বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

একাই বলে যাবেন,
শুনবেন না
হারাধন চৌধুরী

 

আবার ‘মন কি বাত’। ফের তিনি আকাশবার্তা শুনিয়েছেন। কারও কথা  শুনবেন না, শুধু একতরফা শুনিয়ে যাবেন। সবাইকে তা শুনতে হবে—ভক্তিভরে, অন্ধ বিশ্বাস নিয়ে। এটাই তাঁর ‘সামান্য’ চাহিদা। তাঁর ধারণা হয়েছে, পবিত্র কর্তব্য জ্ঞানে দেশবাসী সেটাই করছে। তা না-হলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দাবি করেন কী করে, দেশবাসী ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ ও সবকা বিশ্বাস’-এর মন্ত্র অনুসরণ করছে! নব্য ‘ভারতেশ্বর’ আরও বিশ্বাস করেন, দেশবাসী তাঁরই নেতৃত্বে কোভিড-১৯ যুদ্ধে জিতছে, জয় করেছে আরও প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে। মাত্র সাতবছরের শাসনে তিনিই ডিজিটাল ভারত নির্মাণ করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে দেশ অনেক ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। দেশের নিরাপত্তা ও মর্যাদা বেড়েছে। মিটেছে কাশ্মীরের ক্রনিক সমস্যা। উন্নতি হয়েছে কৃষকের। জীবন-জীবিকা থেকে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি প্রভৃতি নানা ক্ষেত্রে অসামান্য সাফল্য দেখিয়েছে মোদির ভারত। মোদি আরও বিশ্বাস করেন, তাঁর নেতৃত্বে দেশ সোজা লক্ষ্যেই পৌঁছচ্ছে। তাঁর ডানহাত অমিত শাহের অভিমত, মোদি-যুগে জাতীয় নিরাপত্তা, জনকল্যাণ ও সংস্কারে ‘অভূতপূর্ব অগ্রগতি’ হয়েছে। শাহ নিশ্চয়তা দিয়েছেন, মোদির দূরদর্শী নেতৃত্বে দেশ সমস্ত চ্যালেঞ্জে জয়ী হবে এবং ‘উন্নয়নের সফর’ চলতেই থাকবে।
কিন্তু মানুষের কথা শোনা প্র্যাকটিস করলে মোদি জানতে পারতেন প্রদীপের নীচের কাহিনিটাও। স্কুলের চেহারাটাই ভুলে গিয়েছে ছোট ছেলেমেয়েরা। তারা জানে না, ‘গৃহবন্দিদশায়’ শহরের মুষ্টিমেয় কিছু পড়ুয়া অনলাইনে যা শিখছে তার সঙ্গে ‘ঘরে বসে সাঁতার শিখুন’-এর তফাতটা কী হবে? প্রান্তিক অঞ্চলের ছেলেমেয়েদের কাছে অনলাইন শিক্ষাটা এখনও দূরগ্রহে পৌঁছনোর অ্যাডভেঞ্চারের মতোই। যেসব এলাকায় যশের আঘাত নেমে এসেছে, সেখানে বইখাতাও ভেসে গিয়েছে। প্রথম বা দ্বিতীয় বোর্ড পরীক্ষার আগে অনেকের মাথায় আসছে আরও কিছু ইস্যু। অনেকের বাবা/মা মারা গিয়েছেন। কারও বাবার চাকরি চলে গিয়েছে অথবা বন্ধ হয়ে গিয়েছে পারিবারিক ব্যবসা। পরিবারের এক বা একাধিক সদস্য, এমনকী সকলেই কোভিডে আক্রান্ত। মারাও গিয়েছেন কেউ কেউ। মানসিক সমস্যার শিকার ছেলেমেয়েরাও। দেনার দায়ে কিংবা অবসাদ থেকে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটে গিয়েছে কোনও কোনও পরিবারে। সম্প্রতি সংক্রমণ কিছুটা কমলেও সম্ভাব্য তৃতীয় ঢেউয়ের আতঙ্ক যাচ্ছে না। যাতে নাকি কম বয়সি, এমনকী শিশুদেরও বিপদের আশঙ্কা প্রবল। দিল্লির দু’টি বোর্ডের বারো ক্লাসের পরীক্ষা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যাই হোক, আতঙ্কে ভুগছে অনেকে। কোন ভরসায় অফলাইন পরীক্ষায় বসবে? আটকানোর জন্য তারা নাকি ফোরাম গড়েছে। তারা মনে করে, ইতিমধ্যেই ভ্যাকিসন পেয়ে গেলে এই দিনটা তাদের দেখতে হতো না। দশম-দ্বাদশের পরীক্ষার্থীদের টিকাকরণ হল না কেন? লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়ে নতুন কেরিয়ার গড়ার প্রাক্কালে চরম অনিশ্চয়তার শিকার। সব ধরনের গ্রাজুয়েশন ফাইনাল পরীক্ষা গত বছরও স্বাভাবিক হয়নি। বেশিরভাগের কেরিয়ারে এর বিরূপ প্রভাব পড়াটাই স্বাভাবিক। দায় কার? ফাইজারের ইমারজেন্সি ইয়্যুজ অ্যাপ্রুভাল দিতে কেন গড়িমসি করল সরকার? ফাইজারের টিকা তো ১২+ বয়সিদের দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ। এছাড়া কোভ্যাকসিন কিংবা অন্যকোনও ভ্যাকসিনের ট্রায়াল নিয়েও ভাবতে পারত না কি সরকার? 
মানুষের কথা শোনা প্র্যাকটিস করলে মোদি আরও জানতে পারতেন: গান্ধীজি ‘রামরাজ্য’ বলতে যা বুঝতেন মানুষ সেটাই চেয়েছিল। মোদি-শাহের নেতৃত্বে রামনামের লাগাতার যে বদনাম হচ্ছে এটা তাঁরা চাননি। বল্লভভাই প্যাটেলের সুউচ্চ মৃর্তি চাননি কেউ। তাঁরা চেয়েছেন সর্দারের যুক্তরাষ্ট্রীয় আদর্শের প্রতিষ্ঠা। পাঁচ শতাধিক দেশীয় রাজ্যকে মানচিত্রে এনে আজকের সুবিশাল ভারত রাষ্ট্রের চেহারা দান তাঁরই অবদান। কেন্দ্র-রাজ্যের সুসম্পর্কই এটা অটুট রাখতে পারে। ছন্দটা প্যাটেলই বেঁধে দিয়ে গিয়েছেন। মোদিবাবুরা একনায়ক প্রভুর সামনে কতিপয় দুর্বল ভৃত্যের যে কদর্য ছবিটা আঁকতে সচেষ্ট, তাতে ছন্দপতন  অনিবার্য হয়ে উঠছে। একটা অঙ্গরাজ্যের ব্রিলিয়ান্ট চিফ সেক্রটারির চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি ঠেকাতে মোদি স্বয়ং যেভাবে কেলেঙ্কারিতে নেতৃত্ব দিলেন তা ভারতের প্রশাসনিক ইতিহাসে লেখা থাকবে। প্যাটেল যাকে ‘স্টিল ফ্রেম অফ ইন্ডিয়া’ বলেছিলেন সেই সিভিল সার্ভেন্টদের মোদিরা গৃহভৃত্যের স্তরে নামিয়ে আনার স্পর্ধা দেখাচ্ছেন না কি? হলফ করে বলতে পারি, মনমোহন সিং, এমনকী অটলবিহারী বাজপেয়ি হলেও এই নীচতার কথা ভাবতে পারতেন না‌। বিরোধী দল বা  সরকারের দু’চারজন গদ্দারকে ফুসলে জালে তোলার কালচার মানুষ চায় না। তারা চায়, ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ যেসব কারণে মোদির দল ও সাঙ্গোপাঙ্গদের অপছন্দ করে সেই কারণগুলো দূর করতে আন্তরিক হোন মোদি।
বাংলার মানুষ পরিষ্কার বুঝেছে, এখানকার ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি দিল্লির ক্ষমতালোভীদের কোনও শ্রদ্ধা নেই। শুধু ভোটপ্রচারে বেরিয়ে দু'-চারজন দলিত ব্যক্তির বাড়িতে পাতপেড়ে খেলে কিংবা হাস্যকরভাবে দু'-চারটি বাংলা বাক্য বললেই কেল্লা ফতে হয়ে যাবে! বাঙালি ভেতো ঠিকই, কিন্তু নাকে ভাত খায় না। মতুয়া ভোটের দখলদারি নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নতুন নয়। ক্ষমতায় অবস্থানকালে বিমান বসুরাও যোগ দিয়েছিলেন। একাধিক ভোটে মমতার কাছে দশ গোল খেয়ে বুঝেছেন, মতুয়াদের জন্য কাজও কিছু করতে হবে। শুধু বড়মার পাদোদক গ্রহণ আর ঠাকুরবাড়িতে হত্যে দেওয়া যথেষ্ট নয়। মোদি সেই পাঠ নিলেন না। ভাবলেন, বাংলাদেশে মতুয়া মতের উৎসভূমিতে একবার পা রাখলেই সহস্র যোজন পিছনে পড়ে যাবেন মমতা। আর কেউ বুঝিয়েছে, আপামর বাঙালির ভক্তি আর দু'টি জিনিসে—মাকালী আর রবীন্দ্রনাথে। অতএব রবিঠাকুরের লুক আনুন আর যশোরেশ্বরী মাকালীর পায়ে একবার মাথা ঠুকে আসুন। এসবে লাভ যে কিছু হয় না তাও দেখলেন। 
মানুষ আরও জেনে গেল—তবু শোধরাতে কিংবা থামতে জানেন না মোদি। এবার শুরু হয়েছে সিএএ সুড়সুড়ি। বিতর্কটা বাড়ানোর জন্যই পশ্চিমবঙ্গকে বাদ রাখা হয়েছে। অথচ আইনটার মূল লক্ষ্যই ছিল পশ্চিমবঙ্গে আশ্রিত শরণার্থীরা। আইনটা গোলমেলে। অসাংবিধানিক বলেও অভিমত আইনজ্ঞ এবং রাজনীতিকদের একাংশের। তাই বাতিল হওয়াই উচিত। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বাঙালি উদ্বাস্তুদের ভারতে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার জন্য আপ্রাণ লড়েছিলেন। পার্লামেন্টে জওহরলাল নেহরুর বিরুদ্ধে তর্জনী তুলতেও ভয় পাননি। শ্যামাপ্রসাদের সৌজন্যে পরবর্তী সাতদশকে যাঁরা সম্মানের সঙ্গে থিতু হয়েছেন, মোদিরা নতুন করে তাঁদেরকেই দেগে দিতে চাইছেন কেন? স্বাধীনতার ৭৫  বছরের দোরগোড়ায় পৌঁছে কোন পরিবার নতুন করে বলতে যাবে যে, আমার বাবা/ ঠাকুরদা/ ঠাকুরদার বাবা উদ্বাস্তু হয়ে এসেছিলেন! দুই-তিন প্রজন্ম পেরিয়ে গিয়েছে। এমনকী একাত্তর বা তারও পরে এসে যাঁরা লেখাপড়া করেছেন, চাকরিতে বা অন্য পেশায় সুখী জীবনের সন্ধান পেয়েছেন, দেশে বা বিদেশে গবেষণায় ব্রতী রয়েছেন, কেন তাঁদের নতুন করে ডিসটার্ব করা হবে? অনেকের উদ্বাস্তু পরিচয় আজ ফিকে, কিংবা মুছেই গিয়েছে। ছেলেমেয়ে, নাতিনাতনিদের ঘটি বাড়িতে বিবাহ কিংবা অন্যরকম আত্মীয়তার সূত্রে। কী গ্যারান্টি আছে—‘আমি উদ্বাস্তু পরিবারের সদস্য’—সরকারিভাবে এমন স্বীকারোক্তি আদায় করে নেওয়ার পর নতুন কোনও ফাঁদে ফেলা হবে না?
সবচেয়ে বেশি ক্ষুণ্ণ হবে বাংলাদেশ। আজকের পরিস্থিতি লিয়াকত আলির শাসন, এমনকী জিয়াউর রহমান বা এরশাদের যুগ নয়। হাসিনার সরকার সুকৌশলে চেষ্টা করে যাচ্ছে মানুষে মানুষে বিভেদ কমাতে। সে বিভেদ ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক সবই। তিনি মানুষের খিদে ও মৃত্যুহার কমিয়ে, জীবনশক্তি ও আয় বাড়িয়ে পুরো এশিয়াকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। এটা ভারতের জন্য একই সঙ্গে শিক্ষণীয় ও স্বস্তির বিষয়। অনুমান করা যায়, অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং মৌলবাদী উগ্রপন্থা নিয়ে ভারতের পুরনো ভয় কমে যাবে। এটা নির্মূল করতে হলে বাংলাদেশের আরও উত্থান ও শক্তিসঞ্চয় কাম্য। উন্নত ভারত ও উন্নত বাংলাদেশই পারে উপমহাদেশের চেহারায় একটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে। ভারত-বাংলাদেশ হাত ধরাধরি করে এগচ্ছে—এই ছবি পাকিস্তান ও চীনের চৈতন্য ফেরাতে সাহায্য করবে। সিএএ নিয়ে মোদিরা সংযত না-হলে এত বড় সুযোগ নষ্ট হবে। কারও বুঝতে বাকি নেই, সাতবছরের গুচ্ছ গুচ্ছ ব্যর্থতার থেকে ভারতবাসীর দৃষ্টি ঘোরাতেই বারবার নানা ভুলের ফাঁদে জড়ানো হচ্ছে দেশকে। হল্লাগুল্লার নষ্ট সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসুন নরেন্দ্র মোদি। কেটে গেল সাতটা বছর, সে তো কম সময় নয়! এবার অন্তত জানুন, মানুষ কী চায়। শিখুন, ভারত রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর কাছে বহির্ভারতেরও প্রত্যাশা কতখানি।

2nd     June,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
কিংবদন্তী গৌতম
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021