বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

কর্পোরেট তোষণের ফলেই তেল অগ্নিমূল্য
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় 

সরকার যদি নিজেই দাম বাড়ায়, তাহলে পেট্রল ডিজেলের দাম কমবে কী করে? জ্বালানির দাম নিত্য  বাড়ছে। স্বাধীন ভারতে এটা রেকর্ড যে পরপর নয়দিন দাম বাড়ল। গত দেড় মাসে ২১ বার দাম বাড়ল পেট্রল ও ডিজেলের, এবং একমাসের মধ্যে দু’বার গ্যাসের দাম বাড়ল ৫০ টাকা করে। কিন্তু কেন? এর জন্য দায়ী সরকারের অর্থনীতি চালানোর ভ্রান্ত দর্শন। রাজকোষের ভারসাম্য রাখতে তাই বারবার ব্যর্থ হয় সরকার, এবং সেই ব্যর্থতা ঢাকতে কেবলই জ্বালানির উপর কর বসিয়ে আয় বাড়িয়ে ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করে । সব মিলিয়ে সরকারের এই ভুলের গুনাগার দেয় জনগণ।
দরকার ছিল এই ভুল নীতি বদলের। কিন্তু সেটা না করে ভুলকে আড়াল করতে সরকার বলে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দাম বাড়লে আমরা কী করব? কথাটা অর্ধসত্য। তথ্য দিলেই বোঝা যাবে। মানুষ যে দামে পেট্রল ডিজেল কেনে, তার মধ্যে ৬০-৬৩ শতাংশ হল সরকারের শুল্ক। এক্সাইজ ও ভ্যাট পেট্রলের উপর ৬৩ শতাংশ, ডিজেলের উপর ৬০ শতাংশ। তার মানে, বাকি যে প্রায় ৪০ শতাংশ থাকল, সেটার কিছুটা বিদেশ থেকে কেনার খরচ, বাকি তার পরিশোধন, আনা-দেওয়া-পৌঁছনো-মজুত করা, বিক্রির উপর ডিলারের প্রাপ্য কমিশন ইত্যাদি।
এসবের পরিমাণ আলাদা আলাদা করে দেখলে বোঝা যাবে যে সরকারের করের চাইতে বাকি সব ফ্যাক্টর অনেক কম। তাই ওইসব খরচের জন্য এত দাম বাড়ে না, দাম আসলে বাড়ে সরকারের শুল্ক ও করের জন্য। আর এর জন্য দায়ী মোদি সরকারের ভুল নীতি। কতখানি  দায়ী এই সরকার? আর কতটা দায়ী আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি?  সেটা তুলনা করে দেখলেই বোঝা যাবে।
২০১৪ সালে যেদিন মোদি ক্ষমতায় এসেছিলেন সেদিন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ছিল
ব্যারেল প্রতি ১১০ মার্কিন ডলার। আজ সেই দাম কমে গিয়ে হয়েছে ৬৫ মার্কিন ডলার! তাহলে তো দেশে অন্তত মোদির কথা অনুযায়ী পেট্রল, ডিজেলের দাম কমে যাওয়ার কথা। তার বদলে সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত পেট্রলের দাম বাড়ল ২৬ শতাংশ, ডিজেল ৪২ শতাংশ। কেন? 
২০১৪ সালে ডিজেলের দামে নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়ার সময় মোদি সরকার দামবৃদ্ধির পুরোটাই জনগণের কাঁধে ঠেলে দিয়ে মূল্যের উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়েছিল। একই কাজ করেছিল কংগ্রেস, তবে সেটা পেট্রলের উপর। তাতে পেট্রল চালিত গাড়ির মালিকের উপর চাপ পড়ত। কিন্তু মোদি ডিজেলের দামে নিয়ন্ত্রণ তুলে সমস্ত জিনিসের দাম বাড়ানোর রাস্তা করে দিলেন। কারণ ডিজেলের দামবৃদ্ধি মানে সব ক্ষেত্রে দামবৃদ্ধি। একই সঙ্গে মোদি সরকার জানিয়েছিল, ডিজেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমলে এই দেশেও কমবে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি তাঁর  সরকার রাখেনি।।
পরের প্রশ্ন,  এখন তো কমেছে বিদেশে তেলের দাম, তাহলে ডিজেলের দাম দ্বিগুণ হল কী করে? করোনা আক্রান্ত অর্থনীতিতে গোটা বিশ্বে লকডাউনের সময় তেলের দাম একেবারে জলের চাইতেও সস্তা হয়ে গিয়েছিল। বলতে গেলে কোনও চাহিদাই ছিল না। তখনই সরকার মার্চ থেকে অক্টোবরের মধ্যে পেট্রল ও ডিজেলের দাম বাড়িয়েছে—পেট্রলে ও ডিজেলে লিটারে ১৫ থেকে ১৭ টাকা হারে। বিশ্বজুড়ে যেখানে তেলের চাহিদা নেই, জোগান এত বেশি যে উপচে পড়ছে তেল রাখার সমস্ত ট্যাঙ্কার, সেখানে অর্থনীতির নিয়মেই দাম কমবে, এটাই স্বাভাবিক। সেই সময়েও এদেশে সরকার দাম বাড়িয়ে গিয়েছে। কারণ কী? সরকার চালানোর খরচ তুলতে তেলের উপর কর চাপানো হয়। কর্পোরেটের করছাড় হোক, আর সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়াতে হোক, পরিকাঠামো তৈরি হোক কিংবা যুদ্ধ বিমান কিনতে হোক, রাজকোষের ঘাটতি মেটাতে সরকারের কাছে চটজলদি উৎস হল রাতারাতি তেলের উপর কর চাপিয়ে দেওয়া। এই নীতির বিসর্জন না দিলে এভাবে এদেশে পেট্রল ডিজেলের দাম বাড়তেই থাকবে।
সরকারের এই ভুল নীতি ঢাকতে ফাটা রেকর্ডের মতো বারবার বলা হয় যে—আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ছে! তাহলে সরকার কী করবে? সরকারের অনেক কিছু করার ছিল। তেলের দাম নিয়ে সরকারের বা সংসদীয় কমিটির সুপারিশ বা নীতি আয়োগের পরামর্শ কোনওটাই সরকার মানে না। তেলের দাম বিকেন্দ্রীকরণের সময় বলা হয়েছিল যে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশেও পেট্রল ডিজেলের
দাম কমানো হবে। কিন্তু সেটা খুব কমই হয়,
হলেও সেটা খুব কম পরিমাণে হয়। উদারনীতি চালুর পর ঠিক হয়েছিল, একটা বিশেষ তহবিল তৈরি
করা হবে। তেল আমদানির পর পরিশোধন করে লিটার পিছু দাম নির্ধারণ করার সময় যদি দেখা যায় দাম বাড়ছে, তাহলে অয়েল পুল থেকেও অর্থ বরাদ্দ করে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করবে সরকার। এটাই সরকারি সিদ্ধান্ত। তার জন্য একটা অয়েল পুল অ্যাকাউন্ট আছে অর্থমন্ত্রকের। একটা পদ্ধতি আছে সেখান থেকে টাকা নিয়ে বিদেশের বাজারে বর্ধিত খরচ মেটানোর, যাতে তেল কেনার খরচ বাড়লে জনগণের উপর চাপ না পড়ে। এই সরকার সেই অয়েল পুল অ্যাকাউন্টের টাকা নিয়ে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে না কেন?
আসলে সরকার নিজেই চায় দাম বাড়াতে। তাতে সব চাইতে বেশি লাভ সরকারের। যত বাড়বে তেলের দাম, ততই শতাংশের হারে তার থেকে রাজস্ব আয় বাড়বে সরকারের। সরকার যদি নিজেই আয় বাড়াতে কর চাপায়, দাম তো বাড়বেই। ঘাটতি বাজেটে দীর্ণ একটা সরকারের পক্ষে এটাই মনে হয়েছে সহজে পরিত্রাণের রাস্তা। তাই সেটাই করে চলছে।
অথচ বিকল্প পথ ছিল। তেলের দাম না বাড়ানো। জনগণকে রেহাই দিতে সরকারের উচিত ছিল,
এই করোনা আক্রান্ত অর্থনীতিকে ফের দাঁড় করানোর জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ করা। এজন্য তেলের দাম কমিয়ে রাখতে ওই অয়েল পুল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা যেত। করোনা পর্বে তেলের দাম খুব কম ছিল। তাই বরাদ্দ অর্থ বেঁচে আছে। সেটাই এখন বেশি
দামে তেল  কেনার ঘাটতি মেটাতে ব্যবহার করলে পারত সরকার। এটাই এখন সব চাইতে বড়
দরকার ছিল। তাতে দেশে জিনিসের দাম বেশি
বাড়তে পারত না। ফলে সব ধরনের পণ্যের চাহিদা বাড়ত। যে টাকা পেট্রল ডিজেলের কর থেকে আসছে, তার বদলে সেটা এসে যেতে পারত মানুষের বর্ধিত খরচের জিএসটি থেকে। 
উচিত ছিল কর্পোরেট ট্যাক্স বাড়িয়ে তেলের
উপর ডিউটি কমানো। কিন্তু সে পথে হেঁটে শিল্প মহলকে চটাতে চান না কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। উল্টে তাদের হাতেই দেশের বিকল্প জ্বালানি উৎপাদনের ক্ষেত্র তুলে দিয়ে দায় সারতে চায় সরকার। তাতে কর্পোরেট আয়ের উপর কর, পরিষেবায় জিএসটি থেকে আয় বাড়বে। কোষাগারে বেশি পরিমাণ রাজস্ব জমা হবে। বৃদ্ধির সুফল যদি সরকার জনগণকে দিত তাহলে সাধুবাদ পেতে পারত, কিন্তু হয় তার উল্টো। বাজেট ঘাটতি মেটাতে কর চাপে পেট্রল ডিজেলের উপর, বারবার দাম
বাড়ে গ্যাসের। ভর্তুকি বাড়ে না, উল্টে একেবারে
বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। ভর্তুকিহীন গ্যাসের
সরবরাহ কমে যায়। কিন্তু বাড়ে কর্পোরেটের জন্য করছাড়। দেখা যাচ্ছে, পেট্রল ডিজেলে যে আয় তার অনেকটাই খরচ হচ্ছে এই কর্পোরেট তোষণ করতে। গুনাগার গুনছে জনগণ।
 লেখক অর্থনীতির বিশ্লেষক। মতামত ব্যক্তিগত 

25th     February,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
কিংবদন্তী গৌতম
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
10th     April,   2021