বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

দু’টো ডোজ মানেই
বিশল্যকরণী নয়
শান্তনু দত্তগুপ্ত

ডাবল ডোজ। এ এক মহা কেলেঙ্কারির হাল ফ্যাশান। খবরের কাগজে দিস্তা দিস্তা লেখা চলছে, এই ৫০ কোটি মানুষের টিকাকরণ হয়ে গেল। আর একটু... তাহলেই ১০০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। আর তারপরই মহামান্য বিজেপি সরকার তাথৈ তাথৈ করে নাচবে। সেই মর্মে রীতিমতো কর্মসূচি সাজানো শুরু হয়ে গিয়েছে! ১০০ কোটি করোনা টিকা ছুঁচে ভরে শরীরে চালান করে দিলেই হল। সে এক মেগা ইভেন্ট। জো হুজুর ভারত সরকারই যদি এমন পাহাড়প্রমাণ ঢাক বাজানোর উৎসবে কাঠি দেয়, মানুষের দোষ কী! সে তো ভাবতেই পারে, টিকা নিলেই কেল্লা ফতে। বেরিয়ে পড়ো ‘রিভেঞ্জ ট্যুরিজমে’। ঝাঁকে ঝাঁকে ভিড় জমাও পুজো মণ্ডপে। তবেই না মনের শান্তি... চোখের শান্তি! মাসখানেক যাবৎ অনলাইন-অফলাইনে দেদার শপিং হয়েছে। পুজোয় বেরতে না পারলে যে সবটাই মাটি। তাই যেতেই হবে প্যান্ডেলে। একদিন রইল উত্তরের জন্য... আর একদিন দক্ষিণ। তাতেই ম্যানেজ হয়ে যাবে। মাস্ক? বালাই নেই! ‘এত সুন্দর সেজেগুজে বেরব, মাস্ক পরলেই যে চোনা পড়ে যাবে। আর ডাবল ডোজ নেওয়ার পর মাস্ক কেন পড়ব? আমেরিকায় তো কত জায়গাতেই বলে দিয়েছে, দু’টো ডোজ নেওয়া থাকলে মাস্ক পরতে হবে না। এখানে আলাদা হবে কেন?’ বলছিলেন এক কিশোরী। উল্টোডাঙা ব্রিজ পেরিয়ে পদব্রজে চলেছেন তিনি শ্রীভূমি স্পোর্টিংয়ের উদ্দেশে। সঙ্গে মেলা সাঙ্গোপাঙ্গ। চোখ তুলে সামনের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্রিগেড সভা রয়েছে যেন! ফারাকটা হল, এটা কোনও প্যারেড গ্রাউন্ড নয়। সাধারণ মানুষের যাতায়াতের পথ। আর দিনটা সপ্তমী। কেউ যাচ্ছেন এয়ারপোর্ট... দেড় ঘণ্টা হয়ে গেল, অ্যাপোলো হাসপাতালের সামনে থেকে সবে উল্টোডাঙা পৌঁছেছেন তিনি। আর আধ ঘণ্টার মধ্যে না পৌঁছতে পারলে বিমান তাঁর জন্য অপেক্ষা করবে না। ঠিক পাশের লেনে দাঁড়িয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্স। চালকের পাশের আসনে বসা প্রৌঢ় ভদ্রলোক দু’চোখ ভরা উদ্বেগ নিয়ে মাথাটা বের করে দিয়েছেন জানালার বাইরে। প্রশ্ন একটাই, আর কতক্ষণ? আধ কিলোমিটারের মধ্যে খান তিনেক এমন অ্যাম্বুলেন্স নজরে এল। এঁরা কি পুজো দেখতে বেরিয়েছেন? সবাই কি পুজো দেখতেই বেরচ্ছেন? না। তা নয়। উৎসবের আনন্দ ততক্ষণই, যতক্ষণ তা অন্যের ক্ষতির কারণ হয়ে না দাঁড়াচ্ছে। 
করোনা বিদায় নেয়নি। তা সত্ত্বেও আনন্দে মেতেছেন এঁরা... পুজো কমিটির ধারক ও বাহকেরা। তাঁরা প্রভাবশালী। তাই ২০০৯ সালের কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ হেলায় অমান্য করতে পারেন। আদালত তো জানিয়েই দিয়েছিল, কোনওভাবে মণ্ডপের উচ্চতা যেন ৪০ ফুট না ছড়ায়। তা সত্ত্বেও বছরের পর বছর বহু পুজো কমিটি ইচ্ছেমতো প্রভাব খাটিয়ে চলেছে। বেড়ে চলেছে প্যান্ডেলের উচ্চতা। থিম হচ্ছে...। আমাদের রাজ্য সরকারের পরিকাঠামো অনুযায়ী, আগুন লাগলে ১৫০ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত জল দিতে পারে দমকল। কিন্তু মণ্ডপের উচ্চতা যদি ১৪৫ ফুট হয়? সেই আগুন কত দ্রুত ছড়াবে, আর তাতে দমকলের পক্ষে আদৌ জল দেওয়া সম্ভব হবে কি না, সেই অঙ্ক পুজো প্ল্যানিংয়ের সময় কেন কষে নেওয়া হবে না? এটা কি দায়বদ্ধতার নমুনা? আসলে, এক একটা পুজো কমিটির নেপথ্যে এক একজন প্রভাবশালী। আর প্রত্যেকেই লেগে পড়েছেন কম্পিটিশনে। একজন অন্যজনের ঘাড়ে দোষ ঠেলে চলেছেন... অমুক পুজোয় তো ৬০ ফুট উঁচু প্যান্ডেল হয়েছে! তমুক প্রভাবশালী ৪৫ ফুটের মণ্ডপ করেছে। তার বেলা? কেউ যদি ৪০ ফুটের উপর মণ্ডপ তৈরি করেই থাকেন, তাহলে প্রশাসন কেন ব্যবস্থা নেয়নি? কেন সেই মণ্ডপের বাড়তি অংশ ভেঙে দেওয়া হয়নি? এই সবটাই তো মানুষের স্বার্থে, যে কোনও রকম বিপদ এড়ানোর উদ্দেশ্যে? দোষ চাপালেই কি প্রশাসনিক কর্তব্য মিটে যায়? ভিড়ের দাপটে একটি পুজোয় জনতার প্রবেশ অষ্টমীর রাত থেকে বন্ধ করে দেওয়া হল। তার আগের পাঁচদিনে কিন্তু যা হওয়ার হয়েই গিয়েছে। তৃতীয়া থেকে ঢল নেমেছে রাস্তায়। কোভিড বিধি রয়েছে... আছে তার ফাঁকও! সেই ফাঁক খুঁজেই জনতাকে ‘দর্শনের সুযোগ’ করে দেওয়া হয়েছে নিরন্তর। যুক্তি কী? এক পুজো কমিটির কর্তা বলছিলেন, ‘হাইকোর্ট তো বলেছে মণ্ডপের ভিতর ভিড় জমানো যাবে না। তা তো হয়নি! বাইরে ভিড় হলে আমরা কী করব?’ কিন্তু তাঁরাই তো সুচারুভাবে প্যান্ডেলের একপাশটা খোলা ছেড়ে রেখেছেন। মানুষও বাঁধভাঙা জলের মতো ছুটে গিয়েছে থিম দেখার নেশায়, ভিড় করেছে, ধাক্কাধাক্কি হয়েছে... আর ছুটি নিয়েছে সামাজিক দূরত্ব। যেন একটা এই ক’টা পুজো না দেখলে জীবনই বৃথা! মুচকি হেসেছে নিয়তি। কারণ, এই ক’দিনে রাজ্যে করোনা সংক্রমণ বেড়ে চলেছে... ধীরে ধীরে। সরকারি হিসেব বলছে, ১৭ অক্টোবর রাজ্যে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ৬২৪। মৃত্যু ১৪। ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ ১৬ অক্টোবর সংক্রামিত হয়েছিলেন কিন্তু ৪৪৩ জন। অর্থাৎ একদিনেই আক্রান্ত বেড়েছে ১৮১। এই পরিসংখ্যান কি যথেষ্ট উদ্বেগজনক নয়? সবচেয়ে বড় কথা, পুজো মিটেছে সদ্য। যাঁরা প্রকৃতির বিরুদ্ধে ‘প্রতিশোধ’ নেওয়ার লক্ষ্যে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন, সেই পুজোপিপাসুরা এখনও হাতেনাতে ফল পাননি। কারও সবেমাত্র উপসর্গ দেখা দিয়েছে, কেউ অপেক্ষায় রয়েছেন তিনদিন সম্পূর্ণ হওয়ার। তারপর টেস্ট করাবেন। কেউ কেউ তো আবার করোনা পরীক্ষার ধারেকাছেও যাবেন না। ডাক্তারকে ফোন করে ওষুধ জেনে নেবেন। সেই মতোই চলবে চিকিৎসা। একান্তই না পারলে গন্তব্য হাসপাতাল! কিন্তু করোনা সেই সময়টা দেবে তো? 
আতঙ্ক বাড়ছে... তৃতীয় ঢেউয়ের। কেরলে ওনাম উৎসবের ঠিক পরেই একদিনে নতুন করোনা সংক্রমণ ছিল ৩১ হাজার ৪৪৫। পজিটিভিটির হার ১৯.০৩ শতাংশ। তখন আমরা আলোচনা করেছি... আতঙ্কিত হয়েছি। আর চায়ের পেয়ালায় তুফান তুলে তখন আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু কী ছিল? পুজো আসছে... সতর্ক হওয়া চাই। না হলে কেরলের দশা হবে আমাদেরও। কিন্তু আমরাও বোধ হয় এখন মোদিজিতে অনুপ্রাণিত... কথায় আছি। কাজে নেই। পুজোর ঢাকে কাঠি পড়া মাত্র কেরল ভুলেছি আমরা। ওনামের করোনা কাণ্ড যেন আদিম যুগের কথা! আগে এই পুজোটা তো এনজয় করি! মাথা খাটিয়ে আমরা শব্দবন্ধটা বের করেছি বটে... ‘রিভেঞ্জ ট্যুরিজম’। দেড় বছর ধরে প্রকৃতি আমাদের বাড়িতে বসিয়ে রেখেছে। আর এখন আমরা চ্যালেঞ্জ ছুড়েছি তাকে... আমাদের কাছে ডাবল ডোজ আছে। আর প্রকৃতি কিছুই করতে পারবে না। কাঁচকলা দেখিয়ে ড্যাংড্যাং করে আমরা ঘুরব, ফিরব, ফুচকা খাব। এই না হলে পুজোর আনন্দ! পুজো কমিটির হর্তাকর্তারাও সুযোগ নিয়েছেন তারই। ভিড় একটু বেশি হলেই অজুহাত রেডি, ‘ওরা তো পাড়ার লোক।’ এক একটা পাড়ায় যে এত লোক থাকতে পারে, তা এই পুজোতেই আমরা আবিষ্কার করলাম। অঞ্জলি থেকে সিঁদুর খেলা—সর্বত্রই ঠেলাঠেলি। মাস্ক পরলে আবার মা দুর্গা ঠিক মতো অঞ্জলির মন্তর শুনতে পাবে না। সিঁদুর খেলা তো যাবেই না! তাই, চালিয়ে যাও মহাশয়।  
দায়টা কার? এটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন। কলকাতা হাইকোর্ট নির্দেশ দেবে। সেটা কাজে লাগানোর দায়িত্ব প্রশাসনের, পুজো কমিটিগুলোর। তা কি হয়েছে? পুলিসও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যেন ঠুঁটোর ভূমিকায়। এক পুলিসকর্মী বলছিলেন, ‘এত লোক... কী করব? লাঠি চালাব নাকি?’ না, লাঠি আপনি অবশ্যই চালবেন না। কিন্তু ম্যানেজমেন্ট বলে তো একটা বস্তু আছে! সেটাও কি করা যেত না? যাওয়া-আসার সব পথই মণ্ডপমুখী। সব পাগলই যেন মত্ত মাদল বাজিয়ে ছুটে চলেছে... চলেছে। পুজোয় তাদের সব ভালো... সস্তা ভালো, দামিও ভালো... কাঁসিও ভালো, ঢাকও ভালো। কিছু একটা তো হচ্ছে! ওতেই হবে। ওই ছেলেটাও পুজোয় এসেছিল কলকাতায়। বাবা আর কাকার হাত ধরে। ওরা ঢাক বাজাবে, আর ছেলেটা কাঁসর। কলকাতার পুজো নয়, পেটের টান নিয়ে এসেছিল তাকে এই শহরে। তাও দশমী হতে না হতেই তার বাড়ি যাওয়ার বায়না। এই ভিড়ে সে আর চায় না থাকতে। সে জানে, করোনা বলে একটা রোগ তার স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে। এই রোগ ভিড়েই ছড়ায়। তাই আর নয়...। 
আট বছরের একটা শিশুও বোঝে এই রোগের জ্বালা। আর আমাদের মতো বুড়ো খোকারা...?

19th     October,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021