বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

‘সাফল্যের’ ছাঁটাই
শান্তনু দত্তগুপ্ত

অপেক্ষা করছেন জে পি নাড্ডা। প্রধানমন্ত্রীর সিগন্যাল পেলেই শুরু হবে ফোন। সঙ্কেত দিলেন নরেন্দ্র মোদি। আর সঙ্গে সঙ্গে নাড্ডাজির ফোন শুরু হল। ‘রবিশঙ্করজি... দল সিদ্ধান্ত নিয়েছে...’। 
১২টা ফোন কল। তারপর ১২ জনের ইস্তফা... মন্ত্রিসভা থেকে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, তথ্য-সম্প্রচার, আইন—হেভিওয়েট সব মন্ত্রক। অথচ এই 
ক’দিন আগেই সাত বছর পূর্তির আদিখ্যেতায় ঢাক পেটানোর উৎসব লেগেছিল। মোদি সরকারের জয়গানে এই মন্ত্রীদেরই স্তুতির খই ফুটছিল। প্রধানমন্ত্রী নিজেই যুক্তি সাজাচ্ছিলেন, কীভাবে তাঁর মন্ত্রীরা দেশকে উন্নতির শিখরে নিয়ে গিয়েছেন। 
কীভাবে কোভিডের মতো বিশ্বব্যাপী মহামারীর গলায় ফাঁস পরিয়েছে তাঁর স্বাস্থ্যমন্ত্রক। তাহলে আচমকা 
হল কী? এক ফোনেতেই আপাতত সেই মন্ত্রিসভা আলো করে থাকা সোনামানিকরা পথে বসেছেন। প্রধানমন্ত্রী গালভরা একটা যুক্তি অবশ্য দিয়েছেন—যুব ব্রিগেড চাই। মন্ত্রিসভার গড় বয়স হবে ৫০-এর নীচে। আদৌ কি তাই? 
বানপ্রস্থে যাঁরা
মন্ত্রিসভার সদস্যদের যাওয়া এবং আসার নেপথ্যে থাকা আসল যুক্তি পর্দার আড়ালে। কানাঘুষো চলছে, মূল কারণটা করোনা। কেন্দ্রীয় সরকার আসলে এই সমস্যা সামাল দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। অক্সিজেনের প্রবল সঙ্কট, পরিকাঠামোর দৈন্য প্রকাশ্যে চলে আসা, ভ্যাকসিন নিয়ে টালবাহানা... এবং কোভ্যাকসিন সরবরাহের নেপথ্যে দুর্নীতির আঁচ। ব্রাজিল তদন্তের নির্দেশ দেওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলে পর্যন্ত মুখ পুড়েছে ভারত সরকারের। অথচ দণ্ডমুণ্ডের কর্তা নিজেই কি না এই দিকটায় মাতব্বরি করেছেন! শুধু তাই নয়, প্রধানমন্ত্রী এ নিয়ে বৈঠক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী, জেলাশাসকদের সঙ্গে, বৈঠকে নাটকীয় প্রবেশ করে বাতিল করেছেন সিবিএসইর বোর্ড পরীক্ষাও। তাহলে এই সমালোচনা, ব্যর্থতার জন্য দায়ী কে? কেন, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী! আহা... পদে তো তিনিই আছেন! তাহলে অন্য কেউ কেন কাঠগড়ায় দাঁড়াবে? সাফল্য পেলে না হয় ক্রেডিট যেত প্রধানমন্ত্রীর পকেটে। কিন্তু ব্যর্থতা? কভি নেহি। কাজেই, হোক জবাই। সামনে দিল্লির পুরভোট আসছে। তাঁকে হয়তো দলকে চাঙ্গা করার কাজে লাগানো হবে।
প্রকাশ জাভরেকর আবার নিপাট ভদ্দরলোক। তথ্য-সম্প্রচারমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ছিল সংবাদমাধ্যমের উপর পূর্ণ খবরদারির। তা তিনি করতেই পারেননি। বিহার, বাংলার মতো রাজ্যে ভোট গেল। কিন্তু জাভরেকরজি কী করলেন? সংবাদপত্র খুললেই বিজেপির এমন বিরোধিতা! এমন সমালোচনা! নিয়ন্ত্রণই করতে পারলেন না মন্ত্রী। তার উপর মোদিজির সাতকাহনের সম্প্রচারটাও তো ছিল তাঁর দায়িত্ব। সেটাই বা কতটা পেরেছেন? এবার দেখা যাক, দলের কোনও কাজ আছে কি না। সেটা দেখুন। একই নির্দেশ পৌঁছে গিয়েছে রবিশঙ্কর প্রসাদ, রমেশ পোখরিয়ালের কাছে। আবার সন্তোষ গঙ্গওয়ারের ভবিষ্যতে কী ঝুলছে, সে ব্যাপারে তো তাঁর ঘনিষ্ঠ দলীয় কর্মীরাও জানেন কি না সন্দেহ। আর যাঁদের যাঁদের প্রোমোশন হল? সেখানে অঙ্ক কতটা কঠিন?
পদোন্নতির পিছনে
একেবারে নম্বর দিয়ে সাজিয়ে ফেলা যাক। ১) হরদীপ সিং পুরী: মন্ত্রিসভার একমাত্র শিখ প্রতিনিধি। সামনেই পাঞ্জাবে ভোট। তাঁকে কাজে লাগাতে পারলে সীমান্তবর্তী রাজ্যটিতে কিছুটা লাভের মুখ দেখতে পারে বিজেপি। পাঞ্জাবে কংগ্রেসের সেরা বাজি অবশ্যই ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং। কিন্তু চাপানউতোর তো তাদের অন্দরেও রয়েছে! যদি ফায়দা তোলা যায়! আসল কারণটা অবশ্য আরও গভীর। নরেন্দ্র মোদির সাধের সেন্ট্রাল ভিস্তা প্রকল্পের কারিগরের নাম হরদীপ সিং পুরী। কৃতজ্ঞতা বলে একটা বস্তু তো আছে নাকি! ২) কিরণ রিজিজু: সাতেপাঁচে না থাকা মন্ত্রী। সবচেয়ে বড় কথা, বুদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং উত্তর-পূর্বের একমাত্র মুখ। ৩) মনসুখ মাণ্ডব্য: পশু-পাখি, গোরু-ছাগলের ডাক্তার কি না দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তবে তাতে কীই বা আসে যায়! স্মৃতি ইরানিও মোদি মন্ত্রিসভায় শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। মাণ্ডব্য মহাশয়ও ঠিক মানিয়ে বুঝিয়ে নেবেন। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল, তিনি আবার তাঁর প্রধানমন্ত্রীর মতোই সংস্কারে বিশ্বাসী। এ সংস্কার অবশ্য জন্ম বা পরিবারগত নয়! মন্ত্রকের কাজে কর্মে পরিবর্তন আনার। দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় মনসুখ মাণ্ডব্যই ছিলেন জীবনদায়ী ওষুধ এবং অক্সিজেনের দায়িত্বে। তা সে উৎপাদন হোক, বা আমদানি। ৪) অনুরাগ ঠাকুর: হিমাচলের ঠাকুর পরিবারের উত্তরসূরি। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা, অমিত শাহের আস্থাভাজন। আগামী বছর হিমাচলে ভোটও রয়েছে। মোদিজিকে সেটাও তো মাথায় রাখতে হয়! এছাড়া বিহারে বিজেপির ঠাকুর সম্প্রদায়ের মুখ রাজকুমার সিং, তেলেঙ্গানায় আগ্রাসন বাড়ানোর ছক কষা গেরুয়া শিবিরের জন্য সে রাজ্যের অস্ত্র জি কিষান রেড্ডি, গুজরাতের প্যাটেল সম্প্রদায়ের পুরষোত্তম রূপালা... তালিকা ধরে বিচার করলে দেখা যাবে, এ বদল নামমাত্র নয়। নেপথ্যে জাতপাতের রাজনীতি এবং ‘প্রাইজ পোস্টিং’-এর গল্প লুকিয়ে রয়েছে পুরোদমে। বাংলার ক্ষেত্রে অবশ্য অঙ্কটা আলাদা। এখানে একমাত্র এজেন্ডা—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতা।
হার মানা দায়
কোথায় ভেবেছিলেন, ২০০ আসন নিয়ে বাংলা দখল হবে... সেই স্বপ্ন মাটিতে আছাড় খেয়েছে। কিন্তু হার মানা চলবে না। তাই যতরকম পাঁয়তাড়া আছে, সব কষে নতুন সরকারকে বিরক্ত করতে হবে। তা সে প্রাপ্য টাকা আটকে হোক, বঙ্গভঙ্গের জিগির তুলে, কিংবা উপনির্বাচনে বাধা তৈরি করে... সব চলবে। যেন বাংলাকে কেন্দ্র করে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগেছে। উত্তরবঙ্গে পরিকল্পিতভাবে একটা হাওয়া ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, বঙ্গভঙ্গ হবেই। আর সিএএ। রুল তৈরিটা শুধু বাকি। তারপর ঘুসপেটিয়াদের ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বাংলা থেকে বিদেয় করবে বিজেপি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য সাফ জানিয়ে রেখেছেন, অন্যায় তিনি হতে দেবেন না। তাও চেষ্টার কসুর নেই। এবার চারজন নতুন মন্ত্রীকে বসানো হল। সবই অবশ্য হাফপ্যান্ট। বাংলা নিয়ে এত কামড়াকামড়ি করার পরও ফুল মন্ত্রী একজনও জুটল না। আর সেই রাষ্ট্রমন্ত্রী কারা? নিশীথ প্রামাণিক—যাঁর বিরুদ্ধে ১১টা ফৌজদারি মামলা। মোদি মন্ত্রিসভার একমাত্র মন্ত্রী, যাঁর বিরুদ্ধে খুনের মামলা রয়েছে, স্মাগলিং, আবার সোনার দোকানে চুরিরও। তিনিই নাকি আজ দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী? খেল দেখাচ্ছেন বটে মোদিজি! খুনের চেষ্টার মামলা তো রয়েছে জন বারলার বিরুদ্ধেও। সে সব কি মন্ত্রী করার আগে নজরে আসে না? ভারত সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য নিয়ে কাটাছেঁড়া তো হবে বিশ্বভর! আন্তর্জাতিক মহল নাক সিঁটকোবে। আপনার রেপুটেশন থাকবে তো? কী যোগ্যতা নিশীথ প্রামাণিক, জন বারলার? উত্তরবঙ্গে বসে বিভাজনের রাজনীতির ডিমে তা দেবেন। এটাই তো? মতুয়া সম্প্রদায়কে তোষামোদ করার জন্য শান্তনু ঠাকুরকেও নিয়ে এসেছেন। না হলে আপনারই আতঙ্ক, এ বিদ্রোহ করে বসলে একটা বড় ভোটব্যাঙ্ক হাতের বাইরে চলে যাবে। তাই ভোলবদল হবে, রদবদলও... কিন্তু অঙ্ক কষে। রাজনীতির অঙ্ক, প্রতিশোধের পাটিগণিত। মানুষ নয়, আগে ক্ষমতা। দেশ বেচে হলেও...।
নতুনত্বের নেপথ্যে
পিপিপি অর্থাৎ পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ। গালভরা নাম। কিন্তু উদ্দেশ্যটা সাফ, যত পারো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির উপর থেকে দায়ভার ঝেড়ে ফেলতে হবে। হয় অংশীদার, না হলে স্রেফ বিক্রি। কোষাগার ভর্তি হবে সরকারের। আর ছাঁটাইয়ের আতঙ্কে প্রাণ যাবে সেই কর্মীদের... যাঁরা বছরের পর বছর এইসব সরকারি সংস্থার ছাতার তলায় নিশ্চিন্তে আশ্রয় পেয়ে এসেছেন। বিক্ষোভ হবে, আন্দোলনও। কিন্তু সব স্তিমিত হয়ে যাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারের শাসনে। রেলমন্ত্রী থাকাকালীন পীযূষ গোয়েল বলতেন, ‘চিন্তা নেই। রেল বেসরকারিকরণ হবে না।’ তারপরও জল্পনার আঁচ ছড়িয়ে পড়ত প্রতিটি স্টেশনে, রেলপথে। কথায় বলে, ধোঁয়া যখন বেরচ্ছে, আগুনও কোথাও না কোথাও আছে। অর্থাৎ, রেলকে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার কানাঘুষো একেবারে গুজব নয়। নতুন মন্ত্রী সেই ইন্ধনে কিন্তু ঘি ঢেলেছেন। কে এই মন্ত্রী? অশ্বিনী বৈষ্ণব। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘খাস লোক’। সম্মুখে নন, কিন্তু প্রচ্ছন্নে অবশ্যই। প্রাক্তন আইএএস, সঙ্ঘ পরিবার থেকে উঠে আসা এবং পিপিপি মডেলের ‘সম্রাট’। অটলবিহারী বাজপেয়ি প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় তিনিই ছিলেন ডেপুটি সেক্রেটারি। আর ক্ষমতা যাওয়ার পর বাজপেয়িজির ব্যক্তিগত সচিব। একটা বিষয় পরিষ্কার, অশ্বিনী মহাশয়কে নিয়েও গভীর পরিকল্পনা রয়েছে নরেন্দ্র মোদির। আর একটু তলিয়ে দেখলে, অন্য নামগুলোও কিন্তু কাকতালীয় নয়! সর্বানন্দ সোনোওয়ালকে এবার আর অসমের মুখ্যমন্ত্রী করা হয়নি। তাই একটা মন্ত্রিত্ব... মুখ বন্ধ করার জন্য। কংগ্রেস থেকে ভাঙিয়ে আনার পর জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়াকেও একটা উপহার দিতে হতো। তার উপর তিনিই এখন মন্ত্রিসভার সবচেয়ে ধনী বলে কথা... ঘোষিত সম্পত্তি ৩৭৯ কোটির। আর বিহারে চিরাগ পাসোয়ানকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে তাঁরই কাকা পশুপতি কুমার পরস, দলিতদের বার্তা দিতে বীরেন্দ্র কুমার, মহারাষ্ট্রের জন্য নারায়ণ রানে তো রয়েছেনই। 
মন্ত্রীরা বদলেছেন। চেয়ার নয়। কারণ, ওই চেয়ারগুলোতে বসলে তাঁদের একটাই কাজ... গুণকীর্তন। প্রধানমন্ত্রী ফতোয়া দেবেন, তাঁরা সই করবেন, আর মন্ত্রক চালাবেন অফিসাররা। এভাবেই না সাত বছর ধরে ‘সাফল্য’ এসেছে, একের পর এক পালক জুড়েছে প্রধানমন্ত্রীর মকুটে! এভাবেই বিক্রি হয়েছে দেশের সম্পদ। ক্ষমতার মোহে অন্ধ সে জন... আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি... হাঁফ উঠছে আমাদের...।

13th     July,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021