বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

দেশের মানুষের কুকথায় জর্জরিত মোদি
সন্দীপন বিশ্বাস

দোতলা ভিতের উপর পঞ্চাশ তলা বাড়ি নির্মাণ করলে তা ভেঙে পড়বেই। এটা জানার জন্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার প্রয়োজন নেই। সকলেই এটা জানেন। কিন্তু সম্ভবত মোদিজি এটা জানেন না। গুচ্ছ গুচ্ছ ব্যর্থতার ভিতের উপর স্বপ্নে তিনি গগনচুম্বি ক্ষমতা-সৌধ নির্মাণ করার জন্য ব্যগ্র হয়ে উঠেছেন। কিন্তু তা একের পর এক ভেঙে পড়ছে। পরপর বিপর্যয়। এই মুহূর্তে তিনি জোড়া ফলার আক্রমণে বিপর্যস্ত। তাই কার্যত খুব একটা বাইরে তাঁকে দেখা যাচ্ছে না। তাঁর গলার সেই হম্বিতম্বি ভাবও আজ আর নেই। বোঝা যাচ্ছে, বাংলার নির্বাচনই তাঁর শেষের শুরু হয়ে উঠেছে। তারপর থেকেই তাঁর মুখে কুলুপ। এখন তিনি শুধু অঙ্ক কষে চলেছেন। কৌশলের পারমুটেশন-কম্বিনেশনের অঙ্ক কষতে কষতে তিনি ঈষৎ ক্লান্ত। 
জোড়া ফলার আক্রমণের একটি হল উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডের ক্রমবিবর্তমান প্রতিকূল রাজনীতি। মোদিজি যতবার শিব গড়ার চেষ্টা করছেন, তাঁর অপটু হাতে পুতুলটি ততবারই বাঁদরে পরিণত 
হচ্ছে। সেটা অবশ্যই মাটির দোষ নয়, সেটা শিল্পীর অদক্ষতার প্রমাণ। উত্তরপ্রদেশে তিনি যোগীজিকে বাগে আনতে পারেননি। একটার পর একটা যোগী-অপসারণ কাব্যের প্লট ব্যর্থ হয়েছে। যোগীর মাথার উপর আশীর্বাদের হাত রয়েছে সঙ্ঘ পরিবারের। সেই কাঁটা উপড়ে ফেলার আগেই মোদির পায়ে বিঁধল উত্তরাখণ্ড কাঁটা। 
উত্তরাখণ্ডের ইতিহাস বদলের ইতিহাস।  গত ২১ বছরে ১০ বার মুখ্যমন্ত্রী বদল হয়েছে সেখানে। এর মধ্যে বিজেপির ৭, কংগ্রেসের ৩। গত চার মাসে সেখানে ৩ বার মুখ্যমন্ত্রী বদল করল বিজেপি। ৭০ আসন বিশিষ্ট বিধানসভায় ৫৭ আসন নিয়েও পুরো পাঁচ বছর  সেখানে বিজেপি স্বস্তিতে সরকার চালাতে পারল না। এর কারণ অবশ্য বিরোধীরা নন। ব্যর্থতার মূল কারণ নিহিত রয়েছে দলের কোন্দল-উপকোন্দলের মধ্যে। সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও কেন এত কোন্দল? কারণ, মোদি এবং অমিত শাহ। তাঁরাই মূলত দিল্লি থেকে সুতো নেড়ে রাজ্যের সরকার চালানোর চেষ্টা করেছেন। তাই নিয়ে উত্তরাখণ্ডে তুমুল বিদ্রোহ দলে। গুজরাত লবি সেখানে সরকার চালাবে, তা তাঁরা মেনে নিতে পারেননি। মুখ্যমন্ত্রী ত্রিবেন্দ্র সিং রাওয়াতের কোনও স্বর ছিল না। মোদিবাবুদের ঠিক করে দেওয়া মাতব্বররাই আড়াল থেকে রাওয়াতকে চালাতেন। এটা রাজ্যের বিধায়করা মেনে নেননি। তাঁরা রাওয়াতের সব বেচে দেওয়ার নীতিকেও পছন্দ করেননি। মোদিজির সুপরামর্শে রাওয়াত রাজ্যে একের পর এক জমি শিল্পের নামে বেনিয়াদের হাতে তুলে দিচ্ছিলেন। পরিবেশের ভারসাম্যের তোয়াক্কা না করেই পাহাড়ের পর পাহাড় বেচে দিচ্ছিলেন শিল্পের নামে। মোদিবাবুর আদর্শ মেনে ত্রিবেন্দ্রও হয়ে উঠেছিলেন বেচুবাবু সরকারের কর্তা।   
এছাড়াও রাওয়াতের বিরুদ্ধে ঘুষ কেলেঙ্কারির অভিযোগ আছে। বিজেপি অনুরাগী এক বিনিয়োগকারীর থেকে রাওয়াত বড় অঙ্কের টাকা ঘুষ খেয়েছেন বলে অভিযোগ। তবে শুধু রাওয়াত নয়, সে রাজ্যে ২১ বছরে ২০৬ জন নেতা-মন্ত্রীর নামে ঘোটালা কেস আছে। সেসব নারদের থেকেও বড় কেলেঙ্কারি।  উত্তরাখণ্ড কিছুটা সময় কংগ্রেসের দখলে ছিল। বেশিরভাগ সময়ে সেখানে রাজত্ব করেছে বিজেপি। অথচ বিজেপি অন্য রাজ্যে অবিরত নেতা-মন্ত্রীদের ছিদ্র খুঁজে বেড়ায়। 
এরাজ্যের বিজেপি নেতা-বিধায়করা একবার উত্তরাখণ্ডে গিয়ে ব্যাপারটা সামলে আসুন। এখানে অকারণে তাঁরা দিগগজি ফলাচ্ছেন। এখানে তাঁদের নেই কাজ তো খই ভাজ অবস্থা। সেই সঙ্গে একবার উত্তরাখণ্ডে পাঠানো হোক ধনকার বাবুকেও। কেউ কেউ অভিযোগ করে বলছেন, এ রাজ্যে যেমন অশান্তির পালে হাওয়া দিতে তিনি রাজ্যজুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন, সেটা উত্তরাখণ্ডে গিয়ে একবার দিয়ে আসুন। ওখানে অশান্তি পাকাতে খুব বেশি পরিশ্রম করতে হবে না। বারুদ তৈরিই আছে।
ত্রিবেন্দ্রজি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যতটা ব্যর্থ, বিজ্ঞানী হিসেবে বোধহয় তার থেকেও বেশি খ্যাত। তিনি বলেছিলেন, এই পৃথিবীতে গোরুই একমাত্র প্রাণী, যারা নিশ্বাসের সঙ্গে অক্সিজেন ত্যাগ করে। তবে এরকম বহু সেল্ফ স্টাইল্ড বিজ্ঞানী বিজেপিতে অসংখ্য আছেন। আমাদের রাজ্যেও আছেন। তাঁরা বিজ্ঞের মতো গোরুর দুধে সোনা আবিষ্কারের থিসিস তৈরি করেছেন। তবে উত্তরাখণ্ডে বিদ্রোহ শুধু দলের অন্দরেই নয়, ক্ষোভের আগুন জ্বলছে মানুষের বুকের ভিতরেও। সেখানে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো বলে কিছু নেই। শিক্ষার দুরছাই অবস্থা। এমনকী মানুষের অন্ন সংস্থানের কোনও ব্যবস্থা সেভাবে নেই। চাকরিও দুরাশা। মানুষ ক্ষিপ্ত। মানুষের সেই মারমুখী চেহারা দেখে বিধায়করা তাঁদের কেন্দ্রে যেতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে দলীয় বিধায়কদেরও ক্ষোভ তীব্র হয়ে উঠেছে। দল বেঁধে অনেকেই কংগ্রেসে যোগ  দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। সেই বিদ্রোহ চাপা দিতে উত্তরাখণ্ডের এমপি তীরথ সিং রাওয়াতকে মুখ্যমন্ত্রী করে রাজ্যে পাঠানো হল। নিয়মমতো তাঁর বিধানসভায় জিতে আসা দরকার। বিজেপি সেই পথে গেল না। অবিধায়ক তীরথকে সরিয়ে বিজেপি একটা ট্রিকি গেম খেলল। কিন্তু কেন? কেননা উত্তরাখণ্ডে উপনির্বাচন করে তীরথকে জেতাতে গেলে বাংলাতেও উপনির্বাচন করতে হয়। মোদিরা যে এখনই সেই উপনির্বাচনের পথে হাঁটতে চান না, তীরথকে সরানোটা সেটারই প্রমাণ। উপনির্বাচন করলে মমতার সুবিধা। তিনি ভোটে জিতে মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন। সেটাকে ঘেঁটে দিতেই এই অপকৌশলের পথে হাঁটল বিজেপি। নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রাভঙ্গ। শুধু কৌশল করে মমতাকে বিপাকে ফেলাই এখন মোদিবাবুদের এক নম্বর অ্যাজেন্ডা। চুলোয় যাক দেশ শাসন, চুলোয় যাক পেট্রলের দাম একশো টাকায় পৌঁছে যাওয়া, বাড়ুক যত ইচ্ছে গ্যাসের দাম, নাক কাটা যাক রাফাল কেলেঙ্কারি নিয়ে, ভ্যাকসিন কেলেঙ্কারি নিয়ে ধিক্কার উঠুক, সেসব বোধহয় এখন আর মোদিবাবু পরোয়া করেন না।  এসব নিয়ে এখন তাঁর দেশজোড়া অসম্মান। সারা দেশের ভুক্তভোগী মানুষের কুকথায় আজ মোদি জর্জরিত। তাতেও তাঁর কিছু এসে যায় না। মমতাকে টাইট দিতে পারলেই তাঁর নৈতিক শান্তি। ঐশ্বরিক সুখানুভূতি।  
আর আট মাস বাদেই উত্তরাখণ্ডে সাধারণ নির্বাচন। এখন রাজ্যে বিজেপির যা অবস্থা। হারবেই হারবে। মানুষ এখন থেকেই বিজেপিকে সরাবে বলে ফুঁসছে। উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখণ্ড এই দুই রাজ্যেই হারের আতঙ্কে কাঁটা হয়ে আছে বিজেপি। এই দুই রাজ্যেই বিজেপিতে ব্যাপক ভাঙন ধরেছে। প্রতিদিন শত শত দলীয় কর্মী পার্টি ছেড়ে বিরোধী দলে যোগ দিচ্ছেন। অন্যদের বিব্রত করতে গিয়ে রাজ্যে রাজ্যে আজ ভাঙছে বিজেপি। মোদির একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে পার্টির ভিতরেই প্রতিবাদ প্রকাশ্যে আসছে। 
এছাড়া হরিদ্বার কেলেঙ্কারি নিয়েও সেখানকার মানুষ ক্ষুব্ধ। গত বছর তবলিগি সম্মেলনের দিকে কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা আঙুল তুলে বলেছিলেন, ওদের জন্য করোনা ছড়াচ্ছে। কথাটা অবশ্য সর্বাংশে ভুল নয়। কিন্তু এবছর কুম্ভমেলায় লক্ষ লক্ষ মানুষের জমায়েত ঘিরে সারা দেশে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরোক্ষভাবে বলেছে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সবথেকে বড় কারণ এই কুম্ভমেলা। সেই অপছন্দের কথাগুলোকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে বিজেপি প্রতারণার আশ্রয় নিল। কুম্ভ থেকে যে করোনা ছড়াচ্ছে না, সেটা প্রমাণ করার জন্য এক লক্ষ ভুয়ো নেগেটিভ রিপোর্ট প্রকাশ্যে এনে প্রমাণ করার চেষ্টা হল, হিন্দু সাধু ও ভক্তরা করোনা ছড়ানোর জন্য দায়ী নন। ভুয়ো রিপোর্টের তত্ত্ব প্রমাণ হতেই চারিদিকে উঠেছে ছি ছি রব। সারা দেশের কাছে নেতাদের নাক কাটা গিয়েছে। রাজ্যে আওয়াজ উঠেছে, এই বিজেপিকে অবিলম্বে হটাও। 
এই অন্তর্যাতনার মধ্যে আবার হাতুড়ির ঘা মেরেছে রাফাল কেলেঙ্কারি নিয়ে তদন্ত। ফ্রান্স নিজেই তদন্ত কমিটি বসিয়ে দেখতে চাইছে, এই ডিলের মধ্যে কতটা ঘোটালা রয়েছে। ফ্রান্স অল আউট খেলতে নেমেছে, তাই দেখে প্রমাদ গুনতে শুরু করেছেন মোদি। সত্যিই তো বিক্রেতা দেশ যদি তদন্ত করার সাহস দেখায়, তবে ক্রেতা দেশ ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে কেন? কে ঘুষ খেল, সেটা তো সরকারেরই তদন্ত করে দেখা উচিত। তা না করে সরকার শাক দিয়ে মাছ ঢাকা দিচ্ছে। 
৩৬টা বিমান কেনা হয়েছে প্রতিটি ১ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা দামে। অথচ এই অস্ত্রই মনমোহন সিংয়ের আমলে ৫২৬ কোটি টাকায় কেনার কথা হয়েছিল। কেন তিনগুণ বেশি টাকা দিয়ে এই অস্ত্র কেনা হল? এতে কত টাকা কাটমানি ছিল?এই অস্ত্র ক্রয়ে কারা কারা লাভবান হয়েছেন? সুষেনমোহন গুপ্তের সঙ্গে বিজেপির কার কার সম্পর্ক? সুষেনের মারফৎ টাকা গিয়েছে কার কার ঘরে? কেন যৌথ সংসদীয় কমিটির নাম শুনেই মোদি ভয়ে কাঁপছেন? অনেক প্রশ্ন, অনেক রহস্য! বর্ফস অভিযোগ ঘিরে রাজীব গান্ধীকে সরতে হয়েছিল। সেই ইতিহাসই কি আবার ফিরে আসছে? মোদির অতীত এবং মোদির বর্তমান—, এই দুইয়ের পাটিগণিত বলছে, তাঁর যাওয়ার সময় আসন্ন। রসায়ন বলছেন, তিনি এখন ক্রম উদ্বায়ী।   

7th     July,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021