বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

সত্যি কি তৃতীয় ঢেউ
আটকাতে চান নরেন্দ্র মোদি!
হিমাংশু সিংহ

কোভিড পর্বে ৫৬ ইঞ্চি ছাতির ধ্যাষ্টামি কম দেখেনি দেশ। গতবছর ২২ মার্চ থালা-ঘটি-বাটি বাজানো থেকেই সেই চোর-পুলিস খেলার শুরু। তারপর বালাকোটে পাকিস্তানকে মারার মতো করোনাকেও ‘মিছিমিছি’ জব্দ করার সার্টিফিকেট মালা করে গলায় পরে লোকহাসানো নাটক কম হয়নি। সেই আত্মতুষ্টিরই খেসারত দিতে হচ্ছে গরিব জনগণকে। শুধু দ্বিতীয় ঢেউই কেড়ে নিয়েছে প্রায় আড়াই লাখ প্রাণ। গত ১৮ মাসে জাতির উদ্দেশে ভাষণেও প্রধানমন্ত্রী রেকর্ড গড়েছেন। আত্মশাসনের কথা বলতে গিয়েও এমন উচ্চকিত আত্মপ্রচার তাঁর পক্ষেই সম্ভব। কিন্তু সব ছাড়িয়ে এই ধারাবাহিক রঙ্গমঞ্চে তাঁর আর একটা মেগা এপিসোড দেশবাসী দেখল গত বৃহস্পতিবার। তৃতীয় ঢেউ যখন দুয়ারে কড়া নাড়ছে, বারাণসীর পুণ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করলেন, ‘শিষ্য’ যোগী আদিত্যনাথ যেভাবে দ্বিতীয় ঢেউ রুখে দিয়েছেন তা অতুলনীয়। এমন নজির নাকি ভূভারতে নেই! আরও বলেছেন, টিকাকরণে উত্তরপ্রদেশ দেশের মধ্যে শীর্ষে! অর্থাৎ দেশের বাকি সব মুখ্যমন্ত্রীর লড়াইকে এককথায় খাটো করে দিলেন। সবাইকে হারিয়ে ঢাক বাজালেন শুধু প্রিয় আদিত্যনাথের। এত বড় লড়াইয়ের মাঝপথে একজন দেশনেতার মুখে এটা সাজে? সোজা কথায়, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ও কর্তব্যকে পাশ কাটিয়ে সস্তা ভোটের রাজনীতি করলেন লজ্জা, ঘেন্না ও সৌজন্যকে কয়েক যোজন দূরে সরিয়ে রেখে। যেমনটা তিনি করেছেন বাংলায় বিগত নির্বাচনে। এবং, এবারও পুরোটাই মঞ্চস্থ হল আগামী বছরের গুরুত্বপূর্ণ উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা ভোটকে সামনে রেখে। মোদিজি জানেন, বাধ্য হোন আর অবাধ্য, যোগীকে সামনে রেখেই বাইশ সালে লখনউয়ের কুর্সি তাঁকে দখল করতে হবে। অন্যথায় দিল্লির অলিন্দে তাঁর নিজের ক্ষমতাও মুখ থুবড়ে পড়বে চোরাবালিতে। তাই অকারণে এমন নির্লজ্জ যোগী-স্তুতি!
অথচ, প্রধানমন্ত্রীর দরাজ সার্টিফিকেটের আড়ালে বাস্তবে এই পর্বে উত্তরপ্রদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে রাজপথ কী দেখেছে মানুষ?—অক্সিজেনের অভাবে মুহূর্তে লাশ হয়ে যাওয়াদের পরিবারের কান্না। গঙ্গায় ভেসে যাওয়া মৃতদেহের সারি। ওষুধের কালোবাজারি। হাসপাতালে শয্যা নেই। মাথাকুটে কোনওরকমে একটা মিললেও শ্বাস নেওয়ার অক্সিজেনটাই বাড়ন্ত! তবু অন্যসব মুখ্যমন্ত্রীকে পিছনে ফেলে শুধু উত্তরপ্রদেশকে সার্টিফিকেট কেন? মোদিজি কি জানেন না, গত ডিসেম্বরে যেমন তিনি করোনাকে পরাস্ত বললেও মহামারী পিছু হটেনি, এবারও ঠিক তাই। তৃতীয় ঢেউ কোনরূপে কীভাবে এদেশে বিপদ ডেকে আনবে, সেটাই প্রতিনিয়ত গবেষণা ও পর্যালোচনা করে চলেছেন বিজ্ঞানীরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) সতর্ক করেছে—১১১টি দেশে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট মাথা তুলেছে। বহু ক্ষেত্রেই ভ্যাকসিনও সেই ভোলবদল করা ভাইরাসকে আটকাতে অপারগ। ফলে সংক্রমণ আর একটা ঢেউ হয়ে আবার বিপন্ন করতে পারে মানুষকে, আমাদের দেশকে। তাই আগামী ১০০ দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু শুধু নিদান হাঁকলেই তো চলবে না। তৃতীয় ঢেউ আটকাতে সরকারকেই নিতে হবে প্রধান প্রহরীর ভূমিকা। সেখানে রাজনৈতিক ভেদাভেদ চলবে না। দ্রুত গড়ে তুলতে হবে পরিকাঠামো। বাড়াতে হবে হাসপাতালের শয্যা, অক্সিজেন এবং সেই সঙ্গে তৈরি রাখতে হবে নার্স ও ডাক্তারকে। আর ভ্যাকসিন? নরেন্দ্র মোদিজির জাতির উদ্দেশে দেওয়া শেষ ভাষণের কথা মনে আছে? ৭ জুন, বিকেল ৫টা। সেখানেই বলেছিলেন, ২১ জুন থেকে সরকার কোথাও টিকার অভাব বরদাস্ত করবে না। সব দায়িত্ব কেন্দ্র নিজের কাঁধে তুলে নিলেও বাস্তবে কী দেখছে দেশ? ২১ জুন  টিকাকরণের ‘মেগা ইভেন্ট’ সম্পন্ন হয়েছে। কীভাবে হয়েছে, পরিসংখ্যানে কোথায় জল ছিল? সেইসব বিতর্ক দূরে সরিয়ে দিলেও একটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে: শীর্ষে পৌঁছেই দেশে ভ্যাকসিন দেওয়ার সংখ্যাটা হঠাৎ কমে গেল কেন? তাহলে কি পুরোটাই লোকদেখানো নাটক ছিল? উত্তর সরকারের কাছে নেই। আর্ন্তজাতিক যোগদিবসে দেশে প্রায় ৯১ লক্ষ লোক ভ্যাকসিন পান। তবে টিকা দেওয়ার চেয়ে বড় হয়ে সামনে আসে রেকর্ড ভাঙার ওই ধামাকাটা, যা মোদিজির চিরকালীন ট্রেড মার্ক। একআনা কিছু করলেও আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে বারবার বলো, কেউ এমনটা করেনি কোনওদিন! মহামারীর বিরুদ্ধে লড়তে গিয়েও জাত চেনানো ওই স্বভাবটা থেকে বিচ্যুত হননি তিনি। অথচ, তারপরই ম্যাজিকের মতোই দ্রুত কমে গিয়েছে সংখ্যাটা। এই মুহূর্তে দৈনিক কোটি মানুষকে টিকা দূর অস্ত, সংখ্যাটা কমতে কমতে চল্লিশ লাখেরও অনেক নীচে নেমে এসেছে। 
বিভিন্ন রাজ্য থেকে যে-খবর আসছে তা মোটেই সুখকর নয়। আমাদের শহর কলকাতায় পুরসভা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় প্রায় দু’শোর মতো টিকাকেন্দ্র খুললেও প্রয়োজন মতো ভ্যাকসিন পাচ্ছে না। কোথাও দীর্ঘ লাইন পড়ছে, আবার কোথাও টিকার অভাবে পুরো প্রক্রিয়াটাকেই বন্ধ রাখতে হচ্ছে। স্বভাবতই প্রধানমন্ত্রীর একপেশে বক্তব্যে গর্জে উঠেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভ্যাকসিনের অভাব নিয়ে কেন্দ্রকে নিশানা করে তিনি বলেছেন,  ‘রাজ্যে আড়াই কোটি মানুষকে করোনার টিকা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন ১৪ কোটি ভ্যাকসিন। অথচ, কেন্দ্র ১৪ কোটির বদলে মাত্র ২ কোটি ১২ লক্ষ ভ্যাকসিন দিয়েছে। স্পষ্টতই বঞ্চনার অভিযোগ। মমতা বলেছেন, ‘অনেক রাজ্যকে বেশি ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে, অনেককে আবার দেওয়াই হচ্ছে না। উত্তরপ্রদেশ বিজেপির রাজ্য বলে বেশি দেবেন, বাংলাকে দেবেন না, এটা ঘোর অন্যায়। না পেলে কীভাবে সবাইকে টিকা দেব?’ মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ ষোলোআনা ঠিক। চলতি মাসেও ৭৫ লক্ষ টিকা দেওয়ার কথা বলে মাত্র ২৫ লক্ষ ডোজ পাঠিয়েছে কেন্দ্র। এই অবস্থায় রাজ্যের সব মানুষকে দ্রুত টিকা দেওয়ার কাজ কীভাবে চলবে? তৃতীয় ঢেউ রুখবে কী করে!
অভিযোগটা শুধু বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর গলাতেই শোনা গিয়েছে এমনটা কিন্তু নয়। মমতার বক্তব্যের প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছে অধিকাংশ রাজ্যেই। এই কারণেই রাজস্থানে ৩১ জেলার মধ্যে ২৫টিতেই টিকাকরণ বন্ধ করে দিতে হয়েছে। দিল্লিতেও রাজ্য সরকারের হাতে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন নেই। ব্যাপকভাবে ধাক্কা খাচ্ছে টিকাকরণ। তাহলে ২১ জুন কি বিশ্বকাপ ফাইনাল ছিল যে ঘণ্টায় ঘণ্টায় স্কোর বোর্ড আপডেট করার পর কেন্দ্রের স্বাস্থ্যমন্ত্রক একেবারে ঘুমিয়ে পড়ল। এবং তারই জেরে  তৃতীয় ঢেউ আসার মুখে ক্রমাগত সংখ্যাটা কমতে কমতে তলানিতে!
টিকার জোগান ঠিক করতে না পেরে যত রাগ গিয়ে পড়েছে পর্যটকদের উপর। সংক্রমণ একটু কমতেই ঘরবন্দি মানুষ কেন পাহাড়মুখী? কেন সিমলা, মুসৌরি-সহ শৈল শহরগুলিতে মাস্ক ছাড়া মানুষের ভিড়, তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অবিলম্বে পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে যাতে কোভিড বিধিতে ঢিলে দেওয়া না হয়, তাও নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। কিন্তু ওই ঘুরতে যাওয়ার সংখ্যাটা কত? বাকি দেশের মানুষ তো আর মহামারী আইন লঙ্ঘন করেনি, তাহলে তারা টিকা থেকে বঞ্চিত হবে কেন? নরেন্দ্র মোদি সরকারের নবনিযুক্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রী টিকা বণ্টনের যে হিসেব দিয়েছেন তা আরও আশ্চর্যজনক। টিকা নিয়ে বিতর্কে সবে দায়িত্ব নেওয়া মন্ত্রী মনসুখ মাণ্ডব্য বলেছেন, জুন মাসে কেন্দ্র সারা দেশে ১১ কোটি ৪৬ লক্ষ টিকা দিয়েছে। আর জুলাইতে সেই লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে করা হয়েছে সাড়ে ১৩ কোটি। কিন্তু সরকার যে লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে তাতে অন্তত মাসে ২০ কোটি ডোজের প্রয়োজন। অন্যথায় তৃতীয় ঢেউ আমাদের আর একবার প্রিয়জনকে হারানোর মর্মান্তিক পরিণতির মুখোমুখি দাঁড় করাবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রকের অফিসাররা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী যাই সাফাই দিন না কেন, সাধারণ মানুষ কাছের টিকা কেন্দ্রে গিয়ে কোভিশিল্ড না পেয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। এটাই চরম বাস্তব। আবার যেটুকুও-বা মিলছে তাও রিজার্ভ রাখতে হচ্ছে দ্বিতীয় ডোজের জন্য। ফলে ফাস্ট ডোজ কিংবা ১৮ থেকে ৪৪ বছর বয়সিদের দ্রুত টিকা দেওয়ার কর্মসূচি ধাক্কা খাচ্ছে। অথচ, তৃতীয় ঢেউ অপেক্ষাকৃত কমবয়সি ও শিশুদের উপর প্রভাব ফেলবে বলেই মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারও সেই পরামর্শ মেনেই ১ মে থেকেই কম বয়সিদের টিকাকরণের ঘোষণা করেছিল। কিন্তু সরকারি গাফিলতিতেই সেই উদ্যোগ ফলপ্রসূ হয়নি। কোভিশিল্ড ও কোভ্যাকসিন ছাড়াও এখনও তিন নম্বর টিকা জনসাধারণের জন্য সেভাবে বাজারে আনতে পারেনি সরকার। রাশিয়ার স্পুটনিক কিছু বেসরকারি জায়গায় দেওয়া হলেও সংখ্যাটা নগণ্য। ফাইজার, মডার্নার কথা বলা হলেও সবই এখনও পর্যন্ত শুধু কাগজেকলমে, বাস্তবে মানুষ তা পায়নি। তাহলে ডিসেম্বরের মধ্যে সব নাগরিককে টিকা দেওয়ার গালভরা কর্মসূচিও কি স্রেফ ভাঁওতা? বিরোধীরা বলছে, এটাও মোদিজির ‘মেগা ধাপ্পা’ ছাড়া কিছু নয়। 
এই কাদা ছোড়াছুড়ির মধ্যেই সামনের একশো দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সতর্ক থাকতে হবে সবাইকে। বাঁচাতে হবে সবার প্রিয়জনকে। বাড়াতে হবে টিকাকরণের গতি। কিন্তু এই কঠিন সময়ে শুধু একজনমাত্র মুখ্যমন্ত্রীর পিঠ না চাপড়িয়ে দেশনেতার কি আরও অনেক সংযত থাকা উচিত নয়? শুধু যোগীকে সার্টিফিকেট দিলেই তো করোনা থেমে যাবে না। ভুললে চলবে না, বাংলা-সহ আর সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরাও এই যুদ্ধে গত দু’বছর ধরে একটানা লড়াই চালাচ্ছেন। তাঁদের কথা একবারও মনে পড়ল না! কেন্দ্র ভ্যাকসিন দিচ্ছে না, বঞ্চনা করছে, তবু প্রাণপণে টিকাকরণ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও  মমতার সরকার নিজে থেকে ৬০ কোটি টাকার টিকা বাজার থেকে কিনে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে। তৃতীয় ঢেউয়ের জন্যও প্রায় ১৮৩০ কোটি টাকা আলাদা করে রাখা হয়েছে। অথচ আজও কেন্দ্রের কাছে বাংলার বিপুল পরিমাণ জিএসটি বকেয়া। সেদিকে নজরই নেই অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের। স্বভাবতই বিস্ময়বোধক প্রশ্ন জাগে, সত্যি কি তৃতীয় ঢেউ রুখে দেওয়ার সদিচ্ছা আছে মোদিজির ও তাঁর সরকারের, নাকি এটাও স্রেফ দিখাওয়া!

18th     July,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021