কলকাতা, রবিবার ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৩

 

রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড়ি | ম্যাগাজিন


স্বাস্থ্য পরিষেবায় আজকাল অজান্তেই কেমন যেন একটা বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ জারি হয়ে গিয়েছে—বিল হইতে সাবধান। মানুষও ক্ষোভে ফুঁসছে। রাজ্য সরকার সংশোধনী বিল এনেছে। উদ্দেশ্য—বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। সাধু উদ্যোগ। কিন্তু হাসপাতাল মানেই তো চিকিৎসক। আর চিকিৎসক মানেই এমন একজন, যিনি ঈশ্বরের খুব কাছে। যাঁর উপর ভরসা করে পরিজনকে ছেড়ে দেওয়া যায়... সুস্থ হয়ে আসার জন্য। প্রশ্ন কিন্তু আরও। সরকারি হাসপাতালের উপর যা চাপ, তাতে আজ যদি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি না থাকে, তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? তেমন ডাক্তারই বা কোথাও মিলবে, যিনি নিজের স্বার্থ ছেড়ে রোগীর মাথায় হাত বুলিয়ে বলবেন, আমি তো আছি...! কোথায় মিলবে এমন অগ্নীশ্বরের সন্ধান?


সুপ্রিয় নায়েক

 ডাক্তারির ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে ছেলেটি। মেডিকেল কলেজের কমন রুমে সে নিয়ে জোর আলোচনা। অথচ ছেলেটিরই দেখা নেই। পাশ করার খবর পেয়েই সে চলে গিয়েছে গ্রামের বাড়িতে। জাম্প কাটে দেখা গেল, এক বৃদ্ধ লোক পাড়ার অন্য এক মুরুব্বি স্থানীয় ব্যক্তিকে জানাচ্ছেন, পরীক্ষায় প্রথম হয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছে অগ্নীশ্বর...। কারণ সে যখন ঘরে বসে পুকুরের টাটকা মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাচ্ছিল, তখন তার বোন নিরম্বু উপবাস সহযোগে বিধবাব্রত পালনে ব্যস্ত ছিল। বোনের এমন দুর্দশা সে সহ্য করতে পারেনি। সে ছেলে ধনুকভাঙা পণ করেছে, বিধবা বোনের বিয়ে দিয়েই ছাড়বে! সিনেমা শুরু হওয়ার পর ইতিমধ্যে মিনিট পাঁচেক কেটে গিয়েছে। তখনও অগ্নীশ্বরের দেখা নেই! অথচ টুকরো-টুকরো দৃশ্যে সে ছেলের ব্যক্তিত্বের তীব্র আঁচ অনুধাবন করতে দর্শকদের বিন্দুমাত্র সমস্যা হয় না। বড়দাদা বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, অর্থাৎ বনফুলের গল্প নিয়ে ১৯৭৫ সালে এই ছবিটি নির্মাণ করেছিলেন অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়।
বড় অদ্ভূত ব্যাপার হল, ছবিটি দেখার সময় মনে হয় এ বুঝি ব্যাকরণ মেনে কোনও এক নীতিবাগীশ চিকিৎসকের জীবনকাহিনি লিখেছেন লেখক। আর সাধারণ চিকিৎসক থেকে লার্জার দ্যান লাইফ হয়ে ওঠাকেই বায়োস্কোপের আকারে আমরা দেখছি। তার থেকেও বড় কথা, এই গল্প ‘চিকিৎসক হওয়ার গাইডলাইনে’র থেকেও আরও বেশি করে মানুষ হয়ে ওঠার কথা বলে। হ্যাঁ ঈশ্বর নয়, মানুষ। দর্শক বিশ্বাস করে সেই ছবিতে। আকুল হয়ে বিশ্বাস করতে চায়, প্রতি পদে খুঁজতে চায় একজন অগ্নীশ্বরকে। খুঁজতে হয়... কারণ এই পোড়া বাংলা এখনও বদলায়নি। আজও গ্রামেগঞ্জে সুলভ হয়নি স্বাস্থ্যব্যবস্থা। চাইলেই হাতের কাছে চিকিৎসক মেলে না সেখানে। মেলে না হাসপাতাল। শুধুই কি আর গ্রামে থামা যায়? এই মহানগরীতেই বা রাতবিরেতে ক’জন ডাক্তার কাতর আরজি সত্ত্বেও রোগীর স্বার্থে ঘুম ফেলে বাড়ি চলে আসেন? দুধের শিশুর কান্না সত্ত্বেও তাঁদের অনেকেরই বার্তা যায়, ‘কোনও একটা হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে চলে যান।’ গরিব মানুষ হলে আর বেসরকারিতে সাহস নেই! অগত্যা...। আর জরুরি বিভাগের প্রমাণ তো বয়ে বেড়াচ্ছেই কলকাতার সরকারি হাসপাতালগুলি। নাম বলা বারণ এমন এক সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার বলছিলেন, প্রতিদিন এই রাজধানীর এক একটি সরকারি মেডিকেল কলেজের ইমার্জেন্সিতে প্রায় পাঁচশো মানুষ আসেন। এই হিসাব থেকেই পরিষ্কার, কলকাতার প্রত্যেকটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের জরুরি আর বর্হিবিভাগ মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে কমবেশি দেড় লক্ষ মানুষের ভিড় হয়। বন্যার মতো ধেয়ে আসা এই রোগীর স্রোত সামাল দেওয়া গুটিকতক চিকিৎসকের ক্ষমতার বাইরে, তা বলাই বাহুল্য! তবে চলছে, চেষ্টা চলছে এই পরিস্থিতি বদলানোর। মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে শিশুসাথি, স্বাস্থ্যসাথি, নায্য মূল্যের ওষুধের দোকানের মতো প্রকল্প। সমস্ত সরকারি হাসপাতালে সাধারণ মানুষ চিকিৎসা পরিষেবা পাচ্ছেন বিনামূল্যে। এর সঙ্গে নতুন আরও পাঁচটি মেডিকেল কলেজ খোলার কাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে, সরকারি এবং বেসরকারি মিলিয়ে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ আরও বেড়ে যাবে। তবে এক মাঘে শীত যেমন যায় না, তেমনই চোখের পলকে হাসপাতালের সিঁড়ি, লিফট থেকে গুটকার দাগও উঠে যাবে, রোগী পায়ে ক্ষত নিয়ে ভরতি হলেই প্রতিদিন নিয়ম করে তার ড্রেসিং হবে—এমন ভাবাটাই বুঝি ভুল! আর ভুল বলেই বোধহয় অসহায় দরিদ্র সাধারণ মানুষ চিকিৎসকের মাঝে অগ্নীশ্বরকে খোঁজে। যে মানুষটা হাজার নিয়মের বেড়ি ছিঁড়ে বেনিয়ম করে হাসপাতালের খাবার রোগিণীর বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। কারণ সেই রোগিণী নিজের জন্য বরাদ্দ খাবার দিয়ে দিচ্ছিল অভুক্ত সন্তানদের। কিন্তু চিকিৎসকের ধর্মই যে রোগীকে সুস্থ করা! তাই নাছোড়বান্দা চিকিৎসক রোগীকে সুস্থ না করে হাসপাতাল থেকে ছুটি দেন না। আসলে তিনি তো সেই রোগিণীর মধ্যে নিজের মা’কে খুঁজে পেয়েছিলেন। একইসঙ্গে ছবির দর্শকরা অগ্নীশ্বরের চোখে দিয়ে বাংলার প্রত্যেক মায়ের প্রকৃত রূপ স্মরণ করে। রোগী আর চিকিৎসকের মধ্যেকার সম্পর্কটা শুধু পরিষেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং মানবিকতার পথ বেয়ে রচিত হয় এক অনন্য সোপান। যার উত্তরণ মানুষকে মানুষ হতে শেখায়। দৃঢ় হয় ডাক্তার-রোগীর পারষ্পরিক বিশ্বাসের বাঁধন। এভাবেই বাঁধা ছক ভেঙে এক চিকিৎসক কখন যেন নিজেই হয়ে ওঠেন প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বাস্তব চিত্র যে বড়ই রুক্ষ। লক্ষ মানুষের ভিড়ে সরকারি হাসপাতালের মুষ্টিমেয় চিকিৎসকের সামান্য ‘দয়া’ পাওয়াও যে একপ্রকার দিবাস্বপ্ন। এছাড়া দীর্ঘ মানুষের লাইনে দাঁড়ানোর যন্ত্রণা, আপৎকালীন পরিস্থিতিতেও অপারেশন বা সাধারণ চিকিৎসার জন্য কয়েক মাস পরে ‘ডেট’ পাওয়ার মতো পরিস্থিতির কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই। এরপর সন্তানের রোগযন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে একজন বাবা কর্পোরেট হাসপাতালের দরজায় কড়া নাড়বেন, গ্রামীণ হাসপাতাল থেকে রেফার হওয়া সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে নিয়ে দিশাহারা স্বামী মাথা গলাবেন ঝাঁ-চকচকে হাসপাতালে—তাতে আর আশ্চর্য কী! তবে মানুষের এই আত্মসমপর্ণও তো কোনও এক চিকিৎসকের নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের সন্ধানেই! আসলে নিজের মা, নিজের সন্তান, নিজের স্ত্রী, নিজের স্বামীর চেয়ে আর কোনও কিছু কি বেশি দামি হতে পারে? পারে না। সে জন্যই তো সাধ্যের বাইরে গিয়েও তাদের জন্য সেরাটুকু বেছে নিতে হয় আমাদের। কারণ আমরা বিশ্বাস করি ওই চকচকে হাসপাতালে থাকেন ‘এক সে বড় কর এক ডাক্তারবাবুরা’। তাঁরাই বাঁচিয়ে তুলবেন রোগীকে, আমার আপনজনকে। তাই তো কোন হাসপাতালে কোন উন্নত যন্ত্রপাতি আছে, আমরা ভাবি না। আমরা বুঝতেও চাই না, কোন রোবটিক সার্জারিতে রোগীর দেহের অসুখে আক্রান্ত অঙ্গ বাদ পড়ে যাবে চোখের নিমেষে, কোনও দাগ না রেখে! আমরা শুধু জানতে চাই কোন চিকিৎসক ওই রোবটটাকে নিয়ন্ত্রণ করবেন! অর্থাৎ সাধারণ মানুষের কাছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাঠামো স্থির হয় চিকিৎসকের উপর নির্ভর করে। বিখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অঞ্জনলাল দত্ত তাঁর এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে প্রতিষ্ঠানের চাইতেও বড় হয়ে দাঁড়ায় চিকিৎসক।’ সম্ভবত সেটা সত্যি বলেই কলকাতার বাইপাসের ধারে এক হাসপাতাল কবিগুরুর নামাঙ্কিত হওয়া সত্ত্বেও, আমরা সেই প্রতিষ্ঠানকে বেঙ্গালুরুর এক বিখ্যাত চিকিৎসকের নামে ডেকে থাকি! আর সেই একই কারণে বেসরকারি হাসপাতালগুলি তাদের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চিকিৎসকের ছবি দিয়ে হোর্ডিং লাগায় বড় রাস্তায়, স্টেশনের ধারে। বিজ্ঞাপনে চিকিৎসক আশ্বাস দেন, বুকে ‘মাত্র’ তিন ইঞ্চি ‘কেটে’ সুস্থ করবেন রোগীকে! নজরে আসে নামী এক ‘বাইপাস সার্জেনের’ ‘হাসপাতাল বদলের’ আনন্দ সংবাদ। মুক্ত বাজার অর্থনীতির জোয়ারে কখন যে সেবাব্রতী চিকিৎসকরা প্যাকেজে মোড়া পণ্য হয়ে যান, তা বোধ করি তাঁরা নিজেরাও বুঝতে পারেন না। শুধু রোগীর ঘাড়ে পাহাড় প্রমাণ বোঝা হয়ে দাঁড়ায় এই সব ‘নন প্রফিট’ অর্গানাইজেশনের চিকিৎসার বিল। কারণ বাজার অর্থনীতি শুধু লাভ-ক্ষতিই বোঝে। মানুষের আবেগ নির্ধারণের ক্ষমতা রাখে না। তাই হয়তো বিল না মেটাতে পারায় সঞ্জয় রায়দের মতো ধুঁকতে থাকা রোগীকে চিকিৎসা না করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাসপাতালের ঠান্ডা ঘরে আটকে রাখা যায়। কে জানে, সেদিনও হয়তো সঞ্জয়ের স্ত্রী অন্যায় এবং বিন্দুবৎ আশা রেখেছিল—একজন চিকিৎসক অন্তত এগিয়ে আসবেন। মর্গের মতো শীতল ঘরে পড়ে থাকা স্বামীর ক্ষীণ হয়ে পড়া নাড়ি ধরে পরীক্ষা করবেন। যাবতীয় বিভেদ আর ব্যক্তিগত বাদানুবাদ ভুলে স্কট সাহেবের একরত্তি সন্তানকে বাঁচানোর জন্য যেমনটি করেছিলেন অগ্নীশ্বর। ডাক্তারের সেই লড়াই দেখে ভেঙে গিয়েছিল ইংরেজ সাহেবের অহং। সঞ্জয়ের মতো প্রতিনিয়ত এমন অনেকের বেলাতেই হয়তো কেউ কেউ ভাবেন, ছবির মতো বাস্তবেও মনুষ্যত্বের কাছে গুঁড়িয়ে যাবে অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিত। এমনটা হয়নি। কারণ আর্তের শুশ্রূষা আর চিকিৎসকের মাঝে ছিল কর্পোরেট টাইয়ের টানাটানির হিসাব! আবার সেই হিসাবি অর্থনীতি বলে, হাসপাতাল তো ঠিক কাজই করেছে। ভুল বোধহয় আমার আপনার মতো সাধারণ মানুষ। কর্পোরেট হাসপাতালে কড়ি না ফেলে তেল চাওয়া যে বড় অন্যায়! পরিষেবার পাশাপাশি কিছুটা ব্যাবসাও। কারণ, তাদের যে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হবে! যেমন পরিষেবা, তেমন দাম। কোনও কোনও ক্ষেত্রে একটু যে বেশি হয়ে যায় না তা নয় ঠিকই, কিন্তু ওই যে হাসপাতালের কর্তাব্যক্তিরা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে বলেন, ‘শুধরে নেব’! ওখানেই আমাদের শান্তি। আর যাই হোক, ডাক্তার তো! আমাদের কাছে ভগবানের কাছাকাছি কোনও একটা আসনে তাঁদের জায়গা। মৃত্যুমুখ থেকে প্রিয়জনকে ফিরিয়ে আনতে পারেন তাঁরা। কলকাতার এক বিখ্যাত চিকিৎসকই তো পেশেন্ট পার্টির নানা ‘আহাম্মকপনা’ নিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আপনি কেন মশাই পাঁচতারা হাসপাতালে গিয়ে নাম লেখাবেন, যদি সস্তায় চান? আপনি যদি তাজে রুম বুক করে, শিয়ালদার মা তারা লজের চেয়ে বেশি খরচ হয়ে যাচ্ছে বলে মরাকান্না জুড়ে দেন, তাহলে আমাদের কেন, স্বয়ং ঈশ্বরের কিছু করার থাকবে না। দেখবেন আপনার কান্না দেখে ডাক্তার তার প্রাপ্য ছেড়েও দিতে পারে, কিন্তু প্রাইভেট হাসপাতাল? নৈব নৈব চ।’
সত্যিই তো! চিকিৎসকরা তো এখন শুধু কর্পোরেট ব্যানারের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা কর্মী মাত্র। প্রতিষ্ঠান যেমন অঙ্গুলিহেলন করবে, তেমনভাবেই তাঁদের নড়তে হবে। তাই চিকিৎসকের মুখাপেক্ষী না হওয়াই ভালো। বরং যাঁর যেমন সামর্থ্য তাঁর সেখানে গেলেই তো ল্যাটা চুকে যায়! খামোখা কর্পোরেট হাসপাতালকে গাল পাড়া কেন? ভাবের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলেই তো সত্যিটাও নগ্ন হয়ে যায়—সারা রাজ্যে দু’হাজারেরও বেশি নার্সিংহোম আর বেসরকারি হাসপাতাল চলছে রমরমিয়ে। এই বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকলে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি খুব স্বস্তিদায়ক হত না বোধহয়! কলকাতার কয়েকটি কর্পোরেট হাসপাতালের কর্তৃপক্ষের তরফেই জানা যায়, নয় নয় করেও কলকাতার তাঁদের হাসপাতালগুলির ইমার্জেন্সিতে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ জন রোগী ভিড় করেন। কলকাতায় এমন প্রথম সারির বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে কমপক্ষে কুড়িটি। সহজেই অনুমেয়, বেসরকারি না থাকলে হঠাৎ বিপদে পড়া রোগীদের ঠাঁই হত সেই সরকারি হাসপাতালেই। এর থেকেই বুঝতে সমস্যা হয় না যে, রাজ্যের ছোট বড় বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো না থাকলে রোগীর ঢেউ আর শুধু বন্যার আকারে আসত না। সুনামি হয়ে আছড়ে পড়ত সরকারি হাসপাতালেই! আর একটা হিসাব দেখা যাক। কলকাতার পাঁচটি সরকারি মেডিকেল কলেজ আর হাসপাতালের প্রতিটিতে সাধারণভাবে গড়ে শয্যা রয়েছে দেড় হাজারের কিছু কম বা বেশি। সেখানে কলকাতার প্রথম সারির কর্পোরেট হাসপাতালগুলিতে শয্যা সংখ্যা গড়ে চারশোর কাছাকাছি। এমনিতেই বেডের অভাবে সরকারি হাসপাতালের মেঝেয় ‘শয্যা’ নিতে হয় রোগীকে। বেসরকারি হাসপাতাল না থাকলে আজ কিন্তু সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জমিতে থাকা গাছের ডালেই স্যালাইনের বোতল ঝোলাতে হত! তাছাড়া সবসময়ই যে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র আমার বাড়ির পাশেই থাকবে, এমন তো নয়! তাই রাতদুপুরে বুকে ব্যথা উঠলে রোগীকে নিয়ে কাছের বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রেরই শরণাপন্ন হতে হয়। সে হাসপাতালের পরিষেবা তাজ হোটেলের মতো দামি হলেও। কারণ, তখন স্বজনের রোগযন্ত্রণার উপশমটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়। ছলছল চোখে ঝাপসা হয়ে যায় সামর্থ্যের ভাবনা।
সত্য সততই কঠিন। তবু এই সত্যের মুখোমুখি হয়েও কেন জানি না মানুষের অবাধ্য আবেগ আঙুল তোলে, বোবা চিৎকার করতে চায়—সামান্য বিল না মেটানোর অক্ষমতায় একজন চিকিৎসা প্রার্থীর মৃত্যু হলে তা আর সাধারণ মৃত্যু থাকে না, বরং একটা সংগঠিত নারকীয় অপরাধের ফলাফল হয়ে দাঁড়ায়। কারণ হাসপাতাল শব্দে আজও আমাদের চোখের সামনে ভাসে রেডক্রসের চিহ্ন, হিপোক্রেটাসের শপথ নেওয়া চিকিৎসকের ব্যস্ত যাতায়াত। এই ছবি ভাসে বলেই তো আমাদের ক্ষয়ে যাওয়া মূল্যবোধ-সর্বস্ব সমাজে এখনও শিক্ষকদের, চিকিৎসকদের দেখে সামান্য হলেও মাথা ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ। এই সম্মান প্রদর্শনের কারণ, আজও আমরা বিশ্বাস করি তাঁরা ‘সেবা’ নামক মহান ব্রত পালনে নিযুক্ত। ‘থ্যাংকলেস জব’ করেন বলেই তো তাদের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না। আর তাই তো যখন কর্পোরেট হাসপাতালের পিচ্ছিল টাইলস বসানো করিডর দিয়ে চিকিৎসক অভ্যস্ত পায়ে হেঁটে যান, রোগীর আত্মীয়রা হোঁচট খেতে খেতে তাঁর পাশে দৌড়ান—যদি একবার ডাক্তারবাবু অনুগ্রহ করে বলেন... ‘রোগী ভালো হয়ে যাবে’। অথচ তাঁকে দু’দণ্ড দাঁড়ানোর অনুরোধ করতে সাহস হয় না। তাঁকে প্রশ্ন করা যায় না, কেন পাঁচ দিন ভরতি থাকার পরেও রোগীর রোগ সম্পর্কে কিছু জানা গেল না? রোগীর চিকিৎসা নিয়ে এত ধোঁয়াশা কেন? কেন একদিনেই চার-চারটে দামি টেস্ট করাতে হল? মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, পায়ের চিকিৎসা করতে গিয়ে চোখের পরীক্ষা! কীভাবে পাঁচ টাকার গজ হাসপাতালের বিলে পঞ্চাশ টাকা হয়ে গেল? কারণ আমরা মনে করি, গলায় স্টেথো ঝোলানো মানুষটা শাড়ির দোকানদার নয় যে, তাঁর সঙ্গে চিকিৎসার দাম নিয়ে দর কষাকষি করা যায়। তিনি যা ভালো বুঝেছেন তাই করেছেন। আর তখনই ক্ষোভ সংঘবদ্ধ হয়, প্রশ্ন ওঠে—যখন কাঞ্চনমূল্যে সঞ্জয়দের সেবা হতে পারে, তখন কি তাঁরা ভালো বুঝেই চুপ করে বসেছিলেন? উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, আর যদি বাজার অর্থনীতিই সেবা নিয়ন্ত্রণের শেষ কথা হয়, তবে বেসরকারি হাসপাতালগুলি শুরুর দিন থেকেই প্রবঞ্চনা করে আসছে সাধারণ মানুষের সঙ্গে। অর্থনীতির হিসাবই বলে, পূর্ণ পরিষেবা পাওয়ার পরেই তার মূল্য চোকানো উচিত। সেক্ষেত্রে রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পরেই হাসপাতালের বিল মেটানোর প্রসঙ্গ আসে। চিকিৎসা নামে পণ্যটি কিনতে গিয়ে রোগীর কোনওরকম অঙ্গহানি ঘটলে বা রোগীর মৃত্যু হলে কি সম্পূর্ণ পরিষেবা পাওয়া হয়? ঠান্ডা ঘরে থাকা, উন্নত শয্যায় শোওয়া আর ঝকঝকে টয়লেট ব্যবহার করার জন্য কেউ কি হাসপাতালে ভরতি হন? নাকি সুস্থ হওয়ার উদ্দেশ্যে যান? এমন কোনও মানুষ আছেন কি, যিনি মৃত্যুর আগে কর্পোরেট হাসপাতালের ঠান্ডা ঘরে দু’দিন কাটিয়ে আসতে চান? অতএব কর্পোরেট হাসপাতাল যদি পরিষেবার পূর্ণ মূল্য দাবি করে, তবে চিকিৎসায় পূর্ণ সুস্থ হওয়ার দাবিও রোগী করতে পারেন। মুশকিল হল, অর্বাচীনের মতো এই তক্ক পাড়ার রকেই চলে। আসলে চিকিৎসা শাস্ত্রটিই একটি অসম্পূর্ণ বিজ্ঞান। এখানে দুই আর দুইয়ে চার নাও হতে পারে। কারণ, আমরা সবাই ডাক্তার নই। কম্পিউটারের কোন যন্ত্রাংশটা খারাপ হয়েছে, তার জন্য যেমন বিশেষজ্ঞের উপরই নির্ভর করতে হয়, ঠিক তেমনটাই শরীরের ক্ষেত্রেও। অতএব, চিকিৎসক যখন বলেন, অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করাতে গিয়ে পায়ে গ্যাংগ্রিন শুরু হয়েছে, পা কেটে বাদ দিতে হবে, তখনও আমরা কেউ প্রশ্ন তুলি না—কেন ডাক্তারবাবু, কেন? হার্টের রোগের সঙ্গে পায়ের কোথায় সম্পর্ক? কারণ সেই একটাই—এসব সম্পর্কের কথা জানতেই জনগণের করের টাকায় ডাক্তারবাবু পাঁচ বছর ধরে এমবিবিএস পাশ করেছেন। উনি শারীরবিদ্যার সবটুকু জানেন। সেই জ্ঞানেই তো চিকিৎসকরা বলেন, গ্রুপ আর ক্রসম্যাচিং করা সামান্য ব্লাড ট্রান্সফিউশন থেকেও রোগীর প্রাণহানি পর্যন্ত হতে পারে। হ্যাঁ ঠিক তাই। কারণ অন্যের শরীরের রক্ত রোগীর দেহে প্রবেশ করালেই হয় না, রোগীর দেহ সেই রক্ত নিজের শরীরে গ্রহণ করবে কি করবে না, তা একান্তই রোগীর শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার নিজস্ব সিদ্ধান্ত। সেই প্রতিকূল পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দিতে হবে, তা বাতলেও দিতে পারেন একমাত্র চিকিৎসকরাই।
সুতরাং পুনর্মূষিকঃ ভব। চিকিৎসক ছাড়া গুগুল দেখে ডাক্তারি ফলানোর বিকল্প ব্যবস্থা এখনই নেওয়া যাচ্ছে না। তবে কি এমনই চলবে? আগামীদিনেও হাসপাতালে রোগীর আত্মীয়রা ভাঙচুর চালাবেন? আবারও বিল না মেটানোর অক্ষমতায় অসংখ্য তরতাজা সঞ্জয়কে বিদায় নিতে হবে চিরদিনের জন্য? সাংবাদিকরা টেলিভিশনের পরদায় আদালত বসিয়ে চিকিৎসকদের বিচার চালাবেন? সরকারি হাসপাতালের আইসিইউ-এর বেড পাওয়ার জন্য নেতাদের চিঠির প্রত্যাশা করতে হবে? অসংখ্য প্রশ্ন রয়েছে। উত্তর দেবেন এমন অগ্নীশ্বর রয়েছেন কেউ? সেই অগ্নীশ্বর... যিনি ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে রোগীর পাশে বসবেন, তার মাথায় হাত বুলিয়ে আশ্বাস দেবেন ‘আমি আছি তো’। আর মুহূর্তের মধ্যে বিক্ষোভে ফুটতে থাকা জনগণ মুষ্টিবদ্ধ হাত নামিয়ে দেখবে সুধা আসছে। তার হাতে শিউলি ফুল—ডাক্তারের জন্য। আছেন কেউ এমন? আমাদের মধ্যে একজন অগ্নীশ্বরের আজ যে বড় দরকার!

 অগ্নীশ্বরের উত্তম কুমারের ছবি: সুকুমার রায়ের সৌজন্যে




?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta