বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

বাঙালির পাত থেকে কি গঙ্গার
ইলিশ হারিয়ে যাচ্ছে?

কৌশিক প্রামাণিক

করোনার শুরুতে যখন প্রথম ঝাঁপবন্ধ শুরু হল কলকারখানায়, মানুষ হল গৃহবন্দি— তখন আপাত-দূষণমুক্ত পরিবেশ দেখে বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন ‘এবার ইলিশ আসবে ঝাঁকে ঝাঁকে’। গৃহবন্দি বাঙালি রীতিমত উৎফুল্ল ছিল শুধুমাত্র কম দামে রসনা তৃপ্তির আশায়। কিন্তু বিধি বাম। বাস্তবে দেখা গেল ঝাঁকে ঝাঁকে তো দূরের কথা ইলিশের টিকির দেখা পাওয়াও দুষ্কর! দু-চারটে যদিওবা মেলে, তার দাম মধ্যবিত্ত বাঙালির ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবুও বাঙালি আশায় ছিল এবছর না হয় পরের বছর নিশ্চয়ই সহজলভ্য হবে ইলিশ। কিন্তু হায়! এবছরও বর্ষা প্রায় শেষ, তবু ইলিশের দেখা নেই। ফলে শুরু হয়েছে হাহুতাশ। বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য সহ প্রায় রোজই খরচ হচ্ছে নিউজ-প্রিন্ট। কেন ইলিশ গঙ্গা ছেড়ে চলে যাচ্ছে পদ্মায়, মায়ানমারে, তা নিয়ে চলছে বিস্তর আলোচনা। বাজার থেকে ইলিশ হাতে ঝুলিয়ে পাড়া দিয়ে হেঁটে বাড়ি ঢুকতে না পেরে কর্তা যেমন বিষণ্ণ, তেমনই পুকুর ঘাটে ইলিশের স্বাদের সাতকাহন শোনাতে না পেরে গিন্নীও বিমর্ষ। বস্তুত ইলিশ নামক রুপোলি ফসলটির গঙ্গাপ্রাপ্তির সম্ভাবনায় পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি জাতি আজ দিশেহারা। 
গঙ্গার ইলিশের এই প্রায়-গঙ্গাপ্রাপ্তি কিন্তু হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনও ঘটনা নয়। এটাই হবারই ছিল। বিগত কয়েক দশকের ইলিশ শিকারের পরিমাণ পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে ক্রমশ কমেছে ইলিশের পরিমাণ। অন্যদিকে, এবছরই বাংলাদেশে বেড়েছে ইলিশের পরিগমন। অর্থাৎ গঙ্গায় ইলিশের গঙ্গাপ্রাপ্তির অর্থ  ইলিশের ‘বিলুপ্তি’ নয়; ইলিশ আসলে গঙ্গাবক্ষকে পরিহার করতে চাইছে নিজের প্রজননস্থল হিসাবে গঙ্গাকে অযোগ্য মনে করায়। অথবা পরিযান-জনিত শারীরবৃত্তীয় কষ্ট অপেক্ষাকৃত বেশি হওয়ায় তারা পাড়ি দিচ্ছে অন্য নদীর অববাহিকায়। কিন্তু প্রশ্ন হল, কেন তারা পরিহার করতে চাইছে গঙ্গাবক্ষকে? বিভিন্ন পত্রপত্রিকার আলোচনায় বা বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী ‘ছোট ইলিশ শিকার’ ও ‘নদী দূষণই’ হল ইলিশের গঙ্গাপ্রাপ্তির প্রধান কারণ। এই দুই কারণকে কোনওমতেই অস্বীকার করা যায় না। তবু মনে খটকা লাগে, ছোটবেলাতে দেখেছি খোকা ইলিশ বিকোচ্ছে অহরহ— অনেক বেশি পরিমাণেই। কিন্তু তাও ইলিশের অভাব হতে দেখিনি। যদিও দূষণ বেড়েছে অনেকটাই। বিশেষ করে প্লাস্টিক দূষণ। এটা পরীক্ষালব্ধ সত্য যে প্লাস্টিক প্রজননের অন্তরায়। প্রাণীর যৌন হরমোন ক্ষরণের তারতম্য ঘটায় প্লাস্টিক কণা ও প্লাস্টিকে ব্যবহৃত অন্য যৌগ। তাই দূষণ অবশ্যই দায়ী। গঙ্গার রুপোলি ফসলের গঙ্গাপ্রাপ্তির ব্যাপারটা মনন করতে গিয়ে বুঝলাম, আসলে গঙ্গাই তো এগিয়ে চলেছে গঙ্গাপ্রাপ্তির দিকে! ভাবুন তো, আগের শতাব্দীতে গঙ্গার যা নাব্যতা বা গভীরতা ছিল, এখন কি তা আছে? নিশ্চয়ই না। অর্থাৎ গঙ্গার নাব্যতা কমার সঙ্গে ইলিশও কমেছে গঙ্গাবক্ষে। এবার ইলিশের প্রজননের সঙ্গে ব্যাপারটা মেলানো যাক। 
গঙ্গায় ইলিশ মাছ বছরে দুবার প্রজনন করে। এপ্রিল-মে ও সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস নাগাদ। গভীর সমুদ্রের অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা জলে অভ্যস্ত ইলিশ পরিযানের সময় এমনিতেই অনেক শারীরবৃত্তীয় প্রতিকূলতার মধ্যে থাকে। তাই গরমকালে নদীতে ঢোকার সময় তারা নদীর অনেক তলা দিয়ে যায় অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা জল পায় বলে। মৎস্যজীবীদের ফাঁদ নদীর ৩-৫ মিটার তলা পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। কিন্তু গরমকালে প্রায় ১২-১৪ মিটার নীচে দিয়ে যায় বলে ইলিশ খুব একটা ধরা পড়ে না। নির্বিঘ্নে প্রজনন সম্পন্ন করে ফিরে যায় সমুদ্রে। কিন্তু দিন দিন গঙ্গার গভীরতা কমায় ও দূষণের কারণে নদীর তলার জলও এখন অপেক্ষাকৃত গরম। এই কারণে ইলিশ এখন গঙ্গাবক্ষকে এড়িয়ে প্রজননের জন্য যাচ্ছে অপেক্ষাকৃত গভীর নদীতে। তাই গ্রীষ্মকালীন প্রজননের ফলে গঙ্গায় ইলিশের যে সংখ্যাধিক্য ঘটত, এখন তা আর হয় না। অর্থাৎ, গঙ্গার গঙ্গাপ্রাপ্তি ও ইলিশের গঙ্গাপ্রাপ্তি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং পরস্পর সংযুক্ত। উপরন্তু, বর্ষায় কম দামে পাওয়া যায়  বলে যে ছোট ইলিশ আমরা খাই সমস্ত নিয়ম লঙ্ঘন করে, তা কিন্তু বর্ষায় জন্ম নেওয়া ইলিশ নয়। এরা সমুদ্র থেকেও আসেনি। এই ইলিশের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই গঙ্গাবক্ষেই। এরা জন্মেছিল ওই এপ্রিল-মে মাসের প্রজননকালে। কিছুটা বেড়ে ওঠার পর তারা ফিরে যাচ্ছিল সমুদ্রে, যাতে পরিণত হয়ে আগামী বছর ফিরে আসতে পারে এই গঙ্গাবক্ষেই প্রজননের কারণে। কিন্তু আমাদের লোভ তা হতে দিল না। ভরা বর্ষায় ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টিতে জলের উপরিতলের তাপমাত্রাও হয়ে ওঠে মনোরম। তাই ইলিশ তখন অনায়াসে বিচরণ করতে পারে জলের উপরিতলেও। এই সময় প্রজননের জন্য নদীতে ঢোকা পরিণত মাছ ও সমুদ্রে ফিরতে থাকা খোকা ইলিশ উভয়ই ধরা পরে মৎস্যজীবীদের জালে। অধিকাংশ পূর্ণবয়স্ক ইলিশ ডিম পাড়ার আগেই ধরা হয় বলে আগামী প্রজন্মের ইলিশ সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকে ক্রমশ। বর্তমানে বিশ্ব উষ্ণায়ন, নাব্যতা হ্রাস ও দূষণ— এই ত্র্যহস্পর্শে বর্ষাকালেও গঙ্গার জল অপেক্ষাকৃত উষ্ণ হয়ে উঠছে ক্রমশ। তাই ইলিশ এড়িয়ে যাচ্ছে অগভীর, দূষিত ও অপেক্ষাকৃত উষ্ণ গঙ্গাবক্ষকে। ফলে গঙ্গার ইলিশের গঙ্গাপ্রাপ্তি হচ্ছে ত্বরান্বিত। 
তাহলে কি গঙ্গার ইলিশ প্রাপ্তির সম্ভবনা একেবারেই নেই? সরাসরি উত্তর দেওয়া ভীষণই কঠিন। গঙ্গার ইলিশ প্রাপ্তির সম্ভাবনা নির্ভর করছে আমাদের লোভ নিয়ন্ত্রণ, সরকারি উদ্যোগ ও বিজ্ঞানীদের ফলপ্রসূ প্রয়াসের উপর। নাগরিক সচেতনতা অন্যান্য প্রাণী বা উদ্ভিদের সংরক্ষণে ফলপ্রসূ হলেও ইলিশের ক্ষেত্রে তা ফলদায়ী হবে না বলেই মনে হয়। এক্ষেত্রে ইলিশের স্বাদ আর দাম হল প্রধান অন্তরায়। রসনা তৃপ্তির লোভ অধিকাংশ ক্ষেত্রে জয়ী হয় বলেই সচেতন নাগরিকও কম দামে খোকা ইলিশ কিনে বাড়ি ফেরেন। 
সরকারি উদ্যোগ ও অনুদান গঙ্গা ও তার রুপোলি ফসল সংরক্ষণে ভীষণই জরুরি। নদীর নাব্যতা বা গভীরতা বজায় না রাখলে ইলিশের পরিযান কমতেই থাকবে। ফলে, এরপর খোকা ইলিশও আর জুটবে না বাঙালির কপালে। তাই ভবিষ্যতে গঙ্গার ইলিশপ্রাপ্তির প্রধান শর্তই হল নাব্যতা বজায় রাখা, যা সরকারি উদ্যোগ ছাড়া কোনওমতেই সম্ভব নয়। ইলিশ ধরা সংক্রান্ত আইনকানুন প্রয়োগের ব্যাপারটাও পুরোপুরি সরকারি সদিচ্ছার উপর নির্ভরশীল। অন্তত ইলিশের প্রজননকালে সরকারের বেঁধে দেওয়া সময়ে ইলিশ ধরা বন্ধ আছে কি না— এটা দেখভাল করাটা ভীষণ জরুরি। এছাড়া দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত আইনগুলির প্রতিপালন করাটাও সরকারি কর্তব্য। কেননা এক্ষেত্রে নাগরিক সচেতনতা যথেষ্ট নয় বলেই মনে হয়। 
গঙ্গায় ইলিশ প্রাপ্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হিসাবে অনেকে কৃত্রিম প্রজননের কথা বলেন। এ প্রসঙ্গে বলি, বিজ্ঞ্যানীরা ইলিশের কৃত্রিম প্রজননে সফল। তাঁদের নিরলস প্রচেষ্টায় বর্তমানে কল্যাণী, কাকদ্বীপ ও ব্যারাকপুরে চলছে পুকুরে ইলিশ চাষ। কিন্তু পুকুরে ইলিশ চাষ মানে তো আর গঙ্গার ইলিশপ্রাপ্তি নয়! পুকুরের ইলিশ বাঙালির ইলিশ ভক্ষণের প্রত্যাশা হয়তো মেটাবে, কিন্তু ইলিশের স্বাদ আহরণের প্রত্যাশা তাতে মিটবে না বলেই মনে হয়। তার কারণ, ইলিশের অপূর্ব স্বাদনির্ভর করে শরীরে সঞ্চিত ওমেগা- ৩ শ্রেণির ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণের উপর। কেবলমাত্র পরিযানের আগে সঞ্চিত শক্তি-ভাণ্ডার হিসাবে ইলিশের শরীরে অধিক পরিমাণে এই ফ্যাটি অ্যাসিড জমা হয়। তাই পুকুরে বেড়ে ওঠা ইলিশের পরিযান সম্ভব না হওয়ায় এই ফ্যাট জমা হওয়া নিয়ে থাকছে প্রশ্নচিহ্ন। যদিও বিজ্ঞ্যানীরা আশ্বাস দিচ্ছেন যে পুকুরের ইলিশের স্বাদ থাকবে অপরিবর্তিত। 
কৃত্রিম প্রজননের সফলতাকে একটু অন্যরকমভাবে কাজে লাগালে গঙ্গায় খোকা ইলিশের জোগান বাড়তে পারে। গ্রীষ্মকালীন ও বর্ষা-পরবর্তী প্রজননের সময়ে বিজ্ঞ্যানীদের সাহায্যে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ইলিশ পোনা (জটকা) তৈরি করে গঙ্গায় ছাড়া যেতে পারে। একটা ইলিশ থেকেই দেড়-দু লাখ জটকা উৎপাদন করা যায়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতি বছর কোটি কোটি ইলিশ পোনা গঙ্গায় ছাড়া সম্ভব। এই পোনা প্রতিকূলতা সইতে সইতে খোকা-ইলিশ হয়ে ফিরে যেতে পারে সমুদ্রে। যদিও পূর্ণবয়স্ক হয়ে তারা জন্ম-জলে ফিরবে কি না সে নিশ্চয়তা নেই। 
তাই গঙ্গায় ইলিশপ্রাপ্তি তখনই সম্ভব হবে যদি গঙ্গাকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। গঙ্গার নাব্যতা বাড়িয়ে ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ করে গঙ্গাকে সজীব রাখতে পারলেই ইলিশ ফিরবে গঙ্গায়। আবারও বলি, ইলিশ বিলুপ্ত হচ্ছে না, প্রজননস্থল হিসাবে গঙ্গাবক্ষকে আর যোগ্য মনে না করায় গঙ্গা-অববাহিকা  পরিহার করছে মাত্র। তাই গঙ্গাকে ইলিশের প্রজননের জন্য যোগ্য করে তুলতে পারলেই গঙ্গার ইলিশপ্রাপ্তি সম্ভব।
লেখক জীববিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়

30th     October,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021