বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

মমতার গতিশীল রাজনীতির
টক্করে ব্যর্থ বিরোধীরা
সমৃদ্ধ দত্ত

 

মাধ্যমিক পরীক্ষার আড়াই তিনমাস পর ফলপ্রকাশ হতো আগে। এই ধরা যাক, আশি নব্বইয়ের দশকের কথা। এই যে এখন যেমন ফলপ্রকাশ যখনই হোক, পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরই একাদশ শ্রেণির টিউশন ক্লাস শুরু হয়ে যায়। পুরোদমে সেইসব টিউটোরিয়ালগুলোয় পড়ার চাপ আবার চালু হয়। এসব প্রচলন তখন খুব বেশি ছিল না। অন্তত কিছুটা শ্বাস ফেলে ছুটির এক অবকাশ ছিল। কিন্তু সেই অবকাশকে অযথা  নষ্ট না করে কিছু একটা করার পরামর্শ দিতেন অভিভাবকরা। যেমন স্পোকেন ইংলিশে ভর্তি হয়ে যা এই সময়টায়। অথবা একটা কম্পিউটার কোর্স করে নেওয়া যেতে পারে। তখন সবেমাত্র কম্পিউটার ঢুকছে। নিদেনপক্ষে শর্টহ্যান্ড টাইপিংটা শিখে নিতে পারিস। পরে কাজে লাগবে। সোজা কথায়, রেগুলার পড়াশোনা এবং পরবর্তী পরীক্ষাগুলিতে পাশ করার প্রতিযোগিতায় প্রবেশ করার আগে সময় নষ্ট না করে নিজেকে একটু এগিয়ে রাখা। একটু উন্নীত করার চেষ্টা। কোনও একটি এক্সট্রা কারিকুলামে ঢুকে পড়া। বলা হতো, জীবনের ধন যায় না ফেলা। যা কিছুই  শেখা যাক, কোনও না কোনও সময় কে বলতে পারে, হয়তো কাজে লেগে যাবে! অর্থাৎ অলস সময় যাপন করে, নিজেদের চলমানতাকে স্থবির করে রেখে, কবে কখন সময় আসবে, তার জন্য অপেক্ষা করার তুলনায়, জীবন ও কেরিয়ারকে গতিশীল রাখতে হয়। পরে কাজে লাগে। 
এই গতিশীলতা হঠাৎ হারিয়ে গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী রাজনীতির। শুধু বিধানসভা ভোটে জয় নয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধীদের থেকে  রাজনীতির গতিতেও এগিয়ে যাচ্ছেন। একটি ধাপে পৌঁছনোর পর পরবর্তী স্তরে আরোহণের একটা মরিয়া লক্ষ্য সামনে নিয়ে আবার অগ্রসর হওয়ার একটা প্রাণপণ চেষ্টায় তিনি ঝাঁপিয়েছেন। নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে একটি বিরোধী জোট তৈরি করা। সেই জোটের মাধ্যমে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মোদির দলকে পরাস্ত করা। তারপর পরিস্থিতি যদি দাবি করে, তাহলে প্রধানমন্ত্রী হওয়া। বাংলাকে স্বাধীনতার পর প্রথম এক বাঙালি প্রধানমন্ত্রী উপহার দেওয়া। ইত্যাদি ইত্যাদি। এই লক্ষ্যগুলির প্রতিটি সফল হতে পারে। আবার প্রতিটিই ব্যর্থ হতে পারে। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেমে থাকছেন না। তিনি  হেঁটে চলেছেন রাজনৈতিক কেরিয়ারের পরবর্তী স্টপেজের দিকে। তিনি জানেন না তাঁর জন্য কী অপেক্ষা করে আছে। কিন্তু সেই অনিশ্চয়তার জন্য হাল ছাড়ছেন না।  শত বিদ্রুপ অথবা কটাক্ষ শুনতে হলেও ওই পথেই তিনি হাঁটা শুরু করেছেন। দেখা যাক না কী হয়! চেষ্টা করতে দোষ কী। অনেকটা যেন এরকম মনোভাব। ঠিক এখানেই এ রাজ্যের বিরোধীদের সঙ্গে তাঁর রাজনীতির ফারাকটা ক্রমেই আরও প্রকট হয়ে উঠছে। ভালো হোক, মন্দ হোক, অবিশ্বাস্য হোক, স্বাভাবিক হোক, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটা লক্ষ্য‌, একটা ফোকাস, একটা গোলপোস্ট তৈরি করে চলেছেন অবিরত। একটি সাফল্য অর্জনের পর  পরেরটির দিকে অগ্রসর হওয়া।  পক্ষান্তরে, আমরা অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে দেখতে পাচ্ছি, বিধানসভা ভোটে পরাজয়ের পর সামনে অখণ্ড অবকাশে নিজেদের আরও উন্নীত করে, তীব্র তাগিদে ভুলত্রুটি মেরামত করে রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার তাগিদটা চোখে পড়ছে না বিরোধীদের মধ্যে। তারা থমকে রয়েছে। সিপিএম ও কংগ্রেসের সবথেকে বড় সঙ্কট হল, তাদের সামনে কোনও লক্ষ্যই নেই। তারা নিজেদের তৈরিও করছে না। কোনও এক্সট্রা কারিকুলাম কোর্স অর্জনে আগ্রহই নেই। 
প্রতিটি সুস্থ সবল এবং কর্মক্ষম জীবনের একটি করে লক্ষ্য থাকে। নতুন জীবিকার লক্ষ্য‌, আরও বেশি টাকা সঞ্চয়ের লক্ষ্য, সিনেমায় সিরিয়ালে চান্স পাওয়ার লক্ষ্য,  বিদেশে পড়াশোনার লক্ষ্য, নেক্সট পরীক্ষায় আরও ভালো ফলের লক্ষ্য, বিয়ে করার লক্ষ্য, চাকরি পাওয়ার লক্ষ্য...ইত্যাদি। এ রাজ্যে এখন বিধানসভা ভোটে পরাস্ত হওয়ার পর লক্ষ্যটা ঠিক কী, সেটা তারা কিছুতেই যেন নিজেরাই বুঝে উঠতে পারছে না। এই যে অবকাশের সময়টা, অর্থাৎ পরবর্তী ভোট আসার আগে পর্যন্ত তারা কীভাবে এই সময়টাকে কাজে লাগাবে, সেটা নিয়ে যে কোনও নির্দিষ্ট প্ল্যান আছে, ক্যালকুলেশন আছে, সেটা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। অন্তত মাঠে ময়দানে প্রতিফলন কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তাদের রাজনীতিতে কোনও আকর্ষণীয় চমক নেই। যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি কৌতূহল ও আগ্রহের জন্ম দিয়ে ফেলেছেন। আমরা সাধারণ মানুষ অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে 
দেখতে চাইছি তাঁর আগামীদিনের দিল্লি মিশন কোনদিকে এগয়, তিনি রাজ্যে আরও কী কী চমকপ্রদ প্রকল্প নিয়ে আসেন, বাঙালি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কোনও সম্ভাবনা সত্যিই তৈরি হচ্ছে কি না, ইত্যাদি মনোগ্রাহী ইস্যু তিনি উপহার দিতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু আমরা বিরোধীদের থেকে কোনও টানটান, বুদ্ধিদীপ্ত অথবা বেশ সুচারু স্ট্র্যাটেজি সংবলিত রাজনীতির সন্ধান পাচ্ছি না। যা নিয়ে আমাদের কৌতূহল জাগ্রত হতে পারে। 
নতুন রাজনীতির অনুশীলন করতে ব্যর্থ হচ্ছে বিরোধীরা। তারা সেই একই পুরনো রীতিতে আটকে যাচ্ছে। সেটা হল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও একটি মন্তব্য, সিদ্ধান্ত, সরকারের কোনও প্রকল্প ঘোষণা নিয়ে সমালোচনা করা, সাংবাদিক সম্মেলনে আক্রমণ কিংবা টিভির প্যানেল ডিসকাশনে ঝগড়া। যা ভোটের আগেও করে এসেছে। ভোটের পরও করছে। কিন্তু তারা নিজেরাও জানে যে কিছু হচ্ছে না। এভাবে হবেও না। 
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুটি বিষয়ে অনেকটা নিশ্চিন্ত করে ফেলেছেন নিজেকে। প্রথমত, মহিলা ভোটব্যাঙ্ক মোটামুটি সিংহভাগই তিনি নিশ্চিত করে ফেলেছেন আপাতত। অন্য কোনও দলকে মহিলারা এখনই হু হু করে সমর্থন করবেন, এরকম কোনও পরিস্থিতি তৈরি করতে আপাতত পারছে না কোনও বিরোধী দল। আর দ্বিতীয়ত, যখনই বাঙালি আবেগ, বাঙালি সংস্কৃতি রক্ষা, মোদি-অমিত শাহের দিল্লি টিমের সঙ্গে বাংলার ইমেজের টক্করের প্রশ্নটি আসছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই বাঙালি আবেগের সমর্থনকে পূর্ণ মাত্রায় করায়ত্ত করতে সমর্থ হয়েছেন। এই দুটি ইস্যু দ্রুত তাঁর হাতছাড়া হওয়ার চান্স কম। বিশেষ করে এখন থেকে আবার তৈরি হতে শুরু করেছে বাঙালি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন সংক্রান্ত একটি নতুন আবেগ। সেটি বাস্তবায়িত হোক, অথবা না হোক, স্বপ্নটা নিয়ে এগতে দোষের কী আছে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এরকমই একটি স্ট্র্যাটেজির মাস্টারস্ট্রোক দিয়ে ফেলেছেন। কংগ্রেস, সিপিএম, বিজেপির রাজনীতি আটকে যাচ্ছে অপেক্ষার গ্যাপে। তারা একটি ভোট থেকে পরবর্তী ভোটের মধ্যবর্তী গ্যাপটিতে অপেক্ষা করে যে, আবার কবে ভোট আসবে। আবার প্রার্থী দেব, প্রচার করব, কিছু জিতব, কিছু হারব। ব্যস! কিন্তু মাঝখানের এই সময়টায় কোনও রাজনীতির ইস্যু তৈরি করতে পারে না তারা। একটি ভোট চলে যাওয়ার পর, পরবর্তী ভোটের দরজায় পৌঁছনোর আগে নিজেদের বদলে নিতে পারছে না তারা। গতবারের ভোটে যেমন দেখতে ছিল, তাদের  এবারও সেই একইরকম দেখতে লাগছে। এই যে রাজনীতিতে নন ইন্টারেস্টিং হয়ে যাওয়া, বোরিং 
হয়ে যাওয়া এটা বিপজ্জনক। রাজনীতির গতিশীলতা রক্ষায় তারা ব্যর্থ হচ্ছে।  পরীক্ষামূলকভাবে যে কোনও সাধারণ মানুষকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে,  তারা সিপিএম অথবা কংগ্রেসের কাছে কী আশা করে? দেখা যাবে, এই দুই দল যে ঠিক কেমন এবং কী করতে পারে সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোনও ধারণাই নেই সিংহভাগ মানুষের এবং তাই কিছুই আশা করে না। কারণ, এই দুই দল ক্ষমতায় এলে অথবা জয়ী হলে, কী যে বিকল্প ব্য‌বস্থা প্রদান করবে সেটি তাদের নিজেদের কাছেও স্পষ্ট নয়। এই ঘূর্ণাবর্তে ঢুকে পড়ছে বঙ্গবিজেপিও। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্রে সবকটি তির ছোঁড়া হয়ে গিয়েছে তাদের। সাম্প্রদায়িক তির, দুর্নীতির তির, সিন্ডিকেট, ভাইপো সব অস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়ে গিয়েছে। এখন তুণীর শূন্য। এরপর কী? লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ভোটের প্রায় তিন মাস পর বিজেপিকে দিশাহীন দেখতে লাগছে। 
 রাজ্য কংগ্রেস ও সিপিএমের সামনে ব্লাইন্ড লেন। সোনিয়ার সঙ্গে মমতার সাক্ষাৎ, মমতার জোট আহ্বানে সব দলের সবুজ সংকেতের পর এ রাজ্যে এই দু‌ই দলের মমতা বিরোধিতা হাস্যকর। তবু হয়তো এ রাজ্যের বিরোধীরা একটি পথ গ্রহণ করবে। সেটি হল, মমতার দিল্লিমুখী রাজনীতি নিয়ে হাসাহাসি করা, আক্রমণ করা, তাঁকে অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষী তকমা দিয়ে কটাক্ষ করা, ব্যঙ্গবিদ্রুপ করা। আসলে এটি একটি নিখুঁত ফাঁদ। বিরোধীরা এই পথটি নিলেই তৃণমূল প্রচার করার অস্ত্র পেয়ে যাবে যে, বাংলার বিরোধীরা চায় না একজন বাঙালি প্রধানমন্ত্রী হোক। এ যেন উভয়সঙ্কট। মমতা প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন এটা সহ্যও করা যায় না। আবার সরাসরি বিরোধিতাও করা যাবে না। বাংলায় বিরোধী রাজনীতির এহেন ধর্মসঙ্কট আগে কখনও আসেনি! 

30th     July,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021