বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
কলকাতা
 

বাগবাজারের প্রতিমা নিরঞ্জন 

বাঙালির মুঠোয় ফেরার পথ খুঁজছে
আমহার্স্ট স্ট্রিটের ‘গরম শোনপাপড়ি’
ফিকে হচ্ছে শতবর্ষের ঐতিহ্য

কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: হাফ প্যান্ট, মলিন হলুদ গেঞ্জি। পাশে ময়লা ফ্রক পরা বোন। দু’জনে চেয়েচিন্তে ৪ টাকা কোনওরকমে জোগাড় করেছে। কয়েনগুলো মুঠোয় ভরে নিয়ে এসেছে। কাউন্টারে দাঁড়িয়ে এক মধ্যবয়স্ক ব্যাক্তি। বললেন, ‘৬ টাকা পিস। আরও দু’টাকা নিয়ে আয়।’ গেঞ্জিটার মতোই মলিন হল বছর সাতেকের ছেলেটির মুখ। বোনের মুখ আরও অন্ধকার। সেই অন্ধকারে মন কেমন করল কাউন্টারনিবাসীরও। বললেন, ‘দে দেখি পয়সাটা।’ বলতে বলতেই এক ঠোঙা ঝুরোঝুরো শোনপাপড়ি ধরিয়ে দিলেন হাতে। এই এক ঠোঙা দু’জনে খেয়ে শেষ করতে পারবে কি না, সে নিয়ে ঘোর সন্দেহ রয়েছে, পরিমাণ তার এতটাই।
আঁজলা ভরে জল তোলার মতো ভঙ্গিতে হাত চলছে। অনবরত। ফুলের রেণুর মতো ভাঙছে, আবার গড়ছে। তৈরি হচ্ছে হাল্কা হলুদ রোঁয়া। জড়ো হচ্ছে কিছু হলদে কাশফুল। আলতো হাতে সেই ফুল থাকে থাকে সাজিয়ে তৈরি হচ্ছে শোনপাপড়ির চারচৌকো ব্লক। টাটকা, গরম... শোনপাপড়ির আদি অকৃত্রিম ঠিকানা। কলকাতায় এসে বানাতে শুরু করেছিলেন হাওড়ার কারিগররা। আমহার্স্ট স্ট্রিটের সেই দোকানে... এক দুপুরবেলা।
সিটি কলেজের গা লাগোয়া পাশের গলিটাই বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিট। দোকানের নাম নিউ শোনপাপড়ি শপ। নামে নিউ হলে কী হবে, দোকানটার বয়স ১০৩ বছর। আমহার্স্ট স্ট্রিট থানার উল্টোদিকের গলি দিয়ে ঢুকে দু’পা এগলে বাঁ হাতে কালচে সবুজ রঙের দোকান। ঠিক যেন ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট সিনেমায় খুঁজে পাওয়া। ঝাঁ চকচকে ফ্ল্যাটবাড়ির পাশে ছোট্ট টালিচালার ঘর। সামনে লোহার ঘেরাটোপ। অন্দরমহল বলতে, প্রশস্ত একটি ঘর। সেটাই শোনপাপড়ির কারখানা। সে ঘরে কাঠের মস্ত বারকোশ। সেঞ্চুরি হাঁকানো পোক্ত সিন্দুক। মিষ্টি বানানোর পেল্লাই পাটাতন। একটা ছোট্ট টেবিল ফ্যান ছাড়া গোটা কারখানায় কোনও যন্ত্র নেই। শোনপাপড়ি তৈরির গোটা প্রক্রিয়াটা হাতে। একশো বছরের কায়দা। এখনও বহাল। ‘এ জন্যই এই টেস্ট। থাইল্যান্ড, নেপাল, দিল্লি, গুজরাত থেকে এসে নিয়ে যায়। বানানোতে কোনও ফাঁক পাবেন না, বুঝলেন।’—জামার কলার একবার ঝাঁকিয়ে সগর্ব মন্তব্য ম্যানেজার তপন ঘোষের। সেই কোন কালে এক আত্মীয়ের হাত ধরে তিনি শোনপাপড়ি বানাতে ঢুকেছিলেন। অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে এখনও জড়িয়ে মিষ্টি-মায়ায়।
প্রথমে চিনির পাক। আলাদা করে বেসন, ডালডা, ময়দাও পাক দেওয়া হয়। আগুন গরম সেই আঠা আঠা দু’ধরনের লেই খালি হাতে ঘাঁটতে হয়। এটাই মূল পর্ব। হাত দিয়ে অনবরত নাড়াতে নাড়াতে তৈরি হতে থাকে রোঁয়া রোঁয়া পাপড়ি। তারপর একটু ঠান্ডা হতে সেটি থাকে থাকে সাজানো হয় বারকোশে। একটু জমাট বাঁধল। তারপর কেটে পিস পিস করার কাজ। একেকটা পিস ছ’টাকা। ২৮০ টাকায় এক কিলো। ঘর্মাক্ত আদুর গা। হাত সমানে চলছে। একবার একটু থামলেই চিনি জমাট বেঁধে যাবে। খোলতাই হবে না পাপড়ি। স্বাদেও ঘাটতি দেখা দেবে। মুখ ফিরিয়ে নেবে খদ্দের। বাইরে রোদ্দুর আগুন ঢেলে চলেছে। দোকানের ভিতর তাপমাত্রা কম করে আরও দু’ডিগ্রি বেশি। পাখা বন্ধ রেখে উত্তপ্ত চিনি-বেসন-ঘিয়ের পাক ঘেঁটেই চলেছেন জনা পাঁচ কারিগর। হাত পুড়ছে। পুড়ুক। শোনপাপড়ির পাক ঠান্ডা হতে দেওয়া যাবে না। ১০০ বছরের এই প্রাচীন নির্মাণশৈলী খাঁটি শোনপাপড়ি উপহার দেয় মানুষকে। সেই ঐতিহ্য যেন নষ্ট না হয়, হাত জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাক... পরোয়া নেই।
এই কারখানায় এক সময় দিনে ২০০ কেজি চিনির শোনপাপড়ি হতো। পিস—আড়াই হাজার। তখন ২২জন কর্মচারী কাজ করতেন। লকডাউনের পর থেকে ব্যবসায় ভাটা। এখন কর্মী চার। ম্যানেজার ছাড়া রয়েছেন রাজা ঘোষ, গৌতম পাল ও সনৎ পাল। নিউ শোনপাপড়ি শপের মালিক স্বপন ঘোষ। তাঁর মামা পান্নালাল পাল আমতা থেকে এসে বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিটে ঘর ভাড়া নিয়ে শুরু করেছিলেন শোনপাপড়ি বানানোর ব্যবসা। গমগম করতে থাকা সেই দোকান এখন ধুঁকছে। কতদিন চালানো যাবে তা নিয়ে সংশয়ে কর্মচারীরাই। এখন মাত্র দু’জন ফেরিওয়ালা রয়েছেন। তাঁরা টিনের বাক্স নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বিক্রি করেন। লকডাউনের পর দোকানে খদ্দেরদের আনাগোনাও কমেছে। বিদেশে যাচ্ছে না। ফিকে হচ্ছে ঐতিহ্য। দ্রুত। দুপুরে বসা ভিয়েন... বেলা তিনটের পর গেলে গরম গরম শোনপাপড়ির স্বাদ... মুখে দিলে গলে যাবে... আর কতদিন? 

20th     August,   2022
 
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ