বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

করোনার গ্রাসে মোদির দর্প ও অহঙ্কার
মৃণালকান্তি দাস

কোভিড-যুদ্ধে জিততে ‘আত্মনির্ভর’ ভারতের ডাক দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। টিকা উদ্ভাবনের পর সেই ডাকের প্রাবল্য আরও বেড়েছিল। বিজেপির মেজো-সেজো নেতারাও হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন, নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে গোটা দুনিয়াকে টিকার জোগান দিয়ে রক্ষা করবে ভারতই। মোদিই এখন ‘বিশ্বগুরু’। মোদি ও তাঁর দলের রাজনীতির মূল সমস্যা এটাই। জাতীয়তাবাদ দিয়ে জনাবেগ সামলানো যায়, মহামারী নয়। এই অমোঘ সত্যটি এড়িয়ে গিয়ে আজ চক্রব্যূহে আটকে পড়েছেন নরেন্দ্র মোদি নিজেই।
করোনার দ্বিতীয় তরঙ্গে মড়কের গন্ধ ছেয়ে ফেলছে দেশ। গ্রাম-শহর-মফস্সল, প্রতিটি আশপাশ। মড়ক লেগেছে দেশে। দেশে করোনা প্রতিষেধকের আকাল। বিভিন্ন রাজ্যে কার্যত স্তব্ধ ১৮-৪৪ বছর বয়সিদের টিকাকরণ। টিকার জোগান বাড়াতে আমেরিকা সফরে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। দিল্লির শ্মশানের অনির্বাণ আগুন এখন ইউরোপ এবং আমেরিকার সংবাদপত্রের প্রচ্ছদে। সৎকারের জায়গা থিকথিক করছে। পোড়ানোর কাঠ নেই। গোরস্থানে জায়গা নেই। মানুষ মরছে পতঙ্গের মতো। আমার দেশে আর সৎকারের জায়গা নেই। ভাসছে নদীর জলে। উল্টানো কাগজের নৌকার মতো। পুণ্যতোয়া গঙ্গায়। রোগগ্রস্ত, অসুস্থ নিকটজনকে যথাযথ স্বাস্থ্য পরিষেবার অভাবে ধুঁকতে দেখে অজস্র পরিবার আতঙ্কের শিকার। ভারতের সমাজের ভিতটাই যেন কেঁপে উঠেছে।
যে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে একবছর আগে আসমুদ্রহিমাচল থালা-বাসন বাজিয়েছিল, আজ তিনি কটূক্তি ও কটাক্ষের পাত্র! কোভিডে প্রাণ হারানো মানুষজনের কথা বলতে গিয়ে আবেগতাড়িত প্রধানমন্ত্রীকে অপ্রয়োজনীয় ‘কুম্ভীরাশ্রু’ বিসর্জনে শক্তিক্ষয় না করে টিকার জোগানে সচেষ্ট হওয়ার পরামর্শ অবলীলায় দিচ্ছে বিরোধীরা। আরও বিস্ময়ের, প্রধানমন্ত্রীর এতদিনের রক্ষকদের অধিকাংশও নিষ্ক্রিয়। প্রতিবাদের অস্ত্র ভোঁতা। এখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম একযোগে বলছে, ভারতে বিপুল মৃত্যু, স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভাঙন, টিকার অভাব বা টিকাকরণের শ্লথগতি, সবকিছুর জন্যই দায়ী নরেন্দ্র মোদি সরকারের অদূরদর্শিতা, পরিকল্পনাহীনতা, আত্মসন্তুষ্টি। দুনিয়ার বহু দেশ যেখানে টিকাকরণ প্রকল্পের অন্তিম ধাপে পৌঁছে গিয়েছে, ভারত সেখানে এখন দ্বারে দ্বারে টিকার সন্ধান করে ফিরছে। বিখ্যাত মেডিক্যাল জার্নাল দ্য ল্যানসেট সম্পাদকীয় প্রতিবেদনে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে কাঠগড়ায় তুলে লিখেছে, ‘জাতীয় বিপর্যয় ডেকে আনার জন্য মোদিই দায়ী। সঙ্কটের সময় তিনি যা করেছেন তাতে মনে হয়েছে, কোভিডের মোকাবিলার চেয়ে ট্যুইটারের সমালোচনা মুছতে তাঁর আগ্রহ বেশি। এই স্বকীয় অপরাধ অমার্জনীয়।’
বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সরকারই নয়, মোদির টিকানীতির সমালোচনায় মুখর একদা তাঁরই ঘনিষ্ঠ সহযোগীরাও। নীতি আয়োগের প্রথম প্রধান হিসেবে মোদি যাঁকে বেছেছিলেন সেই অরবিন্দ পানাগড়িয়া বলেছেন, ‘টিকার বিকেন্দ্রীকরণ এক বিরাট ভুল।’ টিকানীতির সমালোচনা করেছেন মোদির প্রাক্তন প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রহ্মনিয়ানও। তিনি বলেছেন, ‘তিনটি বিষয়ে নজর দেওয়া দরকার। টিকার দাম বেঁধে দেওয়া যাতে অযথা অনিশ্চয়তা সৃষ্টি না হয়, সেই দাম শূন্য হওয়া উচিত, যাতে সবাই তা পেতে পারে এবং উৎপাদককে টিকার দাম মেটানোর দায় কেন্দ্রের, রাজ্যের নয়।’ টিকানীতি দেখে মোদির অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পর্ষদের আরেক প্রাক্তন সদস্য রথীন রায় হতাশা চেপে রাখতে পারেননি। তাঁর ট্যুইট, ‘হায়, অবশেষে কেন্দ্রও হাত তুলে দিল!’
এই প্রথম প্রায় নিঃসাড়ে ও নিরুচ্চারে কটাক্ষপূর্ণ বর্ষপূর্তি উদযাপন করল মোদি সরকার। কোভিড যদি তার বড় কারণ হয়, দ্বিতীয় কারণ দেশব্যাপী অশান্তি, অসন্তোষ ও জনবিক্ষোভ। তার ছাপ মোদির শরীরী ভাষায় স্পষ্ট। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার কারণ একাধিক। বিশ্বাসে তাঁর চিড় ধরেছে। অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বাসীরাও প্রশ্ন তুলছেন। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফল। ধাক্কা এতই প্রবল যে শুনতে হচ্ছে ‘সরকার যেন স্থবির ও জড়ভরতের প্রতিমূর্তি’। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘এই সাতবছরে যা কিছু সাফল্য, তা দেশের এবং দেশের মানুষের।’ বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছেন, তা হলে ব্যর্থতার দায় কার? নাকি তার পাল্লা ভারী বুঝেই গত সাতবছরের কাজের ফসল এখন দেশবাসীর সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাইছেন মোদি? ‘মন কি বাত’ রেডিও-বার্তায় বলেছেন, ‘এই সাতবছরে সব কাজ সম্ভব হয়েছে, কারণ, সরকার ও জনতার বদলে আমরা একসঙ্গে টিম-ইন্ডিয়া হিসেবে কাজ করেছি।’ বিরোধীদের প্রশ্ন, জনতাকে সাফল্যের ভাগীদার করার ‘অছিলায়’ কি আসলে করোনা মোকাবিলায় চূড়ান্ত ব্যর্থতার দায়ও তাঁদের ঘাড়ে ঠেলে দিতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী?
জানুয়ারির শেষে দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরামের অধিবেশনে (ভার্চুয়াল) অংশ নিয়ে মোদি করোনার বিরুদ্ধে ভারতের জয়ী হওয়ার কৃতিত্ব দাবি করেছিলেন। বিশ্বের তাবৎ বিশেষজ্ঞের আশঙ্কাকে ‘ভুল’ প্রতিপন্ন করে বলেছিলেন, ‘করোনার 
বিরুদ্ধে লড়াইকে জন-আন্দোলনে পরিণত করে ভারত সফল হয়েছে।’ গর্বের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘যে দেশে পৃথিবীর ১৮ শতাংশ মানুষের বসবাস, তারা শুধু নিজেকেই নয়, গোটা বিশ্বকে এই বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছে।’ তিনমাসের মধ্যে সেই গর্বের বেলুন শুধু চুপসেই গেল না, পরিত্রাণের জন্য মোদির ভারত আজ বিশ্বের কৃপাপ্রার্থী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমন্ত সোরেনরা আজ তা প্রকাশ্যে বলতে দ্বিধা করছেন না। প্রধানমন্ত্রী তাঁদের চোখে ‘স্বৈরতন্ত্রী’! মোদির ‘বাক্রুদ্ধতা’ চিত্রিত হচ্ছে ‘কুম্ভীরাশ্রু’ বা ‘নৌটঙ্কি’ বলে!
ইতিমধ্যে কেন্দ্র জানিয়েছে, করোনা মহামারীর তৃতীয় ঢেউ মোকাবিলার কোনও পরিকল্পনা কেন্দ্রের নেই। সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতের কাছে এই অপ্রস্তুতি স্বীকার করে নিয়েছেন। দেশবাসী অবশ্য বিস্মিত হয়নি। কেন্দ্রীয় সরকার যে স্বাধীন ভারতের বৃহত্তম বিপর্যয়ের মোকাবিলায় সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত, ভারতের শহর ও গ্রামে গণচিতার ধুম তার সাক্ষ্য দিচ্ছে। লাগামছাড়া সংক্রমণ ও মৃত্যুর ত্রাহি ত্রাহি রবই শুধু নয়, প্রধানমন্ত্রীকে নিদারুণ উপহাসের পাত্রও করে তুলেছে। মহারাষ্ট্রের শিবসেনাও বলতে ছাড়ছে না, ‘মোদির ভারত এতটাই আত্মনির্ভর যে বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কাকেও আজ সাহায্যের হাত বাড়াতে হচ্ছে!’ কংগ্রেসের গুণগান করে শিবসেনার মুখপত্র সামনা লিখেছে, ‘৭০ বছর ধরে নেহরু-গান্ধীর দল যে ব্যবস্থা তৈরি করে গিয়েছে, দেশ বেঁচে রয়েছে তারই দৌলতে।’
অথচ, দুর্নীতি দূর করে ‘আচ্ছে দিন’ আনার স্বপ্ন দেখিয়ে মোদি ক্ষমতায় এসেছিলেন। সাতবছর পর আজ সেই স্বপ্ন মরীচিকার মতো দূরেই সরে যায়নি, আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে হতাশারও জন্ম দিয়েছে। স্লোগান যত অধরা থেকেছে, ততই জন্ম হয়েছে নতুন নতুন স্লোগানের। ২০১৬ সালে নোট বাতিলের সময় মানুষ বিশ্বাস করেছিল, কালো টাকা উদ্ধার ধনীদের শায়েস্তা করবে। নোট বাতিলের ধাক্কা সামলানোর আগেই চালু করে দেওয়া হয় অভিন্ন পণ্য ও পরিষেবা কর বা জিএসটি। ২০১৭ সালে আবার নতুন স্লোগান দিলেন মোদি ‘নতুন ভারত’ গড়ে কৃষকের আয় দ্বিগুণ করার। সেই কৃষককুল আজ আন্দোলনে। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্ব-ক্ষমতায় আস্থা রেখেই দেশ তাঁকে ২০১৯ সালে ক্ষমতায় ফিরিয়েছে। বছর না ঘুরতেই দেশবাসী দেখল, পরিযায়ী শ্রমিকের সঙ্কটে তাঁর সরকারের উদাসীনতা, কর্মহীনের খাদ্যসুরক্ষায় ব্যর্থতা, দরিদ্রের অর্থসহায়তায় অনিচ্ছা। অতঃপর দ্বিতীয় ঢেউয়ের সম্ভাবনা জেনেও কুম্ভমেলার অনুমোদন, নির্বাচনী জনসভায় তাঁর যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ। শীর্ষ নেতার এই অপরিণামদর্শিতা কত লক্ষ প্রাণ নিল, কে বলতে পারে?
মোদির জনপ্রিয়তায় আচমকা ভাটার প্রধান কারণ কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে ‘ব্যর্থতা ও প্রতিশ্রুতিভঙ্গ’। সবাইকে বিনামূল্যে টিকা দেওয়ার কথা বলে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসা গরিবদের ক্ষুব্ধ করেছে। কৃষকের ক্ষোভ প্রশমন ও মূল্যবৃদ্ধি 
রোধ করতে না পারার ব্যর্থতাও বড় হয়ে 
উঠেছে। কর্মসংস্থানের সঙ্কোচন সৃষ্টি করেছে 
সার্বিক অনিশ্চয়তা। দেশবাসীর ক্ষোভ বাড়িয়েছে, ‘সেন্ট্রাল ভিস্তার’ মতো অনাবশ্যক ক্ষেত্রে বিপুল 
অর্থ খরচ নিয়ে। 
আচ্ছে দিনের বুদবুদ মিলিয়ে লাশের আগুন ও কাফনের হাহাকারে আকাশ-বাতাস এখন ভারী। বিদেশি সংবাদমাধ্যম লিখছে, ভারতে একদিকে টিকা অমিল, অন্যদিকে কিছু মানুষ করোনা রোধে গোময়-গোমূত্র মাখছেন। দু’টি টিকার উৎপাদক, বিশ্বে সর্বাধিক টিকা রপ্তানিকারী রাষ্ট্রের গৌরবধন্য ‘ইন্ডিয়া’ আজ হতমান ‘ভারত’-এ পর্যবসিত। মোদির সাতবছরের দর্প ও অহঙ্কার নিমেষে চূর্ণ হওয়ার মুখোমুখি! কে বলতে পারে, এতদিন উড়তে থাকা নরেন্দ্র মোদি চক্রব্যূহে আটকে পড়ে নিয়তির মুখোমুখি হতে চলেছেন কি না?

3rd     June,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
কিংবদন্তী গৌতম
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021