বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

মতুয়াদের সামনে ‘গাজর’
ঝুলিয়ে লাভ নেই! 
মৃণালকান্তি দাস

অসমের গল্পটা নিশ্চিত এতদিনে বাংলার মতুয়া সম্প্রদায়ের কাছে জলের মতো পরিষ্কার।
কী সেই গল্প? নাগরিকত্ব আইন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১৬ সালে অসম দখল করেছিল বিজেপি। আর পাঁচ বছর পর, বিধানসভা ভোটের মুখে জানা গেল, টাকা শেষ। অতএব ঝাঁপ বন্ধ এনআরসি দপ্তরের। এনআরসি-র কাজ চালানোর জন্য আরও অর্থ সাহায্যের আবেদন জানিয়েছিল অসম সরকার। কিন্তু সেই আবেদন খারিজ করে দিয়েছে রেজিস্ট্রার জেনারেল অব ইন্ডিয়া বা আরজিআই। তাই ১৬০০ কোটি টাকার এনআরসির ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকারে!
অসমে ২০১৯ সালের ৩১ আগস্ট এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ছিল, এনআরসি দপ্তর তালিকায় নাম না-ওঠা ১৯ লক্ষাধিক মানুষকে বাদ পড়ার কারণ জানিয়ে দ্রুত রিজেকশন লেটার বা স্পিকিং অর্ডার পাঠাতে হবে। তা হাতে পাওয়ার ১২০ দিনের মধ্যে নাগরিকত্বের প্রমাণ-সহ হাজির হতে হবে ফরেনার্স ট্রাইবুনালে। ট্রাইবুনালের সংখ্যাও বাড়িয়ে ৫০০ করা হবে। কিন্তু অর্থাভাবে ডেটা এন্ট্রি অপারেটর, সাধারণ কর্মী এবং তথ্য-প্রযুক্তি কর্মীদের বেতন-ভাতা আটকে। রাজ্য সরকার ২২১ জন ফরেনার্স ট্রাইবুনাল সদস্য নিয়োগ করলেও রিজেকশন লেটারের অভাবে সেই সব ট্রাইবুনালও কাজ শুরু করেনি। ফলে সবই তালগোল পাকিয়ে।
শুধু তাই-ই নয়, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) নিয়ে আতঙ্ক কাটছে না এনআরসি-ছুট হিন্দু বাঙালিদের। কী কী শর্তপূরণ করে কাদের আবেদন করতে হবে, তা নিয়ে তাঁরা বিভ্রান্ত। একই নথি জমা দিয়ে যাঁদের পরিবারের অন্যদের নাম উঠেছে, কিন্তু দু’একজন বাদ পড়েছেন, তাঁরা আরও দুশ্চিন্তায়। বুঝতে পারছেন না, ‘শরণার্থী’ পরিচয়ে নাগরিকত্বের আবেদন জানাবেন, নাকি নতুন এনআরসির জন্য অপেক্ষা করবেন!
এনআরসি-র পরিণাম কত নিদারুণ হতে পারে, কীভাবে লক্ষ লক্ষ বাসিন্দার নাম নাগরিকের তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়, অসম তার টাটকা প্রমাণ। রাষ্ট্র মনে করেছে, সেখানকার ১৯ লক্ষ বসবাসকারীর কাছে নিজেদের ভারতীয় হিসেবে ‘প্রমাণ’ করার মতো যথেষ্ট নথিপত্র নেই। নিজের দেশে বাবা-ঠাকুরদা-চোদ্দোপুরুষের ‘অস্তিত্ব’-র কাগজপত্র তাঁরা দাখিল করতে পারেননি। তাই জাতীয় নাগরিকপঞ্জিতে তাঁদের নাম ওঠেনি! সোজা কথায়, যাঁদের নথিপত্র সরকারের কাছে ‘গ্রহণযোগ্য’ বা ‘যথেষ্ট’ বলে মনে হবে না, তাঁরা বংশপরম্পরায় এ দেশে বসবাসকারী হলেও পার পাবেন না। অসম সেটা বুঝিয়ে দিয়েছে।
ব্যতিক্রম নন শিলচরের বিজেপি বিধায়ক তথা প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার দিলীপকুমার পালও। আগস্টে প্রকাশিত এনআরসিতে তাঁর স্ত্রী অর্চনার নাম ওঠেনি। তবে তিনি স্ত্রীর জন্য সিএএ-তে আবেদনের পক্ষপাতী নন। দিলীপ বলেন, ‘‘অর্চনার বাবা-কাকা ১৯৪৮ সালে শিলচরে জমি কিনেছিলেন। তার দলিল সংগ্রহ করে এনআরসির জন্য আবেদন করা হয়েছিল। বাবা-মেয়ের লিঙ্ক হিসেবে প্যান কার্ড দেওয়া হয়েছিল, মানা হয়নি।’’ অসম-ই প্রমাণ, সিএএ নিয়ে যাঁরা স্বপ্ন দেখছেন, তাঁরাও রক্ষা পাবেন না। জানে বাংলার মতুয়া সম্প্রদায়ও।
আসলে যা কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে বোঝা যায়, তাকে দুর্বোধ্য করে তোলাই শাসকের রাজনীতি। তাই, উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্বের মতো একটি সহজ, মানবিক ও সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে প্যাঁচ কষে, রস নিংড়ে তৈরি হয়েছে ২০১৯-এর নাগরিকত্ব আইন। ফলে শাসকের বুদ্ধির সঙ্গে সাধারণের কাণ্ডজ্ঞানের সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছে। সাধারণের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে, চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর ধরে ভোট দিয়ে সরকার গঠন করা নাগরিকদেরও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
উদ্বাস্তুরা এত আইনের মারপ্যাঁচ চাননি। তাঁরা দেশ ভাগাভাগিতে রাষ্ট্রহারা হয়ে যেতে পারেন না। তাঁদের প্রশ্ন, এই আইন যদি উদ্বাস্তুদের মুশকিল আসান হয়, তা হলে অসমে ১৪ লক্ষ হিন্দু বাঙালি এনআরসি তালিকার বাইরে কেন, আর কেনই বা তাঁদের ঠাঁই ডিটেনশন ক্যাম্পে? ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েও প্রধানমন্ত্রী কেন ডিটেনশন ক্যাম্প তুলে দিতে পারলেন না? কারও কাছেই এর কোনও সদুত্তর নেই। অসমের দৃষ্টান্ত থেকে বলা যায়, এই আইন নিয়ে আজ যাঁরা উল্লসিত, তাঁরাও নিষ্কৃতি পাবেন না।
অথচ, গত লোকসভা ভোটে শুধুমাত্র নাগরিকত্ব পাইয়ে দেওয়ার ‘গাজর ঝুলিয়ে’ তৃণমূলের ঝুলিতে থাকা মতুয়া ভোটের দখল নিয়েছিল বিজেপি। সেই ছকেই এবারও ‘দুই কোটি অনুপ্রবেশকারী’, ‘উইপোকা’দের খুঁজে খুঁজে দেশ থেকে বিতাড়নের হুঙ্কার ছাড়ছেন নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহরা। কিন্তু, তাঁরা এটা জানেন না, অসমে এনআরসি-ছুট ১৪ লক্ষ হিন্দু বাঙালির করুণ দশা দেখে বনাঞ্চলের আদিবাসী, ভূমিহীন নিরক্ষর, মুসলিমদের মতো বাংলার মতুয়ারাও শঙ্কিত। কারণ, তাঁরা জেনে গিয়েছেন, আধার কার্ড-ভোটার কার্ড কোনও কিছুই নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। ফলে জলের মতো পরিষ্কার, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ)-এ রাজ্যের সব মতুয়া ঢালাও নাগরিকত্ব পাবেন না। আইনের মারপ্যাঁচেই আটকে যাবেন লক্ষ লক্ষ গরিব, ভূমিহীন নিরক্ষর মতুয়া পরিবার। একরাশ আতঙ্ক গ্রাস করবে মতুয়া সমাজকে। ঠিক অসমের মতোই। যেখানে এনআরসি-ছুটদের আজ দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবেই থাকতে হয়।
অসমের বাসিন্দা শতায়ু চন্দ্রধর দাসের কথাই ভাবুন। আশায় ছিলেন, কোর্ট-কাছারিতে দৌড়ঝাঁপ করতে হবে না আর। নতুন আইনেই ভারতীয় নাগরিক হওয়ার স্বীকৃতি মিলবে। না, কাছাড় জেলার আমড়াঘাটের চন্দ্রধরবাবুর সেই আশা পূরণ হয়নি। আচমকাই পুলিসের সন্দেহ হয়, ১০২ বছরের চন্দ্রধর বোধ হয় বাংলাদেশি। ভোটার তালিকায় ডি (অর্থাৎ ডাউটফুল) চিহ্নিত হলেন। মামলা গেল ফরেনার্স ট্রাইবুনালে। শুনানিতে চন্দ্রধরবাবু ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে রিফিউজি রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট জমা করেছিলেন। তাতে উল্লেখ রয়েছে, ১৯৫৬ সালে তিনি ত্রিপুরা সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছেন। ট্রাইবুনাল ওই সার্টিফিকেটের যথার্থতা মানতে পারেনি। অন্যান্য নথি দেখাতে নির্দেশ দেয়। সেদিন আর কোনও নথি হাতে না-থাকায় তাঁকে ‘বিদেশি’ বলে রায় দেওয়া হয়। ১০২ বছর বয়সে তাঁর ঠাঁই হয় শিলচর সেন্ট্রাল জেলে (কাগজে-কলমে যা ডিটেনশন সেন্টার)। তিন মাস পরে অসুস্থ হয়ে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়ার পরে তাঁর জামিন মঞ্জুর হয়। শুধু চন্দ্রধর দাসরাই নয়, লক্ষাধিক ভারতীয় ‘বিদেশি’ তকমায় ভুগছেন অসমে। এই লক্ষাধিক ভারতীয়কে সব প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর হেনস্তার মুখে পড়তে হয়েছে। লড়তে হয়েছে মামলা। খরচ করতে হয়েছে প্রচুর অর্থ। ভারতীয় হয়েও বিদেশি ‘তকমা’ নিয়ে বেঁচে থাকার মানসিক গ্লানি তো বাড়তি পাওনা।
মানবাধিকার সংগঠনগুলির দাবি, ডিটেনশন শিবিরে বন্দিদের বাংলাদেশি হিসেবে ধরে নিয়ে সরকার তাঁদের ‘নিজের দেশের ঠিকানা’ দিতে বললেও, বংশানুক্রমে বা দীর্ঘদিন ধরে অসমের মাটিতেই বসবাস করা এই মানুষগুলি ভারতেরই বাসিন্দা। তাই তাঁদের পক্ষে কোনওভাবেই বাংলাদেশের ঠিকানা দেওয়া সম্ভব নয়। আর আদতে বাংলাদেশের বাসিন্দা হলে, কেউই ঠিকানা গোপন করে বছরের পর বছর জেলে পচতে চাইবেন না।
মতুয়ারাই আজ বলছেন, ভোট প্রচারে এসে নাগরিকত্ব সংশোধন আইনকে যাঁরা রক্ষাকবচ বলছেন, আসলে তাঁরা ক্ষমতাবান। নিজেদের কাগজপত্র গুছিয়ে ফেলেছেন। এখন নিজেদের আখের ঘোছাতে সিএএ নিয়ে সোচ্চার। ভোটার, রেশন, আধারের মতো সরকারি পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও কেন আবার নতুন করে নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের মুখাপেক্ষী হতে হবে? সেই প্রশ্নও মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষদের মনে জেগে উঠেছে। মতুয়া সম্প্রদায় আর বিজেপির ফাঁদে পা দিতে চায় না।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও জানিয়ে দিয়েছেন, কোনও বিভাজন নয়। এ রাজ্যে নাগরিকত্ব সংশোধন আইন কার্যকর হতে দেবেন না। এ রাজ্যের সব ভোটারই ভারতের নাগরিক। ফলে বিধানসভা নির্বাচনে মতুয়া ভোট কোন দিকে যাবে, বিজেপি-র কাছে এখন লাখ টাকার প্রশ্ন। কারণ, দলের অঙ্ক বলছে, নীলবাড়ি দখল করতে হলে মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোট ঝুলিতে ভরতেই হবে। হিসেব এও বলছে, প্রায় ৩০টি বিধানসভা আসনের ফলাফল এদিক-ওদিক করে দিতে পারেন গুরু হরিচাঁদ ঠাকুরের অনুগামীরা।
বিজেপি এত দিন বলে এসেছে, নয়া নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) কেন্দ্রীয় সরকারের বিষয়। রাজ্য তাতে নাক গলাতে পারে না। সেই বিজেপিই আবার পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী ইস্তাহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ‘আমরা মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই নয়া নাগরিকত্ব আইন কার্যকর করব।’ কেন্দ্রের আইন কার্যকর করতে রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকতে হবে কেন? এই কুৎসিত মিথ্যাচার আর কতদিন?‌ অন্তত ২মে পর্যন্ত। পেট ভরাতে চাইছে বিজেপি‌, ভোটের পেট। কিন্তু মিথ্যার চাষ?‌ বিষের চাষ?‌ তা চলবে বিধানসভা ভোট‌ পর্যন্ত। বঙ্গবাসীর কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ওঁরা কী করবেন, ওঁদের ব্যাপার। আমাদের কাজ একটাই, মিথ্যার জাল ছিন্ন করে বাংলাকে নিরাপদ হাতে রাখা। 

9th     April,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
কিংবদন্তী গৌতম
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
12th     May,   2021