বর্তমান পত্রিকা : Bartaman Patrika | West Bengal's frontliner Newspaper | Latest Bengali News, এই মুহূর্তে বাংলা খবর
কলকাতা
 

তুলসী চক্রবর্তীর সেই ভিটে
ধুঁকছে বিস্মৃতির অভিমানে

কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: খ্যানখ্যানে বুড়ির মুখের মতো মরচে ধরা তালা। ততোধিক মরচে দরজার কড়ায়। দরজার নীচে ঘাস গজিয়েছে। তার মধ্যে ছোট্ট, খয়াটে একটা নুড়ি। পরশপাথর নয় তো?
এ বাড়ি তুলসী চক্রবর্তীর। জোরে ধাক্কা দিলে ঝুরঝুরে দরজাটা ভেঙে পড়বে নির্ঘাৎ। ভেঙে ঢুকে পরশপাথরটা বাড়ির মালিককে ফেরত দেওয়া গেলে বেশ হতো। ঘড়ির কাঁটাটা বনবনিয়ে পিছনে ঘুরিয়ে যদি বছর ষাটেক আগেও নিয়ে যাওয়া যায়, নিশ্চয়ই দেখা মিলবে বৈঠকখানার আরামকেদারায় হেলান দিয়ে থাকা চেহারাটাকে। ধুতি, হাতাওয়ালা গেঞ্জি। হয়তো চা খাচ্ছেন। নাকি হুঁকোটা হাতে ধরা? পাথর হাতে নেবেন তিনি। চোখ দু’টি বড় থেকে বিস্ফারিত। হজম হয়ে যাওয়া নুড়ি ফিরে এল? পাথর পাওয়ার দ্বিতীয় পর্যায়ে আনন্দে আটখানা বাংলা সিনেমার কিংবদন্তি শিল্পী।
আচমকা তক্ষকের ডাকে চটকা ভাঙলে অবশ্য বোঝা যাবে, ঘড়ির কাঁটা রিওয়াইন্ড মোডে নেই। দুপুরের রোদে খ্যানখ্যানে তালা ঈষৎ গরম। ছ্যাঁকাও দিয়েছে একবার। এই তালা দিয়ে বন্ধ দরজার ওদিকে দু’তলা বাড়িটা জুড়ে জঙ্গল। তক্ষক ছাড়া আর কোন কোন প্রাণী এই ঘরে রয়েছে, কে জানে? ঢুকলে হয়ত বাদুর, সাপ, ব্যাঙ, কাঁকড়াবিছে দু’-চারখান নির্ঘাৎ মিলবে। সংক্ষেপে এই হল প্রবাদপ্রতিম শিল্পী তুলসী চক্রবর্তীর বসত ভিটার বর্তমান অবস্থা। ১৯৬১ সালের ১১ ডিসেম্বর তুলসীবাবু মারা যান। তারপর তাঁর স্ত্রী ঊষারানি বাড়িটাতে বছর পঁয়ত্রিশ কাটিয়েছেন। সবাই জানেন, শেষ জীবন তাঁর কেটেছে খুবই কষ্টে। লোকের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে চেয়েচিন্তে সংসার চালাতে হয়েছিল ঊষারানিকে। শেষদিন গলদা চিংড়ি, ফুলকপি আর কড়াইশুঁটি কিনে এনেছিলেন তুলসীবাবু। এই বাড়িতে স্বামীর জন্য ঊষারানির সেই শেষ রান্না। খেয়েদেয়ে শুয়েছিলেন তুলসীবাবু। ভোরে ভেদবমি। ডাক্তার আসার আগেই সব শেষ। 
তার ক’দিন আগে থেকেই অবশ্য ভুগছিলেন খুব। ভালোমতন চিকিৎসা করানোর পয়সাও ছিল না। সুস্থ হতেন। শ্যুটিংয়ে যেতেন। অসুস্থ থাকলে বিশ্রাম নিতেন বাড়িতে। প্রায় বিনা চিকিৎসায় কেটেছিল শেষের ক’দিন। বাড়িটা এলাকার কয়েকজন ব্রাহ্মণকে দিয়ে গিয়েছিলেন। এখন সেই অর্থে মালিকানা কারওরই নেই। স্থানীয় এক বাসিন্দা বললেন, ‘দেবত্র সম্পত্তি। এখন কেউ থাকে না।’
চিরকাল ট্রামে-বাসে যাতায়াত করে স্টুডিও পৌঁছতেন। নির্লোভ, চাহিদাহীন, আদ্যন্ত সৎ, অনিশ্চয়তায় গ্রাস হয়ে থাকা একজন বড় মনের মানুষ। বাংলা সিনেমার পরশপাথর ছিলেন তুলসীবাবু নিজেই। সিনেমাগুলোকে ছুঁয়েছেন, আর সেগুলি সোনা হয়েছে। ছ’ঘর এক উঠোন ছেড়ে হাওড়ায় ২নং কৈলাস বসু থার্ড লেন-এর বাড়িটি কেনেন। ছ’হাজার টাকা দাম ছিল মধ্য হাওড়ার এই সংকীর্ণ গলির দু’কামরার দোতলা বাড়িটির। প্রবোধচন্দ্র চক্রবর্তী নামে একজন বললেন, ‘ঘরে ছিল একটি পুরনো পালঙ্ক, একটি কাঠের আলমারি, গোটা কয়েক টুল আর একটা ইজিচেয়ার। রান্নাঘরে ঢুকিনি কোনওদিন। বাড়ি গেলে জেঠিমা হালুয়া খেতে দিত।’ হাওড়া স্টেশনের খুবই কাছে মল্লিক ফটক। সেখানে খুরুট বললে যে কেউ দেখিয়ে দেবে। কৈলাশ বসু থার্ড লেন লিকলিকে একটা গলি। বাঁ হাতে শেষ বাড়ি ২ নম্বরের দরজা। 
শোনা যায়, সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, ‘তুলসীবাবু না থাকলে পরশপাথর সিনেমা করার কথা ভাবতাম না। উনি বিদেশে জন্মালে অস্কার পেতেন।’ শংকর বইতে লিখেছেন,‘যদি তুলসী চক্রবর্তী, রবি ঘোষ, নৃপতি চ্যাটার্জির মতো অভিনেতা বিদেশে জন্মাতেন, তা হলে তাঁদের স্মরণে এক-একটি সরণি থাকত।’ মার্কিন অভিনেতা অ্যান্ড্রু রবিনসন বলেছিলেন, ‘চক্রবর্তী চ্যাপলিনের শ্রেষ্ঠ সময়ের কথা মনে করিয়ে দেন। গোঁফ ছাড়া চ্যাপলিন, আর বড় চোখ... যা অনুভূতির সঙ্গে সঙ্গে কথা বলে ওঠে’।
এই শিল্পীই আজ বিস্মৃতপ্রায়। জীর্ণ বাড়িটিও বইতে পারছে না অভিমানের জ্বালা। যেন ভেঙে পড়লেই হয়! কখনও দাবি উঠেছে, তুলসী চক্রবর্তীর নামে রাস্তা হোক। বাড়িকে সংগ্রহশালা হিসেবে গড়ে তোলা হোক। সময় গড়িয়ে যায়। সেই সব দাবি হারিয়ে যায় গঙ্গাবক্ষে। চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে সাড়ে চুয়াত্তরে কখনও আমরা থমকে যাই। অতটুকুই। বাস্তব জগতে এসে বড্ড অচেনা হয়ে পড়েন তুলসীবাবু, ঊষারানি। এখন প্যাকেজের যুগ, পরশপাথরের নয়। নিজেই কখনও নিজের কদর করেননি। ইন্ডাস্ট্রি কদর করেছে, কিন্তু উপযুক্ত মূল্য চোকায়নি। আসলে পরশপাথররা নিজের দাম বোঝে না। যাঁরা কুড়িয়ে পায়, ভাগ্য ফিরে যায় তাদের।

15th     August,   2022
 
 
রাজ্য
 
দেশ
 
বিদেশ
 
খেলা
 
বিনোদন
 
আজকের দিনে
 
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
এখনকার দর
দিন পঞ্জিকা
 
শরীর ও স্বাস্থ্য
 
বিশেষ নিবন্ধ
 
সিনেমা
 
প্রচ্ছদ নিবন্ধ