বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
অমৃতকথা
 

সৌন্দর্য

কবি বলিয়াছেন—“ভাবের অঞ্জন মাখি যে দিকে পালটি আঁখি, নেহারি জগৎ এই অসীম সুন্দর।” অর্থাৎ হৃদয়ে ভালবাসা থাকিলে, চক্ষু সেই রাগে রঞ্জিত হইলে সর্বত্রই সৌন্দর্য দেখিতে পাওয়া যায়, অন্বেষণ করিয়া বাহির করিতে হয় না। ভালবাসাই সৌন্দর্যকে প্রকাশ করে। যাহাকে যে ভালবাসে, তাহাকে এইজন্যই সে সুন্দর না দেখিয়া পারে না। তাই স্নেহময়ী জননীর চোখে কানা ছেলেও পদ্মপলাশলোচন বলিয়া প্রতিভাত হয়। আবার, যেখানে সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ হয়, সেখানে ভালবাসা আপনিই জাগিয়া উঠে। উভয় পক্ষই বীজাঙ্কুরবৎ পরস্পর জড়িত। রসানুভূতি যখন ভোক্তার দিক্‌ হইতে ফোটে, তখন প্রথম পক্ষ এবং যখন ভোগ্যের দিক্‌ হইতে জাগে, তখন দ্বিতীয় পক্ষ সার্থক বলিয়া বুঝা যায়। ঐ অনুভূতি কাহার কোন্‌ দিক্‌ হইতে কখন্‌ জাগে, তাহা বলা যায় না। বস্তুতঃ দুই পক্ষই সমান সত্য। অর্থাৎ প্রেম ও সৌন্দর্য উভয়ে পরস্পর ব্যঙ্গব্যঞ্জক সম্বন্ধ। কোন্‌টি পূর্বে, কোন্‌টি পরে, সে প্রশ্নের উত্তর নাই। আমরা এই দুই দিক্‌ হইতে কথাটার একটু আলোচনা করিব। সর্বদেশে ও সর্বকালেই প্রাজ্ঞগণ এই তত্ত্বটি স্বীকার করিয়াছেন। শকুন্তলার সেই—
রম্যাণি বীক্ষ্য মধুরাংশ্চ নিশম্য শব্দান্‌
পর্যুৎসুকীভবতি যৎ সুখিতোহপি জন্তুঃ।
তচ্চেতসা স্মরতি নূনমবোধপূর্বং 
ভাবাস্থিরাণি জননান্তরসৌহৃদানি।।
এই শ্লোকে কালিদাস এই তত্ত্বেরই ইঙ্গিত করিয়াছেন। রূপ, রস, গন্ধ প্রভৃতির রমণীয়তা বলিলে সৌন্দর্যই বুঝায়। কালিদাস বলেন, এই সৌন্দর্যদর্শনে চিত্তে ভালবাসার বা “সৌহৃদের” স্মৃতি জাগিয়া উঠে—যদিও সে স্মৃতি অস্পষ্ট হউক, যদিও উহা অবুদ্ধিপূর্বক হউক এবং যদিও সে ভালবাসা “ভাবস্থির” হউক, তথাপি উহা ভালবাসারই স্মৃতি বটে। কিন্তু যাহার অনুভব হয় নাই, তাহার তো স্মরণ হয় না, সুতরাং মানিতে হইবে আমরা সৌন্দর্যকেই ভালবাসিয়াছিলাম। নতুবা সৌন্দর্যদৃষ্টে ভালবাসার স্মৃতি জাগিত না। সৌন্দর্য ও সুন্দর, প্রেম ও প্রেমিক, একই। ধর্ম ও ধর্মীতে স্বরূপগত কোন ভেদ নাই। যে জ্ঞাতা সেই জ্ঞান, যে আনন্দময় সেই আনন্দ, যে চেতন সে-ই চৈতন্য—আবার বিষয়ও সে-ই।
কিন্তু তবু জ্ঞানাংশে বহুত্বের আরোপ হয়, জ্ঞাতা একই থাকে। উপাধিভেদে সৌন্দর্য অনন্ত হইলেও সুন্দর একই বটে, তেমনই উপাধিভেদে প্রেম অনন্ত হইলেও প্রেমিক একই, তাহা সত্য।
প্রেমিক যেন “আমি”, আর সুন্দর যেন “তুমি”। জগতের যত সৌন্দর্য্য সবই যখন এক সৌন্দর্য, তখন একমাত্র অদ্বিতীয় সুন্দর তুমি। সব প্রেমই যখন মূলে এক প্রেম, তখন একমাত্র অদ্বিতীয় প্রেমিক আমি। তোমার অনন্ত সৌন্দর্য, আমার অনন্ত প্রেম—প্রকারে অনন্ত, কালে অনন্ত, দেশে অনন্ত, বৈচিত্র্যে অনন্ত—ইহাতেই তোমাতেই আমাতে নিত্যলীলা। অবশ্য এ লীলার স্ফূর্তি তখন সম্ভবপর যখন তুমি ও আমি স্বরূপে সজাগ থাকি। সুতরাং লীলা অনন্ত, ধাম অনন্ত, আস্বাদন অনন্ত। এইজন্যই পূর্ণ সৌন্দর্য চিরপুরাতন হইয়াও প্রতিক্ষণে রসিকের নিকট ‘নিত্য নূতন’ রূপে প্রতিভাত হয়। ‘জনম অবধি হম রূপ নেহারনু নয়ন ন তিরপিত ভেল’—দেখিয়া দেখিবার আকাঙ্ক্ষা কখনই নিবৃত্ত হয় না। ভালবাসা ও সৌন্দর্য জলপিপাসা ও জলের সহিত উপমেয়। সৌন্দর্য ভিন্ন ভালবাসার দ্বিতীয় কোন অবলম্বন নাই। শ্রদ্ধা বা নিষ্ঠার একমাত্র বিষয় যেমন সত্য, জ্ঞানের একমাত্র বিষয় যেমন মঙ্গল বা নিঃশ্রেয়স, প্রেমের একমাত্র বিষয় তেমনই সৌন্দর্য বা প্রেয়ঃ। যদি জগতে জল বলিয়া কোন পদার্থ না থাকিত তাহা হইলে পিপাসাও থাকিত না, কারণ জল ও পিপাসা পরস্পর সাপেক্ষ। সেই জন্যই পিপাসার সত্তাই জলের সত্তা প্রমাণিত করে। বস্তুতঃ পিপাসা জলের অভাব সূচনা করে অথবা সত্তা সূচনা করে, তাহা আলোচনার বিষয়। পিপাসা বিরহ,—উহা এক দিকে যেমন মিলনের অস্পষ্ট স্মৃতির উদ্দীপক, অপর দিকে তেমনি মিলনের সংঘটক।
গোপীনাথ কবিরাজের ‘সাহিত্য চিন্তা’ থেকে 

10th     November,   2022
 
 
কলকাতা
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ