বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য ও
মহামান্য আদালতের সাম্প্রতিক রায় 
কান্তি গাঙ্গুলী

গত ১৬ মার্চ ম্যানগ্রোভ অরণ্য ধ্বংস নিয়ে এক নজিরবিহীন রায় দিয়েছে মহামান্য কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে এক ডিভিশন বেঞ্চ। ঘোষিত রায় অনুযায়ী—সংরক্ষিত অরণ্য অঞ্চলের কোনও প্রকার ক্ষতিসাধন হয়, এমন কোনও ধরনের কাজ করা যাবে না এবং পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে সুন্দরবন বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ, ব্যাঘ্র প্রকল্পের সংরক্ষিত অরণ্য অঞ্চল ও সংরক্ষিত বিশেষ ম্যানগ্রোভ অঞ্চল রক্ষার ক্ষেত্রে সামগ্রিক নীতি গ্রহণ করতে হবে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এই নির্বাচনী ডামাডোলের বাজারে উপরোক্ত রায়টি নিয়ে তেমন কোনও আলোচনা শোনা যাবে না। এমনিতেই সুন্দরবনের পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টি নিয়ে সমস্ত রাজনৈতিক দলের ভোটপ্রার্থীদের মধ্যেই তেমন কোনও হেলদোল নেই। আমি নিজেও এই নির্বাচনে একজন প্রার্থী। কিন্তু প্রার্থী হিসেবে নয়, সারা বছরই আমি সুন্দরবনের পরিবেশগত বিষয়ের আলোচনাকে যতটা সম্ভব সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক দলের কর্মীদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করি। কারণ এই কাজটি করা ভীষণ দরকার।
মানুষ তার স্বাধীনতাকে ফলপ্রসূভাবে উপলব্ধি করার জন্য এক ধরনের সামাজিক চুক্তিতে আবদ্ধ হতে চায়; এমনটাই ভাবতেন আলোকায়ন পর্বের মহান দার্শনিক জ্যাঁ জ্যাঁক রুশো। পরবর্তী চারশো বছরে হবস, কান্ট, জন রলস থেকে অমর্ত্য সেন প্রমুখ চিন্তাবিদ সামাজিক চুক্তির বিষয়টিকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। যদিও আগামী চারশো বছরে পৃথিবীতে মানুষ নামক প্রাণীর অস্তিত্ব থাকবে কি না সেটা অনেকটাই নির্ভর করছে সামাজিক চুক্তির তত্ত্বকে প্রসারিত করে পরিবেশগত কোনও বৃহত্তর চুক্তির কথা আমাদের চিন্তা চেতনায় অনুরণন তুলতে পারছে কি না, তার উপর। আগামী পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও পরিবেশ বাঁচানোর আন্দোলন তাই বর্তমান সময়ে একটি প্রধান কাজ। এই নিবন্ধেরও মূল আলোচ্য বিষয় সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য ও বাদাবনকে রক্ষার বিষয়টি।
সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যে কমপক্ষে প্রায় একশো চুয়াল্লিশ প্রজাতির ম্যানগ্রোভ গাছ আছে। এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যের পঁচানব্বই শতাংশই হচ্ছে প্রকৃতির অকৃপণ দান। ম্যানগ্রোভ গাছের ফল থেকেই উৎকৃষ্ট মধুর আহরণ প্রাকৃতিক নিয়মেই সব থেকে বেশি হয় সুন্দরবনে। ম্যানগ্রোভ অরণ্যের ফুল ও ফল নদীর জলে পড়ে প্রাকৃতিক উপায়েই নতুন করে ম্যানগ্রোভ অরণ্য গড়ে ওঠে। সারা পৃথিবীতে এত বড় ও বৈচিত্র্যময় ম্যানগ্রোভ অরণ্য আর দ্বিতীয়টা নেই।
শুধু তাই নয়, সুন্দরবনের কোর এরিয়া মাছের ডিম-ফোটার সব থেকে প্রয়োজনীয় জায়গাও বটে। ম্যানগ্রোভ অরণ্যের ঝরা পাতা সমুদ্রের লোনা জলে পড়ে এবং পচে গিয়ে ফাংগাস হিসেবে মাছের খাবার তৈরি করে। সে কারণেই মাছের প্রজনন স্থল হিসেবে এই অঞ্চলটি একটি আদর্শ স্থান। আসলে বঙ্গোপসাগরে মাছের খাবারের আঁতুড়ঘর হচ্ছে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের উপজাত পদার্থ। প্রকৃতির অনেক বৈচিত্র্য, একেবারে বিদ্যালয় স্তর থেকে সেই শিক্ষা পাঠক্রমে অঙ্গীভূত করতে হবে।
সুন্দরবনের এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যই আমাদের প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে। প্রশ্ন হল, আমরা কি সেই বাদাবন বা ম্যানগ্রোভ অরণ্যকে রক্ষা করতে যথেষ্ট পরিমাণে যত্নশীল? পূর্বে সুন্দরবনবাসী এই জঙ্গল কেটে সাফ করেছেন বসতির প্রয়োজনে। পরিতাপের বিষয় যে, এখন আর বসতির প্রয়োজনে সুন্দরবনে ম্যানগ্রোভ অরণ্য ধ্বংস হচ্ছে না। বরং ইটভাটায় ইটের পাঁজা পোড়ানোর জন্য এবং কয়েকশো কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে কায়েমি স্বার্থের প্রয়োজনে বেআইনি ফিশারির কারবারের জন্যই সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য আজ বিপন্ন হতে বসেছে।
সম্প্রতি রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্পে পাকা বাড়ি হচ্ছে। অ্যাসবেস্টসের ছাদের নীচে এইসব গাছের তক্তা কাজে লাগানো হয়। এছাড়াও জ্বালানি হিসেবে এইসব গাছের বেআইনি মজুত হচ্ছে। দ্বিতীয় বিষয়টি হল হাজার হাজার একর বেআইনি ফিশারি তৈরি হয়েছে ম্যানগ্রোভ অরণ্যকে ধ্বংস করেই। রাজনৈতিক কর্মী, প্রশাসনের একাংশ ও সমাজবিরোধীদের দ্বারা এইভাবে নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যরাজি। মাতলা, ঠাকুরান, বিদ্যাধরী, রায়মঙ্গল, সপ্তমুখী, হেড়োভাঙা, মৃদঙ্গভাঙা ইত্যাদি নদীর চরে যে নিবিড় ম্যানগ্রোভ অরণ্যরাজি ছিল আজ তা প্রায় ধ্বংসের মুখে। এই ধ্বংসলীলা অব্যাহত দুই ২৪ পরগনা জুড়েই। প্রশাসনের বড় অংশও এককথায় উদাসীন। অবশ্য অঞ্চলভিত্তিক সমস্যাও বিস্তর। আসলে লবণাক্ত জমিতে সাধারণ মানুষ ধান চাষে অতটা উৎসাহিত নয়। বিশেষ করে চিংড়ি চাষে এখন সকলের যেন খুব উৎসাহ। কারণ চিংড়ির ব্যবসা যথেষ্ট লাভজনক। ফলে অপরিকল্পিতভাবে সুইসগেট দিয়ে জল টেনে এনে এইসব ফিশারি তৈরি হচ্ছে। এতে নদীবাঁধও ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। কিন্তু এই ঘটনার দায় শুধু সরকারের নয়। যদি ছেচল্লিশ লক্ষ সুন্দরবনবাসী এই পরিবেশ ধ্বংসের মোকাবিলায় এগিয়ে না আসেন; তাহলে শুধু সরকার কিছু করতে পারে না। জনগণের সচেতনতা, প্রতিরোধ, দীর্ঘমেয়াদি প্রতিবাদ ছাড়া সমুদ্রের গভীরে, নদীনালার খাঁড়ির কন্দরে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের সংরক্ষণ সম্ভব নয়। এত নিবিড় ও বিস্তৃত সরকারি পরিকাঠামোও নেই এই প্রাকৃতিক সম্পদকে রক্ষা করার জন্য!
জনগণের সাগ্রহ অংশগ্রহণ ছাড়াও সরকারের সদর্থক ভূমিকা অবশ্যই এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনী রাজনীতির ডামাডোলে অসংখ্য বার ‘খেলা হবে’ না বলে যদি আমরা বলতে পারতাম পরিবেশ ও প্রকৃতিকে বাঁচানো হবে, তাহলে হয়তো আমরা সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য রক্ষার ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করতে পারতাম। সুন্দরবনকে বাঁচানোর জন্যই যা জরুরি। সুন্দরবন উন্নয়ন দপ্তরের দায়িত্বে থাকার সময় কিছু চেষ্টা করেছিলাম। প্রতিবছর ২১ আগস্ট দিনটিকে ‘সুন্দরবন দিবস’ হিসেবে পালন, প্রতিটি বিদ্যালয়ে সুদৃশ্য ফোল্ডারে করে সুন্দরবনের পরিবেশগত ও বাস্তুতন্ত্রের মূল বিষয়ের বক্তব্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও চেষ্টা হয়েছিল। স্কুল পড়ুয়াদের মধ্যে কয়েক লক্ষ চারাগাছ রোপণের জন্য বিতরণ করার মূল উদ্দেশ্যটিই ছিল যাতে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা সুন্দরবনকে জানতে বুঝতে পারে। কিছু সাফল্যও এসেছিল। এইভাবেই কম্যুনিটিতে নতুন প্রজন্মের ভিতরে সচেতনতা সৃষ্টি করা দরকার। একটা উদাহরণ দিই। ক্যানিং-এর কাছে মাতলা নদীর চরে ভাঙনখালি অঞ্চল। প্রায় বিশ কিলোমিটার মাতলার চর, চোরাশিকারীদের হাতে ম্যানগ্রোভ অরণ্যরাজি এককথায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হল। সুন্দরবনের অভিভাবক-সম প্রয়াত তুষার কাঞ্জিলাল, লোকমান মোল্লা, সুব্রত দাশগুপ্ত প্রমুখ মিলে সুন্দরবন উন্নয়ন পর্ষদের সভায় সিদ্ধান্ত নিলাম হাজার হাজার স্কুল পড়ুয়াকে নিয়ে হাজার হাজার ম্যানগ্রোভের চারা সৃজন করব ওই ম্যানগ্রোভ অরণ্য ধ্বংস হওয়া মাতলার চরেই। ধ্বংসের উৎস মুখেই নতুন করে জীবনের গান রচিত হবে।
সে এক ঐতিহাসিক দিন। গাছ লাগালাম। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে চরম হুঁশিয়ারি দেওয়া হল, বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে সমস্ত চোরাই ও বেআইনি কাটা গাছ যেন রাজ্য সড়ক সোনাখালি-বাসন্তী হাইওয়ের উপর রেখে আসা হয়, অন্যথায় সরকার চরম ব্যবস্থা নেবে। এই হুঁশিয়ারিতে কাজ হল। প্রায় দুশো লরি ম্যানগ্রোভ কাঠ উদ্ধার হল। এক অনাবিল আনন্দে সেদিন মুখরিত হয়েছিল পরিবেশ আন্দোলনের আলোয় উজ্জ্বল মাতলার চর। একইভাবে পাথরপ্রতিমার জি-প্লট, গোবর্ধনপুর, বুড়োবুড়ির তট প্রভৃতি অঞ্চলের ক্ষেত্রে সরকার সিদ্ধান্ত নিল এখানকার মানুষকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে। কারণ, নদী ও সমুদ্রের তটে ভয়ঙ্কর ভাঙন। আমরা সেদিন দপ্তর থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এই অঞ্চলে প্রায় বাইশ কিলোমিটার তটরেখা জুড়ে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে রোপণ করব ম্যানগ্রোভ এবং ঝাউবনানীর বৃক্ষ। আজ বুড়োবুড়ির তটে কী মনোরম ঝাউগাছের সারি, সেখানে সিনেমার শ্যুটিং হয়। দুটি ছোট ব্রিজ, একটা বনশ্যামনগর এবং একটা চাঁদমারির ঘাট—এই দুটি ছোট ব্রিজ হলেই বুড়োবুড়ির তট চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে হয়তো দিঘা, মন্দারমণিকেও। এই দুটো ছোট ব্রিজের ডিটেইলড প্রোজেক্ট রিপোর্টও তৈরি করেছিলাম। অর্থাৎ একদিকে নদীবাঁধ কংক্রিট হোক, অন্যদিকে ভিতরের দিকে গ্রামের সীমান্তে তাল, নারকেল, সুপারির ঘন সুবিন্যস্ত বনসৃজন হোক, যে গাছগুলো সাইক্লোনকে প্রশমিত করতে পারে। যদি ম্যানগ্রোভ অরণ্যকে রক্ষা করা না যায় তাহলে সুন্দরবন ও কলকাতা শহরতলি এক কঠিন বিপদের মুখে পড়বে, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
সুন্দরবনবাসী হিসেবে তাই দলমত নির্বিশেষে সকল রাজনৈতিক কর্মীর কাছে অনুরোধ করব, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্য রক্ষার বিষয়টিতে অগ্রাধিকার দিন। ভোট আসবে, ভোট যাবে, কিন্তু অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই ম্যানগ্রোভ অরণ্য রক্ষার বিষয়টি অবশ্যই আমাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। আমরা এক্ষেত্রে একটা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক মঞ্চ গঠন করতে পারি। স্কুল কলেজের ছাত্র-শিক্ষক, ক্লাব সংগঠন, গ্রন্থাগার কমিটি, এনজিও এবং সমস্ত রাজনৈতিক দলের কর্মীদের নিয়ে একটা ব্রড-বেসড মঞ্চ তৈরি করতে হবে, যার একটাই উদ্দেশ্য—সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষা। আজ জীবনের উপান্তে এসে এই ঠাঁইনাড়া মানুষটার একটাই আকাঙ্ক্ষা—জীবনের শেষদিন পর্যন্ত যেন সুন্দরবনবাসীর সঙ্গে সুখ দুঃখের ভাগ নিতে পারি, সুন্দরবনের নদীবাঁধ ও ম্যানগ্রোভ অরণ্য বিষয়ে পরবর্তী প্রজন্মকে যেন কিছুটা হলেও সচেতন করতে পারি।
লেখক প্রাক্তন মন্ত্রী(মতামত ব্যক্তিগত) 

27th     March,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
কিংবদন্তী গৌতম
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
12th     May,   2021