চারুপমা

চিনে নিন পচমপল্লি 

দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় শাড়ি পচমপল্লি। এই শাড়ি বোনার কায়দা, রঙের ব্যবহার ও নকশার নতুনত্ব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন কমলিনী চক্রবর্তী।

সুতো বুনে কাপড় তৈরি করে তা রঙে চুবিয়ে তৈরি হয় নানা নকশা। কিন্তু আজ       এমনই এক শাড়ি বোনা ও নকশা তোলার কথা বলব যা বানানোর পদ্ধতিই ভিন্ন। এহেন নকশার নাম পচমপল্লি। ১৯৫০ সাল নাগাদ তেলেঙ্গানার প্রত্যন্ত মফস্‌সল শহর বুধন পচমপল্লির ঘরোয়া মহিলারা রেশম বা সুতির সুতো উজ্জ্বল রঙে রাঙিয়ে তুলতে লাগলেন। তারপর এই রঙিন সুতো এমনভাবে হাতে বোনা হতো যাতে বরফি কাটা নকশা আসত গোটা শাড়িতে।
 
রং বৈচিত্র্য  
লাল, বেগুনি, নীল, কমলা, সবুজের মতো উজ্জ্বল রংগুলো ফুল, পাতা এমনকী সব্জির নির্যাস থেকেও তৈরি করতেন গ্রামের মেয়ে বউরা। তারপর সুতোর গোছায় বিভিন্ন জায়গায় গিঁট বেঁধে সেগুলোর এক এক জায়গা আলাদা রঙে চুবিয়ে একটা প্যাটার্ন তৈরি হতো। এই রংগুলো সরাসরি সুতোয় করা হতো বলেই তারা একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে যেত প্রথম থেকেই। এই মিলমিশই ক্রমশ পচমপল্লি শাড়ির বিশেষত্ব হয়ে উঠল। এর আগে দক্ষিণী শাড়িতে জরির আধিক্য ছিল। সোনালি সুতো, জরির মাঠা পাড়, ফুল তোলা বুটি বা টেম্পেল ছেড়ে একেবারেই ভিন্ন প্যাটার্নে তৈরি হল পচমপল্লি শাড়ি। এই ধরনের বরফি বা ডায়মন্ড প্যাটার্নে ধারগুলো যে একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত সেটাই নকশার প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়াল। বুধন পচমপল্লি গ্রাম থেকে উঠে এসেছিল বলে নতুন এই নকশার নাম দেওয়া হল পচমপল্লি।

ধার মেলানো নকশা 
একেবারেই ভিন্ন প্যাটার্ন বলেই পচমপল্লি শাড়ির জনপ্রিয়তা এসেছিল সহজেই। পচমপল্লি শাড়ির আসল রহস্য লুকিয়ে রয়েছে বরফির ধার মেলানো ডিজাইনে। তেলেঙ্গানার গ্রাম্য মহিলাদের হাতে বোনা কাজ ক্রমশ ভারতের অন্যত্রও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। উজ্জ্বল সুতোর নকশায় সিল্ক ও সুতি দুই ধরনের বুননেই তৈরি হতে শুরু করে এই শাড়ি। আমেদাবাদের বুটিক গো লুম-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং ডিজাইনার টিনা মিত্র বলেন, ‘উজ্জ্বল রং, আরাম এবং নকশার আভিজাত্যই এই শাড়িকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তুলেছিল। দক্ষিণ ভারতের গর্জিয়াস জরির কাজ আর মোটা সিল্কের শাড়ির বদলে এমন ভিন্ন ধাঁচই এই শাড়ির বিশেষত্ব হয়ে ওঠে।’ আর একটা বিশেষত্বের কথাও তিনি উল্লেখ করেন, তা হল এর হাতে বোনা উইভ। ‘মেশিনে এই ধরনের সূক্ষ্ম কাজ তোলা যায় না’, বললেন টিনা। তাঁর কথায়, ‘পচমপল্লি শাড়ির নকশার আসল কথাই হল বরফির ধারগুলো সূক্ষ্ম টানে বুনতে হবে যাতে তা প্রকট না হয়ে ওঠে। এতে একটা রং অন্য রঙের সঙ্গে ব্লেন্ড করে যায় বা মোলায়েমভাবে মিশে যায়। আর কাপড়টা দেখলে মনে হয় যেন অনেক রঙের তরঙ্গ খেলে গিয়েছে তার মধ্যে।’ মেশিনে এমন তরঙ্গ খেলানো যায় না। বরং বোনার ধরনটা একেবারেই যান্ত্রিক  হয়ে যায়। তাতে পচমপল্লি নকশার ষোলোআনাই মাঠে মারা যায়। সেই কারণেই এই শাড়িগুলো বুনতে প্রচুর সময় লাগে। তবে এখন এক ধরনের মেশিন আনা হয়েছে যার মধ্যে দিয়ে সুতোগুলো প্রাথমিকভাবে চালানো হয়। তাতে সুতোগুলো একটা সিস্টেমে তাঁতে ঢোকে। আগে এই কাজটাও পুরোপুুরি হাতেই করা হতো। তবে তার জন্য শিল্পীর কাঁধের উপর অসম্ভব চাপ পড়ত। সেটা এড়ানোর জন্যই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেন জানালেন টিনা। শাড়িতে নকশা তোলার কাজটা অবশ্য এখনও হাতেই করা হয়। 

উজ্জ্বল রঙে বোনা
শাড়ির রঙের কথা বলতে গিয়ে টিনা বলেন রেশম সুতো দিয়ে যে পচমপল্লি শাড়িগুলো বোনা হয়, সেগুলো সবই খুব গাঢ় এবং  উজ্জ্বল রঙে ডাই করা হয়। এর একটা কারণ হয়তো এই যে, উজ্জ্বল রঙের উপর রেশম সুতোর জেল্লা সবচেয়ে বেশি খোলে। তবে এখন আধুনিক নকশায় নানারকম পরীক্ষানিরীক্ষা চালানো হচ্ছে এই শাড়িগুলোর উপর। বিশেষত রঙের ক্ষেত্রে অনেক এক্সপেরিমেন্ট করা হচ্ছে। হালকা রং নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। যেমন স্লেট রঙের সঙ্গে সাদা মেশানো হচ্ছে, তসর বা হালকা বিস্কুট রং ব্যবহার করা হচ্ছে। গোলাপির সঙ্গে কখনও সাদা কখনও বা ঘিয়ে রং মিশিয়ে তাতে একটা পেঁয়াজি বা দুধেআলতা ধাঁচ তৈরি করা হচ্ছে। তবে আপাতত এই ধরনের পরীক্ষা মূলত সুতির সুতোর উপরেই করা হচ্ছে। সুতির শাড়িতে হালকা রংগুলো কেমন খোলে তা দেখে তবেই সেটাকে রেশম সুতোয় বোনা হয়। ‘পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গিয়েছে যে স্লেট বা তসর রঙের জেল্লা রেশম সুতোতেও খুব সুন্দরভাবেই ফোটানো যায়’, জানালেন আর এক ডিজাইনার অদিতি বর্মা। তিনি আরও বলেন, নকশা যতই প্রচলিত হয়, তার চাহিদা যত বাড়ে ততই নতুনত্বের খোঁজও শুরু হয় স্বাভাবিকভাবেই। সেক্ষেত্রে আবার বরফি প্যাটার্নের মধ্যেই কোনাকাটা ফুল তোলা হয়েছে। কখনও বা পাড়ে মন্দিরের চূড়ার আকার দেওয়া হয়েছে ওই ডায়মন্ড বা বরফি প্যাটার্নের সাহায্যেই। 

জনপ্রিয়তা বেড়েছে ক্রমশ
অদিতি জানালেন, একটা নকশা যখন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তখন তা তার পারিপার্শ্বিক এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু হুবহু একইরকম বুনন সেক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। বরং বিভিন্ন অঞ্চলের বুনন শিল্পকে নিজের মধ্যে একাত্ম করে সামান্য তারতম্য ঘটে নকশায়। এমটাই হয়েছিল পচমপল্লির ক্ষেত্রে। তা তেলেঙ্গানার গ্রাম থেকে যখন গুজরাতের পাটন গ্রামে এসে পৌঁছল তখন সেখানে রঙের ব্যবহার ও নকশার বুননে সামান্য বদল ঘটল। নতুন এই নকশার নাম হল পাটন পাটোলা। আবার এই নকশাই যখন গুজরাত ছেড়ে ওড়িশার সম্বলপুরে পৌঁছল তখন আবার তার বোনার কায়দা বদলে গেল। তৈরি হল আরও নতুন ধরন। আর সেই নকশার নাম হল সম্বলপুরি ইক্কত। এই সব নকশাগুলোই যদি খুব খুঁটিয়ে লক্ষ করা যায় তাহলে দেখবেন এগুলো বোনার কায়দা থেকে প্যাটার্ন— সবেতেই বেশ কিছু মিল রয়েছে। 

নকশার নতুনত্ব
এখন চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নকশায় নতুনত্ব দেখা দিচ্ছে, জানালেন অদিতি। তিনি বললেন, পচমপল্লি নকশার ক্ষেত্রে রঙের এক্সপেরিমেন্টের বিভিন্ন স্তর রয়েছে। তাঁর কথায়, ‘নকশা, সে যত জনপ্রিয়ই হোক না কেন, যদি একঘেয়ে হয়ে যায় তাহলে তার চাহিদা থাকে না। একটা সময় পচমপল্লির জনপ্রিয়তা ধাক্কা খেয়েছিল এই নকশার একঘেয়েমির কারণেই। একই বরফি প্যাটার্নের উপর নানা রঙের তরঙ্গ দেখতে দেখতে চোখ সয়ে গেল সকলের। তখন তাঁরা নকশার নতুনত্ব খুঁজতে শুরু করলেন। সেই চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিতেই ফুল, পাতার ডিজাইন তৈরি হল পচমপল্লির মূল বুননকে অক্ষত রেখে। তারপর তাতে আরও নতুনত্ব আনতে আবার পেজলি বা কলকার ছোঁয়াও বোনা হল এই শাড়িতে। ক্রমশ জিওমেট্রিক শেপগুলো (বরফি, ডায়মন্ড) একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে ফুল, পাতা ইত্যাদিতে রূপান্তরিত হল। তৈরি হল পচমপল্লির নতুন ধরন।’
গ্রাফিক্স: সোমনাথ পাল
6Months ago
কলকাতা
রাজ্য
দেশ
বিদেশ
খেলা
বিনোদন
ব্ল্যাকবোর্ড
শরীর ও স্বাস্থ্য
বিশেষ নিবন্ধ
সিনেমা
প্রচ্ছদ নিবন্ধ
আজকের দিনে
রাশিফল ও প্রতিকার
ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
mesh

গৃহ পরিবেশে হঠাৎ আসা চাপ থেকে মানসিক অস্থিরতা। ব্যবসা ভালো চলবে। অনুকূল আয় ভাগ্য।...

বিশদ...

এখনকার দর
ক্রয়মূল্যবিক্রয়মূল্য
ডলার ৮২.৭৬ টাকা৮৪.৫০ টাকা
পাউন্ড১০৭.০০ টাকা ১১০.৫২ টাকা
ইউরো৮৯.৮৮ টাকা৯৩.০৪ টাকা
[ স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া থেকে পাওয়া দর ]
*১০ লক্ষ টাকা কম লেনদেনের ক্ষেত্রে
দিন পঞ্জিকা