বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

দিল্লির ভাইসরয় দূর হটো
পি চিদম্বরম

আব্রাহাম লিঙ্কন বলেছেন, মানুষের, মানুষের দ্বারা এবং মানুষের জন্য সরকার হল গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের, এখনও পর্যন্ত এটাই হল, সবচেয়ে সহজ এবং সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা। সরকারের কেন্দ্রে হল জনগণ। যখন মানুষের সংখ্যাটা বিশাল তখন প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র হল একটা সুবিধাজনক উপায়।
ভারত হল একটা ফেডারেল স্টেট বা যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় পরিচালিত একটি রাষ্ট্র। আর দিল্লি হল ভারতের ন্যাশনাল ক্যাপিটাল বা জাতীয় রাজধানী। এটাই স্বীকৃত যে দিল্লির সরকারটা হবে অন্য রাজ্য সরকারগুলোর থেকে আলাদা। তবুও, সেটা যদি নিশ্চয় করে একটা গণতান্ত্রিক সরকার হয় তবে সেই সরকার অবশ্যই জনগণকে তার মধ্যমণি মানবে। সংবিধানের চূড়ান্ত ব্যাখ্যাতা ও মীমাংসক হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য (এনসিটি অব দিল্লি) বনাম ভারত ইউনিয়ন (২০১৮) মামলায় বলেছে যে, ‘‘কনস্টিট্যুয়েন্ট পাওয়ার বা গণক্ষমতা প্রয়োগের অর্থ হল বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত দিল্লির ন্যাশনাল ক্যাপিটাল টেরিটরির বাসিন্দা-জনগণের উপর গণতান্ত্রিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্পণ।’’ আদালত অনুমোদন সাপেক্ষে জগনমোহন রেড্ডি জে’কে উদ্ধৃত করেছে, যিনি ‘কেশবনন্দ ভারতী’তে বলেছেন, সরকারের গণতান্ত্রিক রূপটা হল সংবিধানের বুনিয়াদি কাঠামোর অংশ। 

গণক্ষমতা
সংসদের কনস্টিট্যুয়েন্ট পাওয়ার বা গণক্ষমতা প্রয়োগের ভিত্তিতে দিল্লির সরকারের ক্ষমতা ও কর্তব্যকর্ম চূড়ান্তরূপে নির্ধারিত হয়েছে। ১৯৯১ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ‘দিল্লির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করতে’ অনুচ্ছেদ ২৩৯এএ যুক্ত করা হয়। উদ্দেশ্য ও কারণ সংক্রান্ত বক্তব্যে পরিষ্কার যে ‘দিল্লি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবেই চলবে এবং তার জন্য একটা বিধানসভা থাকবে এবং এই বিধানসভার কাছে দায়বদ্ধ একটা মন্ত্রিসভাও থাকবে, যার হাতে থাকবে সাধারণ মানুষের প্রয়োজন মেটাবার উপযুক্ত ক্ষমতা।’’  
২৩৯এএ অনুচ্ছেদে ব্যবহৃত শব্দাবলি ও বাগধারার অর্থগুলো প্রতিটি গণতান্ত্রিক দেশেই গ্রাহ্য। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘আঞ্চলিক নির্বাচনী ক্ষেত্রগুলো থেকে প্রত্যক্ষ নির্বাচন’, ‘বিধানসভার হাতে থাকবে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ... যে বিষয়গুলো রাজ্য এবং যুগ্ম তালিকা সংশ্লিষ্ট, এবং বিশেষভাবে, ‘সেখানে একটা মন্ত্রিসভা থাকবে ... যার মাথায় থাকবেন মুখ্যমন্ত্রী, লেফটেন্যান্ট গভর্নরের কর্তব্যকর্ম সম্পাদনে সহায়তা এবং পরামর্শ দেওয়ার জন্য ...।’’ অনুচ্ছেদ ২৩৯এএ-র অধীনে গভর্নমেন্ট অব দ্য ন্যাশনাল টেরিটরি অ্যাক্ট, ১৯৯১ প্রণয়ন করা হয়েছিল, ওই অনুচ্ছেদে বর্ণিত ব্যবস্থাগুলোর বাস্তব প্রয়োগের উদ্দেশ্যে। 

দ্য ডগ অ্যান্ড দ্য টেইল
গত কুড়ি বছর যাবৎ অনেক দৃষ্টান্ত জমা হয়েছে, যেখানে লেজই (লেফটেন্যান্ট গভর্নর) কুকুরটির (মন্ত্রিসভা) উপর কর্তৃত্ব করার চেষ্টা করে গিয়েছে, কিন্তু সেসব কড়া হাতেই দাবিয়ে দেওয়া হয়েছে। ২০১৪ সালের পর থেকেই হাবভাবটা বদলে গিয়েছে। দিল্লিতে (কেন্দ্রে) অধিষ্ঠিত বিজেপি সরকার দিল্লিতে (এনসিটি) একটা অ-বিজেপি সরকার বরদাস্ত করতে পারে না। বিশেষ করে দিল্লিতে রাজনৈতিক ক্ষমতা একজন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার ব্যবস্থাটা প্রধানমন্ত্রী মানতে পারেন না। তাই, দিল্লির সরকারে আসল ক্ষমতাধর কে—দীর্ঘদিন আগে চাপা পড়ে যাওয়া এই বিতর্কটাকে ফের চাগিয়ে দেওয়ার একটা মরিয়া চেষ্টা করা হয়েছে। ‘রাজ্য (এনসিটি অব দিল্লি) বনাম ভারত ইউনিয়ন’ মামলায় এই চেষ্টার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ২০১৮ সালের ৪ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করে দিয়েছে যে, ‘‘২৩৯এএ(৪) অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘এইড অ্যান্ড অ্যাডভাইস’ (সহায়তা ও পরামর্শ ) কথাটির অর্থ এইভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে যে, দিল্লি এনসিটির লেফটেন্যান্ট গভর্নর মন্ত্রিসভার সহায়তা ও পরামর্শ নিয়ে চলতে বাধ্য।’’ 
মিস্টার মোদির মধ্যে ‘ইগো’ জিনিসটা রয়েছে মারাত্মক পরিমাণে (আমার মনে হয়, সব প্রধানমন্ত্রীর মধ্যেই এটা রয়েছে) এবং ভুল লক্ষ্যের পিছনে ধাওয়া করাটাও তিনি ছাড়েন না। তিনি সুযোগের সন্ধানে ছিলেন এবং চালটা তখনই দিলেন যখন দেশ চারটি রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ভোট নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। তিনি অনুচ্ছেদ ২৩৯এএ ছুঁতে পারেননি। কারণ, সংসদের উভয় কক্ষে এনডিএ-র দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। তাই গভর্নমেন্ট অব দ্য ন্যাশনাল ক্যাপিটাল টেরিটরি অ্যাক্ট, ১৯৯১ সংশোধনের মতো সহজ রাস্তাটি তিনি বেছে নিলেন। সুপ্রিম কোর্টকে বিদ্রূপ করে, উদ্দেশ্য ও কারণ সংক্রান্ত বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, ‘মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের ব্যাখ্যাটিকে কার্যকর করার জন্যই’ সংশোধনী বিলটি আনা হয়েছে। কিন্তু সত্যটা হল, এই বিল সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করার লক্ষ্যে একটা উদ্ভট প্রচেষ্টা। 

নিঃসন্দেহে অসাংবিধানিক
এই বিল আইনটা সংশোধন করছে এটা নিশ্চিত করতে যে ‘সরকার’ বলতে লেফটেন্যান্ট গভর্নরকেই বোঝাবে। এই সংজ্ঞা অনুসারে, লেজটাই হয়ে যাচ্ছে কুকুর আর কুকুরটা হয়ে যাচ্ছে লেজ! বিলে আরও ব্যবস্থা থাকছে যে, ‘কোনও এগজিকিউটিভ অ্যাকশন নেওয়ার আগে ... সরকারের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে ... নির্দিষ্ট সমস্ত ব্যাপারে লেফটেন্যান্ট গভর্নরের মতামত নিতে হবে।’ আইন প্রণয়নের ভেলকি দিয়ে মোদি সরকার দিল্লিতে তার ভাইসরয় বসিয়ে দিয়েছে! অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং তাঁর মন্ত্রীদেরকে ভাইসরয়ের ফাইফরমাশ খাটবার জন্য চাপরাসির স্তরে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। মিস্টার কেজরিওয়ালের জানা উচিত, আরও একটা সাংবিধানিক অভ্যুত্থানের দিন সামনে, যেমনটা প্রত্যক্ষ করেছে জম্মু ও কাশ্মীর—তার রাজ্যের মর্যাদা চলে গিয়েছে এবং রাজ্যটি দু’টি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। তবু, ‘জাতীয়তাবাদ’-এর নামে মিস্টার কেজরিওয়াল গণতন্ত্রের উপর ওই আঘাতটিকে সমর্থন করেছেন। আজ তাঁর হিসেব করার এবং অপমানের দিন। তৎসত্ত্বেও, তাঁর প্রতি আমার সহানুভূতি রয়েছে, যদি মোদি সরকারের বিরুদ্ধে তিনি লড়াই করতে চান। 
ভারতে প্রতিদিন গণতন্ত্রের ক্ষয় হচ্ছে। দুনিয়া একটা জিনিস খেয়াল করেছে যে ভারত আজ ‘আংশিক স্বাধীন’(পার্টলি ফ্রি) মাত্র। বিজেপির লক্ষ্য, একদলীয় শাসন কায়েম করা, একটা বিপুলায়তন অথচ নামকে ওয়াস্তে সংসদ, বশংবদ বিচার ব্যবস্থা, সরকার পোষিত সংবাদ মাধ্যম, অনুগত কর্পোরেটস, গোলাম-সুলভ জনগণ যারা বস্তুগত উন্নয়নেই তুষ্ট থাকবে। এই ভারতের সঙ্গে চীনের আর কোনও ফারাক থাকবে না। এটা হল ‘ডেজা ভ্যু’ ১৯৩৫—ভারত শাসন আইন, ১৯৩৫ এবং ‘গো ব্যাক সাইমন’।  
লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

28th     March,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
কিংবদন্তী গৌতম
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
12th     May,   2021