একটা সত্য ঘটনা, আর তা থেকে জন্ম নিল একটা নাটক। নাটক তো জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা নানা ঘটনার মঞ্চরূপ। কিন্তু কিছু কিছু ঘটনা এমন হয় যা মানুষকে নাড়িয়ে দিয়ে যায় ভিতর থেকে। তেমনই একটি ঘটনা ঘটেছিল এই পোড়া দেশে। কিছুদিন আগে এক বিদেশি দম্পতি এদেশে এসে গর্ভ ভাড়া নেয়। যথাসময়ে শিশুর জন্ম দেয় সারোগেট মা। কিন্তু ওই বিদেশি দম্পতি শিশুর দায়িত্ব না নিয়ে পালিয়ে যায়। তখন শিশুটির কী হল? এই ঘটনাটি নাট্যকার-অভিনেত্রী-পরিচালক তাপসী রায়চৌধুরিকে নাড়া দেয়। তিনি লেখেন নাটক ‘গর্ভকেশর’। সম্প্রতি যেটি মঞ্চস্থ হল তপন থিয়েটারে।
গর্ভ ভাড়া নেওয়ার এই বিষয়টি, যাকে বলা হয় ‘সারোগেসি’ সেটি বেশ জটিল ব্যাপার। যেসব মহিলারা গর্ভে সন্তান ধারণ করতে অপারগ তাঁরা অন্য মহিলার গর্ভ ধার নিয়ে সন্তান লাভ করতে পারেন। সংক্ষেপে এটাই সারোগেসি।
একটা সময়ে এদেশের ফার্টিলিটি সেন্টারগুলোর চিকিৎসা পদ্ধতি এবং তুলনামূলক কম খরচের সুবিধা নিয়ে বিদেশের বহু সন্তানহীন দম্পতি সন্তানলাভ করেছে। ২০০২ সাল থেকে এদেশে কমার্শিয়াল সারোগেসি চালু হয়। অর্থাৎ অর্থের বিনিময়ে গর্ভদান। কিন্তু সম্প্রতি এদেশের সর্বোচ্চ আদালত এই আইনে বদল ঘটিয়েছে। নতুন আইনে বলা হয়েছে, পরিবারের কোনও নিকট আত্মীয় গর্ভদান করতে পারবেন। এর সঙ্গে অর্থের কোনও যোগ থাকবে না। একই সঙ্গে কমার্শিয়াল সারোগেসি বন্ধের নির্দেশ জারি হয়েছে। এছাড়াও এদেশের সারোগেসি আইনে আরও নানা বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। যেমন, গর্ভদানকারী মা সারোগেট শিশুর দাবিদার নন। সন্তানলাভে ইচ্ছুক দম্পতি শিশুটির আইনত বাবা মা। গর্ভদানকারী মা শিশুর দাবি করলে ইচ্ছুক দম্পতি আইনি ব্যবস্থা নিতে পারবেন। আবার শিশু জন্মের পর ইচ্ছুক দম্পতি যদি শিশুটির দায়িত্ব নিতে গররাজি হয়, তখন গর্ভদানকারী মা আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন। এই ধরনের বহু আইন জড়িত রয়েছে এদেশের সারোগেসি সিস্টেমের সঙ্গে। এইসব নিয়ম এবং তার মাঝে ক্ষতবিক্ষত হতে থাকা মাতৃত্ব নিয়েই রচিত ‘গর্ভকেশর’।
নাটকে এক গর্ভদানকারী মা আছে। আছে এক সারোগেট সন্তান। যাকে তার আইনত রক্তের সম্পর্কের বাবা মা ফেলে চলে যায়। সেই সন্তান ও তার দুই মা, একজন জন্মদাত্রী এবং অপরজন আইনত। এদের কেন্দ্র করে নাটক আবর্তিত।
নাটকের শুরুতে জয়িতা মনীশের একমাত্র সন্তান বছর পঁচিশের ইমনের মৃত্যু হয়। কোন কারণে ইমনের মৃত্যু হল তা অবশ্য নাটকে পরিষ্কার নয়। জয়িতা আর মনীশের বিলাপে জানা যায়, আঠাশ বছর আগে তাদেরই করা কোনও গর্হিত অপরাধের সাজা ইমনের মৃত্যু। কী সেই অপরাধ? নাটক চলে যায় ফ্ল্যাশ ব্যাকে।
মুম্বইবাসী জয়িতা সন্তান ধারণে অক্ষম ছিল। সে ও তার স্বামী মনীশ সারোগেসির সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। জয়িতার বন্ধু লাবণ্য সারোগেট মা হতে রাজি হয়। অর্থাৎ জয়িতা-মনীশের সন্তানকে শুধুমাত্র গর্ভে ধারণ করবে লাবণ্য। এমন মহান কাজে লাবণ্যকে উৎসাহই দিয়েছিল তার স্বামী হীরক। যদিও লাবণ্য তার শ্বশুরবাড়িতে বিষয়টি জানায়নি। শুভদীপ ও জয়দীপ এই দুই সন্তানের জননী লাবণ্য তৃতীয়বার গর্ভবতী হল জয়িতার সন্তানকে জন্ম দেওয়ার জন্য। যথা সময় শিশু জন্মাল। কিন্তু বিপত্তির সূত্রপাত তারপরই। শিশুটির ডানহাত বিকল। ফলে বিকলাঙ্গ শিশুর দায়িত্ব এড়িয়ে পালিয়ে গেল জয়িতা-মনীশ। তখন থেকে শিশুটির স্থান হল লাবণ্যর বাড়িতে। পরম যত্নে মাতৃস্নেহে লাবণ্য তাকে বড় করল। পরিবারের বাকি সদস্যদের কাছেও ছেলেটি পরম আদরের। শুধু হীরক যেন একটু হলেও তফাতে থাকে। যদিও বাবার সব কর্তব্যই সে পালন করেছে। সেই শিশু আজ আটাশ বছরের তরতাজা প্রাঞ্জল। অত্যন্ত মেধাবী। চার্টার্ড অ্যাকাউনটেন্ট। মায়ের সবচেয়ে আদরের ছোট ছেলে সে। লাবণ্যর ভরা সংসারে হঠাৎ দুর্যোগের মেঘ ঘনায়। হীরক জানায়—প্রাঞ্জল তাদের সন্তান নয় এবং আইনত সে হীরকের সম্পত্তির অংশীদারও নয়। ব্যস, পরিবারে ঝড় ওঠে। আঠাশ বছরের পুরানো সত্য প্রকাশ পেতেই পরিবারের ভিত নড়ে যায়। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় লাবণ্য ও প্রাঞ্জল। চাপা থাকা সত্য জেনে প্রাঞ্জল মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দাদারা কেউ তাকে নিরস্ত করতে পারে না। যদিও দাদু ও বোন প্রাঞ্জলকেই সমর্থন করে। অন্যদিকে হীরক ও লাবণ্যর মাঝে অশান্তির কালো মেঘ জমা হয়। হীরক আইনি জটিলতার কথা বলে। কিন্তু মায়ের মন এসব মানতে নারাজ। লাবণ্য তার মাতৃস্নেহকে অস্বীকার করবে কী করে! শুধু গর্ভধারিণী মা বলেই কি জন্ম দেওয়া শিশুটির ওপর মায়ের সত্যিই কোনও টান থাকতে নেই? রক্ত সম্পর্কের মা’র চেয়ে সে কি সত্যিই কম? এরকম বহু প্রশ্ন লাবণ্যের মানসিক স্থিতাবস্থাকে টলিয়ে দেয়। অন্যদিকে প্রাঞ্জলও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। ঠিক এই সময় পরিবারটিতে আরও ঝড় আসে। আঠাশ বছর পর জয়িতা এসে হাজির হয় সন্তানের দাবি নিয়ে। শুরু হয় নতুন জটিলতা। আইনত জয়িতা ও মনীশ প্রাঞ্জলের দাবিদার। কারণ তারা প্রাঞ্জলের রক্তের সম্পর্কের বাবা-মা। জয়িতা ছেলে ফেরত চায়। লাবণ্য দিতে নারাজ। দুই মায়ের টানাপোড়েন নাটকে সুন্দরভাবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক প্রাঞ্জল আজ দুই মায়ের দাবিই অস্বীকার করে। এক মায়ের স্নেহের দাবি। অন্য মায়ের আইনি অধিকারের দাবি। এক সন্তানকে হারিয়ে আরেক সন্তানকে স্বার্থপরের মতো আঁকড়ে ধরতে চায় জয়িতা। মঞ্চে সন্তান হারা জয়িতার আকুতি বেশ খানিকটা আরোপিত মনে হয়। তুলনায় লাবণ্যর চরিত্রটি অনেক মানবিক। এই টালমাটাল অবস্থায় হীরকসহ গোটা পরিবার শুধু ভালোবাসার টানেই প্রাঞ্জলকে পরিবারের একজন বলে মেনে নেয়। কিন্তু এর পরেও প্রাঞ্জল দুটি পরিবারকেই ছেড়ে চলে যায়। এটাই প্রাঞ্জলের প্রতিবাদ। শুধু দুটো পরিবারের বিরুদ্ধে নয়, গোটা সমাজের বিরুদ্ধে।
নাটকটিতে সারোগেসির মতো জটিল বিষয়কে অত্যন্ত মানবিকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। নাটকে আইনি কচকচানি নেই। কিন্তু সারোগেসি সংক্রান্ত নিয়মনীতিগুলো পরিস্কারভাবে বলা হয়েছে। সহজ সরল সংলাপ মন ছুঁয়ে যায়। নাটকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি লাবণ্য ও প্রাঞ্জল চরিত্রে তাপসী রায়চৌধুরি ও সুপ্রভাত ঘোষের অভিনয়।
এছাড়া হীরক চরিত্রে রজত গঙ্গোপাধ্যায় এবং দাদু মণিশঙ্করের চরিত্রে সত্যপ্রিয় সরকারের অভিনয় অত্যন্ত সাবলীল। বাকিরা যথাযথ। তবে জয়িতার ভূমিকায় মৌসুমী সেনের অভিনয় হৃদয় স্পর্শ করে না। তাপসী রায়চৌধুরির মঞ্চ ভাবনা কাহিনি অনুসারে যথাযথ। সুদীপ সান্যালের আলোক পরিকল্পনা ভালো। আড়াই ঘণ্টার নাটকটি আমাদের চেতনাকে নাড়া দেয়। নাটকের সামগ্রিক পরিকল্পনা ত্রিদিব ঘোষের।

‘প্রাণ’ রক্ষার নতুন লড়াই

সম্প্রতি গিরিশ মঞ্চে অভিনীত হল ‘থিয়েটার কমিউন’ প্রযোজিত নাটক ‘নোলক রহস্য’। অমিত মৈত্র রচিত এই নাটকের নামকরণের মধ্যেই বিষয়বস্তুর স্পষ্ট ইঙ্গিত আছে। নাট্যকাহিনি রহস্যে ঘনীভূত হওয়ার মূলে রয়েছে একটি নোলক। সাড়ে তিনমাস বয়সে সোমু যখন তাঁর মায়ের নোলকটি টান মেরে ছিঁড়ে ফেলেছিল তখন সে ছিল জ্ঞানহীন শিশু। তাই মায়ের রক্তঝরা মুখ ও যন্ত্রণার গভীরতা কেমন ছিল আজ কিছুই তাঁর মনে নেই। কিন্তু পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মুখে সে প্রায়ই শুনতে পায় এই আঘাতের কথা। তাই নোলক পরা মায়ের মুখটা দেখার জন্য সোমুর কৌতুহল ক্রমেই বাড়তে থাকে। কিন্তু শিশুকালে মা’কে হারিয়ে সেই ইচ্ছেটা কিছুতেই পুরণ করতে পারে না। তাই উপায় হিসেবে বেছে নেয় বেশ কিছু পুরানো অ্যালবাম ও ডায়েরি। যদি মায়ের নোলক পরা মুখটা একটু দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু না, কোনও ছবিতেই নোলকের অস্তিত্ব বা সামান্য চিহ্নটুকুও নেই। এমনকী যিনি বিয়ের দিন সোমুর মা’কে সাজিয়েছিলেন তিনিও জানিয়েছেন, সেদিন নোলক পরানো হয়নি। এরপরেই সোমুর কৌতুহলের সীমা ছাড়িয়ে যায় এবং দেখা দেয় নানান প্রশ্ন। আর এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই সোমুর জন্মস্থানের প্রসঙ্গ উঠে আসে। সোমুর জন্ম কোথায়? মানকুণ্ডু, বসন্তপুর, বারানসী, বড় মামার বাড়ি, নাকি ছোট মামার বাড়ি। এই রহস্য নিয়েই ধন্দে পড়ে যায় সোমু। প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটনের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় সোমুর প্রিয় বান্ধবী ঝিনুক ও বন্ধু সুব্রত।
অবশেষে অন্তিম দৃশ্যে জানা যায়, ঠাম্মা, ছোট কাকা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের স্নেহ মমতায় সোমু এ বাড়িতে বড় হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সোমু এই বংশের কেউ নয়। এমনই আশ্চর্য ঘটনা প্রবাহে নির্মিত হয়েছে নাট্যকাহিনি। আসলে পৃথিবীতে রক্তের সম্পর্কটাই যে শেষ কথা নয়, তার বাইরেও যে একটা পবিত্র মানবিক সম্পর্ক আছে সেটাই ব্যক্ত হয়েছে এই নাটকে। পাশাপাশি দেখানো হয়েছে একটি সদ্যোজাত ‘প্রাণ’কে রক্ষা করার জন্য কোনও পরিচয়ের দরকার হয় না। প্রেম, ভালোবাসা, স্নেহ, মমতা ও সুস্থ মানসিকতাই যথেষ্ট। এ ক্ষেত্রে নাট্যকার প্রশংসা পেতেই পারেন। তবে নামকরণে রহস্য কথাটা উল্লেখ থাকলেও নাটকীয় সংঘঠনে কিন্তু রহস্য সেইভাবে ঘণীভূত হয়নি।
নাটকে ব্যবহৃত আলো, পোশাক ও মঞ্চসামগ্রী বিশেষ গুরুত্ব বহন করেনি। ঠাম্মা চরিত্রে ছন্দা চট্টোপাধ্যায় চমৎকার অভিনয় করেছেন। অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন তনুশ্রী রায়, বাসুদেব মিত্র, সৌম্য পাল, রবীন চৌধুরী ও ভিক্টর ঘোষ। নাটক রচনা ও নির্দেশনা প্রসেনজিৎ সেনগুপ্ত। সব শেষে এ কথা বলাই যায় যে, থিয়েটার কমিউন নাট্যদল এমন একটি পরিবারের সন্ধান দিয়েছে যে পরিবারটি মানবতাবোধকে আশ্রয় করেই ‘প্রাণ’ রক্ষার লড়াইয়ে শামিল হয়েছে, যা বিশেষভাবে সমাদর যোগ্য।

সঞ্জীব বসু

মারু বেহাগের ঠিকানা বদল

ঠিকানা কি মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত? না হলে কারও ঠিকানা বদল হলে অথবা ঠিকানা বদলের সম্ভাবনা সামনে এলে সে কেন বিপন্ন বোধ করে? মারু বেহাগ প্রযোজিত এবং জলি গুহ রায় নির্দেশিত নাটক ‘ঠিকানা বদল’ সেই বিপন্নতা প্রকাশের একটি সফল প্রয়াস। প্রৌঢ়া দময়ন্তী সেন এক হিসাবে একজন সফল মা। নিজের চেষ্টায় বড় করে তুলেছেন তার দুই ছেলে আর দুই মেয়েকে। বড় ছেলে, তার স্ত্রী আর ছোট মেয়ে থাকে তার সঙ্গে। বড় মেয়ে আর ছোট ছেলে ও তার স্ত্রী আলাদা থাকে। দুই ছেলের বউ আর বড় মেয়ের সম্পর্ক খুবই নিকট। তিনজনের একটাই মিল—সকলেই সংসারে তাদের আধিপত্য নিয়ে থাকে। সকলের মধ্যে থেকেও দময়ন্তী সেন একা। একটা সময় আসে যখন দময়ন্তী সেন বোঝা হয়ে ওঠে তার ছেলেমেয়ে আর সংসারের কাছে। তারা ঠিক করে মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাবে। কে বাড়ির কোন ঘর দখল করবে তাই নিয়ে শুরু হয় লংকা ভাগ। নাটকের এই পর্যন্ত আমাদের চেনা। শেষ পর্যায়ে রুখে দাঁড়ান দময়ন্তী। অনেক যত্নে নিজের হাতে তৈরি এই ঠিকানা আর সে বদল করতে রাজি নয়। ছেলেমেয়েদের জানিয়ে দেন যে এই বাড়ি তার, তাই তিনি এখানে থাকবেন আর বাকি সবাই যেন বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। দময়ন্তী সেনের দীর্ঘ মনোলগ দিয়ে শেষ হয় নাটক। মঞ্চসজ্জা সাধারণ কিন্তু সুচারু। দুই ছেলের বউয়ের উচ্চগ্রামের অভিনয় এবং গোবেচারা স্বামীদের অভিনয় বেশ নাটুকে। স্বচ্ছ স্বাভাবিক অভিনয় দিয়ে নাটকটিকে বেঁধে রেখেছেন দময়ন্তীর ভূমিকায় জলি গুহ রায়। নাটকে হঠাৎ দেশভাগ এবং তৎসংক্রান্ত রাজনীতির অবতারণা কিছুটা প্রক্ষিপ্ত লেগেছে। নাটকটি সমকালীন সমস্যা নিয়ে রচিত এবং নিশ্চিৎ ভাবে একটি বার্তা বহন করছে।

শ্যামল বোস

আমাদের সমাজ সত্যিই কতটা প্রগতিশীল,
প্রশ্ন তোলে ‘মনোহর কাহানিয়া’

পুরাণ বা ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা অদিতি, হিড়িম্বা বা উলুপির মতো চরিত্র পাই যাঁরা ভীষণভাবে কামনা করেছেন বিশেষ পুরুষকে। তাকে পাওয়ার জন্য তাঁরা সব কিছু করতে প্রস্তুত। আবার তিষ্যা, বা আর্মেনীয় সভ্যতার ফিদ্রা—এঁরাও পুরুষকে এমন তীব্রভাবে কামনা করেছেন যে আকাঙ্ক্ষিত পুরুষের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কটা কী, সেটাকেও গুরুত্ব দেননি। যৌনতাটাই তাঁদের কাছে বড় হয়েছে। এই একই মানসিকতা যদি কোনও পুরুষের হয় তবে সে তার পুরুষত্ব নিয়ে গর্ব করে। সমাজও তাকে প্রশ্রয় দেয়। কিন্তু নারীর এই তীব্র কামনাকে আমাদের সমাজে ঘৃণার চোখে দেখা হয়। নারীর বহুগামিতাও নিন্দনীয়। নারীর এই সহজলভ্যতা পুরুষকে আকর্ষণ করে না। যাকে ইচ্ছে করলেই পাওয়া যায়, সেখানে ভোগের আনন্দ কোথায়? কিন্তু যে নারীতে গমন করতে হলে বেগ পেতে হয়, জোর খাটাতে হয়—সেখানেই আনন্দ। অর্থাৎ পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সেই চিরাচরিত ‘মেল ইগো’। যখনই কোনও দেশে বহিঃশত্রুর আক্রমণ হয়েছে বা জাতিদাঙ্গা লেগেছে, তখনই বয়স নির্বিশেষে নারীর অবমাননা হয়েছে, ঠিক ওই কারণে। যে কোনও দেশ বা জাতির সম্মান হল নারী। মাতৃভূমি যেমন মা, নারীও মা। সেই মা জাতকেই ক্ষতবিক্ষত করা মানে সেই দেশকে পদানত করা। বিজয়ী শক্তি তাদের জিৎ, আধিপত্য বোঝাতে নারীকে ধর্ষণ কর। এটাই রেওয়াজে পরিণত হয়েছে, আদিকাল থেকে আধুনিক সমাজ পর্যন্ত।
পরিসংখ্যান বলছে সমগ্র দেশে প্রতি ১৫ মিনিটে একজন করে নারী লাঞ্ছিত হচ্ছে। যার ৭০ শতাংশই প্রকাশ্যে আসে না। প্রতিদিন সংবাদপত্র খুললেই দেশের কোথাও না কোথাও নারীর অবমাননা কথা পড়া যায়। শুধু মুখগুলো বদলে বদলে যায়। ছ’ বছরের শিশুকন্যা থেকে অশীতিপর সন্ন্যাসিনী—কলকাতা হোক বা দিল্লি, কামদুনি হোক বা বানতলা। কিংবা মধ্যমগ্রাম অথবা উত্তরপ্রদেশের ফতেপুর। কিংবা কলকাতার সুজেট জর্ডন।
এই ঘটনা নিয়েই দিল্লির নাট্যদল ‘স্বপ্ন এখন’ মঞ্চস্থ করল ভীষণ প্রাসঙ্গিক প্রযোজনা ‘মনোহর কাহানিয়া’।
সুজেট এবং পার্ক স্ট্রিট— গ্যাং রেপ—পাঁচ অভিযুক্তের অন্তর্ধান—পুলিশ প্রশাসনের গাফিলতি—অভিযুক্তদের ধরতে বিলম্ব—মিডিয়ার মুখরোচক আলোচনা—দোষীদের পাকড়াও এবং সবশেষে সুজেটের মৃত্যু। পুরো ঘটনাটা পশ্চিমবঙ্গবাসীর জানা। তাই এই নাটকের বিষয়বস্তু ভীষণই চেনা। কিন্তু এই নাটক সেই চেনা গল্পেরই অনেকগুলো অচেনা দিক উন্মোচন করে। গল্পের প্রেক্ষিতে কিছু প্রশ্ন তুলে ধরে।
‘জীবন তুমি গেলাস, তিন চুমুকেই শেষ’—এই রকম মানসিকতার পুরুষকে আমরা তারিফ করি। আদর করে বোহেমিয়ান বলি। কিন্তু এই রকম মতাদর্শ যদি কোনও নারীর থাকে, তাহলেই কি সে সহজলভ্য হয়ে যায়? এইরকম নিজের শর্তে চলা কোনও নারীকে কেন আমরা বলতে পারি না—ও তো বোহেমিয়ান। হতে পারে তার জীবনদর্শন ঠিক নয়, যেমনভাবে সুজেটের মধ্য রাতে পার্টি করে ফেরাটাকে তাঁর মেয়েরাও সমর্থন করেনি। কিন্তু তাই বলে কি সে বেওয়ারিশ সম্পত্তি হয়ে যায়? তার মতের তোয়াক্কা না করে, কী করে পুরুষ তাকে কামনা করতে পারে? তাহলে কি একজন বারবণিতাকেও যখন তখন সম্ভোগ করা যেতে পারে তার মতের বিরুদ্ধে? সুজেটের পরিচিত বন্ধুই তাকে লিফ্‌ট দেয়। চেনা মানুষকে বিশ্বাস করাটা কি তার অপরাধ? প্রশ্ন তোলে এই নাটক।
যারা ধর্ষক, তারাও তো মায়ের সন্তান। কোনও মেয়ের দাদা, কিংবা ভাই। তাহলে অন্য নারীর প্রতি সেই সম্মানটা দেখায় না কেন? আসলে সেই সম্মানবোধটাই তাদের মধ্যে জন্মায় না। যে কারণে শুধু বাইরে নয়, পরিচিত গণ্ডির মধ্যেও নারীকে পাশবিকতার শিকার হতে হচ্ছে। যাকে আমরা বলি ‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স’। একজন পুরুষ সমাজে জন্মে কী দেখছে? না সে দেখছে, বাবার কাছে মা মার খাচ্ছে। মামা-কাকা-জ্যাঠাদের প্রতাপে সদা জোড়হস্ত হয়ে রয়েছে মামি-কাকি-জেঠিমারা। পুরুষের ইচ্ছেমতোই বাড়ির মহিলাদের চলা দেখতে দেখতে ছোট্ট ছেলেটি বড় হচ্ছে। নারীর প্রতি অসম্মান ঢুকে যাচ্ছে তার মজ্জায়। এরপর স্কুল, কলেজ, কর্মজগৎ—সব জায়গায় সে নারীকে ভোগের বস্তু ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারছে না। সে তো সম্মান করার কথা ভাবতেই শেখেনি বা তাকে শেখানো হয়নি। আর তাই ন-জন পুরুষ মিলে পাশবিক অত্যাচার চালায় কলেজের ছাত্রীটির উপর। তাই তো চলন্ত বাসের মধ্যে ধর্ষিতা হয় প্যারা মেডিকেলের মেয়েটি। জমি বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যু হয় তাপসী মালিকের। আর চলন্ত গাড়ির মধ্যে পাঁচজন পশুর কামনার শিকার হয় সুজেট জর্ডন।
মনে রাখতে হবে বিহার, উত্তরপ্রদেশের গ্রামে উচ্চবর্ণের বীরপুঙ্গবরা দলিতদের বসতি আগুন লাগিয়েই ক্ষান্ত হত না, তাদের লাঞ্ছনার শিকার হতে হত দলিত নারীদের। এটা আসলে জয়ের আনন্দ। এক একজন ধর্ষিতা, এক একটি হারের লজ্জাচিহ্ন।
‘মনোহর কাহানিয়া’র মধ্যে দিয়ে এই কঠিন সত্যকে তুলে ধরেছে ‘স্বপ্ন এখন’ নাট্যসংস্থা। দিল্লির এই দলটি বাংলার পাশাপাশি হিন্দি এবং ইংরেজিতেও নাটকটি মঞ্চস্থ করেছে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য। ‘আর নয়। আর চাই না’—এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে তারা শহরে, গ্রামে তাদের নাটক নিয়ে যাচ্ছে। সাধুবাদ জানাতে হয় তাদের প্রচেষ্টাকে। সমস্ত শিল্পীর চমৎকার সম্মিলিত অভিনয় এবং সৌমিক রায়ের পরিচালনায় এক টানটান নাটক দেখার স্বাদ দেয় ‘মনোহর কাহানিয়া’।
পরিচালক সুজেটের গল্পের মাধ্যমে সমস্ত ধর্ষিতা নারীর বেদনাকে তুলে এনেছেন। এমন অবস্থা যে কোনও নারীর হতে পারে। কিন্তু হয় না যে, তা শুধুমাত্র একটা চান্স ফ্যাক্টর বা ভাগ্য। এ যেন সেই মিউজিক্যাল চেয়ার, যে কেউ এই চেয়ারে বসতে পারে। শুধুমাত্র চান্স ফ্যাক্টরের অপেক্ষা। নাটকের শুরুতেই দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের জন্য এই মিউজিক্যাল চেয়ার’এর খেলাটাকে পরিচালক ভারি চমৎকারভাবে ব্যবহার করেন সলতে পাকানোর কাজে। এই যে একটা চেয়ার’কে ঘিরে দর্শকাসন থেকে মঞ্চে আসা মহিলাদের ঘোরা, ঠিক যেন ভালো-মন্দের দোলাচাল। ওই যে সেই ‘চান্স ফ্যাক্টর’। তুমিও এই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে পার। নাটকের শেষে পরিচালক আরও একবার দর্শকদের মাঝে এসে দাঁড়ালেন। কীভাবে বন্ধ করা যায় এই পাশবিকতাকে, সেই নিয়েই দর্শকদের মতামত শুনলেন। চমৎকার এবং অভিনব চিন্তাভাবনা।
ধর্ষিতার স্কার্টের ঝুল কতটা ছিল, তার বেশবাস কতটা স্বল্প, সেটা মাথায় রেখে অপরাধীর অন্যায় বিবেচ্য হয় যে সমাজে, সেই সমাজের পরিবর্তন আদৌ কি সম্ভব? প্রগতিশীলতার ধ্বজাধারী এই সমাজব্যবস্থা এবং এখানে বসবাস করা মানুষ, যবে থেকে সত্যিই প্রগতিশীল হবে, তবেই নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে। সত্যিই যদি এটা হয় তাহলে সৌমিককে আর এই নাটক মঞ্চস্থ করতে হবে না।

অজয় মুখোপাধ্যায়
 












©Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta