বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

‘কারবার শুধু সরকারগুলির সঙ্গে’
পি চিদম্বরম 

শিরোনামের চারটি শব্দে (কারবার শুধু সরকারগুলির সঙ্গে) বিতর্কটাকে বাঁধা উচিত। রাজনৈতিক নেতা (বিরোধী সদস্য এবং মন্ত্রীরা), বিচারপতি, আমলা, ছাত্র, নাগরিক আন্দোলনের কর্মী, সাংবাদিক এবং ব্যবসায়ীদের উপর নজরদারিতে স্পাইওয়্যার ব্যবহার নিয়ে যে বিতর্ক দানা বেঁধেছে, কথাটা বলছি সেই প্রসঙ্গে। এনএসও গ্রুপের লিখিত বিবৃতিতে শব্দ চারটি রয়েছে। আমরা জানি, অনিষ্টকারী স্পাইওয়্যার পেগাসাস-এর নির্মাতা ও মালিক হল এনএসও গ্রুপ। এনএসও গ্রুপ আগে একটা বিবৃতিতে বলেছিল যে, ‘‘এনএসও তার প্রযুক্তি বিক্রি করে কেবলমাত্র বিশ্বস্ত বলে গণ্য সরকারের তরফে আইন প্রয়োগে নিযুক্ত এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে।’’ তারপরেই নতুন এই বিবৃতিটা দিল তারা। 
এনএসও গ্রুপ, একই সঙ্গে, তার ক্লায়েন্ট বা সরকারের তরফে স্পাইওয়্যারের প্রকৃত ব্যবহার থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছে। কারণ, কিছু ক্লায়েন্ট-গভর্নমেন্ট এই স্পাইওয়্যারের অপব্যবহার করে থাকতে পারে। ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু প্রশ্ন রয়েছে। তার তালিকা দেওয়ার আগে একটা সতর্কবার্তা এই যে, যারা সক্রেটিসকে কিংবা যুক্তি বা যুক্তিপূর্ণ বিতর্ক অপছন্দ করে, অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো তাদের জন্য নয়। বাকিদের জন্য প্রশ্নগুলো হল: 
কোনও সরাসরি উত্তর নেই
১. ভারত সরকার অথবা তার কোনও এজেন্সি কি এনএসও গ্রুপের ক্লায়েন্ট? 
এটা একটা সোজা-সাপ্টা প্রশ্ন। এর উত্তর হতে পারে কেবলমাত্র হ্যাঁ অথবা না। কিন্তু দুর্বোধ্য কিছু কারণে সরকার সরাসরি উত্তর দিতে অস্বীকার করল। সরকার উত্তর দিতে অস্বীকার করার কারণেই সন্দেহ উত্তরোত্তর বেড়ে চলছে। 
২. আন্তর্জাতিক তদন্তের ভিত্তিতে দি ওয়্যার-এর রিপোর্টে প্রকাশ যে, ‘এনএসও গ্রুপের একটা ভারতীয় ক্লায়েন্ট’ ছিল। এই রিপোর্টের কারণে সরকারের সম্ভাব্য জবাব দেওয়া কঠিন হয়ে গিয়েছে। এখন প্রশ্ন হল, এদেশের ক্ষেত্রে ক্লায়েন্ট ভারত সরকার না-হয়ে থাকলে এই ক্লায়েন্টটা তবে কে?
সরকার বলতেই পারত, ‘আমরা ক্লায়েন্ট নই’। কিন্তু তার পিঠেই প্রশ্ন উঠত, ‘তাহলে, ভারতীয় ক্লায়েন্টটা কে?’  সরকার আরও বলতে পারত, ‘আমি জানি না’। তখন একটা প্রশ্ন উঠে যেত যে, ‘ভারতীয় ক্লায়েন্ট সম্পর্কে জানতে তুমি উদগ্রীব নও।’ জবাব যা-ই হোক না কেন, সেটা কীভাবে দেবে সরকার জানে না। কারণ, তাতে এমন একগুচ্ছ প্রশ্ন পীড়িত করবে যে তার জবাব গুছিয়ে ওঠা সরকারের পক্ষে কঠিন। 
৩. যদি ভারত সরকার অথবা তার কোনও এজেন্সি ক্লায়েন্ট হয়ে থাকে তবে কবে সে এই স্পাইওয়্যার পেয়েছিল?
খোলসা করার ব্যাপারে সরকার আত্মবিশ্বাসী হলে প্রথম প্রশ্নের জবাবে ‘না’ বলে দিতে পারত এবং এই প্রশ্নের উত্তরে বলে দিতে পারত ‘অপ্রাসঙ্গিক’। কিছু দুর্বোধ্য কারণে, এই প্রশ্নেরও সোজা-সাপ্টা জবাব দিতে সরকার ফের অস্বীকার করল। তার ফলে সন্দেহটা চড়চড় করে বেড়ে গিয়েছে। 
বিস্ময়কর নির্লিপ্তি
৪. অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং ফরবিডেন স্টোরিজ-এর তদন্ত ‘সন্দেহভাজনদের’ একটা দীর্ঘ তালিকা প্রকাশ করেছে। ওই তালিকাকে বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে আমরা আপাতত নজর রাখব সেই নামগুলোর উপরে প্রকৃতপক্ষে যাঁদের ফোনে আড়িপাতা (অভিযোগ অনুসারে) হয়েছে। ‘দি ওয়্যার’ অনুসারে, দুই মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব এবং প্রহ্লাদ প্যাটেলকেও তারা এর মধ্যে রেখেছে। এই ফাঁস হয়ে যাওয়া নিয়ে সরকার ভাবিত নয় কেন? 
নাগরিক হিসেবে আমরা জানতে চাই, মন্ত্রীদের ফোনেও আড়িপাতা হয়েছে কি না। নিরুদ্বিগ্নভাবের ভান করছে কেন সরকার? ২০১৭-১৯ পর্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা যে ডিভাইসগুলো ব্যবহার করেছিলেন, ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য সেগুলো সরকারকে জমা দিতে বলাটাই কি সঠিক পদক্ষেপ হতো না? সরকার কোনও উদ্বেগ প্রকাশ করেনি। এমনকী সত্য জানার ব্যাপারে সামান্য কৌতূহলও দেখা যায়নি তার মধ্যে। এই বিস্ময়কর নির্লিপ্তভাবই সরকারের উপর এক দীর্ঘ, গভীর সন্দেহের ছায়া বিস্তার করেছে। 
তদন্তের উপসংহার ক্রমে প্রকট হচ্ছে। সাবধানতাই মনে হচ্ছে মূল লক্ষ্য। সাবধানতা ও সতর্কীকরণের পিছনে ভারত সরকার গোপনই করতে চাইছে। এনএসও গ্রুপের ‘ভারতীয় ক্লায়েন্ট’ ছিল। ‘আড়িও পাতা হয়েছিল’ ভারতের কিছু ফোনে। এমন অপ্রিয় কোনও সত্য সাবধানতা ও সতর্কীকরণ নস্যাৎ করতে পারে না। আমার স্থির বিশ্বাস এই যে, ভারতীয় ক্লায়েন্ট মহোদয়ের নামটি শীঘ্রই সামনে চলে আসবে। এটাও সম্ভব যে ভারতীয় সন্দেহভাজনদের তালিকাভুক্ত আরও কিছু ফোন ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য তুলে দেওয়া হবে। আর সেই পরীক্ষার রিপোর্ট থেকে এটাও জানা যাবে যে পরীক্ষিত কিছু ফোনে স্পাইওয়ার দিয়ে আড়িপাতা হয়েছিল। তখন সরকার কী করবে? 
ভারত বনাম অন্যসব দেশ
পেগাসাস ফাঁস নিয়ে উদার গণতান্ত্রিক দেশ ফ্রান্স, কঠোর গণতন্ত্র ইজরায়েল এবং হাঙ্গেরির মতো সন্দেহজনক গণতন্ত্রের পাশে নরেন্দ্র মোদির সরকারের প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ উল্টো।  
অভিযোগটা, ফ্রান্স যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছে। তার ফলে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ একটি ইমার্জেন্সি সিকিউরিটি মিটিং ডাকেন এবং একগুচ্ছ তদন্ত শুরু করেছেন। ম্যাক্রঁ কথা বলেছেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনেটের সঙ্গে। এই বিষয়ে ইজরায়েল একটা তদন্ত করছে। বেনেট আশ্বাস দিয়েছেন, তদন্তে ইজরায়েল যা পাবে সেটা তিনি ফ্রান্সের সঙ্গে শেয়ার করবেন। তার অব্যবহিত পরেই ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেনি গাঞ্জ উড়ে গিয়েছিলেন ফ্রান্সে, খুব সম্ভব ফ্রান্সের ক্ষোভ প্রশমন করতে। 
এনএসও গ্রুপের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তাদের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলকে দিয়ে খতিয়ে দেখার জন্য ইজরায়েল একটা আদেশ জারি করেছে। ইজরায়েলের সরকারি কর্তাব্যক্তিরা এনএসও গ্রুপের অফিস ‘ভিজিট’ করেছেন, যেটাকে একটা তদন্তের সূচনা হিসেবেই দেখতে হবে।
হাঙ্গেরির ক্ষেত্রে দেখা গেল, তাদের বিচারমন্ত্রী বলেছেন, ‘প্রতিটা দেশের হাতে এই ধরনের হাতিয়ার থাকা প্রয়োজন’। কিন্তু পেগাসাস স্পাইওয়্যার নিয়ে তিনি কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন। অনেক বিরোধী নেতা, মেয়র এবং সাংবাদিকের ফোনে আড়িপাতা হয়েছে। 
সরকারের ইস্তফার দাবিতে শোনা গিয়েছে সরব কণ্ঠ। কিন্তু সরকার কর্ণপাতই করেনি। 
এবার আসা যাক ভারত প্রসঙ্গে। যে-কোনওরকম তদন্তের বিরোধিতা করেছে সরকার। এমনকী, সংসদে বিতর্কের দাবিটাও তারা নস্যাৎ করে দিয়েছে। সংসদীয় কমিটির একটা মিটিংয়ের হাজিরা খাতায় সই দিতে অস্বীকার করেন বিজেপি সাংসদরা এবং ওই উদ্যোগে তাঁরা বাধাও দেন। 
ভারত, এখন থেকে, হাঙ্গেরির গোত্রভুক্ত। আপনি তাতে গর্বিত কি?
 লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

2nd     August,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021