বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

হাই ভোল্টেজ নন্দীগ্রামের ভোটযুদ্ধ 
লড়াই বিশ্বাস বনাম বিশ্বাসঘাতকতার
শান্তনু দত্তগুপ্ত

সুভাষ চক্রবর্তী পরিবহণমন্ত্রী থাকাকালীন হলদিয়ার জন্য ২৬টা বাস চালু করেছিলেন। সেই বাস রাত পর্যন্ত পাওয়া যেত। আর যাওয়া যেত তমলুক পর্যন্ত। হয়তো পুরনো সরকারি বাস... হয়তো মেরামতির উপরই চলত। তাও পরিষেবাটা ছিল। শুভেন্দু অধিকারী পরিবহণমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথম যে কাজগুলি করেছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম হলদিয়ার এই বাস পরিষেবা বন্ধ 
করে দেওয়া। এখনও রাত আটটা বাজলে সাধারণ মানুষের বুক ধড়ফড় শুরু হয়ে যায়... ফিরব কীভাবে? আম জনতার কাছে রাতের বেলা হলদিয়া থেকে তমলুক ফেরা মানেও যেন মানব সভ্যতার উল্টো প্রান্তে পাড়ি দেওয়া। 
জামাকাপড়ের ব্যবসা পেতেছিলেন তিনি। হলদিয়ার মতো শহর... একটু ধারদেনা হয়েছে, ও ঠিক উশুল হয়ে যাবে। তার উপর জেলার দোর্দণ্ডপ্রতাপ তৃণমূল নেতার লোকজন এসে বলে গিয়েছে, ‘আমরা তো আছি! ভয় কী!’ সবে ব্যবসাটা একটু বাজার ধরেছে... তাঁদেরই একজনের ফোন এল। বললেন, ৪০ হাজার টাকার মাল নেব। কী কী নেবেন, সে সব বিস্তারিত বললেন। আর দিলেন টাইমলাইন... সাত দিন। ব্যবসায়ী খুশি। সাত দিন পর সেই ‘জননেতা’র লোকজন এলেন। মাল নিলেন। আর হাতে ধরালেন ১০ হাজার টাকা... ‘বাকিটা সামনের সপ্তাহে পেয়ে যাবেন।’ তিন বছর হয়ে গিয়েছে। দোর্দণ্ডপ্রতাপ তৃণমূল নেতা আজ বিজেপিতে। সেই ৩০ হাজার টাকা তিনি এখনও পাননি। তাঁর মতো আরও বহু ব্যবসায়ী আছেন সেখানে। নিজেদের নাম কেউ প্রকাশ্যে আনতে চান না। প্রভাবশালী বলে কথা!
উম-পুনে দুর্নীতি নিয়ে রোজ গলা ফাটাচ্ছেন দিল্লি থেকে বাংলার বিজেপি নেতারা। ক্ষতিপূরণের টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ উঠেছিল সেই প্রভাবশালী নেতার গড়েও। এক জেলার নেতার উপাখ্যান... শুভেন্দু অধিকারীর হাতে তৈরি তিনি। তাঁরই জমানায় উম-পুন। অভিযোগ, ক্ষোভ... সব রয়েছে। কিন্তু সেই নেতা নেই। তিনি তাঁর ‘গুরু’র পদাঙ্ক অনুসরণ করে গেরুয়া শিবিরে। এতদিন ফেজ টুপি পরে নন্দীগ্রামে যেতেন। বলতেন, সালাম আলেকুম। আর বেরনোর সময় ‘খোদা হাফিজ’। আর এখন তিনিই সংখ্যালঘু বিরোধী কথা বলছেন। শোনাচ্ছেন হিন্দুত্বের নীতিকথা। 
পূর্ব মেদিনীপুর... বাংলার মধ্যেই একটা আলাদা রাজত্ব। সে রাজত্ব অধিকারী পরিবারের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হয়ে সরকারে আসার পর যে নেতাকে তিনি সবচেয়ে বেশি ভরসা করেছিলেন, তাঁর নাম শুভেন্দু অধিকারী। যে নেতাকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিভাবক হিসেবে দেখেছিলেন, তাঁর নাম শিশির অধিকারী। আর আজ সেই পরিবারই উঠতে বসতে তাঁর বাপ-বাপান্তর করছে। শুভেন্দুবাবুর রাজত্ব গড়ে ওঠার নেপথ্যে ছিল একটাই কারণ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশ্বাস। আস্থা। শুভেন্দু যা করবে, তাতে দলের ভালো হবে... এটাই ভাবতেন নেত্রী। সংগঠন? শুভেন্দু বুঝে নেবে। উন্নয়ন? সেটাও শুভেন্দু দেখে নেবে। প্রকল্পের জন্য টাকার ব্যবস্থাটুকু শুধু করে দিলেই চলবে। সেটা মমতা করে দিতেন। কৃতিত্ব শুভেন্দু অধিকারীর। আর বেফাঁস কিছু হয়ে গেলে? তার দায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। 
মনে পড়ে রাজেশ খান্নাকে... ‘বাবুমশাই... এত ভালোবাসা ভালো নয়’। একুশের বিধানসভা ভোটে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেটাই আবিষ্কার করেছেন। এত ‘বিশ্বাস’ ভালো নয়। পিঁপড়েকে চিনির পাহারায় বসিয়ে রাখা যায় না। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেটাই করেছিলেন। অভিযোগ কম ছিল না... টেট চাকরির একটা আসনের জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা, এক জেলার প্রার্থীকে অন্য জেলায় নিয়ে গিয়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়া, তারপর আবার জেলায় বদলি করিয়ে ফিরিয়ে আনা, ভোট দিতে না দেওয়া...। শাসক দলের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষ। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেখেননি। কারণ, তিনি বিশ্বাস করেছিলেন। সেই ‘বিশ্বাসভাজন’ আজ দলবদলু। তাহলে যাবতীয় অভিযোগের দায় কার? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের?
মাঝে আর একটা দিন। তারপরই দ্বিতীয় দফার নির্বাচন। আর এই পর্বেই রয়েছে সবচেয়ে হাই ভোল্টেজ কেন্দ্র—নন্দীগ্রাম। এত সমীকরণ খোঁজার নেপথ্যে এই একটাই কেন্দ্র। আর সঙ্গে একটা গুরুতর প্রশ্ন—মানুষ কার পাশে থাকবে? ভোটার কার পাশে থাকবে? বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা সর্বত্র দাবি করছেন, এবার সরকার তাঁদেরই। বারবার সভা করছেন নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ। কংগ্রেস কটাক্ষ করছে... প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে আর দিল্লি নয়, এবার থেকে কলকাতা যেতে হবে। অন্তত ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত। কারণ ওইদিনই বাংলার বিধানসভা নির্বাচনের শেষ প্রচার। তাই ঘাঁটি আঁকড়ে পড়ে আছেন তাঁরা। আছোলা ভাষায় আক্রমণ করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। কিন্তু সবটাই হিন্দিতে। আহা রে... তাঁরা এটুকু বুঝতে পারছেন না, বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে গেলে এই ভাষাটা খুব বেশি মানুষ বুঝতে পারেন না। শুনতেও চান না। তাঁদের কাছে কিন্তু মমতার ‘গরমেন্ট’ অনেক বেশি কাছের... অনেক বেশি আন্তরিক। রাজনীতির বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটা জনসভায় কত লোক হল, তা দিয়ে ভোট বিচার হয় না। তেমন কিছু হলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০০১ সালেই সিপিএমকে উপড়ে ফেলে দিতেন। মোদি-শাহের সভায় ভিড় হচ্ছে কি না, সেটা কিন্তু আজ বিবেচ্য নয়। দেখতে হবে, যাঁরা তাঁদের সভায় যোগ দিচ্ছেন, তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ততা কতটা? অর্থাৎ, মোদি যখন বলছেন, ‘দিদি, এবার আসল পরিবর্তন হবে’... তখন তাঁর সামনের জনতা ঠিক কীভাবে রিঅ্যাক্ট করছে। বক্তা এবং শ্রোতার মধ্যে যদি একটা ইতিবাচক ওয়েভ কাজ না করে, তাহলে সেই জনসভাকে সফল বলা যায় না। একই দিনে নরেন্দ্র মোদি সভা করলেন অসম এবং বাংলায়। পড়শি রাজ্যে জনসভায় উপস্থিত জনতার যে স্বতঃস্ফূর্ততা নজরে এল, তা কিন্তু বাংলায় ছিল না। আর তাই এখানে অনেক বেশি আগ্রাসী ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। গলার পারদ চড়েছে বারেবারে। আক্রমণের ঝাঁঝও বেড়েছে। মানুষ কিন্তু হাততালি দেওয়া, বা খানিক চিৎকার ছাড়া আর কিছুই করেননি। মানেটা পরিষ্কার, শ্রোতার সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করতে পারেননি মোদি। পারছেন না অমিত শাহও। পারছেন না জে পি নাড্ডা, রাজনাথ সিং বা যোগী আদিত্যনাথ। তাও তাঁরা পড়ে রয়েছেন। সভায় উঠে শিশিরবাবুর ‘জোড়হাত’ মাথায় ঠেকাচ্ছেন। পিঠ চাপড়ে দিচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারীর। 
বিজেপি একটা বিষয় বুঝছে... হাওয়া যতটা প্রচারে আছে, বাস্তবে অতটা নেই। ভয়টা এখানেই। নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ তো দাবি করে এসেছেন, ‘২০০ আসন পেয়ে সরকার গড়ব’। আদৌ সেটা 
হবে তো? তাই মরিয়া চেষ্টা শুরু হয়েছে। নিন্দুকে বলছে, ভোট জয়ের লক্ষ্যে নাকি কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ছড়ানো হচ্ছে। মূলত জঙ্গলমহল, পূর্ব মেদিনীপুর। ‘নাম সংকীর্তন করুন, আমরা টাকা দিচ্ছি’, ‘পুজোয় টাকা লাগবে, আমরা দিচ্ছি’... ভাবছেন সাধারণ মানুষ। ভয়ও পাচ্ছেন। এটাই যে শেষ অস্ত্র! এই হাতিয়ার কাজে না লাগলে দিল্লির দণ্ডমুণ্ডের 
কর্তাদের এত খরচের সফর সবটাই জলে যাবে। 
ভুল হল, এই খরচ তো আর ওঁরা নিজেদের পকেট থেকে দিচ্ছেন না! সবটাই আমাদের সাধারণ করদাতাদের রক্ত জল করা টাকা। তারপরও আমাদের ৯০০ টাকা দিয়ে গ্যাস কিনতে হয়, প্রায় ১০০ টাকা দিয়ে তেল। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। এই তো এসে গিয়েছে ‘আচ্ছে দিন’। এবার নাকি আসবে ‘ডবল ইঞ্জিন’ আচ্ছে দিন। একা রামে রক্ষা নেই, সুগ্রীব দোসর!
জবাব দিতে হবে। রাজনীতির প্রত্যেক কারবারিকে। শুভেন্দুবাবু, ভোট চাওয়ার আগে একবারও কি জিজ্ঞেস করেছেন, ‘গ্যাসের দাম এত বেড়েছে, আপনাদের কষ্ট হচ্ছে না?’ করেননি। করতে 
পারেন না। কারণ, আপনিও জানেন, সবটাই ধোঁকা। মোদির জমানায় মধ্যবিত্ত আজ নিম্নবিত্ত হয়েছে। নিম্নবিত্ত প্রায় ভিখারি। তারপরও ‘ডবল ইঞ্জিনে’র স্বপ্ন দেখান আপনারা। কামারহাটি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোট চাইতে গিয়েছিলেন রাজু বন্দ্যোপাধ্যায়... বিজেপির হয়ে। ভোটাররা তাঁকে ছেঁকে ধরে বললেন, ‘পেট্রলের দাম কত নিচ্ছেন? গ্যাসের দাম কত নিচ্ছেন? আগে মোদিজিকে গিয়ে দাম কমাতে বলুন, তারপর ভোট চাইতে আসবেন... মরে যাব, তাও বিজেপির পাশে থাকব না।’
এটাই ভোটের আসল হাওয়া।
এই হাওয়ায় একটাই প্রশ্ন রাজ্য রাজনীতির অন্দরে ঘোরাফেরা করছে... শুভেন্দুবাবু কি নন্দীগ্রাম জয়ের ব্যাপারে আদৌ আত্মবিশ্বাসী? প্রচারের প্রথম পর্বে সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘দেখা হবে লড়াইয়ের ময়দানে’। মমতা সেই ‘আর্জি’ শুনেছেন। নন্দীগ্রামকেই বেছে নিয়েছেন যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে। শুভেন্দুবাবু আবারও হুঙ্কার ছাড়লেন, ‘একটাই আসনে লড়তে হবে’। সেটাও শুনলেন নেত্রী। ভবানীপুরে এবার তৃণমূল প্রার্থীর নাম শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। তারপর? এবার এল নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ। এক ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়’কে খুঁড়ে বের করলেন শুভেন্দু অধিকারী। দাবি করলেন, তৃণমূল সুপ্রিমো তথ্য গোপন করেছেন। পরে দেখা গেল, বিষয়টা তা নয়। শুভেন্দুবাবু এতটা মরিয়া হয়ে উঠলেন কেন? নন্দীগ্রাম তো আপনারই গড়? সেখানে ইন্দিরা গান্ধী প্রার্থী হলেও তো আপনার ভয় পাওয়ার কথা নয়? তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে এত অস্বস্তি কেন?

30th     March,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
কিংবদন্তী গৌতম
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
12th     May,   2021