বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

মোদির সব প্রতিশ্রুতি যেন গল্পদাদুর আসর
সন্দীপন বিশ্বাস 

হঠাৎই জহর রায়ের একটি কৌতুক নকশা মনে পড়ল। এক ভদ্রলোক একটি ঘর ভাড়া নিতে গিয়েছেন। ঘর দেখে পছন্দও হয়েছে। দু’টি ঘর, রান্নাঘর, সঙ্গে আলাদা বাথরুম। কিন্তু ভাড়া শুনে ভদ্রলোকের মাথার চুল খাড়া হয়ে গেল। ভাড়া ৫০০ টাকা। গত শতাব্দীর সাতের দশকে পাঁচশো টাকা বাড়ি ভাড়া কতটা বেশি, তা প্রবীণরা জানেন। সেই ভদ্রলোক বাড়িওয়ালাকে বললেন, আচ্ছা, আমি যদি রান্নাঘর ভাড়া না নিই, কত ভাড়া দিতে হবে? বাড়িওয়ালা বললেন, চারশো টাকা দেবেন? তখন সেই ভদ্রলোক বললেন, আচ্ছা, আমি যদি বাথরুমটাও না নিই, তাহলে কত ভাড়া দিতে হবে? বাড়িওয়ালা ভদ্রলোকের এবার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। কিছু বুঝতে না পেরে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, সে কী! বাথরুম নেবেন না কেন? ওটা না হলে চলবে কী করে? ভদ্রলোক তখন বললেন, দেখুন ,এত ভাড়া দিয়ে থাকলে খাওয়ার আর পয়সা থাকবে না। তাই রান্নাঘরের দরকার নেই। আর না খেলে বাথরুমের কি আর দরকার আছে? একবার বুঝেই দেখুন।
হ্যাঁ, এই কৌতুক নকশার ভিতরে যে যন্ত্রণাবোধটুকু আছে, সেটা এখনকার মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। ক্রমেই হাজার টাকার দিকে এগিয়ে চলেছে রান্নার গ্যাসের দাম। ফাটকা বাজারের মতো প্রতিদিন সরকার বাড়িয়ে চলেছে রান্নার গ্যাস আর পেট্রল-ডিজেলের দাম। ওই পয়সা দিয়ে গ্যাস কেনার পর পকেটে কি ছ্যাঁকা লাগবে না? একটা গ্যাস গৃহস্থের এক মাস চলা মানে প্রতিদিন শুধু জ্বালানি খরচই প্রায় ৩০ টাকার মতো? এরপরেও মোদিজি কোন সুখস্বপ্নের গল্প আমাদের শোনাচ্ছেন? মনমোহনের আমলের গ্যাস, পেট্রলের দাম সাত বছরে দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। দিন দিন আপনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, আপনি যত কথাই বলুন না কেন, পরিস্থিতি আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই। আপনি এখন কথা বললেই মনে হয় গল্পদাদুর আসর বসেছে। এক স্বপ্নের, ইউটোপিয়ান জগতের ফানুসকে গল্পের মতো তুলে ধরে বারবার বোঝাতে চান, এটাই আসলে বাস্তব। কিন্তু আর তো বিশ্বাসের জায়গাটা আগের মতো নেই। গত সাত বছর ধরে আপনার কাজ এবং কথার ফারাক বুঝিয়ে দিয়েছে, আপনি আসলে একজন বিক্রেতা। বেনিয়া। আপনি স্বপ্ন বিক্রি করেন, দেশের সম্পদ বিক্রি করেন। কিন্তু আপনি দেশের সমস্যা মেটাতে পারেন না। আপনি গরিব মানুষের ঘরে ঘরে বিনা পয়সায় উজ্জ্বলা গ্যাস ঢুকিয়ে দিয়ে গ্রাহক সংখ্যা বাড়িয়ে গ্যাসের দাম বাড়ালেন পাক্কা ব্যবসায়ীদের মতো। কিন্তু উজ্জ্বলার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার। ধরা পড়ে গিয়েছে গল্পদাদুর আসরের মিথ্যাচার। সেই সব গরিব মানুষ আর গ্যাস নেন না। কেননা তাঁদের কাছে সাড়ে আটশো টাকা দিয়ে গ্যাস ব্যবহার করা বিলাসিতা ছাড়া কিছুই নয়। গ্রামের মানুষ আবার কাঠ-কয়লা-কেরোসিনে ফিরে গিয়েছেন। সেই কেরোসিনের দামেও আপনি কোপ মেরেছেন। কুপি জ্বালাবার মতো তেল কেনার পয়সাও আর নেই। বহু মানুষের কাজ চলে গিয়েছে গত এক বছরে। শেষ বাজেটে আপনি একশো দিনের কাজের বরাদ্দে টাকা কমিয়ে দিয়েছেন। এরপর স্বপ্ন দেখাতে চাইলে মানুষ কি আর বিশ্বাস করবেন? এর আপনি কতটা বুঝতে পারেন জানি না। জানলে গল্পদাদুর আসর বসিয়ে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নের বেলুন ওড়াতেন না।
পেঁয়াজের দাম চড় চড় করে চড়ছে। ষাট, সত্তর করে ক্রমেই একশোর দিকে এগচ্ছে। এই দাম নিয়ে একটু পিছনের দিকে তাকাই। পেঁয়াজের দামের আগুনে একদিন পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল দুই রাজ্যের বিজেপি সরকার। বেশি দিন আগের কথা নয়। ১৯৯৮ সালের কথা। দিল্লিতে এবং হরিয়ানায় গোহারান হারল বিজেপি। ১০ টাকার পেঁয়াজ সেদিন ৬০-৭০ টাকায় কিনতে গিয়ে হাত পুড়েছিল সাধারণ মানুষের। সেই ফোসকা পড়া হাতের যন্ত্রণার জবাব দুই রাজ্যের মানুষ দিয়েছিলেন ভোটবাক্সে। সুষমা স্বরাজ সরকারকে হারিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল শীলা দীক্ষিত নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার। শুধু পেঁয়াজের দামই বিজেপির পকেট থেকে সাড়ে ১৩ শতাংশেরও বেশি ভোট কেড়ে নিয়েছিল। রাজস্থানেও একই চিত্র দেখা গিয়েছিল। বিজেপির ভরাডুবি হয়েছিল। ২০০ আসনের মধ্যে কংগ্রেস একাই ১৫০ আসনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। মুখ্যমন্ত্রী ভৈঁরো সিং শেখাওয়াতের মন্ত্রিসভার ২৮ জন মন্ত্রী সেদিন হেরে গিয়েছিলেন।
বাংলার ভোট ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। সব শিবিরেই সাজো সাজো রব। সব দলই মানুষকে নানাভাবে তাদের ভোট দেওয়ার বার্তা দিচ্ছে। এবার পরিস্থিতি কিন্তু অন্যবারের থেকে একেবারে অন্যরকম। তাই আরও সচেতন হয়ে, সব দিক বিচার করে মানুষকে ভোট দিতে হবে। দেশের এবং রাজ্যের পরিস্থিতির তুল্যমূল্য বিচার করে মমতা এবং মোদির প্রতিটি পদক্ষেপের ভালোমন্দ যাচাই করতেই হবে। পেট্রপণ্যের দিনের পর দিন মূল্যবৃদ্ধি, শিল্পপতিদের ব্যাঙ্ক লুট করে দেশান্তরী হওয়া, দিনের পর দিন ব্যাঙ্কের সুদ কমে যাওয়া, ব্যাঙ্কগুলির দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার পথে এগিয়ে চলা, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, দেশের অর্থনীতির তলিয়ে যাওয়া, কৃষক আন্দোলনের যৌক্তিকতা, রেল থেকে অন্যান্য শিল্পের বেসরকারিকরণ, হঠাৎ করে গোপনে রেলের ভাড়া বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে বিপাকে ফেলা, সিএএ, এনআরসি অথবা গোলি মারো শালোকো স্লোগান— এসব বিচার করতেই হবে। বিচার করতে হবে কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, পথশ্রী, শিশুসাথী, সমব্যথী, জয় জোহার, সবুজসাথী ইত্যাদিকেও । সুতরাং এই ভোট শুধু রাজনৈতিক দলগুলিরই অগ্নিপরীক্ষা নয়, এই নির্বাচন রাজ্যের সোয়া আট কোটি ভোটারের কাছেও এক চরম অগ্নিপরীক্ষা। সেই অগ্নিপরীক্ষায় রাজ্যের মানুষ পাশ করতে না পারলে তার ফল ভোগ করতেই হবে।
মমতার কন্যাশ্রী সারা বিশ্বে স্বীকৃতি পেয়েছে। একদিন ‘দুয়ারে সরকার’ও দেশের এবং বিশ্বের মডেল হয়ে উঠতে পারে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এই কনসেপ্ট নিয়ে গবেষণা হতে পারে। নবান্ন থেকে সরকার পৌঁছে গিয়েছে গ্রামের পাঠশালা, হাট, আটচালা, খেত-খামারে। মানুষ ঘিরে ধরে সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছেন, তাঁরা এটা পাননি, ওটা চান। লাল ফিতের ফাঁস খুলে গিয়ে সরকার হয়ে উঠেছিল তাঁর প্রতিবেশী, তাঁর পরিবারের সদস্য। আজ প্রতিটি রাজ্যের সরকারকে এই ভূমিকাই পালন করতে হবে। এই সরকার মেয়েদের সম্মান দিয়েছে। মেয়েকে তারা বিদায় করে দেওয়ার সামগ্রী ভাবে না। মেয়েকে যাঁরা বিদায় করে দেওয়ার সম্পত্তি ভাবেন, তাঁরা মেয়েদের সম্মান দেন না এবং মেয়েদের শক্তি সম্পর্কেও তাঁদের স্পষ্ট ধারণা নেই। এখনও তাঁরা সেই মধ্যযুগীয় বর্বর ভাবনার মধ্যেই আটকে রয়েছেন। বাংলার সাড়ে তিন কোটি মেয়ে এবার এই অসম্মানের কথা মাথায় রেখে তাঁদের ভোটটা দেবেন।
সবশেষে যে প্রসঙ্গটা চলে আসে, সেটা হল ইভিএম প্রসঙ্গ। অতীতে ইভিএম নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। ভবিষ্যতেও হবে। কিন্তু ইভিএম নিয়ে কোনও সদর্থক সিদ্ধান্তে পৌঁছনো এখনও সম্ভব হয়নি। প্রশ্নটা হল ইভিএম কি হ্যাক করা সম্ভব? অর্থাৎ ইভিএমকে কি নিয়ন্ত্রণ করা যায়? অনেকে বলেন, সম্ভব নয়। আবার অনেকে বলেন সম্ভব। এর আগে কয়েকটি রাজ্যের ভোটে দেখা গিয়েছে, ভোটাররা যে কোনও বাটনই টিপুন না কেন, ভোট চলে যাচ্ছে একটি বিশেষ প্রতীকে। কম্পিউটার মেমরিতে এমন প্রোগ্রাম করা যায় বলে বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন। ধরা যাক, একটি মেশিনে প্রথম একশোটি ভোট পড়ল সঠিকভাবে। কিন্তু একশো ভোটের পর নিজস্ব ইচ্ছেমতো ভোটিং প্রোগ্রামিং করা যায় বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। সেটা ৬:৩:১ বা ৫:৩:২ বা যেমন ইচ্ছে, তেমন অনুপাতে হবে। অর্থাৎ যেকোনও ১০টি ভোটের ক্ষেত্রে প্রথম পছন্দে যাবে ৬টি ভোট, দ্বিতীয় পছন্দে যাবে ৩টি ভোট এবং তৃতীয় পছন্দে যাবে ১টি ভোট। ইচ্ছেমতো অনুপাতে প্রোগ্রামিং সম্ভব। অনেকে বলেন, না না এটা সম্ভব নয়। অপর পক্ষের যুক্তি হল, অজানা দূরত্বে বসে যদি জঙ্গিরা পেন্টাগনের ওয়েবসাইট হ্যাক করতে পারে, ভারতের ওয়েবসাইটের মধ্যে ঢুকে যেতে পারে, অন্য রাষ্ট্রে বসে দুষ্টু লোকেরা যদি আপনার, আমার অ্যাকাউন্টের টাকা তুলে নিতে পারে কিংবা পৃথিবীতে বসে মঙ্গলের যন্ত্রযানকে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, তার তুলনায় এত কম পয়সার মেশিনে সেটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না কেন? এনিয়ে বিতর্ক থেকেই যাবে। জানি না। ভোটের পর বিতর্ক বাড়বে কি না! তবে ভোটাররা বিশ্বাস করেন, তাঁদের গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাকে বা ভোটদানের সততাকে ইভিএম মেশিন প্রতারণা করবে না।  

3rd     March,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
কিংবদন্তী গৌতম
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
13th     April,   2021