বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

দেশকে তিনি করেছেন
ছন্নছাড়া শ্মশানভূমি
সন্দীপন বিশ্বাস

করোনা এবং নির্বাচনকে ঘিরে সারা দেশ আজ এক প্রহসনের নাট্যমঞ্চে পরিণত হয়েছে। যেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পরিচালিত এক প্রহসন অভিনীত হচ্ছে, কমেডি অব এররস। গোদা বাংলায়, ভ্রান্তিবিলাস। এক রাজা ও মন্ত্রীর ভুলে সারা দেশে হাজার হাজার মানুষকে প্রাণ দিতে হচ্ছে। কিন্তু রাজামশাইয়ের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। তিনি এখন বৃহত্তর ক্ষমতার নেশায় উন্মাদ হয়ে ছুটছেন। অক্সিজেন নেই, ভ্যাকসিন নেই, পর্যাপ্ত বেড নেই, ওষুধ কোম্পানিগুলির কেউ কেউ ইচ্ছেমতো ওষুধের দাম বাড়িয়ে মানুষকে পিষে মারছে।  রাজ্যে রাজ্যে অসহায় মানুষের মৃত্যুর মিছিল। শ্মশানের চিতা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নিভছেই না। কোথাও হয়তো চিতায় ছ’টা দেহ পুড়ছে। বাইরে লাইন দিয়ে পড়ে রয়েছে, ২০-২৫ জনের দেহ। কোথাও চলছে লাশের উপর লাশ চাপিয়ে গণদাহ। সাধারণ মানুষ যতটা দিশাহারা, রাজ্যগুলিও ততটা দিশাহীন। আর এই দুঃসময়ে দিশা দেখানোর পরিবর্তে তিনি বাংলা-দিল্লি ডেলি প্যাসেঞ্জারি করছিলেন। 
পরে অবশ্য বৈঠক ডাকলেন।  দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল সেই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেছেন, ‘বলুন, এখন এই সমস্যায় আমি কাকে ফোন করে আমার সমস্যার কথা জানাব? কে আমার সমস্যার সমাধান করবেন?’ তার জবাব প্রধানমন্ত্রী দিতে পারেননি।  সেই সরকারি বৈঠকের কথাবার্তা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় দারুণ গোঁসা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। ভুল করে লাইভ হলেও সেটা একপক্ষে ভালোই হয়েছে। সারা দেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, এই করোনাকালে ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতির দৌড় কতটা? এখন আবার গোপনীয়তা কী? দেশের মানুষ জানতে চান, কেন এই দুঃসময়ে মানুষকে বিপদের দিকে ঠেলে দিয়ে, সমস্ত পরিস্থিতি সম্পর্কে উদাসীন হয়ে শুধু বাংলা দখলের জন্য তিনি এতটা মরিয়া হয়ে উঠেছেন? কীসের নেশায় সবকিছু ইতিকর্তব্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে তিনি বা তাঁর দলের নেতারা বাংলায় জনসভা করছেন? আসলে সবটাই আপনার প্রহসন। দেশের করোনা রোগীদের উপেক্ষা করে এখানে এসে ‘দিদি দিদি’ ডাকটুকুও সেই প্রহসনের অঙ্গ ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষ তাঁকে নায়ক করে তুলতে চেয়েছিলেন। তিনি নিজেই রিলিফ কারেক্টরের ভূমিকা বেছে নিলেন।
আমরা পুরো নির্বাচন জুড়ে কী দেখলাম? প্রচারের ঢক্কানিনাদ। পরিযায়ী নেতা, তাঁদের শাগরেদ, সভায় ভিড় বাড়াতে অন্য রাজ্য থেকে ভাড়া করে আনা হিন্দিভাষী সমর্থক— কী করলেন তাঁরা? ভিড়ের শক্তিপ্রদর্শন করতে গিয়ে প্রকারান্তরে এই নির্বাচন পর্ব হয়ে উঠল বেনজির এক শবসাধনা! আক্রান্তের সংখ্যা গুনতে গুনতে এবং মৃত্যুর দমবন্ধ আবহের মধ্যেও তিনি বাংলা দখলের সুখ স্বপ্নে বিভোর। 
বাড়ুক আক্রান্তের সংখ্যা অথবা মৃত্যু, তাতেও 
কমবে না নির্বাচনী দফা বা প্রচারের সংখ্যা। 
নিরোর গল্প আমরা পড়েছি। কিন্তু তাঁকে দেখিনি। হিটলার, মুসোলিনির গল্পও আমরা পড়েছি। 
তাঁদেরও আমরা দেখিনি। কিন্তু সেই না দেখাটুকু বোধহয় আমরা পুষিয়ে নিতে পারলাম আজকের নিষ্ঠুরতম বাস্তবতার যন্ত্রণাদগ্ধ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। এত প্রচার, এত টাকার ওড়াওড়ি, এত ভাষণ—সব শুনে মনে পড়ে যাচ্ছে কবি সমর সেনের কবিতার একটি পংক্তি। ‘কর্কশ কাকের কণ্ঠে শুনি ধ্বংসের গান।’ তাঁর ক্ষমতাকালের মধ্যে তিনি যে কেবল ধ্বংসের জয়গান গেয়েছেন, এ নিয়ে তো দ্বিমত 
থাকার কথা নয়! আর তাঁর সব ভুলভাল কাজের দোসর হয়েছে নির্বাচন কমিশন। তাদের ভুলেই এত মৃত্যু। মাদ্রাজ হাইকোর্ট অবশ্য এটাকে মৃত্যু বলতে রাজি নয়। হাইকোর্ট বলছে, এগুলো খুন ছাড়া আর কিছুই নয়। আদালতের মহামান্য বিচারপতি নির্মমভাবে বলেছেন, এঁদের বিরুদ্ধে খুনের মামলা রুজু হওয়া উচিত। এভাবে চললে আগামী ২ মে গণনা বন্ধ করে দেওয়ার সতর্কবার্তা দিয়ে বিচারপতি ক্ষমতান্ধদের উচিত শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষও ভাবছে, এর আগে এই দেশে এতবড় ক্ষমতালোভী এবং নিষ্ঠুর সরকার কি আর এসেছে? 
এর থেকেও আক্রমণাত্মক সমালোচনা করেছে অস্ট্রেলিয়ার সংবাদপত্র ‘দি অস্ট্রেলিয়ান’। সেখানে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, মোদিজিই দেশকে এমন সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। তিনি আসলে একজন ভিড়প্রেমী প্রধানমন্ত্রী। যিনি তাঁর জনসভায় ভিড় দেখলে উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন। আরও যেসব নিন্দাবাক্য সেই লেখায় ব্যবহৃত হয়েছে, সে সম্পর্কে আমাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সরকার চালানোর ক্ষেত্রে তাঁকে অদক্ষ, উদ্ধত হিসাবে ব্যক্ত করা হয়েছে। এর সঙ্গে মিশেছে তাঁর উগ্র জাতীয়তাবাদ। সঙ্কট ঘনীভূত হওয়ার কারণ এগুলিই।      
তবে শুধু বাইরেই নয়, এবার নিন্দার ধ্বনি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বিজেপির অন্দরেই। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের স্বামী পরকলা প্রভাকর যে সুরে নরেন্দ্র মোদিকে ভর্ৎসনা করেছেন, তা বোধহয় বিরোধীরাও করেন না। তিনি বলেছেন, মোদি সরকার আসলে একটি হৃদয়হীন সরকার।  তিনি তাঁর ব্লগে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে করোনা সঙ্কট নিয়ে তথ্য গোপনের অভিযোগ এনেছেন। বলেছেন, এঁদের কাছে ধর্ম, কুম্ভমেলা এতই বড় যে, মানুষ তাঁদের কাছে তুচ্ছ। কার্যত দেশে করোনার এই বাড়বাড়ন্তের জন্য তিনিও মোদিকে দায়ী করেছেন।
এত দৌড় সত্ত্বেও মোদিজির সিদ্ধিলাভ বোধহয় হবে না। সাত দফা ভোট হয়ে গিয়েছে। সরকার গড়ার রসদ সম্ভবত পেয়ে গিয়েছেন বাংলার বাঘিনী। নির্বাচন জুড়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলে যেটুক বুঝেছি, তার অন্যথা হওয়ার নয়। অবশ্য ইভিএম কেলেঙ্কারি হলে ফল একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে যেতে পারে। তবে সেটা প্রকৃত জনাদেশ নয়।
ভোটের পরই মোদিজিকে রবীন্দ্রনাথের মেক আপ তুলে ফেলতে হবে। কেননা এখানে ওই রূপসজ্জার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাচ্ছে। আগামী বছরে উত্তরপ্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ, পাঞ্জাব, গুজরাত, জম্মু ও কাশ্মীর সহ কয়েকটি রাজ্যে ভোট। জানি না, এবার তিনি কোন রূপসজ্জায় অবতীর্ণ হবেন। তবে সেটা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু এখন এই মহামারীকালে তাঁকে যে ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে, সেটা কাঙ্ক্ষিত নয় দেশের মানুষের কাছে। তাঁকে বড় অসহায় এবং ভীত 
দেখাচ্ছে এই সঙ্কটকালে। আর সেই কারণে 
মহামারীর মুখে যথেষ্ট প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না। ভ্যাকসিনের দাম নিয়েও এই সঙ্কটকালে সরকারের দ্বিচারিতা দেখে প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে মানুষ। এই শাসনকালে বেঁচে না থাকলে আমরা জানতেও পারতাম না, মৃত্যু এত সুলভ। এখানে কবিগুরুর একটি গানের উল্লেখ করা যেতে পারে। 
‘না বাঁচাবে আমায় যদি মারবে কেন তবে? / কিসের তরে এই আয়োজন এমন কলরবে? / অগ্নিবাণে তূণ যে ভরা, চরণভরে কাঁপে ধরা, /জীবনদাতা মেতেছ যে মরণ-মহোৎসবে।  জীবনদাতা নিজেই যখন 
টিকা উৎসবের ঘোষণা করে মরণ উৎসবে মেতে ওঠেন, দেশটা তখন একটা ছন্নছাড়া, শ্মশান ছাড়া আর কিছুই হয়ে উঠতে পারে না।
২০১৪ সালের ২৯ এপ্রিল এক ট্যুইট বার্তায় তিনি বলেছিলেন, ‘দেশ চায় এক মজবুত সরকার। সেখানে মোদি থাকলেন কি না, সেটা কোনও ব্যাপার নয়। আমি আবার ফিরে গিয়ে চায়ের দোকান খুলতে পারি, কিন্তু দেশ যেন আমাকে নিয়ে দুর্ভোগে না পড়ে।’ এই কথাটা কি মোদিজির মনে পড়ছে? দয়া করে কোনও স্তাবক কি একবার তাঁকে কথাটা মনে করিয়ে দেবেন? 
আজ মোদিজি স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছেন, বিকাশ মানে কর্মহীন হয়ে যাওয়া। বিকাশ মানে সব বেচে দাও। বিকাশ মানে অর্থনীতিকে খুন করা, বিকাশ মানে মৃত্যুর উৎসব! বিকাশ মানে তিলে তিলে যন্ত্রণা সহ্য করা। স্বাধীনতার প্ল্যাটিনাম জয়ন্তীর প্রাক্কালে দেশকে আপনি কোন শ্মশান যাত্রায় পাঠাচ্ছেন মিঃ পিএম? যেসব নেতা ও সমর্থক সুবিধাভোগী, তাঁরা অবশ্য এখনও মোদির নামে জোর দম দিয়ে তাঁর কৃতিত্ব জাহির করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। 
আজ দেশে ওষুধ, অক্সিজেন নিয়ে যে বাস্তব চিত্র, সেটাই আগামী দিনে প্রকট হয়ে উঠবে কিন্তু খাদ্যের ক্ষেত্রেও। কৃষিবিল চালু হলে অচিরেই দেশে খাদ্যের হাহাকার হবে। কেননা দেশের খাদ্যভাণ্ডারের দখলদারি চলে যাবে বৃহৎ শিল্পপতিদের হাতে। কখন, কাকে কতটুকু খাবার দিয়ে মোটা মুনাফা করা যাবে, সেটা তারাই ঠিক করবে। আর সরকার দর্শকের ভূমিকা ছাড়া কিছুই করতে পারবে না। কিছু করতে গেলেই সরকারের কাছা ধরে টানবে তারা। শিল্পপতিদের বশংবদ সরকার দেশকে সেদিকেই নিয়ে যাচ্ছে। 
সবকিছু মিলিয়ে মোদি হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন ভারতের এক নব্য মহাপুরুষ। কিন্তু বাস্তবের এই চিত্রনাট্যটা যেন বিরিঞ্চিবাবার মতো হয়ে গেল। এই অবস্থায় চোখের সামনে ভেসে উঠছে সত্যজিৎ রায়ের ‘মহাপুরুষ’ ছবির শেষ দৃশ্যটি। পলায়নরত ‘মহাপুরুষ’ বিরিঞ্চবাবা ও তাঁর শাগরেদ। 

28th     April,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
কিংবদন্তী গৌতম
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021