বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

সাধু সাবধান, ভাবিয়া করিও কাজ
তন্ময় মল্লিক

‘বদল হবে, বদলাও হবে’। নির্বাচনের আগে দিলীপ ঘোষ থেকে সায়ন্তন বসুদের এটাই ছিল জনপ্রিয়তম স্লোগান। ‘বদলা নেওয়ার’ হুমকির পাশাপাশি চোখা চোখা ডায়ালগের ফুলঝুরি ফুটত। প্রতিযোগিতায় এঁটে উঠতে পারেননি অনুব্রত মণ্ডলও। ‘ডাটিয়ে পগার পার করে দেব’ বলার পর অনুব্রতবাবু ‘খেলা হবে’তেই আটকে ছিলেন। কিন্তু বিজেপি নেতাদের হুমকির তুফান ছুটছিল। ‘দিকে দিকে শীতলকুচি হবে’, ‘চারজনকে নয়, আটজনকে মারা দরকার ছিল’, ‘রগড়ে দেব’, আরও কত কী! বিজেপিতে তখন আদি আর দলবদলুদের মধ্যে একে অপরকে ছাপিয়ে যাওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতা। সেসব কথাই এখন ব্যুমেরাং হচ্ছে। নেতাদের বোঝা উচিত ছিল, মুখের কথা আর হাতের ঢিল একবার বেরিয়ে গেলে আর ফেরানো যায় না।
মারামারি, খুনোখুনি কোনও সুস্থ মানুষ সমর্থন করতে পারেন না। এই ধরনের কাজের সঙ্গে যারা যুক্ত থাকে, তারা মানসিকভাবে অসুস্থ। একথা মেনে নিয়েও বলছি, নির্বাচনোত্তর সংঘর্ষের জন্য বিজেপি নেতারাই বহুলাংশে দায়ী। এখন অনেকেই মিন মিন করে ‘শান্তি চাই, শান্তি চাই’ বলছেন। মঞ্চে দাঁড়িয়ে বড় বড় ডায়ালগ ঝাড়ার আগে কর্মী সমর্থকদের সুরক্ষার কথাও নেতাদের ভাবা উচিত ছিল। 
প্রতিটি ঘটনার পিছনেই কারণ থাকে। এবারে নির্বাচনের শুরু থেকে যে সমস্ত ঘটনা ঘটেছে তা বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে, এই অশান্তি সৃষ্টির দায় কাদের।
একটা কথা মানতেই হবে, রাজ্যে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব সর্বদা শাসক দলের উপরেই বর্তায়। হিংসা নিয়ন্ত্রণে শাসক দল হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেসকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে। রাজ্যের মানুষ উন্নয়ন ও শান্তির স্বার্থেই তাদের বিপুল ভোটে জিতিয়েছেন। সেকথা মাথায় রেখেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃতীয়বার মুখ্যমন্ত্রিত্বের চেয়ারে বসেই করোনা মোকাবিলা ও রাজ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। 
এবার দেখা যাক, রাজ্যের পরিস্থিতি এমন হল কেন?
২০১১ সালে ৩৪ বছরের সিপিএম জমানার অবসান ঘটেছিল। বাম আমলে এরাজ্যে কংগ্রেস এবং পরবর্তী সময়ে তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীদের উপর কম অত্যাচার হয়নি। করন্দা, সূচপুর, কেশপুর, গড়বেতা, ছোট আঙারিয়া, নন্দীগ্রাম, নেতাইয়ের মতো গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে। পুকুরে ফলিডল মিশিয়ে মাছ মেরে দেওয়া, খেতমজুর বয়কট, জমি দখলের ঘটনায় জেরবার হয়ে গিয়েছিল বাংলার মানুষ। অনেকেই ভেবেছিলেন, ক্ষমতা বদল হলে রাজ্যে রক্তগঙ্গা বয়ে যাবে। কিন্তু সেটা হয়নি। 
তার প্রথম কারণ ক্ষমতা দখলের অনেক আগে থেকেই তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘বদলা নয়, বদল চাই।’ জেতার পর তিনি দলীয় কর্মীদের বলেছিলেন, ‘পাড়ায় পাড়ায় রবীন্দ্র সঙ্গীত বাজিয়ে বিজয় উৎসব পালন করুন।’ তাতে রাজ্যের সাধারণ মানুষ শুধু নয়, বিরোধীরাও আশ্বস্ত হয়েছিলেন।
দ্বিতীয় কারণ, সিপিএমের মাতব্বররা আগেই বুঝে গিয়েছিল, হাওয়া ভালো নয়। তাই বেশিরভাগই মস্তানি ছেড়ে সেঁটে গিয়েছিল। অনেকে তলায় তলায় তৃণমূলের সঙ্গে সমঝোতাও করে নিয়েছিল। 
ফলে সিপিএমকে নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
২০১৬ সালে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে সিপিএম ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন দেখলেও তারা উস্কানির রাস্তায় যায়নি। ফলে তৃণমূল দ্বিতীয়বার জেতার পরেও রাজ্যে তেমন অশান্তির ঘটনা ঘটেনি। ব্যক্তিগত ঝাল মেটানোর জন্য কোথাও কোথাও টুকটাক অশান্তি হলেও তা ব্যাপক আকার নেয়নি। 
সেদিক দিয়ে ২০২১ এর নির্বাচনী প্রেক্ষিত ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিজেপি বাংলা দখলের জন্য সব চেষ্টাই চালিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদার মানুষও দিনের পর দিন দেশের একমাত্র মহিলা মুখ্যমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে কটাক্ষ করেছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন এজেন্সিকে নির্লজ্জভাবে কাজে লাগানো হয়েছে। নারদ-সারদা কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত তৃণমূল নেতাদের চাপ দিয়ে বিজেপিতে নিয়ে গিয়েছে। তাঁদেরই উস্কে দিয়ে তৃণমূলের নেতানেত্রীদের কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বুকে যা কখনও হয়নি, এবার সেটাও হয়েছে। জাতপাত ও ধর্মের সুড়সুড়ি দিয়ে প্রকাশ্যে ভোট চাওয়া হয়েছে।
নির্বাচনের মুখে দলবদলু অধিকাংশ নেতা কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী পাওয়ায় ধরাকে সরা জ্ঞান করেছিলেন। মমতাকে ভাঙিয়ে চারচাকায় চড়া নেতারা চার্টার্ড প্লেনের সওয়ারি হয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, হাতে চাঁদ পেয়েছেন। কিন্তু মাটিতে যে নামতে হবে, সেটা ভুলে গিয়েছিলেন। তাই বাংলার মানুষ হ্যাঁচকা টানে বাস্তবের রুক্ষ মাটিতে তাঁদের আছড়ে ফেলেছেন। ঘোর কাটতে তাঁদের অনেকেই এখন গাইছেন, ‘আমায় একটু জায়গা দাও মায়ের মন্দিরে বসি।’
তবে দলবদলুদের মধ্যে এবার ‘জাত’ চিনিয়েছেন মিঠুন চক্রবর্তী। খোদ প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় বিজেপিতে আত্মপ্রকাশ। জাতশিল্পী বলে কথা! তাই নিজের জাত বোঝানোর জন্য যোগদান মঞ্চেই ঝেড়েছিলেন ফিল্মি ডায়ালগ, ‘আমি বালিবোড়া নই, জলঢোঁড়া নই, জাত গোখরো। এক ছোবলেই ছবি।’ ভাষা বুঝতে না পারলেও ‘মহাগুরু’র ডায়ালগে হাততালির ঝড় দেখে মোদিজি হয়তো ভেবেছিলেন, বাঙালির সেন্টিমেন্টকে কব্জা করার মতো একজন লোক এতদিনে পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু, ভোটের ফল বেরনোর পর তিনি টের পাচ্ছেন, ‘জাত গোখরো’র ফোঁস-ফোঁসানি দেখে বাংলার মানুষ ঘরে ঘরে কার্বোলিক অ্যাসিড রেখে দিয়েছিল।
অমিত শাহ এরাজ্যের প্রচারে এসে বার বার বলেছেন, ‘ইসবার দোশো পার।’ বাংলার মানুষ কথা শুনেছেন। আসন সংখ্যা ২০০ পেরিয়েছে। তবে সেটা বিজেপির নয়, তৃণমূলের। নরেন্দ্র মোদি থেকে দিলীপ ঘোষ প্রায় প্রতিটি সভায় বলতেন, ‘উনিশে হাফ, একুশে সাফ’। এখানেও একটু উল্টো হয়েছে, একুশে সাফের বদলে উনিশেরও হাফ হয়ে গিয়েছে। লোকসভায় বিজেপি ১৮টিতে জিতেছিল। বিধানসভা ভোটের বিচারে মাত্র ন’টিতে এগিয়ে।  
এই অবস্থার মধ্যেও বিজেপির দিল্লির নেতৃত্ব নানাভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছে। ফেক নিউজ তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়াচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী রাজ্যের রাজ্যপালকে ফোন করছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক রাজ্যের কাছ থেকে রিপোর্ট চাইছে। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে দিল্লির প্রতিনিধিরা রাজ্যে চলে আসছেন। যাকে বলে হই হই কাণ্ড রৈ রৈ ব্যাপার। দেশকে বোঝাতে হবে, ‘বাংলায় জঙ্গলরাজ চলছে।’ ভুললে চলবে না, গোধরা কাণ্ডের সময় এই মোদিজিই ছিলেন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী।
তবে বিজেপির এমন কৌশল এই প্রথম নয়। মহারাষ্ট্র তার সাক্ষী। ক্ষমতা দখল করতে না পেরে বিজেপি সেখানেও লাগাতার ভুয়ো খবর আর ছবি ছড়িয়ে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে। সেই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে মহারাষ্ট্রের প্রদেশ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক শচীন সাবন্ত বলেছেন, গত দেড় বছর ধরে মহারাষ্ট্রে রাজ্যপাল, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের উপর হামলার থেকে ভুয়ো খবর, ভুয়ো ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার আমরা সাক্ষী। এসব করে একটা গল্প খাড়া করার চেষ্টা হয়।’ সাবন্তের সতর্কবার্তা, ‘বিজেপি গুজব ছড়িয়ে তিলকে তাল করে ফেলতে পারে।’ এব্যাপারে তিনি সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর প্রসঙ্গও উল্লেখ করেছেন। দিল্লিতেও জনগণের ভোটে নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে। তার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার আইন সংশোধন পর্যন্ত করেছে। যে কোনওভাবে বিরোধীদের শায়েস্তা করাটাই বিজেপির ট্র্যাডিশন।
নির্বাচনে নাস্তানাবুদ হওয়ার পরেও বাংলাকে নিয়ে বিজেপির চিন্তার কারণ একটাই—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ বুঝে গিয়েছেন, সিবিআই, ইডির গল্প দিয়ে আর খুব বেশি এগনো যাবে না। হ্যাটট্রিকের পর জাতীয় রাজনীতিতে ‘বাংলার বাঘিনী’ই মোদি-বিরোধী প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন। তাই ‘বিজেপির চাণক্য’ কেন্দ্রীয় টিম পাঠিয়ে, ফোনাফুনি করে তাঁকে চাপে রাখতে চাইছেন।  
বাংলায় একটা কথা চালু আছে, এক কান কাটারা গ্রামের পাশ দিয়ে যায়। আর দু’কানা কাটারা গ্রামের ভিতর দিয়ে যায়। বিজেপির দিল্লির নেতৃত্বের হালচাল দেখে মনে হচ্ছে, তাঁরা দ্বিতীয় পর্যায়ভুক্ত। লজ্জা শরমের বালাই নেই। সেটা থাকলে এমন গোহারা হারার পরে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির কথা কল্পনাও করতে পারত না।
বাংলার এই রায়ের পরেও বিজেপির ‘বহিরাগত’ নেতাদের শিক্ষা হয়নি। বাংলা ও বাঙালিকে এখনও তাঁরা ঠিকমতো চিনতে পারেননি। অমিতজি, আপনারা ‘জাত গোখরো’ দেখেছেন, কিন্তু ‘স্পিট কোবরা’ দেখেননি। স্পিট কোবরা ছোবল মারে, আবার প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে প্রয়োজনে বিষ ছুড়তেও পারে। তার সামনে পড়লে প্রবল পরাক্রমশালী সিংহও ভয়ে পিছু হটে। বাঙালি হল সেই ‘স্পিট কোবরা’। তাই বলি, সাধু সাবধান, ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না।

8th     May,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
কিংবদন্তী গৌতম
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021