন দাবি মানা কষ্টকর। আসলে বিজেপি নেতৃত্ব ‘পাবলিক পালসটা’ বুঝে গিয়েছে। নেতারা উপলব্ধি করছেন, মানুষকে বুথ পর্যন্ত যেতে দিলে ভোটটা কিছুতেই বিজেপির ঘরে যাবে না। তাই মেরেধরে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতার মরিয়া চেষ্টা।
আগরতলা সহ ত্রিপুরার মোট ২০টি পুরসভার আসন সংখ্যা ৩৩৪। তার মধ্যে ১১২টি আসন ইতিমধ্যেই বিজেপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দখল করে নিয়েছে। মনোনয়ন দাখিলে বাধা দিয়ে সাতটি পুরসভা কব্জা করার পরেও বিজেপির বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতার খিদে মেটেনি। বিজেপির যিনি পুরনির্বাচনের দায়িত্বে আছেন তিনি কি ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন? কারণ পঞ্চায়েতে বিজেপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৯৬ শতাংশ আসন দখল করেছিল। আর পুরভোটে? তার তুলনায় অনেকটাই কম! তাই বিরোধী দলের আরও ৩৬ জনের মনোনয়ন প্রত্যাহার করিয়ে সংখ্যাটা একটা ভদ্রস্থ জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। ৩৩ শতাংশ। এই ট্রেন্ড বজায় রাখতে পারলে ত্রিপুরা বিধানসভাও হয়তো বিনা ভোটেই বিজেপির দখলে এসে যাবে!
২০২৩ সালে ত্রিপুরা বিধানসভার নির্বাচন। তাই প্রায় সব রাজনৈতিক দলই পুরভোটকে ‘প্রস্তুতি ম্যাচ’ হিসেবে দেখছে। বঙ্গের নির্বাচনে মোদি-অমিত শাহ জুটিকে হারানোর পর তৃণমূল কংগ্রেস ত্রিপুরাকে পাখির চোখ করায় ‘খেলা’ আগেই জমে গিয়েছে। তৃণমূলেকে ঘিরে মানুষের উন্মাদনা দেখে বিপ্লব দেবের দল বুঝেছে, মমতাকে ঠেকাতে না পারলে ত্রিপুরায় তাদের ‘লালকার্ড’ দেখা কেউ ঠেকাতে পারবে না। তাই ত্রিপুরায় তৃণমূলকে আটকাতে আদাজল খেয়ে নেমেছে বিজেপি।
আমার ধারণা, এবার গেরুয়া শিবির ত্রিপুরায় পুরভোটটা অনেক অঙ্ক কষে করাবে। মারধর করে, মিথ্যে কেস দিয়ে পুলিস প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে তারা যতটা বেশি সম্ভব আসন জেতার চেষ্টা করবে। কর্মীদের বোঝাতে চাইবে, বিরোধীরা যতই লাফঝাঁপ করুক, জিতবে বিজেপিই। কিন্তু যেসব আসনে তাদের জেতার সম্ভাবনা নেই বা খুব কম সেখানেই তারা ‘গেম’ খেলবে। তৃণমূলকে আটকানোর জন্য সিপিএমের সুবিধা হবে, এমন পলিসি নেবে। কারণ তৃণমূল অপেক্ষা সিপিএমকে মোকাবিলা করা তাঁদের পক্ষে অনেক সহজ।
বিজেপি নেতারা খুব ভালো করেই বুঝেছেন, মমতা পা রাখার একটু জায়গা পেলেই ত্রিপুরাতেও বাংলার মতো বিজেপির ভিটেমাটি চাটি হবে। আর তার প্রভাব পড়বে লোকসভা নির্বাচনে। আগরতলা পুরসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ও সিপিএমকে টেক্কা দিতে পারলেই ত্রিপুরায় হু-হু করে বাড়বে তৃণমূল। তখন মোদি-বিরোধী প্রধান মুখ হওয়ার দৌড়ে মমতা আরও কয়েক কদম এগিয়ে যাবেন। আর সেটা মোদিজির জন্য যথেষ্ট বিপজ্জনক। তাই পুরভোটে যে কোনও মূল্যে তৃণমূলকে ‘শূন্য’ করাই বিজেপির টার্গেট। 
একেবারে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে বাঁধা ছকে এগচ্ছে বিজেপি। তৃণমূলকে দুরমুশ করা শুরু হয়েছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুস্মিতা দেবের গাড়ি ও মিছিলের উপর হামলা চালিয়েও দমাতে পারেনি তৃণমূলকে। কর্মীদের মারধর ও কেসে ফাঁসানোর ঘটনা প্রমাণ করেছে, ত্রিপুরাকে মুক্তাঞ্চল বানাতে চাইছে বিজেপি। এই অবস্থায় তৃণমূলের আবেদনের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট ত্রিপুরার প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে, সব রাজনৈতিক দলের নির্বিঘ্নে প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা জানিয়ে জমা দিতে হবে হলফনামা।
সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশ বিপ্লব দেবের প্রশাসন কতটা মানবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। সংশয়ের কারণও আছে। আগরতলায় বিজেপি দুষ্কৃতীদের হামলার মুখে পড়ে তৃণমূল প্রার্থী অর্চনা বিশ্বাসের প্রাণভিক্ষার করুণ আর্তি মানুষের হৃদয় টলিয়ে দিয়েছে। তারপরেও নির্বিকার ত্রিপুরার পুলিস। বিজেপির দুষ্কৃতীদের তাণ্ডবে লন্ডভন্ড তাঁর বাড়ি। সেই ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে অর্চনাদেবীর ‘বাঁচাও বাঁচাও’ আর্তচিৎকার একটা কথাই প্রমাণ করে, ত্রিপুরায় গণতন্ত্র আজ বিপন্ন।

13th     November,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021