বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

বাংলা নয়, আগে যোগী-রাজ্য নিয়ে কথা বলুন
মৃণালকান্তি দাস

‘ঠোক দিয়ে যায়েঙ্গে’!
এটাই নাকি উত্তরপ্রদেশ থুড়ি উত্তমপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের মন্ত্র। যোগী নিজের রাজ্যকে ‘উত্তমপ্রদেশ’ বলতেই ভালোবাসেন। তিনি স্বপ্ন ফেরি করেন, এই রাজ্য নাকি সবেতেই ‘উত্তম’। কেমন সেই রাজ্য?
ক্ষমতায় আসার দু’মাসের মাথায় যোগী সংবাদমাধ্যমে ঘটা করে বলেছিলেন, ‘‘অগর অপরাধ করেঙ্গে তো ঠোক দিয়ে যায়েঙ্গে।’’ যার অর্থ, অপরাধ করলে গুলি খেতে হবে। প্রকাশ্যেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন, রাজ্যে অপরাধীদের মোকাবিলায় পুলিসকে ‘ফ্রি হ্যান্ড’ দেওয়া হয়েছে। সেই ট্র্যাডিশন অনুযায়ীই চলছে 'এনকাউন্টার-রাজ'! আজ উত্তরপ্রদেশ কার্যত এনকাউন্টার প্রদেশে পরিণত হয়েছে। সর্বত্র আতঙ্ক আর আতঙ্ক। শুনলে অবাক হবেন, যোগীরাজ্যে গত ৪০ মাসে ৬২০০ এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটেছে। মৃত্যু হয়েছে ১২৪ জনের। মৃতদের মধ্যে জাতিগত ভিত্তিতে মুসলিম ৪৭ জন, ব্রাহ্মণ একজন, যাদব সম্প্রদায়ের ৮ জন আর বাকি ৫৮ জনই ঠাকুর ও দলিত সম্প্রদায়ের। অভিযোগ, সংখ্যালঘুদের বেছে বেছে এনকাউন্টার করা হচ্ছে। যদিও এত এনকাউন্টার সত্ত্বেও যোগী-রাজ্যে কিন্তু শান্তিশৃঙ্খলা ফিরে আসেনি। খুন, ধর্ষণ-সহ একাধিক ঘটনায় প্রায় প্রতিদিনই শিরোনামে উত্তরপ্রদেশ। বছর তিনেক আগেই বিধানসভায় দাঁড়িয়ে সত্যি কথাটা কবুল করে ফেলেছিলেন উত্তরপ্রদেশের পরিষদীয় মন্ত্রী সুরেশকুমার খান্না। বলেছিলেন, ‘‘যোগী আদিত্যনাথের মুখ্যমন্ত্রিত্বের প্রথম দু’মাসে রাজ্যে ৮০৩টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে!’’ সেটা ২০১৭ সালের জুলাই। যোগী সরকারের বয়স তখন মাত্র চার মাস। ২০১৭ ও ২০১৮ সালের এনসিআরবি রিপোর্ট বলছে, এই দু’বছরই যোগীর রাজ্য নারী নির্যাতনে শীর্ষে রয়েছে। গোটা দেশে নারী নির্যাতনের মোট সংখ্যা ওই দুই বছরের প্রতি বছরই ৩ লক্ষের কিছু বেশি, তার মধ্যে প্রায় ৬০ হাজার মামলা শুধু উত্তরপ্রদেশেই। বিতর্কিত ‘লাভ জিহাদ’ আইন আসার পর অপরাধের সংখ্যা আরও বাড়ছে।
হিন্দু মেয়েদের মুসলিম পরিবারে বিয়ে রুখতে দীর্ঘদিন ধরেই ‘লাভ জিহাদ’ আইনের পক্ষে মঞ্চ তৈরি করে আসছিল যোগী সরকার। গত বছর নভেম্বরে অর্ডিন্যান্স জারি করে বিয়ের নামে ধর্মান্তরণরোধী আইন কার্যকর করে তাঁর সরকার। তারপর থেকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সংখ্যালঘুদের হেনস্তার অভিযোগ সামনে এসেছে। পুলিস প্রশাসন তো বটেই, অনেক ক্ষেত্রে বজরং দলের মতো কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি বিচারকের ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ। মোরাদাবাদের ঘটনা যার সাম্প্রতিক উদাহরণ।
মোরাদাবাদে রশিদ আলি এবং সেলিম নামের দুই সংখ্যালঘু যুবককে বেদম প্রহারের পর থানায় নিয়ে আসে বজরং দলের কর্মীরা। এক বছর আগে পিঙ্কি নামে একটি মহিলার সঙ্গে বিয়ে হয় রশিদের। সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে নিয়ে ওই দিন বিয়ে রেজিস্ট্রি করতে যাচ্ছিলেন রশিদ ও তাঁর ভাই সেলিম। সেখান থেকে তাঁদের তুলে আনা হয়। অভিযোগ ওঠে, হিন্দু ঘরের মেয়ে পিঙ্কিকে জোর করে বিয়ে করেছেন রশিদ। আগুপিছু না দেখেই সেই সময় রশিদ ও সেলিমকে গ্রেপ্তার করে পুলিস। পিঙ্কিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় সরকারি হোমে। সেই টানাপোড়েনে গর্ভপাত হয়ে যায় পিঙ্কির। বিষয়টি আদালতে উঠলে পিঙ্কি জানান, নিজের ইচ্ছেতেই রশিদকে বিয়ে করেছিলেন তিনি। এমন ঘটনা হামেশাই ঘটে চলেছে।
বাংলায় ভোটে প্রচারে এসেছেন মধ্যপ্রদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি শাসনের দাবি তুলেছেন সেই বিজেপি নেতা নরোত্তম মিশ্র। তিনি বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে এখন মাফিয়ারাজ চলছে। দিলীপ ঘোষ থেকে দলবদলু নেতারা— সকলের এক রা। কিন্তু এ রাজ্যের বিজেপি নেতারা কি জানেন, উত্তরপ্রদেশের হাল! না জানলে জেনে রাখুন, কেন্দ্রের তথ্য বলছে, অপরাধের স্বর্গরাজ্য এখন উত্তরপ্রদেশ। আসলে এই একুশ শতকে তথ্য গোপন করা মুশকিল। ইন্টারনেট ঘাঁটলেই যে কেউ পেয়ে যান যাবতীয় তথ্য।
তথ্যই বলছে, ২০১৭-র মার্চ মাসে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন যোগী আদিত্যনাথ। সেই বছর উত্তরপ্রদেশে ৪,৬৬৯টি ধর্ষণের মামলা দায়ের হয়েছিল। এর মধ্যে অন্যতম উন্নাও গণধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড। যে মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন বিজেপির বিধায়ক কুলদীপ সিংহ সেঙ্গার। ২০১৮ সালে ধর্ষণের সংখ্যা সামান্য কমে দাঁড়ায় ৪,৩২২। এর মধ্যেও ৪১টি ক্ষেত্রে ধর্ষিতাকে খুন করা হয়েছিল। ২০১৯ সালে উত্তরপ্রদেশে মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের সংখ্যা ৫৯,৮৫৩। যা দেশের মধ্যে সর্বাধিক। এর মধ্যে ধর্ষণের মামলার সংখ্যা ৩,০৬৫টি। সরকারি তথ্যই জানাচ্ছে, উত্তরপ্রদেশে রোজ গড়ে ১১ জন মেয়ে ধর্ষিত হন। আর বিজেপি নেতাদের মুখে ‘নারীশক্তি’-র কথা শুনলে ছলনা মনে হয়! হাতরাসের ঘটনার কথাই ধরুন। অপরাধী অপরাধ করে, কিন্তু তাকে সংগঠিত শক্তি দিয়ে যখন আড়াল করবার চেষ্টা হয় তা হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর অপরাধ। আর সেটাই হয়েছিল যোগী রাজ্যে। ধর্ষণেই ওরা থেমে যায়নি, কেটে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল জিভ, মেরে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল ‌শিরদাঁড়া। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গুরুতর আহত মেয়েটি জবানবন্দিতে পুলিসকে জানিয়েছিল, তার ওপর যৌন নিপীড়ন করা হয়েছিল। এরপরও পুলিস রিপোর্ট বলেছে— ধর্ষণ তো হয়নি! তাহলে গোপনাঙ্গে ক্ষত কীসের? জবাব ছিল না রিপোর্টে। আর নির্যাতিতার বাবাকে হাতরাসের জেলাশাসকের ‌শাসানির মূলকথা ছিল— বয়ান বদল করো। গণধর্ষণে অভিযুক্তদের আড়াল করা থেকে নির্যাতিতার দেহ সৎকার, বয়ান বদলের জন্য নির্যাতিতার পরিবারের লোকজনের উপর চাপ সৃষ্টি করা থেকে সংবাদমাধ্যমকে ঢুকতে বাধা দেওয়া— নির্বিকার ছিল যোগী সরকার।
সেদিন গভীর রাতে জ্বলন্ত অগ্নিশিখার সামনে অসম সাহসী একাকী সাংবাদিক প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘‌ইয়ে ক্যা জ্বল রহা হ্যায়?’‌ এই প্রশ্ন আগামী বহু দিন ভারতীয় গণতন্ত্রকে তাড়া করে ফিরবে। গোটা ভারত জেনে গিয়েছে, যোগী আদিত্যনাথের রাজত্বে উচ্চবর্ণের সাত খুন মাফ। উন্নাওয়ের নাবালিকা ধর্ষণের ভয়াবহ স্মৃতি তার সাক্ষ্য দেবে। হাতরাসের সেই দলিত মেয়েটিকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে, তারাও উচ্চবর্ণের ও ধনী। উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আবহাওয়া এই বিশেষ অপরাধপ্রবণতার পক্ষে অনুকূল। নারীর প্রতি অসম্মান, দলিত, আদিবাসীদের বা মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা, দারিদ্র্যের অবজ্ঞা, এবং এক ভয়ঙ্কর শক্তিমদমত্ত বাহুবলী নীতিহীন পৌরুষের আরাধনা— এই সবই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির অপরিহার্য অঙ্গ। আর তাই সেই ঘটনার পরও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছিলেন, “ধর্ষণ তো হাতরাসেও হয়, রাজস্থানেও হয়। শুধু হাতরাস নিয়ে কেন এত শোরগোল?” ভাবুন, এরাই নাকি ভোট প্রচারে এসে পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন!
কে না জানে, যোগী সরকারের টার্গেট সংখ্যালঘু, দলিতরাই। অভিযোগ উঠেছে, নিজে তো সংখ্যালঘুদের উন্নয়নে খরচ করছেনই না, উল্টে কেন্দ্রীয় বরাদ্দের টাকাও আটকে দিচ্ছেন। সম্প্রতি সংখ্যালঘু মন্ত্রক সংসদে যে তথ্য পেশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে ২০১৯-২০ অর্থবর্ষে সংখ্যালঘু উন্নয়ন খাতে কেন্দ্র যে অর্থ বরাদ্দ করেছিল, তার ১০ শতাংশও খরচ করেনি উত্তরপ্রদেশ সরকার। অর্থাৎ, দেশের সংখ্যালঘু জনসংখ্যার একটা বড় অংশ উত্তরপ্রদেশে বসবাস করলেও তাঁদের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ ৯০ শতাংশের বেশি টাকা ব্যবহারই করা হয়নি। কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু উন্নয়ন মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবর্ষে উত্তরপ্রদেশের সংখ্যালঘু উন্নয়নের জন্য কেন্দ্র বরাদ্দ করেছিল প্রায় ১৬০ কোটি টাকা। কিন্তু যোগী আদিত্যনাথের সরকার খরচ করেছে মাত্র ১৬ কোটি টাকার কিছু বেশি। বাকি টাকা অব্যবহৃত হয়ে রয়ে গিয়েছে। ভাবতে পারেন, এরা পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলে রাজ্যের সংখ্যালঘু, দলিত, আদিবাসীদের অবস্থা কী হবে! অমিত শাহরা এরাজ্যের সংখ্যালঘুদের নিয়ে রাজনীতি করার আগে তাকিয়ে দেখুন পশ্চিমবঙ্গের দিকে। সংখ্যালঘু উন্নয়নের ক্ষেত্রে গোটা দেশে প্রথম সারিতে রয়েছে বাংলা। রাজ্যে সংখ্যালঘু উন্নয়নে বরাদ্দ অনেক বেড়েছে। ২০১০-’১১ আর্থিক বর্ষে বাজেট বরাদ্দ ছিল ৪৭২কোটি টাকা, সেখানে ২০২০-’২১ এ বরাদ্দ করা হয়েছে ৪ হাজার ১৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সংখ্যালঘু বৃত্তি ‌‘ঐক্যশ্রী’‌ খাতে দু’কোটি ৩৮ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে। সংখ্যালঘু বিষয়ক বিভাগ ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের কল্যাণ ও সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য ৬০৮টি প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যুবক ও মহিলারা যাতে স্বনির্ভরশীল হতে পারে, সেইজন্য একাধিক পদক্ষেপ ইতিমধ্যেই গ্রহণ করেছে রাজ্য। ২০১৯-এর জুন মাসে প্রায় অর্ধেক ছাত্রছাত্রী কেন্দ্রের তরফে বৃত্তি না পাওয়ায়, রাজ্যের সংখ্যালঘু ছেলেমেয়েদের শিক্ষায় এগিয়ে নিয়ে যেতে ‘ঐক্যশ্রী’ প্রকল্পের মাধ্যমে স্কলারশিপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর জন্য ৬১৬ কোটি বরাদ্দ করা হয়েছিল নবান্নের তরফে। বাংলার ভবিষ্যৎ কার হাতে সুরক্ষিত থাকবে, সেটা এখানকার সংখ্যালঘু গরিব মানুষ খুব ভালোই বোঝেন।
বিজেপির নেতারা তাকিয়ে দেখুন, এ রাজ্যে লড়াই করে হার না মানা গাঁয়ের গরিব মানুষের সম্প্রীতির প্রতি কী অপরিসীম কৃতজ্ঞতা! মনে রাখবেন, এ রাজ্যের এক চতুর্থাংশ মানুষ সংখ্যালঘু। রাজ্যের বহু সাফল্যের কারিগর সংখ্যালঘুরা। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সালে আলিগড়, জামশেদপুর ও বারাণসীতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে। ১৯৮১ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত গোটা দশক বড় ধরনের দাঙ্গা হয়েছে দেশের নানা রাজ্যে। ১৯৯২ সালের দাঙ্গার কথাও কেউ ভোলেননি। মনে আছে গুজরাতের নারকীয় তাণ্ডবলীলার কথাও। ব্যতিক্রম পশ্চিমবঙ্গ। 

26th     February,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
কিংবদন্তী গৌতম
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
10th     April,   2021