বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

নন্দীগ্রামে জিতবে বাংলাই
হিমাংশু সিংহ

আচ্ছা, নন্দীগ্রামে কে জিতবে বলুন তো? বাজারের মাছওয়ালা থেকে ধোপদুরস্ত বহুতলের বাবু, গত বৃহস্পতিবার টানটান উত্তেজনার মধ্যে ভোট যত এগিয়েছে এই একটা প্রশ্নেই ঘুরপাক খেয়েছে বাঙালি সমাজ। যত উত্তেজনা ছড়িয়েছে বাঙালির রক্তচাপ ততই ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। সেই সঙ্গে মোবাইলে হোয়াটস অ্যাপে নানারকম ইঙ্গিত আর বার্তা ঘুরেছে প্রতিনিয়ত। দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছি, সত্যকে মিথ্যে আর মিথ্যেকে সত্য প্রমাণিত করার খেলায় সঙ্ঘ পরিবারের জুড়ি মেলা ভার। কিন্তু আগ্রাসী প্রচারই যে শেষ কথা বলে না, তা আগামী ২ মে প্রমাণ করবে নন্দীগ্রাম। রেয়াপাড়া, ভাঙাবেড়িয়া, গোকুলনগর, ওসমানচক, বয়াল—কোথায় কার আধিপত্য, তা নিয়েই চলছে চুলচেরা হিসেব। সেই সঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনীর ছোটাছুটি, বুথে এজেন্ট হিসেবে ছেলেকে পাঠাতে অনিচ্ছার কথা জানিয়ে অসহায় মায়ের কান্না, সবই দু’চোখে পরখ করেছে বাঙালি। এবার অভিজ্ঞতা আর বাস্তবকে মিলিয়ে নেওয়ার পালা। তাই তর্ক চলবে আরও একমাস। চূড়ান্ত ফল বেরনো পর্যন্ত। কিন্তু জয়-পরাজয়ের অঙ্ক কষতে কষতেই মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করছে: এই চরম বিদ্বেষ আর হানাহানি কীসের জন্য? কার বিরুদ্ধে এমন মরণপণ লড়াই? বাংলার বুকে এ কোন সর্বনাশা ‘যুদ্ধ’ দেখছে গোটা দেশ? একটা ভোট ঘিরে গোটা সমাজকে এভাবে আড়াআড়ি ভাঙার ভয়ঙ্কর ছক কি খুব দরকার ছিল মোদি বাহিনীর? একটা বহিরাগত দলের হয়ে তথাকথিত ভূমিপুত্রের এই মরণপণ লড়াই কি রাজ্যের মানুষের ভালোর জন্য, নাকি শুধুই ক্ষমতা দখলের নেশায় মত্ত হয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বাংলার জমি দখলের এমন অদ্ভুত গোঁ? ভোট মিটে যাবে। ফলও বেরবে। তখন বাকি দেশ আমাদের দুয়ো দেবে না তো!
দু‌ই যুযুধান প্রার্থী একটা বিধানসভা কেন্দ্রে। এমনটা হতেই পারে। নির্বাচন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন তো কতই আসে যায়। ইতিহাসই তার সাক্ষী। এক্ষেত্রে আর পাঁচটা রাজ্যের মতোই নীরবে নির্বিঘ্নে ভোটপর্ব মিটতে পারত। কিন্তু কেন্দ্রের নাম যেখানে নন্দীগ্রাম এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে একজন প্রায় চার দশক বাংলার রাজনীতির মোড় ঘোরানো মুখ্য চরিত্র, সেখানে একটু ঝড় তো বইবেই। তার অভিঘাতে গাছের ডালপালাও একটু নড়বে। দশ বছর আগে এই বাংলার বহু কাঙ্ক্ষিত ঐতিহাসিক পালাবদলের কাণ্ডারীই শুধু নন, সিপিএমের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে এই বঙ্গে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রধান স্থপতিও তিনি। বাংলার অগ্নিকন্যা। এ কথা অস্বীকার করার বুকের পাটা অতিবড় বেইমানেরও হবে না। প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার সঙ্গে দশ বছর যুদ্ধ করেও তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা বাংলার যে-কোনও নেতানেত্রীর চেয়ে কয়েক যোজন এগিয়ে। যে-কোনও জনমত সমীক্ষাতেই তা বারেবারে প্রমাণিত। তাই বিজেপি নামক এক ভয়ঙ্কর প্রচার ইঞ্জিনের সামনে দাঁড়িয়েও তিনি অনায়াসে বলতে পারেন—‘বহিরাগত যত গুন্ডাই ওরা আনুক না কেন, নন্দীগ্রামে আমি জিতছিই।’ এই দৃঢ় প্রত্যয় আর আত্মবিশ্বাসই তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের তুরুপের তাস। জখম পা নিয়ে একাকী এক নারী রাজ্যটাকে চষে বেড়াচ্ছেন। দৈত্যের বেশে ঝাঁপিয়ে পড়া গোটা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। খোদ প্রধানমন্ত্রীকে সাধারণ ডেলি প্যাসেঞ্জারে পরিণত করেছেন! এসবই লেখা থাকবে শতবর্ষ পরের ইতিহাসের পাতায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের কাছে তা হয়ে উঠবে আদর্শ গবেষণার বিষয়।
নন্দীগ্রামে নেত্রীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গত নভেম্বর পর্যন্ত তাঁরই মন্ত্রিসভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। এখন তিনি পয়লা নম্বর দলবদলু। নেত্রীর ছত্রছায়ায় খেয়েছেন, পরেছেন, যথেচ্ছ ভোগও করেছেন। তাঁর পতাকার তলায় থেকেই সামান্য জেলার নেতা থেকে এমপি, মন্ত্রী, নানা সংস্থার চেয়ারম্যান হয়েছেন। ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পদও বেড়েছে। নেত্রী পূর্ব মেদিনীপুরে সফরে গেলে শান্তিকুঞ্জে ব্যস্ততার তখন সীমা থাকত না। যাবতীয় কৃতজ্ঞতা বিসর্জন দিয়ে গেরুয়া বেলুনে ফুঁ দিয়ে আজ তিনি যতই বড় বড় কথা বলুন, তাঁর ও তাঁর পরিবারের উত্থান ও বিস্তার সবই আটকে যেত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থন ও আশীর্বাদ পিছনে না থাকলে। সেই সঙ্গে দেড় দশকেরও বেশি সময় যাবৎ একটা পরিবারের লোকজনদের ডজন খানেক শাঁসালো পদ আঁকড়ে থাকা কষ্টকল্পনা হয়েই থেকে যেত। আজ সেই তিনিই এই বাংলাটাকে এক গুজরাতির হাতে তুলে দিতে মরিয়া। মোদিজির হাতে না তুলে দিতে পারলে নাকি বাংলার সর্বনাশ। তাঁকে শিখণ্ডী করে পিছনে পিছনে ঢুকতে মরিয়া ভিনদেশি বণিকরাও। তবে দু’হাতে লাড্ডু নিয়ে নরেন্দ্র মোদির সুরে নাচ বাঙালি বিদ্বৎ-সমাজ সহ্য করবে বলে মনে হয় না। সেই অর্থে বাঙালি জাত্যভিমান রক্ষার গুরুদায়িত্বও আজ আবার সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে। এই লড়াইয়ে তিনি জয়ী হবেনই। তখন দলবদলুদের ভার অমিত শাহরা বইবেন তো?
নির্বাচনে নীতির লড়াই হোক। এক দল জিতুক, অন্য দল হারুক। বাংলার দশ কোটি মানুষ পরিণামটা ঠিক বুঝে নেবেন। কিন্তু যে থালায় একযুগ ধরে খেলাম, আজ ক্ষমতা আর দু’টো ভোটের প্রলোভনে তাকেই টান মেরে পিছনে ঠেলে ফেলে বিপরীত মেরুতে গিয়ে বসলাম, এ কোন দেশি সৌজন্য! কর্মসংস্থান নয়, বড় কোনও শিল্পায়নের ঘোষণা নয়, উন্নয়নের নতুন কোনও দিশা দেখানো, তাও নয়। লকডাউনে কাজ হারিয়ে আরও গরিব হয়ে যাওয়া মানুষকে একটু স্বস্তি দেওয়াও নয়, শুধু একটা কেন্দ্রের ভোট ঘিরে এতটা উত্তাপ। বাংলার হাজারো সর্বনাশের মধ্যে এও আর এক ভাঙনের সূত্রপাত, যাকে রুখতে গেলে বাইরের সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রতিহত করতেই হবে।
এই নির্বাচনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হচ্ছে, ভোট যন্ত্রে সমর্থন টানতে মানুষকে হিন্দু আর মুসলমান, দুই শিবিরে ভাগ করে দেওয়া। নন্দীগ্রামের দু’টো ব্লক মিলিয়ে ভোট আছে আড়াই লক্ষের সামান্য বেশি। এর মধ্যে সংখ্যালঘু ভোট আছে সব মিলিয়ে ৮০ হাজারের মতো। নন্দীগ্রাম-১ ব্লকে দশটা গ্রাম পঞ্চায়েতের অধিকাংশের উপর এখনও নেত্রীর একচ্ছত্র আধিপত্য। দু’নম্বর ব্লকেও প্রায় তাই। সেজন্যই হার নিশ্চিত বুঝে ভোটারদের সম্পূর্ণ হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় মেরুকরণে ফেলে দিতে মরিয়া তাস খেলেছেন দলবদলু তারকা। এই নোংরা খেলা খেলতে গিয়ে তিনি শুধু হিতাহিতজ্ঞানশূন্যই হননি, যাঁর ছত্রছায়ায় চারমাস আগেও শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়েছেন তাঁকে ‘বেগম’ সম্বোধন করতেও পিছপা হননি! বাংলার সংস্কৃতি এই অসৌজন্যকে কোনওদিন বরদাস্ত করে না। এভাবে হিন্দু ভোটের উপর একচেটিয়া দখলদারি যে অসম্ভব, তা ২ মে ভোটযন্ত্রে গণনা শুরু হলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। তিনি আরএসএসের স্কুলে কত বছর বয়সে ভর্তি হয়েছেন, তা আমাদের জানা নেই। তবে দেশের একমাত্র মহিলা মুখ্যমন্ত্রী এবং বাংলার জননেত্রীকে ‘বেগম’ কিংবা ‘পাকিস্তানি’ বলে দেগে দিয়ে হিন্দু ভোটের মেরুকরণের ঘৃণ্য চেষ্টা কোনওভাবেই সফল হতে পারে না। 
বাংলা ও বাঙালির সমাজ এই সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ঘোর বিরোধী। যারা কাজ দিতে পারে না, দু’বেলা অন্নের সংস্থান করতে পারে না তারা শুধু ভোট আদায় করতে মানুষে-মানুষে ঘৃণা ও বৈরিতা বাড়ানোর এমন ন্যক্কারজনক অপচেষ্টা করে কোন মুখে! মেদিনীপুরের মাটি দেশপ্রেমিকদের মাটি। মানুষের অধিকার রক্ষার পীঠস্থান। সেখানে বিভাজনের বিষ যিনি বপন করার চেষ্টা করবেন, তাঁকে উচিত শিক্ষা পেতে হবে। আজ নয় কাল ইতিহাসই সেই শিক্ষা দেবে। ফল বেরলে তাই বেইমান দলবদলুদের রাজনৈতিক ইনিংসের শেষ না শুরু, তাও দেখে ছাড়বে বাংলার মানুষ। 
পূর্ব মেদিনীপুরের শাহেন শাহ বলে নিজেকে প্রজেক্ট করার চেষ্টা তিনি করলেও জেলার বহু জায়গাতেই কড়া প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। দেখতে হয়েছে কালো পতাকা। নন্দীগ্রামেও পড়তে হয়েছে প্রতিরোধের মুখে। নিজের জেলাতেই যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে গোটা বাংলায় কী অপেক্ষা করে আছে তা সহজেই অনুমান করা যায়। শুধুমাত্র ভোটে জিততে স্বাধীনতা উত্তর বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় জননেত্রীকে বেগম বলে যাঁরা ধর্মীয় মেরুকরণের তাস খেলেন, তাঁদের আর যাই হোক বাংলার মানুষ কোনওদিন বিশ্বাস করবে না, এ আমার দৃঢ বিশ্বাস। বিশেষত বাংলার মা বোনেরা এই অনাচারের জবাব দেবেনই। তিনি শুধু ধর্মীয় মেরুকরণেই ইন্ধন দেননি, সেই সঙ্গে নন্দীগ্রামে চোদ্দো বছর আগের জমি হারানোর যে আতঙ্ক মানুষকে তাড়া করেছিল, তাকেও নতুন করে উস্কে দিয়েছেন। নন্দীগ্রামের মানুষ তাই এবারও ভুল করেনি। ভুল করতে পারে না। নন্দীগ্রামের রায় বাংলার পক্ষেই যাবে। সেই রায় জানারই প্রতীক্ষায় এখন সারা ভারত। এই মাটি থেকেই অশুভ শক্তির পিছু হটাও শুরু হোক।

4th     April,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
কিংবদন্তী গৌতম
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
12th     May,   2021