বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

ন্যাড়া বেলতলায় একবারই
যায়, বলছে ত্রিপুরা
মৃণালকান্তি দাস

শূন্য থেকে এক লাফে ৩৬।
২০১৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ত্রিপুরায় বিজেপির সাফল্যের লাফটা ছিল এই রকমই। আর কিংমেকার ছিলেন সুনীল দেওধর। গড়গড় করে বাংলা বলেন। কেউ বলে না দিলে বোঝার উপায় নেই তিনি মারাঠি। দলের অন্দরে তাঁর কোড নেম ‘ভোট ম্যানেজার’। 
এক সময়ের আরএসএস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ)-এর প্রচারক সুনীল রাজনীতিতে আসার পরে প্রথমে গুজরাতের দাহোড় জেলার দায়িত্বে ছিলেন। তখন সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২০১৩ সালে দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে ছিলেন দক্ষিণ দিল্লির দায়িত্বে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মোদির কেন্দ্র বারাণসীর দায়িত্ব সামলান সুনীল। অতীতে দীর্ঘসময় উত্তর-পূর্বের রাজ্য মেঘালয়ে সঙ্ঘ প্রচারকের দায়িত্ব সামলানো সুনীলকে ত্রিপুরার পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয় ২০১৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে আগে। ত্রিপুরা দখলের লক্ষ্যে মূলত মোদির নির্দেশেই সুনীল আগরতলার পাকাপাকি বাসিন্দা হয়ে গিয়েছিলেন। ত্রিপুরা থেকে বামেদের উৎখাতে তাঁকেই হিরো বানিয়েছিল বিজেপি।
যদিও ভোট বিশ্লেষকরা মনে করেন, ত্রিপুরা দখল মোটেই অপ্রত্যাশিত ছিল না। তার অন্যতম কারণ, সিপিএম আমলের শেষ দিকে জনসংযোগ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বামপন্থী নেতাদের অহঙ্কার আর ঔদ্ধত্য বিজেপিকে শক্তিশালী করেছিল। সেই সময় মানুষের ভোট যতটা না ছিল বিজেপির সমর্থনে, তার থেকেও বেশি ছিল সিপিএমকে পরিহার করার মানসিকতা। মানুষের ক্ষোভকে ব্যবহার করেছিল বিজেপির আই-টি সেল। ভোটার লিস্টের পৃষ্ঠা ধরে কৌশল নির্ধারণ করেছিল। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের আগে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা মোট ৪২ বার ত্রিপুরায় গিয়েছিলেন। শুধু প্রধানমন্ত্রী, এক সপ্তাহের মধ্যে গিয়েছিলেন ৩ বার। প্রধানমন্ত্রী জনসভায় ঘোষণা করেছিলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে সপ্তম বেতন কমিশন অনুসারে মাইনে পাবেন সরকারি কর্মচারীরা। সব স্তরে ৩০-৪০ হাজার টাকা মাইনে বেড়ে যাবে। ‘ফিক্সড পে’-র কর্মচারীদের পার্মানেন্ট করা হবে। ব্যাঙ্কে ১ ঘণ্টায় টাকা ঢুকে যাবে, মিসড কল দিলে চাকরি পাওয়া যাবে। যুবকদের স্মার্টফোন দেওয়া হবে। লোভ দেখানো হয়, ১০০ দিনের কাজ দ্বিগুণ হয়ে যাবে। অন্য ভাতার পরিমাণ যেখানে ৭০০ টাকা ছিল, ২০০০ টাকা করে দেওয়া হবে। বিজেপি স্বপ্নের জাল বুনেছিল, কেন্দ্রে-রাজ্যে এক সরকার থাকলে, কেন্দ্রীয় হারে সব সুবিধে পাওয়া যাবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাহাড়ি মানুষদের আরএসএস বুঝিয়েছিল, আদিবাসীদের জন্য আলাদা রাজ্য হবে। সরল মানুষদের ম্যাপ দেখিয়ে বলেছিল, এটা তোমাদের দেশ, ‘তিপ্রাল্যান্ড’। ইন্ডিজেনাস পিপলস ফ্রন্ট অব ত্রিপুরা (আইপিএফটি)। সত্তাপরিচিতির রাজনীতি দিয়ে আদিবাসীদের মানসিক ভাবে আলাদা করে দিয়েছিল। ত্রিপুরায় হিন্দুত্বের মাটি শক্ত করতে সুনীল দেওধর কোনও চেষ্টাই বাদ দেননি। দল ভাঙানোয় দক্ষতা দেখিয়ে বিজেপিকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ‘মোদি দূত যোজনা’ নামে অভিনব প্রকল্পের ব্লু প্রিন্টও তাঁর মস্তিস্কজাত, ত্রিপুরার যুবসমাজকে এই কাজে নামিয়েছিলেন সুনীল। ফলও মিলেছিল। দীর্ঘ দিনের বামশাসিত ত্রিপুরায় মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন গেরুয়া শিবিরের বিপ্লব দেব।
এহেন সফল ভোট ম্যানেজার সুনীল দেওধরকে বিধানসভা ভোটে বাংলার মাটিতে নিয়ে এসেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। নীলবাড়ি দখলের লড়াইয়ে মোদি-শাহের এই আস্থাভাজনের কাঁধেই তুলে দেওয়া হয়েছিল গুরুদায়িত্ব। কিন্তু বাংলার মানুষ বুঝিয়ে দিয়েছিল, এ রাজ্যের মাটিতে ভোটপাখিদের কোনও জায়গা নেই। সুনীল দেওধরদের ডবল ইঞ্জিনের তত্ত্ব ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল বাংলার মানুষ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে লড়াইয়ে ডাহা ফেল করেছিলেন সুনীল দেওধর। বাংলার মানুষ বুঝিয়ে দিয়েছিল, টাকার লোভ দেখিয়ে এ রাজ্যের মাটি কিনে নেওয়া যায় না। ত্রিপুরার মতো স্বপ্ন দেখিয়ে বাঙালিদের বুঁদ করে ফেলা যায় না।
আজ ত্রিপুরার মাটিতে পা দিয়ে তৃণমূল নেতারা যখন বিজেপির সেই গোহারা চেহারা তুলে ধরতে চাইছেন, কেঁপে উঠেছে গেরুয়া শিবির। শুরু হয়েছে গেরুয়া সন্ত্রাস! ত্রিপুরার বিজেপি বিধায়ক অরুণচন্দ্র ভৌমিক প্রকাশ্যে বিজেপির পার্টি মেম্বারদের নির্দেশ দিয়েছেন, আগরতলা এয়ারপোর্টে তৃণমূল নেতাদের নামতে দেখা গেলে, ‘তালিবানি কায়দায়’ মোকাবিলা করতে। বাংলার ভোট পরবর্তী হিংসা নিয়ে যখন রাজ্যপাল থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক এতটাই বিচলিত, তখন ত্রিপুরায় ভোট পূর্ববর্তী হিংসা নিয়ে তাঁদের কোনও মাথাব্যথা নেই। আসলে ত্রিপুরার মসনদে বসে রয়েছে বিজেপি। তাই ‘সব ঠিক হ্যায়’। ত্রিপুরায় সিপিএম মার খাচ্ছে, কেন্দ্র বলছে, ‘সব ঠিক হ্যায়’। তৃণমূল মার খাচ্ছে, অমিত শাহ বলছেন, ‘সব ঠিক হ্যায়’। ঠিক যেমন উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাতের ক্ষেত্রে নর্থ ব্লক বলে থাকে। অমিত শাহর মন্ত্রক কিংবা পিএমও, কারও মনে হচ্ছে না, ত্রিপুরায় বিপ্লব দেবের সরকার যে অমানবিক কাজ করে চলেছে, তা খতিয়ে দেখতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধি দলের যাওয়াটা প্রাসঙ্গিক। কারণ, সিপিএম কিংবা তৃণমূলের উপর একের পর এক হামলা চালিয়ে বিজেপি নেতৃত্ব বলেছিল, ‘আমরা হিংসায় বিশ্বাস করি না। তবে ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙলে কী পরিণতি হয় তার ট্রেলার সকলেই দেখলেন।’ সুনীল দেওধর একেই কি ডবল ইঞ্জিনের তত্ত্ব বলেছিলেন?
তৃণমূলের সিলেবাসে ত্রিপুরা নতুন কিছু নয়। মমতা যখন বাংলায় বিরোধী নেত্রী হিসেবে শাসক সিপিএমের বিরুদ্ধে লড়ছেন, তখন থেকেই পাশের এই রাজ্যে তৃণমূলকে ছড়ানোর চেষ্টা শুরু করেছিলেন তিনি। সেই ১৯৯৯ সালে ত্রিপুরার নির্বাচনী ইতিহাসে নাম লেখায় তৃণমূল কংগ্রেস। লোকসভা নির্বাচনে সুধীররঞ্জন মজুমদার ঘাসফুল প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বামফ্রন্ট প্রার্থী সমর চৌধুরী নির্বাচিত হলেও দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন তৃণমূল প্রার্থী। সেই শুরু। তারপর ২০১৬। ছয় কংগ্রেস বিধায়ক তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিলেন। নেতৃত্বে সুদীপ রায়বর্মন। কিন্তু পরের বছরই সবাই একযোগে বিজেপিতে নাম লেখান। অচিরে ত্রিপুরায় তৃণমূলের ভিত দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝেছেন, মানুষই শেষ কথা। ফলে ভোটের ময়দানে শক্তিশালী সংগঠন জরুরি। মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা গেলে সুনীল দেওধররা এসেও কিচ্ছু করতে পারবেন না। যেমনটা হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটে। তাই ২০২১-র তৃণমূল কংগ্রেসকে শুরু থেকেই ভিন্ন চেহারায় দেখা যাচ্ছে। বাংলায় বিধানসভা ভোটে সফল ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোরের তৈরি সংস্থাই ত্রিপুরায় জল মাপার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কর্মী থাক বা না থাক, সংগঠন গড়তে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ত্রিপুরায় এসে পড়ে থাকছেন। প্রতি মুহূর্তে লড়াই...। 
খোয়াই মামলা থেকে শুরু করে বিলোনিয়ায় দুই সাংসদের শারীরিক হেনস্তার অভিযোগ, আমবাসার ঘটনা এবং সব শেষে হোটেলে বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া, গাড়ির চালক-মালিকদের হুমকি, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদযাত্রায় অনুমতি না দেওয়া ইত্যাদি তৃণমূলকে ত্রিপুরায় জায়গা করে দিয়েছে। মার খেয়েও মাঠ ছেড়ে না পালানোর মানসিকতা বিজেপি-বিরোধী তরুণদের নজর কেড়েছে। সূচনাতেই সেখানে শাসকদল বিজেপির সঙ্গে সরাসরি সংঘাত শুরু হয়েছে তৃণমূলের। আক্রমণ, রক্তারক্তি, ভাঙচুর চলছে। বিরোধীদের জোর করে আটক করে রাখার অভিযোগও উঠছে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে। এভাবে একের পর এক ঘটনা কেন্দ্র করে বিজেপি বনাম তৃণমূল হয়ে উঠেছে ত্রিপুরায় এই মুহূর্তের সবচেয়ে উত্তপ্ত রাজনীতি।
গত বিধানসভা ভোটে পরাজয়ের পরে সিপিএম নেতারা আক্ষরিক অর্থেই ঘর থেকে বার হননি। বহু জায়গায় দলীয় কর্মীরা মার খেয়েছেন, কেউ প্রতিরোধের কথা ভাবতে পারেননি। গত তিন বছরে ত্রিপুরায় ওই জায়গায় বিরাট শূন্যতা দেখা দিয়েছিল। এ বার তৃণমূল কংগ্রেস মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে। সাধারণ মানুষ নিজেদের মনের কথা, প্রাণের বেদনা প্রকাশের জন্য অন্তত কোনও বিরোধী শক্তি খুঁজে পেয়েছে। আগামী নির্বাচন কী ভাবে কোন দিকে মোড় নেবে ত্রিপুরায়, এখনই তা বলার সময় আসেনি। তবে অনুমান করা যায়, বাংলার তৃণমূল ওই প্রতিবেশী রাজ্যে দ্রুত ডালপালা ছড়াচ্ছে। সেখানে ভোট হওয়ার কথা ২০২৩ সালে। মধ্যবর্তী এই দু’বছরে যদি বিশেষ কোনও ওলোটপালট না হয়, তবে লোকসভা নির্বাচনের আগেই ‘মিশন ত্রিপুরা’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে আর একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
ত্রিপুরা তৃণমূল স্টিয়ারিং কমিটির আহ্বায়ক সুবল ভৌমিকের কথায়, ‘তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে বাংলার মতো ত্রিপুরাতেও সরকারি প্রকল্পের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা পাবেন ত্রিপুরাবাসী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে নতুন ত্রিপুরা গড়ে উঠবে। বিজেপি ভয় পেয়েছে তাই লাগামছাড়া সন্ত্রাস চালাচ্ছে। ভয় দেখিয়ে, হামলা, মামলা করে, কিডন্যাপ করেও তৃণমূল কংগ্রেসকে টলানো যাবে না। এক ইঞ্চিও জমি ছাড়ব না বিজেপিকে। মানুষ বিজেপিকে বুঝে নিয়েছে। দল হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেসও ত্রিপুরার মাটিতে বিজেপিকে বুঝে নেবে। লড়াই হবে চোখে চোখ রেখে। ত্রিপুরায় এবার মা দুর্গার রূপে নামবেন মহিলারা, বিজেপিকে হারাবেই তৃণমূল।’
দু’বছর পরে ত্রিপুরা বিধানসভায় তৃণমূল কংগ্রেস কত আসন পাবে, তা এখন নানা সমীকরণের উপর নির্ভরশীল। তবে এটা নিশ্চিত, এক জন হাওয়াই চপ্পল পরা মহিলার ভয়ে কাঁপছেন বিপ্লব দেব। আর তাই নিজের গদি বাঁচাতে দিল্লিতে গিয়ে আবার সুনীল দেওধরের পায়ে পড়েছেন। বিপ্লবকে কি আবার বাঁচাতে পারবেন সুনীল?
ত্রিপুরাবাসী বলছে, ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায়!

11th     November,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021