বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
বিশেষ নিবন্ধ
 

বিজেপিতে গিয়ে খুব সুবিধা হবে না
সৌগত রায়

পশ্চিম বাংলার নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, কিছু লোক তৃণমূল কংগ্রেস ত্যাগ করে বিজেপিতে যাচ্ছেন। এটা শুরু হয়েছিল লোকসভা নির্বাচনের আগে থেকেই, যখন দলের এক সর্বভারতীয় নেতা তথা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং বাঁকুড়া জেলার এক এমপি বিজেপিতে গিয়েছিলেন। তখন খুব বেশি লোক তৃণমূল ছাড়েননি। কিন্তু সাম্প্রতিককালে বেশ কয়েকজন নেতা তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে গিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলেন পূর্ব মেদিনীপুর এবং হাওড়া জেলার দুই নেতা। তাঁরা দু’জনেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। বাকি যেসব বিধায়ক গিয়েছেন, আমি মনে করি, তাঁদের অধিকাংশেরই কোনও গুরুত্ব নেই। 
এঁদের অনেকেই এবারের নির্বাচনে তৃণমূলের টিকিট পেতেন না। যেমন দীপক হালদার। টিকিট পেলেও তিনি হেরে যেতেন বলেই মনে হয়। এই দলত্যাগীদের সংখ্যাটা ১২-র বেশি নয়। তাই যাঁরা বলছেন, তৃণমূল থেকে দলে দলে লোক চলে যাচ্ছে, তাঁরা ভুল বলছেন। কারণ, তৃণমূলের ২১৮ জন বিধায়ক ছিলেন। বিধায়ক সংখ্যা ২১১ থেকে ২০১৬ সালে বেড়ে ২১৮ হয়েছিল। তার মধ্যে বড়জোড় ১২ জন গিয়েছেন। তাই এঁদের দলত্যাগের কোনও প্রভাব বাংলার রাজনীতিতে পড়বে না। যাঁরা গিয়েছেন, তাঁদের নিজেদেরই স্থানীয় বিধানসভা কেন্দ্রের বাইরে কোনও প্রভাব নেই। বিজেপির টিকিট পেলেও এঁরা সম্ভবত জিততে পারবেন না। 
এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পূর্ব মেদিনীপুরের এক মন্ত্রীর চলে যাওয়া। তার কারণ, তিনি নিজে রাজ্যের ক্যাবিনেট মন্ত্রী ছিলেন। তাঁর পরিবারের আরও দু’জন—তাঁর বাবা ও এক ভাই লোকসভার এমপি। পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় ওঁদের পরিবারের একটা প্রভাব ছিল। আমি নিজে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে ওই প্রাক্তন মন্ত্রীকে দলে রাখার জন্য অনেক চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু পরে বুঝলাম যে, ওঁর উচ্চাশা আকাশচুম্বী। ওঁকে অন্তত পাঁচটি জেলার সার্বিক নিয়ন্ত্রণ দিতে হবে। নইলে উনি তৃণমূলে থাকতে রাজি নন। পরে এও জানলাম, বিজেপির সঙ্গে আগে থেকেই তাঁর যোগাযোগ চলছিল। তৃণমূল ছেড়ে সেখানে যোগদানের ব্যাপারে বিজেপির কাছে তিনি কথা দিয়েছিলেন। তার ফলে ওঁর পক্ষে পিছিয়ে আসার কোনও সুযোগ ছিল না। তবে, ডোমজুড়ের এক নেতার তৃণমূল ছেড়ে যাওয়াতে আমি আশ্চর্য হইনি। কারণ, ওঁর কোনও রাজনৈতিক পশ্চাদপট নেই। তিনি ছাত্র-যুব আন্দোলন করে রাজনীতিতে উঠে আসেননি। তিনি ম্যাজেনমেন্ট পাশ। তাই ওঁর কাছে রাজনীতিটা কিছুটা কর্পোরেট চাকরি বদলের মতো। এর মধ্যে আদর্শের কোনও ব্যাপার নেই। 
তবে, আমি সবচেয়ে দুঃখিত হয়েছি এবং আশ্চর্যও বটে দীনেশ ত্রিবেদী দল ছাড়ায়। দীনেশ ত্রিবেদী কোনও তৃণমূলস্তরের রাজনীতিক নন। তিনি কোনওদিনই কোনও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত 
ছিলেন না। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ না-থাকার ফলে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। অথচ ওঁকে টিকিট দিতে গিয়ে অর্জুন সিংকে আমাদের হারাতে হয়। লোকসভার ভোটে তাঁর পরাজয়ের পরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দীনেশ ত্রিবেদীকে রাজ্যসভায় মনোনীত করেন। ওঁর পাঁচ বছরেরও বেশি রাজ্যসভার মেয়াদ বাকি ছিল। তিনি বিজেপির থেকে কী প্রলোভন পেয়ে তৃণমূল ছাড়লেন, সেটা আমি এখনও জানতে পারিনি। 
তৃণমূলের কিছু নেতাকে ভাঙানোর জন্য বিজেপি মূলত তিনটে পন্থা অবলম্বন করেছে। এক, ভয় দেখানো। সিবিআই বা ইডির কেস দেখিয়ে। সেটা প্রাক্তন সর্বভারতীয় নেতা এবং পূর্ব মেদিনীপুরের প্রভাবশালী প্রাক্তন মন্ত্রীর ক্ষেত্রে ঘটেছে। দুই, লোভ দেখানো। ভবিষ্যতে ভালো পদ দেওয়ার লোভ। দীনেশ ত্রিবেদীর ক্ষেত্রে সেটা ঘটে থাকতে পারে। তিন, মানুষের ক্ষোভ উসকে দেওয়া। সংগঠন নিয়ে যাঁদের ক্ষোভ ছিল, তাঁদের সেই ক্ষোভ উসকে দিয়ে দলত্যাগে প্ররোচিত করা। সেই চেষ্টা এখনও চলছে। যাঁরা বিজেপিতে যাচ্ছেন, স্পষ্টতই তাঁদের কাছে আদর্শটা মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। নইলে, একটা ধর্মনিরপেক্ষ দল ছেড়ে কেউ কি একটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক দলে যেতে পারেন? 
যাঁরা যাচ্ছেন তাঁরা এটাও মনে রাখছেন না যে, বিজেপিতে নেতৃত্ব পেতে গেলে আরএসএসের আশীর্বাদ পেতে হবে। এই প্রসঙ্গে অসমের হিমন্ত বিশ্বশর্মার কথা মনে আসে। অসমের নির্বাচনে বিজেপিকে জেতাতে তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। অসমে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার কাণ্ডারী হয়েও হিমন্ত বিশ্বশর্মা কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী পদ পাননি। একইভাবে সুদীপ বর্মনকে মুখ্যমন্ত্রী না করে আরএসএসের আশীর্বাদ ধন্য বিপ্লব দেবকে ত্রিপুরায় মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে। বিজেপির এই দল ভাঙানোর খেলা চলছেই। নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ সব ভোটমুখী রাজ্যে এই নোংরা খেলাটি চালু করেছেন। 
মহারাষ্ট্রে নির্বাচনের আগে এনসিপি দলটাকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু বিজেপির এই খেলার বিরুদ্ধে মারাঠা স্ট্রংম্যান শারদ পাওয়ার সাহসের সঙ্গে রুখে দাঁড়ান। এবং মূলত তাঁরই চেষ্টায় ভারতের সবচেয়ে ধনী রাজ্যে বিজেপিকে ক্ষমতার বাইরে থাকতে হয়েছে। বিজেপি শারদ পাওয়ারের ভ্রাতুষ্পুত্র অজিত পাওয়ারকে প্রায় ভাঙিয়ে এনেছিল। কিন্তু পরিবারের চাপে শেষমেশ অজিত পাওয়ার তাঁর মূল দলে ফিরে যান। 
পশ্চিম বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বিজেপির এই নষ্ট রাজনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। বিজেপিকে নিয়ে চিন্তা না করে তিনি মানুষের 
স্বার্থে ‘দুয়ারে সরকার’ বা ‘স্বাস্থ্যসাথী’র মতো যেসব প্রকল্প নিয়েছেন, তাতে লক্ষ লক্ষ মানুষ আবার তৃণমূলের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভায় বিপুল জন সমাগম হচ্ছে। সেই তুলনায় 
লোক হচ্ছে না অমিত শাহ বা জে পি নাড্ডার সভায়। তাই যত দিন যাচ্ছে, বাংলায় বিজেপির উত্থানের সম্ভাবনা ততই কমছে। লালকৃষ্ণ আদবানির সময় বিজেপি বলত, তারা হচ্ছে ‘পার্টি উইথ আ ডিফারেন্স।’ তার মানে আদর্শনিষ্ঠ পার্টি। আদবানি-বাজপেয়ির দল দাবি করত, দেশের অনান্য রাজনৈতিক দলের মতো টাকার থলির রাজনীতি তারা করে না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে মোদি-শাহের জমানায় বিজেপি একটা মানি ব্যাগের পার্টি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দলে যাঁরা পুরনো, আরএসএস প্রচারক এবং স্বয়ংসেবক আছেন, তাঁরা নিশ্চয় অস্বস্তি বোধ করছেন। কিন্তু মোদি-শাহের ভয়ে মুখ খুলতে পারছেন না তাঁরা। তবে ভবিষ্যতে এর মূল্য বিজেপিকে চোকাতেই হবে। 
বিভিন্ন লোকের সঙ্গে কথা বলে আমার নিজের মনে হয়েছে, কিছু লোক বেরিয়ে যাওয়ার পর তৃণমূল আরও সংহত এবং শক্তিশালী হয়েছে। কর্মীদের মধ্যে একটা রুখে দাঁড়ানোর মানসিকতা লক্ষ করা যাচ্ছে। তা‌ই এই কায়দায় বিজেপি কোনওদিনই জিততে পারবে না। এমনকী, পূর্ব মেদিনীপুরের অতিশয় উচ্চকাঙ্ক্ষী প্রাক্তন মন্ত্রীটি স্বয়ং নন্দীগ্রামে দাঁড়ালে আজ হেরেই যাবেন। রাজ্যের রাজনৈতিক ঐতিহ্য মনে রেখে এই নীতিহীন দলত্যাগের রাজনীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকেও রুখে দাঁড়াতে হবে। 
দল ছেড়ে যাঁরা চলে গিয়েছেন, তাঁদের জন্য তৃণমূলের কোনও ক্ষতি হয়নি। বিজেপিরও লাভ হয়নি কোনও। বরং আদর্শহীন রাজনীতির মুখগুলো থেকে মুখোশ খুলে পড়েছে। মানুষ ছদ্ম আদর্শের নেতাদের চিনে নিচ্ছেন। দেখে নিচ্ছেন, বাংলার সংস্কৃতি, ঐহিত্য ও আদর্শ বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রকৃতপক্ষে কারা লড়াই করছেন আর কারা স্রেফ আত্ম-প্রতিষ্ঠা বা আখের গোছনোকেই জীবনের মোক্ষ মনে করছেন। স্বাধীন ভাবনাচিন্তার বিশ্বকে বহুকাল যাবৎ পথ দেখিয়েছে বাংলা। কয়েকজন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ মেটাতে যাঁরা এমন রাজ্যকে একপ্রকার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সচেতন মানুষকে রুখে দাঁড়াতেই হবে। 
তবেই অক্ষত থাকবে ‘সোনার বাংলা।’ নইলে তা হয়ে যাবে সোনার পাথরবাটি!
লেখক তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য। মতামত ব্যক্তিগত  

18th     February,   2021
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
কিংবদন্তী গৌতম
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
 
হরিপদ
 
10th     April,   2021