বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

মানুষের জন্য কী করলেন?
জবাব চায় দেশ
শান্তনু দত্তগুপ্ত

গত অক্টোবর মাসের ২০ তারিখ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানালেন, দেশের প্রত্যেক নাগরিক টিকা পাবেন। একজনও বাদ যাবেন না। ২৫ অক্টোবর, ২০২০। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রতাপ ষড়ঙ্গী ঘোষণা করলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রত্যেক দেশবাসী বিনা খরচে ভ্যাকসিন পাবেন। এক একজনের পিছনে ৫০০ টাকা করে খরচ করবে মোদি সরকার।’
২১ এপ্রিল, ২০২১। কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়ে দিল, ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সি নাগরিকদের ফ্রিতে ভ্যাকসিন দেওয়া যাবে না। তাঁদের নিজেদের গাঁটের কড়ি খরচ করে করোনার মোকাবিলা করতে হবে।
প্রতিশ্রুতি, প্রত্যাশা এবং বাস্তব—রাজনৈতিক স্বার্থের জমানায় এই তিনের মধ্যে বিস্তর ফারাক। অথচ, এটা হওয়ার কথা ছিল না। নির্বাচিত সরকার সব প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারবে—এমন প্রত্যাশা খুব সাধারণ ভোটারও করেন না। কিন্তু জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম সহায়তাটুকু তো সরকারের কাছ থেকে পাওয়া যাবে! সেই আশা করাটা নিশ্চয়ই বাড়তি নয়? করোনা নামক এক বিশ্বব্যাপী মহামারীর যুগে চিকিৎসা এবং প্রতিষেধক কিন্তু জীবনের অতি প্রয়োজনীয় পরিষেবা রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। আর মহামান্য ভারত সরকার সেই পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রেই শুরু করেছে চূড়ান্ত ছেলেখেলা। 
গত সাত বছরে নরেন্দ্র মোদি সরকার সাধারণের জীবনযাপনে কোন বাড়তি সুবিধাটা দিয়েছে, তার উত্তর খুঁজতে আর একজন নরেন্দ্র মোদির প্রয়োজন। আম জনতার সাধ্যের মধ্যে সেই বিশ্লেষণ আসে না। প্রতিশ্রুতির পাহাড়ে চেপে ’১৪ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন মোদিজি। ভারত ভেবেছিল, এই এতদিনে একজন খাঁটি প্রধানমন্ত্রী পাওয়া গিয়েছে। পাঁচ বছরের মেয়াদ কেটে যাওয়ার পরও আমাদের ঘোর কাটল না। আবার আমরা সরকারে আনলাম স্বপ্নের ফেরিওয়ালাকে। নোট বাতিল, জিএসটি, অর্থনীতির ভরাডুবি, বেকারত্ব, মত প্রকাশের অধিকারের দরজায় তালা... অনেক কিছুই তো হয়েছিল। তা সত্ত্বেও আমরা আবার স্বপ্ন দেখতে চাইলাম। আজ আমরা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যদি প্রশ্ন করি, উনিশের লোকসভা ভোটে বিজেপিকে সমর্থনের ঝুলি উপুড় করে আমরা কি ঠিক করেছি? উত্তর আসবে... না, করিনি। আমাদের অন্তর আজ সে কথা বলবে। কারণ আমরা চোখের সামনে দেখছি, করোনার নেপথ্যে যত না ভয়াবহতা, তার থেকে হাজার গুণ বেশি রাজনীতি। তারপরও তো আমাদের আশা মরে না! প্রধানমন্ত্রী বললেন, সবাই থালা বাজাও। আমরা থালা বাজালাম। উনি বললেন, সবাই ভ্যাকসিন পাবে। আমরা আশায় বুক বাঁধলাম। হাওয়ায় প্রতিশ্রুতি ভেসে এল, বিধানসভা ভোটে জিতলে বিহারে প্রত্যেকেকে ফ্রি ভ্যাকসিন...  হল না। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এক(মাত্র)নায়ক সিদ্ধান্ত নিলেন, ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সি নাগরিকদের টিকার দায় সরকার নেবে না। আমরা সেটাও মেনে নিলাম! ১৩৫ কোটির দেশে প্রায় ৩৮ শতাংশ মানুষ রয়েছেন বয়সের এই কাঠামোর মধ্যে। অর্থাৎ, প্রায় ৫১ কোটি ৩০ লক্ষ দেশবাসীকে নিজের ভ্যাকসিন নিজেকেই বুঝে নিতে হবে। এটাই প্রধানমন্ত্রীর নিদান। কেন? দেশের তরুণ প্রজন্ম কি ছাগলের তৃতীয় সন্তান? নাকি এই প্রজন্মের জন্য গোমূত্র স্টক করা হচ্ছে? বলা যায় না... কেন্দ্রীয় মন্ত্রী যদি বলতে পারেন যে, গোমূত্র খেলে কোভিড হবে না, তাহলে সে দেশে সব সম্ভব। ভারতে কোভিড মোকাবিলার নামে তৈরি পিএম কেয়ার্সের টাকা কোথায় যাচ্ছে, তা জানার অধিকার নেই। আচমকা এক একটা ঘোষণা আসছে... পিএম কেয়ার্সের টাকায় অমুক হচ্ছে, তমুক হচ্ছে... জেলায় জেলায় অক্সিজেন প্লান্ট বসানোর জন্য টাকা বরাদ্দ হচ্ছে... ব্যস! কত টাকা এই তহবিলে জমা পড়েছিল, আর কত টাকা এখন পর্যন্ত খরচ হয়েছে, সেই হিসেবটা দিলে সুবিধা হয়। পাওয়া যাবে না। কারণ এ পোড়া দেশে সংক্রমণ গুণোত্তর প্রগতিতে বাড়লেও ভোট প্রচারে মেতে থাকেন দিল্লির নেতারা... করোনার প্রথম ঢেউ সামলে নেওয়া একটা রাজ্যে গা জোয়ারি করে আট দফা ভোটের নিদান দেয় নির্বাচন কমিশন... আর প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে উঠে বলেন, আপনাদেরই সতর্ক থাকতে হবে। যে কথাটি রয়ে যায় গোপনে তা হল, সরকার কিছু করতে পারবে না। বেঁচে থাকার দায় আপনাদের। বাহ, সরকার হো তো অ্যায়সি। 
গত মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলতে বসা মাত্র দেশবাসী উৎসুক হয়েছিল... কী বলবেন নরেন্দ্র মোদি? আবার কি লকডাউন? নাকি করোনা মোকাবিলায় দারুণ কিছু পদক্ষেপের ঘোষণা? অশ্বডিম্ব প্রসব হল রাত পৌঁনে নটায়। বলার মধ্যে একটাই... প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, লকডাউন হবে না। ওটা শেষ অস্ত্র। তাহলে আগের অস্ত্রগুলো কী? দরকার না হলে বেরবেন না, মাস্ক পরে থাকবেন, হাত ধোবেন... ব্যস? শেষ? কানপুর, দিল্লি, লখনউ, মুম্বইয়ের শ্মশানঘাটগুলোর ছবি দেখেছেন মোদিজি? প্রবেশদ্বারের মুখে সার বেধে পড়ে রয়েছে মৃতদেহ। চিতা জ্বলছে... পরপর। ইলিকট্রিক চুল্লির বাইরে নাম বা নম্বর লেখা ট্যাগ বেঁধে পড়ে রয়েছে অস্থিভস্ম। গত দু’মাসেই মোদিজির ‘সোনার ভারতে’র ছবিটা নগ্ন হয়ে সামনে এসে গিয়েছে। আর তিনি নাকি ‘সোনার বাংলা’ উপহার দেবেন! খুব দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, জাতির উদ্দেশে ভাষণের নামে উৎকণ্ঠা ছাড়া আর কিছুই আপনি উপহার দিতে পারেননি মোদিজি। সেই সাসপেন্সও ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। যার গায়ে গেরুয়া রং লেগে নেই, এমন ব্যক্তি ছাড়া প্রত্যেক আম আদমি আপনার এই ‘প্রাইম টাইম থ্রিলারে’ এবার বিরক্ত হচ্ছেন। নিস্তার চাইছেন। আর আপনি বাংলা দখলের নামে নাকানিচোবানি খাওয়াচ্ছেন বাঙালিকে। এটা কেন্দ্রের সরকারের কাছে প্রত্যাশিত নয়। এজন্য আপনাকে নির্বাচিত করে সংসদের মাথায় বসানো হয়নি। জনপ্রতিনিধি এমন একজন, যিনি মানুষের জন্য ভাববেন, কষ্ট লাঘবের উপায় দেবেন। এক এক বার এক এক রকম কথা বলবেন না। আপনার কেন্দ্রীয় সরকার টিকা কিনবে প্রতি ডোজ ১৫০ টাকায়, রাজ্য সরকার ৪০০ টাকায়, আর সাধারণ মানুষ বেসরকারি ক্ষেত্র থেকে কিনলে ৬০০ টাকায়? এই মাত্রাছাড়া বৈষম্যের মূল্য আমরা কেন চোকাব? কোভিশিল্ড, অর্থাৎ অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার গবেষণায় তৈরি ভ্যাকসিন... সাধারণ মানুষকে যদি এর জন্য ৬০০ টাকা করে দিতে হয়, তা হবে গোটা বিশ্বে সবচেয়ে দামি। এখন ডলারের সঙ্গে টাকার যা বিনিময় মূল্য, সেই হিসেবে প্রায় ৮ ডলার দাম পড়বে প্রতি ডোজের। অথচ, এই একই ভ্যাকসিন ব্রিটেনে মেলে ভারতীয় অর্থে প্রায় ২২৪ টাকা ৭৯ পয়সায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২৯৯ টাকা ৭২ পয়সায়, বাংলাদেশেও তাই। এছাড়া ব্রাজিলে এই টিকার দাম পড়ছে ২৩৬ টাকার আশপাশে এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ৩৯৩ টাকা ৩৮ পয়সায়। মানে, রাজ‌্য সরকারগুলিকেও এই ভ্যাকসিন গোটা দুনিয়ার নিরিখে সবচেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে! তাহলে, তাদের প্রোডাক্ট সবচেয়ে সস্তা বলে সিরাম ইনস্টিটিউট লাগাতার যে দাবি করছে, তার ভিত্তি কোথায়? কেন্দ্রীয় সরকার কি এটা জানে না? হতে পারে না। তাহলে কি ভ্যাকসিনের প্রতি ডোজ বাবদ সেই ‘বাড়তি টাকা’ কাটমানি হিসেবে অন্য কোথাও যাচ্ছে? এই প্রশ্ন কিন্তু উঠতে শুরু করেছে। হয় সাধারণ মানুষকে সরকার সরাসরি ধাপ্পা দিচ্ছে, না হলে সংসদের ওই চেয়ারগুলোয় তাদের বসার অধিকার নেই।
কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে দেশ...। গত বছরের তুলনায় এবার করোনার আঘাত অনেক জোরালো। বিবর্তন ঘটেছে ভাইরাসের। যার জন্য আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না। কারণ, বিশ্বের কোথাও এই সংক্রান্ত কোনও সংরক্ষিত তথ্য নেই... কোনও ফর্মুলা নেই। সবটাই ট্রায়াল অ্যান্ড এরর। এভাবেই গবেষণায় মিলবে চূড়ান্ত সাফল্য। সেটা কবে... কতদিনে... জানা নেই। তাই সংক্রমণ মোকাবিলার ক্ষেত্রে এখন প্রয়োজন ছিল নিখুঁত প্ল্যানিং এবং অ্যাকশন। তার সিকিভাগ কি দেখা যাচ্ছে? ভাষণে পেট ভরে না... ভাষণে দেশও চলে না। আত্মনির্ভরতার সবটাই ‘মুখেন মারিতং’ হয়ে থেকে গিয়েছে। করোনার এই মহামারীর মধ্যেও দেশবাসী কীভাবে আত্মনির্ভর হতে পারে, তার কোনও দিশা কেন্দ্রের মহামান্য সরকার দেখাতে পারেনি। দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন সংস্থানের উপায়েরও নিশ্চয়তা নেই। তারপরও মোদিজি বাংলায় আসছেন, ভোট চাইছেন, স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। সেই স্বপ্ন বাংলার মানুষ বিশ্বাস করছে কি? উত্তরের জন্য আরও এক দফা অপেক্ষা করতে হবে। ততদিনে করোনা আরও কতটা দাঁত-নখ বের করবে, তা নিয়ে মানুষ উদ্বিগ্ন। সেই উদ্বেগ বাড়ছে। আর মনে পড়ছে গত ৭ মার্চ দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বিবৃতি... ‘আমরা ঠিক পথেই এগচ্ছি। দেশ থেকে করোনা বিদায় নিতে চলেছে।’ মন্ত্রীমশাই এখন একবার রিওয়াইন্ড করে সেই ভাষণটা শুনে নিতে পারেন। তারপর আসুন দেশবাসীর সামনে। দেশবাসী উত্তর চায়... সরকার এই বিপদের আগাম সতর্কতা কেন নেয়নি? কিন্তু জবাব কি মিলবে? সম্ভাবনা কম। আর জবাব দেবেই বা কে? মন্ত্রীদের দেখা যাচ্ছে... সরকার নিরুদ্দেশ। আপাতত তার খোঁজেই না হয় পোস্টার দেওয়া যাক!

27th     April,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
কিংবদন্তী গৌতম
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
31st     May,   2021
30th     May,   2021