বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

টিম ইন্ডিয়া – প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই
নরেন্দ্র মোদি

২১ অক্টোবর, ২০২১। ভারত ১০০ কোটি ডোজ টিকাকরণ সম্পন্ন করল। টিকাকরণ কর্মসূচি শুরুর মাত্র ন’মাসের মধ্যেই এল এই সাফল্য। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় এ এক দুরূহ যাত্রা! বিশেষত ২০২০ সালের গোড়ার দিকে কী পরিস্থিতি ছিল, তা ফিরে দেখলেই আমরা বুঝতে পারব। ১০০ বছর বাদে মানব সমাজ আরও এক অতিমারির কবলে। এবং কেউ বিশেষ কিছু জানতও না এই ভাইরাস সম্পর্কে। মনে পড়ে, কেমন এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল সেই সময়! দ্রুত চরিত্র বদল করা এক অজানা, অদৃশ্য শত্রুর মুখোমুখি হয়েছিলাম আমরা। 
সেই আশঙ্কা থেকে আশ্বাসের পথে যাত্রার সূচনা হল। ক্রমে বিশ্বের বৃহত্তম টিকাকরণ অভিযানের সুবাদে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠল আমাদের দেশ।
সমাজের একাধিক অংশকে সঙ্গে নিয়ে এটা সত্যিই ভগীরথের মতো এক প্রয়াস। চেষ্টার মাত্রাটা বুঝতে গেলে একটা ছোট্ট তথ্য জেনে রাখা দরকার। প্রতিটি টিকা দিতে একজন স্বাস্থ্যপরিষেবা কর্মীর সময় লাগে ২ মিনিট। সেই অনুযায়ী এই সাফল্যে পৌঁছতে লেগেছে প্রায় ৪১ লক্ষ মানব-দিবস অথবা আনুমানিক ১১ হাজার মানব-বর্ষের চেষ্টা। 
বড় মাত্রার যে কোন প্রয়াসে দ্রুত সাফল্য অর্জন করতে হলে সবার আস্থা অর্জন অত্যন্ত জরুরি। এই অভিযানের সাফল্যের অন্যতম কারণ সেটাই। এই টিকাকরণ এবং তার পরবর্তী প্রক্রিয়ার উপর আস্থা রেখেছে মানুষ। যদিও অনাস্থা এবং আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা কম হয়নি। 
আমাদের মধ্যে কেউ কেউ শুধুমাত্র বিদেশি ব্র্যান্ডে আস্থা রাখেন। এমনকী সেটা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ক্ষেত্রেও। তবে, কোভিড-১৯ টিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভারতবাসী সর্বসম্মতিক্রমে আস্থা রেখেছে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ ভ্যাকসিনের উপর। এটা এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। 
নাগরিক এবং সরকার যদি একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে জন ভাগিদারীর আদর্শকে সামনে রেখে এক হয়ে যায়, তাহলে ভারত যে কী করতে পারে এই টিকাকরণ অভিযান তার একটি উদাহরণ। ভারত যখন টিকাকরণ অভিযান শুরু করে, তখন অনেকেই ১৩০ কোটি মানুষের ক্ষমতা সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন। কেউ বলেছিলেন, তিন-চার বছর সময় লাগবে ভারতের। কারও কারও দাবি ছিল, মানুষ টিকা নিতে এগিয়ে আসবেন না। এমনও অনেকে ছিলেন, যাঁরা বলেছিলেন, গোটা বিষয়টি অব্যবস্থার চূড়ান্ত হবে এবং টিকাকরণ প্রক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। এমনকী কেউ কেউ তো এও বলেছিলেন যে, ভারত সরবরাহ শৃঙ্খল অটুট রাখতে পারবে না। কিন্তু জনতা কারফিউ এবং তার পরবর্তী লকডাউনের মতোই ভারতবাসী দেখিয়ে দিয়েছে, তাঁদের আস্থাভাজন অংশীদার করে তোলা গেলে কী অভাবনীয় ফলই না হতে পারে।
যখন সকলে এগিয়ে আসেন, তখন অসম্ভব বলে কিছুই থাকে না। আমাদের স্বাস্থ্যপরিষেবা কর্মীরা পাহাড়ে চড়ে, নদী পেরিয়ে দুর্গম জায়গায় পৌঁছে গিয়েছেন মানুষকে টিকা দিতে। ভারতে টিকা নিয়ে অনাগ্রহীর সংখ্যা ছিল বেশ কম, যা অনেক উন্নত দেশেও দেখা যায়নি। তার জন্য আমাদের যুব সমাজ, সমাজকর্মী, স্বাস্থ্য পরিষেবা কর্মী, সামাজিক এবং ধর্মীয় নেতাদের প্রত্যেকেরই অভিনন্দন প্রাপ্য। 
টিকাকরণ অভিযানে অগ্রাধিকার চেয়ে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বিভিন্ন রকম চাপ ছিল। কিন্তু সরকার এটা নিশ্চিত করেছে যে, অন্য অনেক কর্মসূচির মতো টিকাকরণ অভিযানেও কোন ভিআইপি সংস্কৃতি থাকবে না। 
২০২০-র গোড়ায় যখন কোভিড-১৯ বিশ্বজুড়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে, তখন থেকেই আমাদের কাছে এটা পরিষ্কার ছিল যে, টিকার সাহায্য নিয়ে এই অতিমারির মোকাবিলা করতে হবে। সেইমতো আমরা প্রস্তুতি শুরু করে দিই। বিশেষজ্ঞ গোষ্ঠী গঠন করি। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকেই একটি রোডম্যাপ সাজিয়ে ফেলি।
আজ পর্যন্ত হাতেগোনা কয়েকটি দেশই নিজেরা টিকা তৈরি করতে পেরেছে। ১৮০টিরও বেশি রাষ্ট্র সম্পূর্ণভাবে কয়েকটি মাত্র উৎপাদকের ওপরেই নির্ভরশীল। বেশ কিছু দেশ এখনও টিকা হতে পাওয়ার অপেক্ষায়। সেখানে ভারত ১০০ কোটি ডোজের মাত্রা অতিক্রম করে গিয়েছে! একবার পরিস্থিতিটা ভাবুন—যদি ভারতের নিজস্ব টিকা না থাকত, তাহলে ভারত কীভাবে এই বিশাল জনসংখ্যার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ ভ্যাকসিন সংগ্রহ করত? এবং তার জন্য কত বছর সময় লাগত? এখানেই অভিনন্দন জানাতে হয় ভারতীয় বিজ্ঞানী এবং উদ্যোগপতিদের, যাঁরা সময়মতো এগিয়ে এসেছেন। তাঁদের প্রতিভা এবং কঠোর পরিশ্রমের জন্যই আজ টিকার ক্ষেত্রে ভারত সত্যিকারের আত্মনির্ভর হয়ে উঠেছে। আমাদের টিকা নির্মাতারা এই বিশাল জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে উৎপাদনও বাড়িয়েছেন, যার থেকে প্রমাণ হয়েছে যে তারা অদ্বিতীয়। 
যে দেশে সরকারকে সাধারণত এগিয়ে চলার পথে বাধা হিসেবে ধরা হয়, সেখানে আমাদের সরকার প্রগতিকে গতি দিয়েছে এবং নিশ্চিত করেছে। প্রথম দিন থেকেই টিকা প্রস্তুতকারকদের পাশে থেকেছে সরকার। প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, অর্থদানের পাশাপাশি বিধিনিয়ম প্রক্রিয়ার গতি এনে সাহায্য করেছে। সরকারের সব মন্ত্রক একসঙ্গে টিকা প্রস্তুতকারকদের পাশে দাঁড়িয়েছে। অপসারণ করা হয়েছে যে কোনও বাধা। ভারতের মতো বিশাল দেশে শুধু টিকা প্রস্তুত করাই যথেষ্ট নয়। নজর দিতে হয়েছে শেষ বিন্দু পর্যন্ত তা পৌঁছনো এবং বাধাহীন লজিস্টিকসের উপর। যে সমস্যাগুলি ছিল, তা বুঝতে হলে ভ্যাকসিনের একটি ভায়ালের যাত্রার কথাটা ভাবুন। পুনে অথবা হায়দরাবাদের একটি কারখানা থেকে ভায়াল পাঠানো হয় যে কোনও রাজ্যের একটি হাবে। সেখানে থেকে সেটি জেলার হাবে যায়। সেই হাব থেকে তা পৌঁছে দেওয়া হয় টিকাকরণ কেন্দ্রে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিমান অথবা ট্রেনে কয়েক হাজার ট্রিপ। এই সম্পূর্ণ যাত্রাপথে টিকার ভায়াল একটি নির্দিষ্টমাত্রায় তাপমাত্রায় রাখতে হয়, যা কেন্দ্রীয়ভাবে তত্ত্বাবধানে থাকে। এর জন্য ১ লক্ষের বেশি কোল্ডচেন উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। আগেভাগেই টিকা সরবরাহের সূচি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে রাজ্যগুলিকেও। যাতে তারা ভালোভাবে সব পরিকল্পনা করতে পারেন এবং টিকাও পূর্বনির্ধারিত দিনেই তাদের কাছে পৌঁছয়। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এ এক অভূতপূর্ব প্রয়াস। 
এই সমস্ত প্রয়াসকে সাহায্য করেছে কো-উইনের মতো একটি শক্তিশালী টেক প্ল্যাটফর্ম। টিকাকরণ অভিযান যাতে সুষ্ঠু ও সঠিক মাত্রায় হয়, যাতে নজর রাখা যায় এবং স্বচ্ছতা বজায় থাকে—তা নিশ্চিত করেছে কো-উইন। এর ফলে স্বজনপোষণ বা লাইন ভেঙে আগেভাগে যাওয়ার কোন জায়গাই ছিল না। একজন গরিব শ্রমিক নিজের গ্রামে প্রথম ডোজটি নিলেও নির্ধারিত সময়ের ব্যবধানে যাতে শহরের কর্মস্থলে এসে দ্বিতীয় ডোজটি নিতে পারেন, সেটাও নিশ্চিত করা হয়েছে। স্বচ্ছতা বাড়াতে রিয়েল টাইম ড্যাশবোর্ডের পাশাপাশি দেওয়া হয়েছে কিউআর কোড দেওয়া সার্টিফিকেট। যাতে পরিচিতি সম্পর্কে নিশ্চয়তা মেলে। এই ধরণের প্রয়াসের নজির শুধু ভারতেই নয়, সারা বিশ্বে বিরল। 
২০১৫ সালে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে আমি বলেছিলাম যে, আমাদের দেশ সামনের দিকে এগচ্ছে ‘টিম ইন্ডিয়া’-র জন্য। এই ‘টিম ইন্ডিয়া’ আমাদের ১৩০ কোটি মানুষের একটি বড় দল। মানুষের অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমরা যদি ১৩০ কোটি ভারতীয়ের অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশ চালাই, তাহলে দেশ প্রতি মুহূর্তে ১৩০ কোটি পা এগিয়ে যাবে। আমাদের টিকাকরণ অভিযান আরও একবার দেখাল এই ‘টিম ইন্ডিয়া’-র ক্ষমতা। টিকা কর্মসূচিতে ভারতের সাফল্য সারা বিশ্বকে এও দেখাল যে, ‘গণতন্ত্র করে দেখাতে পারে’!
বিশ্বের বৃহত্তম টিকাকরণ অভিযানে যে সাফল্য পাওয়া গিয়েছে, তা আমাদের যুব সমাজ, উদ্ভাবক এবং সরকারের সব স্তরকে জনপরিষেবায় নতুন মাত্রা পৌঁছতে উৎসাহিত করবে বলেই আমি আশাবাদী। আর সেটা শুধু আমাদের দেশ নয়, সারা বিশ্বের কাছে হয়ে উঠবে একটি মডেল। 

22nd     October,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021