বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

ভারতীয় ক্রিকেট টিমের
ক্লান্তি ও আশাকর্মীরা
সমৃদ্ধ দত্ত

ওড়িশার জগৎপুরের স্বয়মপ্রভা জেনা নিশ্চয়ই বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা আর যশপ্রীত বুমরাহদের কষ্টটা অনুভব করতে পারবেন। ভারতীয় ক্রিকেটের এই তারকারা সম্প্রতি আইসিসি বিশ্বকাপে পাকিস্তানের সঙ্গে ম্যাচে পরাজিত হয়েছেন এবং টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে গিয়েছেন। আমাদের মন খারাপ হয়েছে। কিন্তু যে কারণকে এই পরাজয় অথবা টুর্নামেন্টে খারাপ ফলাফলের জন্য দায়ী করা হচ্ছে, সেটা বেশ ইন্টারেস্টিং। যশপ্রীত বুমরাহ থেকে নতুন কোচ রাহুল দ্রাবিড়দের বক্তব্য, প্লেয়াররা বিশ্রাম পাচ্ছেন না। একটানা একের পর এক টুর্নামেন্ট খেলতে হয়েছে। তাও আবার বিভিন্ন মহাদেশে। তাই মানসিক ও শারীরিকভাবে ভারতীয় ক্রিকেটাররা খুব ক্লান্ত। বিশ্রাম দরকার। ক্রিকেট অ্যাডভাইসরি কমিটির কাছে এই সমস্যা জানিয়েছেন রাহুল দ্রাবিড়। তাই স্থির হয়েছে আসন্ন নিউজিল্যান্ড সিরিজে কিছু স্টার প্লেয়ারকে বিশ্রাম দেওয়া হবে। তাঁরা আনন্দে কাটান পরিবারের সঙ্গে। আবার ফ্রেশ মানসিকতা নিয়ে তাঁরা ফিরবেন। 
এই সংবাদ জেনে ওড়িশার স্বয়মপ্রভা জেনা অবশ্যই মন খারাপ করতে পারেন। কারণ তাঁকে এবং তাঁর মতো আরও হাজার হাজার অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের কখনও সরকার থেকে বলা হয় না যে, তোমরা বিশ্রাম নাও কিছুদিন। অনেকদিন একটানা কাজ করছ। চিন্তা নেই। যে টাকা স্যালারি পাও, সবটাই পাবে, কমিশনও পাবে। ঠিক যেমন বিসিসিআই থেকে ক্রিকেটাররা পায়। স্বয়মপ্রভা জেনাদের ক্লান্তি আসে না? 
কটকের জামাল জোবরা এলাকার অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী স্বয়মপ্রভার বিয়ে হয়েছে জগৎপুরে। ১৫ কিলোমিটার দূরে। তাই বিয়ের পর তাঁকে জগৎপুর থেকে জোবরা উর্দু প্রাইমারি স্কুলের অঙ্গনওয়াড়ি সেন্টারে আসতে হয় প্রতিদিন সকাল সাতটার মধ্যে। ২০১৯ পর্যন্ত তো কোনও সমস্যা ছিল না। কিন্তু ২০২০ সালের করোনাকালে যখন কোনও ট্রান্সপোর্টই নেই, তখন অল্প সময়ের মধ্যেই সাইকেল চালানো শিখলেন স্বয়মপ্রভা। জগৎপুর থেকে সাইকেল চালিয়ে হাজির হলেন রোজ। তারপর প্রতিদিন ৫ থেকে ৮ কিলোমিটার হাঁটা। বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে শিশুদের ফুড সাপ্লিমেন্ট পৌঁছে দেওয়া, সন্তানসম্ভবা নারীদের ওষুধ খাওয়ানো, কোভিডের যাবতীয় পরীক্ষা করা। একটা সময় তাঁকে দেখলে মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেওয়া হতো। কারণ, তিনি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ইনফেকশন নিয়ে আসছেন। তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বাড়ি বাড়ি থেকে। 
কাজ করতে এভাবে রোজ দেরি হয়ে যাচ্ছে। দিনের শেষে রিপোর্ট তৈরি করে সেটা জমা দিতে হয়। অনেক রাত হয়ে যায় ফিরতে। তাই স্বামীর ঘর ছেড়ে কটকেই নিজের পিতৃগৃহে চলে এলেন দুই বছরের বাচ্চাকে নিয়ে। কিন্তু পিতৃগৃহে দাদা বউদি কাকাদের আপত্তি তাঁর এই থাকা নিয়ে। কেন? কারণ এভাবে রাস্তায় রাস্তায় বস্তিতে বস্তিতে ঘুরে প্রতিদিন তিনি নিশ্চিত করোনার বিষ শরীরে করে বাড়িতে নিয়ে আসছেন। তাই স্বয়মপ্রভা প্রতিদিন বাড়ি ঢোকার আগে সারাদিনের প্রবল পরিশ্রমের পর রাতে রাস্তার কলে স্নান করতেন। জামাকাপড় ধুয়ে ঢুকতেন বাড়ি। অথচ শেষরক্ষা হল না। তাঁর মা রেশমীরেখা আক্রান্ত হলেন করোনায়। এবং প্রাণ হারালেন। তাঁর কাছেই ২ বছরের সন্তানকে রেখে রোজ বেরতেন স্বয়মপ্রভা। স্বয়মপ্রভার থেকেই সংক্রমণ পেয়ে নিশ্চিত মায়ের করোনা হয়েছে। এরকমই ধারণা হল পরিবারের। 
সুতরাং প্রত্যাশিতভাবেই বাপের বাড়িতে আর থাকতে দেওয়া হবে না। বাড়ির সদস্যরা একপ্রকার তাড়িয়েই দিলেন। আবার ফিরে এলেন জগৎপুর। আবার সাইকেলে ৩০ কিলোমিটার। কিন্তু শ্বশুরবাড়িতেও একই আপত্তি। তা঩দের যদি সংক্রমণ হয়? তা‌ই স্বয়মপ্রভা সুস্থ হয়েও আইসোলেশনে থাকেন। বাড়ির বাইরে একটি মাটির ঘর করে দেওয়া হয়েছে। সেখানেই থাকতে হবে। ২০২০ থেকে ২০২১। রুটিন একইরকম চলল। 
সেন্টার বন্ধ। তাই ভারতের প্রত্যন্ত এলাকাগুলির অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের কেউ নৌকায় চেপে, জঙ্গলে হেঁটে, পাহাড় ডিঙিয়ে পৌঁছচ্ছেন গ্রামে গ্রামে। সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মী মহিলারা। মাথায় মেডিকেল কিট নিয়ে বুকজলের নদীতে হেঁটে হেঁটে পেরচ্ছেন পালামৌ থেকে সরগুজার মহিলা অঙ্গনওয়াড়ি ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। ছুটি পাচ্ছেন না। তাঁরা বিরাট কোহলিদের মতো ভাগ্যবতী নয়। পুরো বেতন ও কমিশন পাবেন, অথচ কাজ করতে হবে না, ছুটি পাওয়া যাবে বিশ্রামের জন্য, এসব কেমন যেন স্বপ্নের মতো! অথচ গোটা করোনাকালে গরিব পরিবারের শিশু ও মহিলাদের কারা দিল সবথেকে বেশি স্বাস্থ্য পরিষেবা? এঁরাই। আইপিএল নয়। 
ওই চলেছেন রেলু ভাসাভে। ২৮ বছরের যুবতী। মহারাষ্ট্রের নন্দুরবাড়েরর আশাকর্মী।  অ্যাক্রেডিটেড সোশ্যাল হেলথ অ্যাক্টিভিস্ট। রেলুর কাঁধে একটা লাঠির মতো দেখতে ওটা কী? ওটা বৈঠা। নৌকা চালানোর। প্রতিদিন তাঁকে মোট ২৮ কিলোমিটার নৌকা চালিয়ে গ্রামে গ্রামে যেতে হয়। একটা সমস্যা হয়েছে। করোনার সময় প্রথম বছরটায় তাঁকে দেখলেই দূর থেকে সকলে বাড়ির দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। তাঁর সঙ্গে গ্রামের কেউ কথা বলতে কাছে আসত না। কারণ তিনি তো সংক্রমণ বয়ে বেড়াচ্ছেন। সেই সমস্যা কাটিয়েছেন নিজের উদ্যোগে। সকলকে বুঝিয়ে। দিনরাত গ্রামবাসীদের শিখিয়েছেন কী করতে হবে। এখন নতুন সমস্যাটি হল ভ্যাকসিন দেওয়া। আন্দা গ্রামে ভ্যাকসিন নেওয়ার পরই এক সপ্তাহের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু রেলু বুঝতে পারছেন তাঁদের অন্য রোগের কারণেই মৃত্যু। এর সঙ্গে ভ্যাকসিনের সম্পর্কই নেই। কিন্তু সেকথা বোঝাতে তাঁকে প্রবল পরিশ্রম করতে হচ্ছে। একবার করে নিকটবর্তী সরকারি ব্লক হাসপাতালে ডাক্তারদের মুখের কথা ভিডিও করতে হচ্ছে। প্রতিটি জাতিকে নিজেদের জাতির নেতাদের অভয়বার্তা ভিডিও করে শোনাতে হচ্ছে। নিজের মোবাইলে সেই ভিডিও করে নৌকা চালিয়ে গ্রামে গ্রামে ভ্যাকসিন ক্যাম্প করা তো আছেই। তাছাড়াও অন্য রোগের পরীক্ষা চলছেই।  রেলু ভাসাভের ছুটি নেই। রেলু ভাসাভের বেতনও বাড়েনি। সকাল সাড়ে ৫টায় তিনি বেরন। বাড়ি ঢোকেন রাত সাড়ে ৮টায়। ভারতীয় ক্রিকেটাররা ৫ মাস ধরে বিভিন্ন টুর্নামেন্ট খেলে প্রচণ্ড ক্লান্ত এবং তাঁদের মধ্যে সুপারস্টাররা এবার বিশ্রাম পাবেন এটা জানতে পারলে রেলু ভাসাভের নিশ্চয়ই বিশ্বাস আসবে এরকম ছুটি তাঁরাও একদিন পাবেন!
ভারতীয় ক্রিকেটারদের আয় কত? তাঁরা বিজ্ঞাপন কিংবা ব্র্যান্ড এনডোর্সমেন্ট বাবদ কত টাকা আয় করেন সেটা আলাদা। দেখা যাক ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড থেকে নথিভুক্ত ক্রিকেটারদের কত টাকা বেতন ও ম্যাচ ফি দেওয়া হয়। বিভিন্ন গ্রেড আছে। সর্বোচ্চ বেতন এ-প্লাস  ক্যাটাগরিতে থাকা ক্রিকেটারদের। বছরে ৭ কোটি টাকা। টেস্ট ম্যাচ পিছু ম্যাচ ফি ১৫ লক্ষ টাকা। একদিনের খেলায় ম্যাচ ফি ৬ লক্ষ টাকা। টি টুয়েন্টি ম্যাচ ফি ৩ লক্ষ টাকা। এই এ-প্লাস ক্যাটাগরিতে কারা আছেন? বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, যশপ্রীত বুমরাহ। এরপরের ক্যাটাগরি হল এ-ওয়ান, এই গ্রুপের প্লেয়ার বেতন পাবেন বছরে ৫ কোটি টাকা। টেস্ট ম্যাচ ফি ১৫ লক্ষ টাকা। ওয়ান ডে ম্যাচ ফি ৬ লক্ষ টাকা। টি টুয়েন্টি ৩ লক্ষ টাকা। এই গ্রুপে চেতেশ্বর পূজারা কিংবা আজিঙ্কা রাহানেরা আছেন। 
একজন আশাকর্মীর বেতন কত? ২০০০ থেকে ৩০০০ টাকা। রাজ্যভেদে বদলে যায়। তার সঙ্গে তাদের প্রাপ্য নানাবিধ পরিষেবা বাবদ কিছু ভাতা। টিকা কিংবা স্যানিটারি ন্যাপকিন বিলি অথবা টিবি রোগীদের দেখভাল করা ইত্যাদির জন্য পৃথক ইনসেনটিভ। আগস্ট মাসে দেশজুড়ে আশাকর্মীদের ধর্মঘট করতে হয়েছিল কেন? কারণ, তাঁদের প্রাপ্য সামান্য ভাতাও বকেয়া পড়ে থাকে মাসের পর মাস। অনেক দূরে প্রত্যন্ত গ্রামের আশাকর্মীদের কথা ভাবতে হবে না। দেশের রাজধানী দিল্লির কাহিনি জানা যাক। করোনাকালে দুটি স্পেশাল ডিউটির জন্য বিশেষ ভাতা পাওয়ার কথা ছিল। হোম আইসোলেশনে থাকা করোনা রোগীর হাল-হকিকত জানার জন্য তাদের বাড়ি ভিজিট করা। এজন্য দিনে ১০০ টাকা। আর কন্টেইনমেন্ট জোনে সমীক্ষা করার জন্য ৫০০ টাকা করে। এই টাকা এপ্রিল মাস থেকে বকেয়া হয়ে রয়েছে। দিনের পর দিন আশাকর্মীরা বিক্ষোভ দেখিয়েছেন, দাবি করেছেন, অনশন করেছেন। কাজে কেউ অবহেলা করেননি। দিল্লি যখন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল, তখন একমাত্র আশাকর্মী ও সাফাইকর্মীদের ছুটি ছিল সম্পূর্ণ বাতিল। 
বিরাট কোহলিরা ক্লান্ত একটানা খেলার জন্য। সবেতন। তাঁদের অবশ্য ফ্র্যাঞ্চাইজিদের হয়ে আইপিএল খেলতে কেউ বাধ্য করেনি। সেই সময় কিন্তু ক্লান্তির কথা আসেনি। দেশের হয়ে খেলার পর তাঁদের ক্লান্তি এসেছে। আর  আশাকর্মীরা ছুটি চাননি। বিশ্রাম চান না। তাঁরা ক্লান্ত পরিশ্রমের পরও প্রাপ্য টাকা না পেয়ে পেয়ে!

12th     November,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021