কলকাতা, রবিবার ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৩

 

রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড়ি | ম্যাগাজিন


এক সময় ছিল বাঙালির একান্ত আপন পাহাড়। আলাদাভাবে দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্শিয়াং কোথায় তখন? সেই স্বপ্ন ভাঙল গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনে। অচল হল হিমালয়ের কোলে থাকা গোটা জনপদ। দিনের পর দিন বন্‌ধ। ভাঙল পর্যটন অর্থনীতি। না পারলেন জ্যোতি বসু, না বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। পারলেন মমতা। বিচ্ছিন্নতাবাদের শিকড়ে আঘাত হানলেন তিনি। পাহাড় আজ তাই আবার হাসছে...।


দেবাঞ্জন দাস

সময়টা নেহাত কম নয়, ১৫২ বছর। কখনও সিকিমের নামগিয়াল সাম্রাজ্যের অধীনে, আবার কখনও ভুটান রাজার আগ্রাসনের শিকার হয়েই থাকতে হচ্ছিল তিস্তাপারের পাহাড়ি এই জনপদকে। ১৮৬৪ সালের ইঙ্গ-ভুটান যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আওতায় আসে এই এলাকা। পরিচয় মেলে ওয়েস্টার্ন ডুয়ার্স জেলার মহকুমা হিসাবে। এর দু’বছর পর দার্জিলিং জেলার সঙ্গে যুক্ত হয় কালিম্পং। এবারও সেই মহকুমা হিসাবেই। ভূমিপুত্র লেপচা আর অভিবাসী ভুটিয়া আর লিম্বুদের বাসস্থান কালিম্পং, নিজস্ব অস্তিত্ব স্থাপনের চেষ্টার মাঝে বাধ্য হয়েই পাহাড়ে দার্জিলিং কেন্দ্রিক যাবতীয় আবর্তনের অঙ্গ হয়ে ওঠে। পাহাড়ের নানা আন্দোলন, ক্ষোভ আর বিক্ষোভে কালিম্পং যথাযথ সাহচর্য দিয়েছে দার্জিলিংয়ের ‘মোড়ল’দের। তা সে সুবাস ঘিসিংয়ের পৃথক রাজ্যের স্বপ্ন দেখানো গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের (জিএনএলএফ) রক্তক্ষয়ী আন্দোলন পর্বই হোক, কিংবা পাহাড়ে বিমল গুরুং অ্যান্ড কোম্পানির মৌরসিপাট্টা কায়েম করার চেষ্টা। সব জায়গায় বুক চিতিয়ে লড়েছে কালিম্পং। নিজেদের পৃথক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমে। জিএনএলএফ-এর গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন পর্বে সিআরপি’র গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন দেড়ডজন কালিম্পংবাসী।
বিনিময়ে তিস্তাপারের এই জনপদ পেয়েছেটা কী! পাহাড়, জঙ্গল, নদীর টুকরো কোলাজ জোড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর বিশ্বজুড়ে সমাদৃত গ্লাডিওলাস ফুল আর অর্কিডের সম্ভারে ভরপুর কালিম্পংয়ের দার্জিলিং নির্ভরতা কাটানোর কোনও ব্যবস্থাই হয়নি স্বাধীনতার পর থেকে। সুবাস ঘিসিং পেয়েছিলেন দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিল (ডিজিএইচসি)। বিমল গুরুং আদায় করেছেন গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (জিটিএ)। কিন্তু বঞ্চনা, অনুন্নয়ন, পিছিয়ে থাকার মতো জরামুক্ত হওয়ার ভাগ্য কিন্তু হয়নি কালিম্পংয়ের।
১৮৬৬ সাল থেকে ২০১৭। অবশেষে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে নিজেদের অস্তিত্ব আর পরিচয় পেয়েছেন কালিম্পংবাসী। ২১তম জেলা হিসাবে রাজ্যের প্রশাসনিক মানচিত্রে ঠাঁই করে নিল কালিম্পং। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসার দিন ভ্যালেনটাইন্স ডে’তে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর উজাড় করা ভালোবাসার ছোঁয়া পেল কালিম্পং। ৪২টি গ্রাম পঞ্চায়েত আর ১০৫৬.৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকার এই পাহাড়ি মহকুমা দার্জিলিং কেন্দ্রিক আবর্তন থেকে বেরিয়ে সাবালক হল। আশির দশক থেকে পাহাড়ে পৃথক রাজ্যের দাবি নিয়ে যে বা যাঁরা আন্দোলন করছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই মানুষকে বুঝিয়েছিলেন, একমাত্র আলাদা হলেই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব। কিন্তু ডিজিএইচসি কিংবা জিটিএ হওয়ার পর হাজার হাজার কোটি টাকা হাতে পেয়েও কেন সেই উন্নয়ন সম্ভব হয়নি, তা নিয়ে কিন্তু কোনও প্রশ্নই ওঠেনি পাহাড়ে। কালিম্পং থেকে জিতে আসা জিটিএ’র ১৩ জন সভাসদকেও কোনওদিন এ প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়নি। প্রশ্নবাণে বিঁধতে হয়নি দার্জিলিং আর কার্শিয়াংয়ের আর বাকি ৩২ জন জিটিএ সভাসদ আর তাঁদের চেয়ারম্যান বিমল গুরুংকে। উন্নয়ন প্রত্যাশী মানুষের মনে সযত্নে লালায়িত সেই অনুচ্চারিত প্রশ্নকে উচ্চারণ করিয়েছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। পাহাড়ের ভূমিপুত্র আর অভিবাসীদের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীগুলির সামগ্রিক উন্নয়নের মধ্যে দিয়েই যে পাহাড় এগিয়ে যেতে পারে, সেই পথও দেখিয়েছেন মমতা। একের পর এক উন্নয়ন আর সাংস্কৃতিক পর্ষদ গড়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী গুলির আর্থ-সামাজিক বিকাশে অনুঘটকের কাজ করেছেন তৃণমূল নেত্রী।
পাহাড়ের উন্নয়নে রাজ্য সরকারের ভূমিকা কার্যত থাকারই কথা নয়। রাজ্যের শাসকদল এখানে বিরোধী। নিজেদের মেলে ধরার চেষ্টায় রয়েছে জোড়াফুল শিবির। নির্বাচিত পৌরসংস্থা, বিধায়ক এবং পাহাড়কে ঢেলে সাজানোর ভার পাওয়া জিটিএ, সবটাই গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার দখলে। এমনকী দার্জিলিং লোকসভা আসনটিও বিজেপি’র দখলে। এরকম একটা অবস্থায় পাহাড়ের মানুষের উন্নয়নকে তরান্বিত করতে কেবল ‘সহায়ক’ ভূমিকা পালন করেছেন মমতা। আর তাতেই ঘুম ছুটেছে বিমল গুরুং অ্যান্ড কোম্পানির।
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি কালিম্পং মেলার মাঠে জেলার আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে মমতা বলেছিলেন—অন্য জেলার সঙ্গে পাহাড়কে তুলনা করলে চলবে না। এখানে জিটিএ আছে, রয়েছে পুরসভাগুলিও। উন্নয়নের সব অধিকারই অন্যের হাতে। তবুও পাহাড়বাসীর বহু প্রতীক্ষিত অগ্রগতির স্বার্থে বাড়তি কিছুটা করার চেষ্টা চালাচ্ছি। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, নির্বাচিত সংস্থাগুলি কী কাজ করেছে, তা আপনারা বিচার করবেন! ওরা ওদের কাজ করুক, আমরা আমাদের। নতুন জেলা হল, সঠিক পরিকল্পনা করে কালিম্পংকে পর্যটন মানচিত্রে পাকা জায়গা করে দেওয়ার কাজ শুরু হবে। কার্শিয়াংয়ের মতো এখানেও হবে এডুকেশন হাব। এখানকার অর্কিড আর ক্যাকটাস বিদেশে রপ্তানি হবে। পানীয় জলের সংকট মেটাতে ৫০ কোটি টাকা খরচ করে নতুন একটি প্রকল্প গড়বে জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তর। মমতার এ কথায় সভাস্থল জুড়ে জনতার উল্লাস আর হর্ষধ্বনি তখন সিংহগর্জনে বদলে গিয়েছে। বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব রীতির বাদ্যযন্ত্র আর মঙ্গলধ্বনির সুর তখন একটাই—জয়তু মমতাদিদি। পাল্লা দিয়ে ফাটছিল আতসবাজি। সভাস্থল মেলা মাঠের আকাশ ছেয়ে যাচ্ছিল নীল-সাদা বেলুনে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একে অপরকে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন সবুজ আবির মাখিয়ে।
কালিম্পংয়ের মাটিতে নিজের নামে জয়ধ্বনি শুনতে কম ঘাম ঝরাতে হয়নি বাংলার মুখ্যমন্ত্রীকে। গত ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পরে প্রথমবারের জন্য যখন কালিম্পংয়ে এসেছিলেন মমতা, পাহাড় তখন রাজ্যের মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করার স্বপ্নে বুঁদ হয়ে আছে। গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের দাবিতে মোর্চারা তখন পাহাড় জুড়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। তারই মাঝে তামাং জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন পর্ষদ অনুষ্ঠানে কালিম্পংয়ে হাজির হয়েছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। মমতার এখনকার পাহাড় তখন নিরাপত্তারক্ষীদের পিপাসার জলটুকুও দেয়নি, খাবার জোগাড় করতে তো কালঘাম ছুটেছিল। উন্নয়নের ঝুলি নিয়ে গিয়েও, সপার্ষদ বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর জুটেছিল উপেক্ষা আর মোর্চা নেতাদের আস্ফালন। রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে এরপর বারবার মমতা গিয়েছেন পাহাড়ে। আপন করে নিয়েছেন পাহাড়বাসীকে, আপন হয়ে উঠেছেন তাঁদের। কালিম্পং তো এখন দিদি’র ক্যারিশমায় আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে। একসময়ে মোর্চার কালিম্পং বিধায়ক তথা বর্তমানে জন আন্দোলন পার্টির প্রধান হরকাবাহাদুর ছেত্রীর কথাতেই মালুম হয়েছে বাসিন্দাদের মমতা প্রীতি। হরকাবাহাদুর বলেছেন, দিদি আমাদের উজাড় করে দিয়েছেন, এবার ফেরত দেওয়ার পালা আমাদের।
পাহাড়ের আসন্ন পুরসভা এবং জিটিএ নির্বাচনের আগে কালিম্পং জেলা গঠন যে মমতার মাস্টারস্ট্রোক, তা উপলব্ধি করেছে সংশ্লিষ্ট সব মহল। চোখের সামনে একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্পকে বাস্তবায়িত হতে দেখা পাহাড়বাসীকে প্রকৃত উন্নয়নের স্বাদ দিয়েছেন তিনি। কালো মাথার ভিড়ে ঠাসা সভাস্থলকে তিনি শুনিয়েছেন, কী ভাবে তৈরি হয়েছে লামাহাটা, কী ভাবে তাকদা বনবাংলো মেরামত করার পরও তাতে আগুন ধরানো হয়েছে, কী ভাবে গঠিত হয়েছে বিভিন্ন উন্নয়ন পর্ষদ, কী ভাবে তৈরি হচ্ছে আবাসন, স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কমিউনিটি সেন্টার, জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষার পাঠ্যপুস্তক, স্কুল আর সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র এসব। যতই বাধা আসুক, পাহাড়ের সামগ্রিক সমৃদ্ধির জন্য তিনি যে কাজ করেই যাবেন, তাও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন মমতা। কালিম্পংয়ের সভায় উপস্থিত ছিলেন মোর্চা ছেড়ে আসা পরপর তিনবারের স্থানীয় বিধায়ক গোওলান লেপচা গোওলানের কথায়, আগে দু’জন মুখ্যমন্ত্রীকে দেখেছি। নেহাতই দায় মেটাতে পাহাড়ে আসতেন। পাহাড়বাসীর কাছে তাঁরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েই ছিলেন। এখানেই আলাদা মমতাদিদি, পাহাড়বাসীর মন জয় করে নিয়েছেন। মানুষ তাই তাঁকেই নেত্রী হিসাবে মেনে নিয়েছে।
পাহাড়বাসী আবেগপ্রবণ, পাহাড়বাসী সরল সাদাসিধে। আর এই বিষয়টাকেই পুঁজি করে চলছিল আলাদা রাজ্যের স্বপ্ন উসকে দেওয়ার কারিগরদের মৌরসিপাট্টা। আলাদা রাজ্য হলেই কেবল মিটবে পাহাড়বাসীর যাবতীয় সমস্যা—একসময়ের এই আপ্তবাক্যকে তুলে ধরেই স্বঘোষিত ‘মসিহা’ হয়ে উঠেছিলেন সুবাস ঘিসিং। দার্জিলিং শহরকে তো সেই সময় বায়বীয় গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের রাজধানী হিসাবেই ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছিল। স্বঘোষিত সেই রাজধানীতে বসেই কালিম্পংবাসীকে রাজ্য প্রশাসনের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ করে আইন অমান্য আন্দোলনে নামার ডাক দিয়েছিলেন ঘিসিং। জিএনএলএফ প্রধানের সেই ঘোষণায় আবেগে ভেসেছিল কালিম্পং। কুকরি হাতে সোনালি-সবুজ রংয়ের পতাকা নিয়ে সমস্ত বিধিনিষেধ শিকেয় তুলে ১৯৮৬ সালের ২৭ জুলাই বেলার দিকে জিএনএলএফ কর্মী-সমর্থকরা হামলা চালিয়েছিল কালিম্পং থানায়। উন্মত্ত লোকজন থানার ভিতরে থাকা তৎকালীন ডিআইজি (সিআইডি) কমল মজুমদারের উপর কুকরি দিয়ে আক্রমণ চালায়। তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে রাজ্য সশস্ত্র পুলিশের এক জওয়ান সুব্রত সামন্ত মারা যান। পরিস্থিতি সামলাতে গুলি চালায় সিআরপি। মারা যান ১৩ জন। পরেরদিন হাসপাতালে আরও ছ’জন। এরপরেও পরিস্থিতি কিন্তু এতটুকুও পালটায়নি। বরং কালিম্পং পাহাড়ের জঙ্গলে উত্তর-পূর্ব ভারতের জঙ্গি সংগঠনগুলির কাছ থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে এবার সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে জিএনএলএফ। পুলিশ এবং আধাসামরিক বাহিনীর উপর চোরাগোপ্তা আক্রমণ, ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণ, সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস আর রক্ত ঝরা, তখন পাহাড়ের রুটিনে পরিণত। সমতলে শাসকদল সিপিএমের রোজ মিছিলের স্লোগান—গোর্খাল্যান্ড হতে দিচ্ছি না, দেব না। মহাকরণ ছেড়ে একবারের জন্যেও পাহাড়ে গিয়ে মানুষের বলভরসা হওয়ার কথা চিন্তাও করেননি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ও তাঁর সহকর্মীরা। ঘিসিং পর্ব শেষে বিমল গুরুংয়ের সময়েও সেই ধারা ভাঙতে পারেননি উত্তরসূরি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যও।
এখানেই ব্যতিক্রমী মমতা। আলাদা রাজ্যের দাবিতে বন্ধ-আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া পর্বে গুরুংদের সঙ্গে সমঝোতা তো দূরের কথা, কড়া হাতে তা দমন করেছেন তিনি। নাশকতার সব চেষ্টায় যুক্ত দুষ্কৃতীদের পুরেছেন গারদে। আন্দোলনের ওই পর্বে দার্জিলিং শহরের ম্যালে দাঁড়িয়ে সগর্বে জানিয়ে দিয়ে এসেছেন-পাহাড় এ রাজ্যের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তাঁর জীবন থাকতে কেউ তা বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালাতে পারবে না। সাহস বেড়েছে শান্তিপ্রিয় পাহাড়বাসীর। তৃপ্ত হয়েছে দার্জিলিং নিয়ে নস্ট্যালজিক বাঙালি। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে। নিয়ম করে ফি মাসেই এখন পাহাড়ের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত চষে বেড়াচ্ছেন মমতা। শুধু পাহাড়ে যাওয়াই নয়, যখনই যাচ্ছেন উন্নয়নের স্পর্শে পুলকিত হচ্ছে পাহাড়বাসী। আর তাই সুবাস ঘিসিংয়ের পুত্র মান ঘিসিং আর মোর্চার সেকেন্ড-ইন-কমান্ড রোশন গিরির বোন পরিশমা গিরি এখন মমতার উন্নয়ন রথে সওয়ার হয়েছেন। পাহাড়ের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ঘুরে তাঁরা বলছেন, মমতাদিদি, একমাত্র মমতাদিদিই পারেন পাহাড়বাসীর মুখে হাসি ফোটাতে।
পিছিয়ে পড়া সমস্ত জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক মানোন্নয়নই যে পাহাড়ের সামগ্রিক অগ্রগতির সূচক—বিষয়টা উপলব্ধিতে থাকলেও, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুই হোন কিংবা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, হেঁটেছেন কিন্তু ভিন্ন পথে। পাহাড়ের উন্নয়নের নামে শুধু চা-বাগান আর মোটর স্ট্যান্ডে সিটুর লালপতাকা উড়িয়েই ক্ষান্ত ছিলেন জ্যোতিবাবু আর তাঁর উত্তরসূরিরা। পাহাড় যে লালপার্টির গড়, তা বোঝাতে শংসাপত্রের মতো দার্জিলিং, কার্শিয়াং আর কালিম্পং থেকে বছরের পর বছর শুধু এমএলএ তৈরি করিয়েই সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে ব্যস্ত ছিল সিপিএম অ্যান্ড কোম্পানি। দলের কিছু মাতব্বর ‘দাজুভাই’ আর ‘আমলা’কে পাহাড়ের ভাগ্যনিয়ন্ত্রক বানিয়ে ফি বছরে একবার করে কনভয় নিয়ে দার্জিলিং পাহাড়ে চড়তেন বামপন্থী তাত্ত্বিকরা। মেঘমুক্ত আবহাওয়ায় ঝকঝকে কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি ক্যামেরাবন্দি করে ফিরে যেতেন সমতলে, পাহাড়ে সব শান্তিতে রয়েছে। মূল সমস্যা কী, কোথায় অবস্থান পাহাড়ের আদিম জনগোষ্ঠীগুলির, কেন হচ্ছে না তাদের উন্নয়ন, কেন তৃণমূলস্তরে পৌঁছাচ্ছে না বরাদ্দকৃত উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ, সে সব ভাবার সময় ছিল না আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের কর্তাদের। বামপন্থীরা অন্তত মুখে বলেন, তাঁদের বিশ্বাস ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে। কিন্তু পাহাড়ের ক্ষেত্রে দলের মাতব্বর ও আমলা নির্ভর পরিকাঠামোর উপর যেটা ভর করেছিল, সেটা ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ। আর সে কারণেই ঘিসিং আমলের ছ’বছরের অরাজকতা আর লুটপাট শেষেও পাথর হয়ে ছিল তৎকালীন রাজ্য সরকার। ২০০৪ সালে ডিজিএইচসি’র মেয়াদ শেষের পরেও ঘিসিংকে চটিয়ে পাহাড়ে নিবরাচন করার সাহস দেখাননি লালপার্টির কর্তারা। বরং উলটে ঘিসিংকে পাহাড়ের ‘সোল কেয়ার এজেন্ট’ বানিয়ে দিয়ে মহাকরণের ঠান্ডি ঘরে নিশ্চিন্তে ছিলেন মন্ত্রী-সান্ত্রীরা।
ক্ষমতায় আসার পর থেকে অন্তত পাহাড়ের ক্ষেত্রে আসল বামপন্থী হিসাবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন মমতা। পাহাড়ের উন্নয়নে তাঁর ইউএসপি—ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। আর তাই, প্রত্যন্ত গ্রামে লেপচা, শেরপা, তামাং, ভুটিয়া, ভুজেল, কামি, শারকি, মঙ্গের, দামাই, গুরুংদের মতো পিছিয়ে পডা জনগোষ্ঠীর কাছে উন্নয়নের যাবতীয় রসদ পৌঁছে দেওয়াটাকেই ব্রত করেছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। অনুন্নয়ন, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, খিদে, বেহাল স্বাস্থ্য পরিষেবা, ভাঙাচোরা সড়ক আর পানীয় জলের অপ্রতুলতা নিয়ে দিন কাটানো বস্তিগুলিতে ‘ডোরস্টেপ’ উন্নয়ন পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন মমতা। ২০১২ সাল থেকে শুরু করে চলতি ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত পাহাড়ে মুখ্যমন্ত্রী গড়েছেন ১৫টি উন্নয়ন পর্ষদ। পর্ষদগুলির হাতে পৌঁছে গিয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। সেই টাকা দিয়ে তৈরি হয়েছে বাসস্থান, ভাষা আর সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র, পানীয় জলের ব্যবস্থা আর স্বাস্থ্যকেন্দ্র। চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে পাহাড় সফরে গিয়ে ফের দু’টি উন্নয়ন পর্ষদের ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এবার কিন্তু পাহাড়ের জন্য নয়! পাহাড়ের পাদদেশে তরাই-ডুয়ার্স এলাকার গোর্খা আর আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য পৃথক দু’টি উন্নয়ন পর্ষদ গঠনের ঘোষণা মমতাকে এগিয়ে দিয়েছে অনেকেটাই। মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তিনি যেমন উন্নয়নকে হাতিয়ার করেছেন, ঠিক তেমনই সংগঠক হিসাবে পাহাড়ের বিভিন্ন প্রান্তে সভা করে মোর্চা শিবির ভাঙানোর কাজটা কিন্তু সারছেন তাঁর বিশ্বস্ত সৈনিক অরূপ বিশ্বাস। এহেন সাঁড়াশি চাপে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া এসেছে মোর্চা শিবির থেকে। তাদের নাকি ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে রেখে পাহাড়ে নিজের আধিপত্য কায়েম করতে চাইছেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য, গুরুংরা বোধহয় ভুলে গিয়েছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, তার ভৌগোলিক সীমার মধ্যে রয়েছে দার্জিলিংও।
আলাদা রাজ্যের ‘খোয়াব’ দেখিয়ে পাহাড়ের মানুষকে যে আর বিপথে চালিত করা যাবে না, তা বেশ বুঝতে পেরেছেন দার্জিলিংয়ের পাতলেবাসের বাসিন্দা বিমল গুরুং। বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর ঘনঘন পাহাড়যাত্রা আর পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে একের পর এক পদক্ষেপ যে, বিচ্ছিন্নতাবাদের বিষবৃক্ষকে নাড়িয়ে দিয়েছে, তা বিলক্ষণ বুঝেছে দার্জিলিং শহরের সিংমারিতে মোর্চার সদর দপ্তর। আর তাই গোর্খাজাতির বর্তমান স্বঘোষিত ‘মসিহা’ পায়ের নীচে ধসতে থাকা মাটিকে ধরে রাখতে, ফের আঁকড়ে ধরতে চাইছে বন্ধ-অবরোধের রাজনীতিকে। চলতি মাসের ১৫ ফেব্রুয়ারি মুখ্যমন্ত্রী যখন কালিম্পংয়ে, ঠিক তখন দার্জিলিংয়ে সাংবাদিকদের ডেকে ফের পাহাড়ে আগুন জ্বলার হুমকি দিয়েছেন গুরুং। খবরটা পৌঁছে যায় মমতার কাছেও। কোনও মন্তব্য না করে নিজের কাজটি সেরেছেন তিনি। পুলিশ-প্রশাসনের কর্তাদের ডেকে মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন—শান্ত পাহাড়কে অশান্ত করার চেষ্টা অত্যন্ত কড়া হাতে দমন করতে হবে। কিছুতেই বরদাস্ত করা হবে না বিভেদ আর বিচ্ছিন্ন করার রাজনীতিকে। এর পালটা কোনও প্রতিক্রিয়া অবশ্য মেলেনি মোর্চা শিবির থেকে।
অনুন্নয়ন আর অপদার্থতাকে ঢাকতে পাহাড়ে আলাদা রাজ্যের খোয়াবকে জিগিয়ে রাখার প্রয়াস যে চলবে, তা বিলক্ষণ বুঝেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। গোটা পাহাড়ের সামগ্রিক উন্নয়নই যে সমতলের সঙ্গে দার্জিলিং, কার্শিয়াং আর কালিম্পংকে একাত্ম করতে পারে, সে উপলব্ধিও তাঁর নিজের। সে কারণেই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর (যাদের ভিত বানিয়ে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের ইমারত গড়া হচ্ছিল) প্রকৃত মানোন্নয়নকেই ‘পাখির চোখ’ করে ফেলেছেন মমতা। পাঁচ বছর আগে লেপচা উন্নয়ন বোর্ড দিয়ে শুরু করেছিলেন যাত্রা। এবারের কালিম্পং সফর শেষে জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক পর্ষদের সংখ্যা ১৭। উন্নয়ন পর্ষদে ঢুকে গিয়েছেন পাহাড়ের বাংলাভাষী এবং হিন্দিভাষীরাও। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দিয়ে এসেছেন, যে বোর্ড যত তাড়াতাড়ি জমা দেবে কাজের ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট, তত তাড়াতাড়ি মিলবে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত পরবর্তী কিস্তির টাকা। জনগোষ্ঠীগুলিও প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতে শুরু করেছে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীকে। কেউ বলছে ‘কিংচুম ডরমিত’ (ভাগ্যবিধাতা), কেউ খেতাব দিয়েছে ‘নাংসল ডলমা’ (আলোকবর্তিকা) আবার কেউ বলছে ‘ফায়াফুলা মেজর’ (বিপদের বন্ধু)। বিমল গুরুংদের গাত্রদাহ শুরু এখান থেকেই। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী তাঁর মৌরসিপাট্টায় আঘাত হেনেছেন উন্নয়ন দিয়ে, পাহাড়ের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে নতুন করে বাঁচার পথ দেখিয়ে। মোর্চা প্রধান আর তাঁর দলবলরা এখন টলমলে আসন টিকিয়ে রাখতে ফের জিগির তুলেছেন—গোর্খাল্যান্ড চাইনছু’র। কিন্তু পাহাড়ের প্রতিটি প্রান্তে এখন পালটা স্লোগান উঠেছে সিংহগর্জনে—মমতা সিনে নানা (স্বাগতম মমতাদিদি)/ মমতাদিদি ছেয়জেলো (মমতাদিদি দীর্ঘজীবী হোন)/ গোর্খাল্যান্ড চাইনো না, চাইনো না/বিকাশ চাইনছু (গোর্খাল্যান্ড চাই না/উন্নয়ন চাই)।

 গ্রাফিক্স: সোমনাথ পাল

শিকাগোয় ভাষণ: স্বামীজির পাগড়ি আজও সংরক্ষিত রয়েছে হাওড়ার ঘোষবাড়িতে

স্বামীজি বলেন, আমি সন্ন্যাসী মানুষ, আমার কাছে দেওয়ার মতো কিছু নেই। তবে আমার এই পাগড়িটি আমি সামান্য উপহার হিসাবে দিচ্ছি। লিখেছেন বিভাস মজুমদার।

অভিনব অনেকরকম উপহারের কথা আমরা নানা সময় শুনে থাকি। কিন্তু মুরগির মাংস খেয়ে ভালো লাগায় সৌজন্যবশত নিজের পাগড়িটিই উপহার দেওয়ার ঘটনা অন্যরকম বইকি। সেটি আবার কোনও সাধারণ পাগড়ি নয়, সেটির একটা ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। আসলে সেই পাগড়িটি ছিল স্বামী বিবেকানন্দের। আর তিনি তা উপহার দিয়েছিলেন এক গৃহকর্ত্রীকে। কে এই গৃহকর্ত্রী, তাঁকে দেওয়া উপহারটির কেনই বা ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে তা জানার আগে ফিরে যাওয়া যাক আজ থেকে ১১৯ বছর আগের কথায়।
সময়টা ছিল ১৮৯৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। সেদিন ছিল মাঘী পূর্ণিমা তিথি। আলমবাজার থেকে একটি নৌকাতে আরও কয়েকজন সন্ন্যাসীকে সঙ্গে নিয়ে হাওড়ার রামকৃষ্ণপুর ঘাটে এসে পৌঁছলেন স্বামী বিবেকানন্দ। এর আগে শিকাগো ধর্ম মহাসমাবেশে ভাষণ দিয়ে সেদেশের মানুষের মন জয় করে ভারতে ফিরেছেন যুবক সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ। স্বভাবতই তরুণ এই সন্ন্যাসীকে দেখতে হাওড়ার রামকৃষ্ণপুর ঘাটে সেদিন বহু মানুষ ভিড় জমিয়েছিলেন। তবে তাতে ভ্রুক্ষেপ ছিল না স্বামীজির। নৌকা থেকে নেমেই তিনি গলায় ঝুলিয়ে নিলেন খোল। তা বাজিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে গেলে উঠলেন ‘কে রে ওরে দিগম্বরা এসেছ কুটিরঘরে’। তাঁর সঙ্গে গলা মেলালেন অন্যান্য সন্ন্যাসীরাও। গঙ্গার ঘাট থেকে গান গেয়ে খালি পায়েই চললেন রামকৃষ্ণপুরে নবগোপাল ঘোষের বাড়িতে। স্বামীজি সঙ্গে করে বার্লিন থেকে আনা পোর্সিলিনের তৈরি শ্রীরামকৃষ্ণের একটি মূর্তি এনেছিলেন। সেই মূর্তিটি মাথায় করে নিয়ে স্বামী প্রকাশানন্দজী গঙ্গার ঘাট থেকে নবগোপালবাবুর বাড়িতে নিয়ে এলেন। সেখানে পৌঁছানোর পরে স্বামীজির সঙ্গে তিনি সোজা চলে গেলেন বাড়ির ঠাকুরঘরে। মার্বেল বাঁধানো এই ঠাকুরঘরেই বেদির উপরেই বসানো হল পোর্সিলিনের তৈরি শ্রীরামকৃষ্ণের মূর্তিটি। বলতে গেলে নবগোপালবাবুকে স্বামীজি এই পটটি এদিন উপহার দিয়েছিলেন।
প্রসঙ্গত, নবগোপালবাবু ছিলেন তৎকালীন একটি মার্চেন্ট ফার্মের চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট। ঘটনাচক্রে তিনি একবার তাঁর এক সহকর্মীর সঙ্গে দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেই সাক্ষাতের পর বছরখানেক পার হয়ে গিয়েছে। তিনি আর ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করতে যাননি। কিন্তু একদিন হঠাৎই তাঁকে ডেকে পাঠালেন স্বয়ং রামকৃষ্ণদেবই। এই সাক্ষাৎই নবগোপালবাবুর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। তিনি ক্রমেই শ্রীরামকৃষ্ণদেবের প্রতি একটা অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করতে লাগলেন। স্বভাবতই দক্ষিণেশ্বরে তাঁর যাতায়াত বেড়ে গেল। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে গোটা পরিবারই শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ভক্ত হয়ে পড়লেন। তখন নবগোপালবাবু সপরিবারে রাজাবাজারের কাছে বাদুরবাগানে থাকতেন। সেখানে একবার স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণদেবও এসেছিলেন। ১৮৯০ সালের শেষের দিকে নবগোপালবাবু হাওড়ার রামকৃষ্ণপুরে নতুন বাড়িতে সপরিবারে চলে আসেন। এই বাড়িতে তখন রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের সমাগম লেগেই থাকত। তবে আর সকলে এলেও স্বামীজি এ বাড়িতে সেসময় আসেননি। পরে যখন শিকাগোয় ধর্ম মহাসম্মেলনে আমেরিকাবাসীর মন জয় করে দেশে ফিরলেন, তখন নবগোপালবাবু স্বামীজিকে তাঁর বাড়িতে আসার আমন্ত্রণ জানান। এরপরই ১৮৯৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তিনি পোর্সিলিনের তৈরি শ্রীরামকৃষ্ণের পটটি নিয়ে নবগোপালবাবু বাড়িতে যান। পটটি স্থাপন করার জন্য যে মার্বেলের বেদি তৈরি করা হয়েছিল সেটিকে নবগোপালবাবুর স্ত্রী নিস্তারিনীদেবী ‘গরিবের সামান্য প্রচেষ্টা’ বলে স্বামীজির কাছে মন্তব্য করে বসেন। তা শুনে স্বামীজি আর স্থির থাকতে পারেননি। তাঁর সহাস্য জবাব ছিল, ‘তোমার ঠাকুরের চোদ্দপুরুষও এরকম মার্বেল বাঁধানো ঘরে থাকেনি। ঠাকুর এখানে ভালো থাকবে নাতো কোথায় থাকবে’?
এবার স্বামীজি শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে পুজো করবেন বলে স্থির করলেও কি মন্ত্রে তাঁকে পুজো করবেন তা প্রথমে ঠিক করেননি। তখন তিনি ওই বাড়িতে বসেই রচনা করলেন শ্রীরামকৃষ্ণের প্রণাম মন্ত্র। পুজো করতে গিয়ে তিনি বলে উঠলেন, ‘ওঁ-স্থাপকায় চ ধর্মস্য সর্বধর্মস্বরূপিনে অবতার বরিষ্ঠায় রামকৃষ্ণায়তে নমঃ।’ স্বামীজির রচিত সেই প্রণাম মন্ত্রের মাধ্যমেই এখন রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতিটি শাখায় শ্রীরামকৃষ্ণদেবের পুজো শুরু করা হয়। এখানে আর একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল, যেকোনও পুজো করার সময় কারোর নামে সংকল্প করার রীতি রয়েছে। সেই রীতি মেনে কাকে সংকল্প করে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের পুজো করা হবে তা নিয়ে সেদিন প্রশ্ন ওঠে। স্বামীজিই তার সমাধান করে দেন। তিনি শ্রীমায়ের (সারদাদেবী) নামে সংকল্প করে পুজো শুরু করেন। সেই থেকে রামকৃষ্ণ মিশনের সর্বত্র শ্রীমায়ের নামেই সংকল্প করে পুজো করা হয়ে থাকে।
১৮৯৮ সালে রামকৃষ্ণদেবের মূর্তি স্থাপন উপলক্ষে আয়োজিত পুজো সম্পর্কে নবগোপালবাবুর প্রপৌত্র অধ্যাপক সুব্রত ঘোষের দাবি, সেদিন স্বামীজিই এই বাড়িতে প্রথম শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে অবতার রূপে পুজো করেন। এর আগে কখনও অবতার রূপে শ্রীরামকৃষ্ণদেব পূজিত হননি। ওইদিনের আরও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা রয়েছে যা শুধু তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যই জানেন। সেই ঘটনাটি হল-সে সময় এখনকার মতো হিন্দু বাড়িতে মুরগির মাংস খাওয়ার চল ছিল না। মুরগিকে বলা হত ‘রামপাখি’। স্বামীজি হঠাৎই নবগোপালবাবুর স্ত্রী নিস্তারিনীদেবীর কাছে রামপাখির মাংস খাওয়ানোর অনুরোধ করে বসেন। বৌদি হয়ে স্বামীজির সেই অনুরোধ তিনি ফেলতে পারেননি। মুরগির মাংসের বিরিয়ানি রেঁধে খাওয়ালেন। স্বামীজি বেশ তৃপ্তি করে খেয়েছিলেন সেই রামপাখির বিরিয়ানি। এরপর সারাদিনের পর বাড়ি ফিরে যাওয়ার সময় স্বামীজি ওই রামপাখির মাংস রান্নার খুব প্রশংসা করেন। স্বামীজি বলেন, আমি সন্ন্যাসী মানুষ, আমার কাছে দেওয়ার মতো কিছু নেই। তবে আমার এই পাগড়িটি আমি সামান্য উপহার হিসাবে দিচ্ছি। স্বামীজি পাগড়িটিকে সামান্য উপহার বললেও এটির ঐতিহাসিক দিক দিয়ে এটি অমূল্য। কারণ এই পাগড়ি পরেই তিনি শিকাগোয় ভাষণ দিয়েছিলেন। ওই পাগড়িটি এখনও নবগোপালবাবুদের বাড়িতে সংরক্ষিত রয়েছে। প্রতি বছরই মাঘী পূর্ণিমায় তা জনসমক্ষে প্রদর্শনের জন্য বের করা হয়। ওই পাগড়িটি ছাড়াও বেশকিছু ঐতিহাসিক সামগ্রীও নবগোপালবাবুর পরিবার বংশ পরম্পরায় সংরক্ষণ করে আসছেন। তার মধ্যে রয়েছে সেকালের বিখ্যাত বাদ্যযন্ত্র প্রস্তুতকারক সংস্থা মিলার অ্যান্ড কোম্পানির হারমোনিয়াম, শ্রীরামকৃষ্ণ ও সারদাদেবী ও স্বামী বিবেকানন্দের বিরাট অয়েল পেন্টিং। আর রয়েছে স্বামীজির দেওয়া শ্রীরামকৃষ্ণের পোর্সিলিনের মূর্তিটিও রয়েছে। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল তৈরিতে যে ধরনের মার্বেল পাথর ব্যবহার করা হয়েছিল সেই একই মানের পাথর এ বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের মূর্তি বসানোর জন্য বেদি গড়তে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে সুব্রতবাবু জানিয়েছেন। এই পাথরের বেদি এবং সেইসব পুরানো ঐতিহাসিক সামগ্রীগুলো সযত্নে আজও রক্ষণাবেক্ষণ করে চলেছেন ঘোষ পরিবারের বংশধরেরা।

 পোর্সিলিনের তৈরি শ্রীরামকৃষ্ণের মূর্তিটির ছবি তুলেছেন অতূণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

রেড ইন্ডিয়ান, আদিবাসীদের অস্তিত্ব মুছে
‘আচ্ছে দিন’ চান ট্রাম্প


বিতর্কিত ডাকোটা অ্যাকসেস ও কিস্টোন পাইপলাইন স্থাপনের অনুমতি, এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশন এজেন্সির (ইপিএ) চুক্তি বাতিল এবং এই প্রথম ইপিএ-র ওয়েবসাইট থেকে জলবায়ু পরিবতর্নের কথা মুছে ফেলার নির্দেশের মধ্য দিয়ে আতঙ্ক তৈরি করেছেন ট্রাম্প। ভয়ে পরিবেশবিদরাও গুটিয়ে গিয়েছেন। লিখেছেন মৃণালকান্তি দাস।

অপরিশোধিত তেল পরিবহনে ‘বিতর্কিত’ দু’টি পাইপলাইনের অনুমোদন দিয়ে রীতিমতো আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউজে ঢোকার চারদিনের মধ্যে কিস্টোন এক্সএল ও ডাকোটা অ্যাকসেস প্রকল্প দু’টিতে স্বাক্ষরের মাধ্যমে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, পরিবেশবিদের অভিযোগ, প্রতিবাদকে পাত্তা না দিয়ে পাইপলাইনের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। কারণ, এই প্রকল্পে নাকি বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান তৈরি হবে। আমেরিকানদের কাজের সুযোগ করে দেওয়াই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’। তার জন্য ‘ক্লাইমেট জাস্টিস’ রসাতলে গেলে তাঁর কিছু এসে যায় না। ‘সাসটেনেবল লাইফস্টাইল’ বা ‘সুস্থায়ী জীবনশৈলী’ মেনে চলারও কোনও দায় নেই।
অথচ, পরিবেশের কথা মাথায় রেখে ২০১৫ সালের শেষের দিকে ওবামা প্রশাসন কানাডা থেকে টেক্সাসে অপরিশোধিত তেল পরিবহনে কিস্টোন এক্সএল পাইপলাইন স্থাপন স্থগিত করে দিয়েছিল। স্থানীয় আদিবাসীদের বিক্ষোভের মুখে ডাকোটা পাইপলাইনের জন্য বিকল্প রুট অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মার্কিন সেনাবাহিনী। ওবামা প্রশাসনের সেইসব সিদ্ধান্তকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিয়ে ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন, ‘এখন থেকে আমরা পাইপলাইন তৈরি করতে থাকব, ঠিক যেমনটি আমরা পুরোনো দিনে করেছি।’ একই সুরে নর্থ ডাকোটার গভর্নর জ্যাক ডালরিম্পল জানিয়ে দিয়েছেন, পাইপলাইনের রুট পরিবর্তন করার সুযোগ নেই। তবে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে পরিবেশবিদ মাইকেল ব্রুন বলেছিলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প চার দিন হল অফিস করছেন এবং এরই মধ্যে তিনি আমাদের জলবায়ুর ক্ষেত্রে বিপজ্জনক হিসেবে প্রমাণিত হতে শুরু করেছেন, যেমনটি আমরা আশঙ্কা করেছিলাম আগেই।’ প্রতিবাদ করেছেন, গ্রিনপিসের অ্যানি লিওনার্ড-ও। এই ট্রাম্পই তো মনে করেন, জ্বালানি চাহিদা মেটানোর জন্য জীবাশ্মের ভালো বিকল্প নেই।
লক্ষ্য করুন, লন্ডন ইকোনমিস্ট ২০১৫-র ১৮ ডিসেম্বর লেখে, মূলত রিপাবলিকানদের উৎসাহ এবং মার্কিন তেল ব্যবসায়ী লবির দু’বছর ধরে চাপে নতুন একটি বিল আসে। আইনটি পাস হয় ১৮ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে। আমেরিকান পুঁজিবাজারবিষয়ক মুখ্য পত্রিকা ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ মন্তব্য করে লেখে, চল্লিশ বছর নিষিদ্ধ থাকার পরে ‘এই সিদ্ধান্ত ঐতিহাসিক’ এবং ‘এতে আমেরিকান তেল উৎপাদনকারীদের বাজারে চাপে ও তোড়ের মুখে পড়ে আমেরিকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক

পটবদল’ প্রতিফলিত। এর অর্থ, এখন থেকে আমেরিকান তেল রপ্তানি করা যাবে। আমেরিকার রপ্তানি করার মতো তেল থাকা সত্ত্বেও আইন করে নিষেধাজ্ঞা ছিল, যাতে রপ্তানি করা না যায়।
‘বিতর্কিত’ দুই পাইপলাইনের মধ্যে ডাকোটার পাইপলাইনটি আদিবাসী, রেড ইন্ডিয়ানদের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাওয়ার কথা। অভিযোগ, অপরিশোধিত তেল পরিবহনের জন্য নর্থ ডাকোটা থেকে শিকাগোর পরিশোধনাগার পর্যন্ত প্রস্তাবিত পাইপলাইন স্থাপিত হলে, মুছে যেতে পারে রেড ইন্ডিয়ান, আদিবাসী গোষ্ঠীগুলির অস্তিত্ব। সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে জলের উপর। আদিবাসী গোষ্ঠীর নেতারা বলছেন, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত ‘আইন ও আদিবাসী চুক্তি’র লঙ্ঘন। তারা এর বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়েরও কথা ঘোষণা করেছেন। আদিবাসী গোষ্ঠীটির চেয়ারম্যান ডেভ আর্জামবল্ট দ্বিতীয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ‘আমেরিকানরা জানে যে এই পাইপলাইন অন্যায্যভাবে আমাদের গোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তা আমাদের না জানিয়েই করা হয়েছে।’ পাইপলাইনবিরোধী ওই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন কয়েক হাজার অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন সেনাও। জেলে যেতে হয়েছে কয়েকশো আন্দোলনকারীকে। আন্দোলনে যোগ দিয়ে গত বছর অক্টোবরে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন হলিউডের ‘দ্য ফল্ট ইন আওয়ার স্টারস’ অভিনেত্রী শেইলিন উডলি। ডাকোটা অ্যাকসেস পাইপলাইন প্রকল্পে তখন চারটি অঙ্গরাজ্যজুড়ে তেলের পাইপলাইন বসানোর কাজ চলছে। এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে ৩০০ জন মানুষ নিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি চলার সময় ফেসবুকে লাইভ করছিলেন উডলি। অনধিকার প্রবেশের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল হলিউডের অভিনেত্রীকে। আদিবাসী বিক্ষোভকারীদের উপর পুলিশ লেলিয়ে দিয়েছে শিকারী ‍কুকুরও। ট্যুইটার জুড়ে #NoDAPL শীর্ষক হ্যাশট্যাগে ডাকোটা অ্যাকসেস লাইনের বিরোধিতা শুরু করেছে কয়েক হাজার আদিবাসী। আর মাঠে নিজেদের ঘোড়ায় চড়ে নিজস্ব প্রথা ও ভাষায় প্রতিবাদ জানানো শুরু করেছে। আদিবাসীদের দাবি, তেলের পাইপলাইন করার মাধ্যমে তাদের পবিত্র স্থান ধ্বংস করছে শ্বেতাঙ্গ মার্কিন সরকার। আদিবাসীরা বলছে, মিজৌরি নদীর জল এই তেলের পাইপলাইন নষ্ট করবে। তাঁদের জল চাই, তেল নয়।

ওবামার জমানায় যে রাক্ষস ঘুমিয়ে পড়েছিল, সোনার কাঠি ছুঁইয়ে তার ঘুম ভাঙিয়েছেন ট্রাম্প। ফলে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলি ট্রাম্পের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে ভোলেনি। তাদের পক্ষে রয়েছেন কিছু রিপাবলিকানও। টেক্সাসের সিনেটর জন করনিন বলেই ফেলেছিলেন, ‘এই খবর মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার মতো। এটা প্রমাণ করে যে, আমেরিকার কর্মীদের জন্য যা সবচেয়ে ভালো হবে তা বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনও বিশেষ স্বার্থ নিয়ে কাজ করা উগ্রবাদী দলকে বাধা হয়ে দাঁড়াতে দেবেন না।’ ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নতুন প্রশাসনে পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার প্রধান হিসেবে স্কট প্রুইটকে বেছে নিয়েছেন। ওকলাহোমার এই অ্যাটর্নি জেনারেল প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত নীতির ঘোর বিরোধী হিসেবেও পরিচিত। তিনি শিল্পক্ষেত্রে জীবাশ্ম জ্বালানি বা ফসিল ফুয়েল ব্যবহারের পক্ষে। সমালোচকরা বলছেন, প্রুইট তো জলবায়ু পরিবর্তনকে স্বীকারই করেন না। এহেন পরিবেশবিরোধী ব্যক্তিকে পরিবেশ বিষয়ক সংস্থার শীর্ষ পদে বসানো কতটা বিপজ্জনক তা টের পাওয়া যাচ্ছে ‘বিতর্কিত’ দু’টি পাইপলাইনের অনুমোদনেই।
কানাডা থেকে আমেরিকার গালফ উপকূল পর্যন্ত তেলের দীর্ঘ পাইপলাইন তৈরির প্রস্তুতি নিয়েছিল কানাডার কোম্পানি ট্রান্সকানাডা। ৮৭৫ মাইল দীর্ঘ প্রস্তাবিত এই পাইপলাইনটি কানাডার অ্যালবার্টা থেকে আমেরিকার নেব্রাস্কাতে জ্বালানি তেল সরবরাহে ব্যবহার করার কথা। মোট খরচ ২৩০ কোটি ডলার। এটি নির্মাণ হলে এর মধ্য দিয়ে দৈনিক ৭ লক্ষ ব্যারেল তেল সরবরাহ করা যাবে। পরিবেশবিদদের বিক্ষোভের জেরে ওবামা সমই বিতর্কিত পাইপলাইন নির্মাণ কাজের বিলে ভেটো দেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন বলেছিলেন, তিনি এই পাইপলাইন নির্মাণের ঘোর বিরোধী। জবাবে রিপাবলিকান শিবির থেকে ট্যুইটারে বলা হয়েছিল, হিলারি আমেরিকানদের চাকরির চেয়ে উগ্র পরিবেশবিদদের বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। আশঙ্কা করা হয়েছিল নেচার ক্লাইমেট চেঞ্জ সাময়িকীতে: আমেরিকা যদি আরও বেশি জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ায় এবং বাকি বিশ্বও তার পথ অনুসরণ করে তাহলে পৃথিবীর ধ্বংস হওয়া সময়ের অপেক্ষা। কানাডা চাইছিল ট্রাম্পের জয়। কারণ, কানাডার সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার আমেরিকা। ট্রাম্প ক্ষমতায় এলে, কিস্টোন এক্সএলের পাইপলাইন নিয়ে যাবতীয় বাধা দূর হবে। কানাডার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হার্পারের সময় থেকেই এই পাইপলাইন নিয়ে উদ্যোগী কানাডা। তার উত্তরসূরি জাস্টিন ট্রুডোর সরকারও এই পাইপলাইনের পক্ষে। এই পাইপলাইনের প্রকল্পে ট্রাম্পের স্বাক্ষরের পর তাই কানাডার প্রাকৃতিক সম্পদবিষয়ক মন্ত্রী ট্রাম্পের এই উদ্যোগের প্রশংসাই করেছেন। আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মার্কিন বিজ্ঞানীদের আতঙ্কের মধ্যে রেখেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিজ্ঞানীরা এতটাই গুটিয়ে গিয়েছেন যে, ট্রাম্পের এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতেও রাজি হচ্ছেন না অনেকে। বিতর্কিত ডাকোটা অ্যাকসেস ও কিস্টোন পাইপলাইন স্থাপনের অনুমতি, এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশন এজেন্সির (ইপিএ) চুক্তি বাতিল এবং এই প্রথম ইপিএ-র ওয়েবসাইট থেকে জলবায়ু পরিবতর্নের কথা মুছে ফেলার নির্দেশের মধ্য দিয়ে এই আতঙ্ক তৈরি করেছেন ট্রাম্প। এমনকী আমেরিকার পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার কর্মীদেরও ব্লগ লিখতে ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠাতেও বারণ করা হয়েছে।
মার্কিন নাগরিকদের ‘আচ্ছে দিন’–এর স্বপ্ন দেখিয়েছেন। পরিবেশবিদদের হুঁশিয়ারি দিয়ে স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, আন্দোলন করে আমেরিকানদের জন্য চাকরির সুযোগ কমানো চলবে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত নিজমূর্তি ধারণ করছেন। সেই মূর্তি ভীতিপ্রদ। সুতরাং, দুনিয়া সাবধান!

দূষণে সবার সেরা
এখন ফুসফুসের রোগের রাজধানী হয়ে উঠছে দিল্লি
তিন বছর আগে ‘হু’-এর এই ধরনের সমীক্ষার রিপোর্ট বলছে, অন্যান্য শহরের তুলনায় দিল্লির বাতাসই সবচেয়ে বেশি দূষিত। লিখেছেন অয়নকুমার দত্ত।


বায়ুদূষণের ঠেলায় দু’চোখে অন্ধকার দেখছেন দিল্লিবাসী। শীতের মরশুমে পরিস্থিতি বেজায় ঘোরালো হয়েছিল। শীত কাটতে একটু হলেও স্বস্তি মিলেছে। রাজধানীর বায়ুদূষণে লাগাম টানতে উঠে পড়ে লেগেছে কেন্দ্র ও রাজ্য- দুই সরকারই। কিন্তু এখনও সেভাবে কাজের কাজ কিছুই চোখে পড়ছে না।
বিশ্বের সব দেশের কাছেই এখন দূষণ প্রধান সমস্যা। আর এই সমস্যা আরও প্রকট উন্নয়নশীল বিশ্বে। অবশ্য, দিল্লির বায়ুদূষণ যেন সব কিছুকে হার মানিয়েছে। বায়ুদূষণের অন্যতম চিন্তার কারণ বাতাসে শ্বাসবাহিত ধূলিকণার আধিক্য। এই শ্বাসবাহিত ধূলিকণার আয়তন ২.৫ মাইক্রোমিটার। এগুলি শ্বাসনালী দিয়ে ফুসফুসে ঢুকে গভীর সমস্যার সৃষ্টি করে। দিল্লির বাতাসে এই ধরনের ধূলিকণার ৩৮ শতাংশের উৎস রাস্তার ধুলো-বালি। ২০ শতাংশ আসে যানবাহন থেকে এবং ১২ শতাংশ শ্বাসবাহিত ধূলিকণা আসে নানা গৃহস্থলীর কাজ-কর্ম মারফত। এছাড়াও বাকি ৩০ শতাংশ ধূলিকণা নানা কারণে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। যার মধ্যে ১১ শতাংশের উৎস তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের ফ্লাই অ্যাশ প্রচণ্ড সমস্যার সৃষ্টি করে। দিল্লি থেকে বেশ খানিকটা দূরে বদরপুরে যে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে, তার জন্যও রাজধানীর বাতাস দূষিত হচ্ছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা। যেখানে এক কিউবিক মিটার বায়ুতে ২.৫ মাইক্রোমিটার আয়তনের ধূলিকণা ১০ মাইক্রোগ্রামের বেশি থাকা উচিত নয়, সেখানে দিল্লির বাতাসে এর পরিমাণ ১২২ মাইক্রোগ্রাম।
দিল্লির দূষণের মূল উৎস বাইরে থেকেই— আগাগোড়াই এমনটা দাবি করে আসছে রাজ্য সরকারের পরিবেশ দপ্তর। তাদের দাবি, দিল্লির মোট দূষণের ৬০ শতাংশই বাইরের কারণে। যা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাজ্য সরকারের হাতে নেই। সরকার বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে বিষয়টি পাশ কাটানোর চেষ্টা করলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-এর সতর্কবাণী সত্যিই উদ্বেগের। বিশ্বের বিভিন্ন বড় শহরের বায়ুদূষণ নিয়ে সমীক্ষা চালায় ‘হু’। তিন বছর আগে ‘হু’-এর এই ধরনের সমীক্ষার রিপোর্ট বলছে, অন্যান্য শহরের তুলনায় দিল্লির বাতাসই সবচেয়ে বেশি দূষিত।
২০১৬-এর গোড়ার দিকে বায়ুদূষণে রাশ টানতে কেজরিওয়াল সরকার যান চলাচলের ক্ষেত্রে ‘জোড়-বিজোড় নীতি’ (একদিন জোড় এবং পরের দিন বিজোড় নম্বর প্লেটের গাড়ি রাস্তায় নামবে) চালু করেছিল। তাতে খানিকটা কাজ হয়েছিল। এক ধাক্কায় রাজধানীর বায়ুদূষণ অনেকটা কমে গিয়েছিল। কিন্তু নানা কারণে এটি বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। অবশ্য, রাজধানীর বায়ুদূষণ ঠেকাতে বেশ কিছু দাওয়াই বাতলেছেন পরিবেশবিদরা। তাঁরাও যানবাহন চলাচলের উপর রাশ টানার পরামর্শ দিচ্ছেন। দিল্লিতে শহরের তুলনায় রাস্তা ২৫ শতাংশ। এ জন্য এই শহরে গাড়ির চাপ অত্যন্ত বেশি। যানজটে বাসিন্দাদের প্রাণ কণ্ঠাগত। দিল্লিতে গাড়ির গড় গতিবেগ ঘণ্টায় ২৫-৩০ কিলোমিটার। এর ফলে গাড়ির জ্বালানির অসম্পূর্ণ দহন হয়। যার জেরে বাতাসে বিষাক্ত গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে। জ্বালানির সম্পূর্ণ দহনের জন্য পেট্রল গাড়ির ক্ষেত্রে গতিবেগ ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার ও ডিজেল গাড়ির ক্ষেত্রে ৬০ কিলোমিটার হওয়া বাঞ্ছনীয়। তাই পরিবেশবিদদের মত, আবশ্যকীয় পণ্য পরিবহণের ট্রাক ছাড়া অন্যান্য পণ্য পরিবহণকারী ট্রাক দিল্লি শহরের বুকে ঢুকতে দেওয়া বন্ধ করা হোক। চালু হোক ‘জোড়-বিজোড় নীতি’। বন্ধ হোক দিল্লির আশপাশের ইটভাটা ও পাথর ক্রাশার। বদরপুর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়েও একটা সমাধান সূত্র বের করা হোক। পাশাপাশি, ডিজেল জেনারেটর ও বর্জ্য পদার্থ পোড়ানোর উপর জারি হোক নিষেধাজ্ঞা।
খুব তাড়াতাড়ি বায়ুদূষণ নিয়ে সচেতন না হলে দিল্লি ক্রমেই ফুসফুসের রোগের রাজধানীতে পরিণত হবে। বর্তমানে দেশের রাজধানীর যা হাল-হকিকত তাতে ধূমপায়ী নন, এমন বাসিন্দারও দিনে এক প্যাকেট সিগারেট খাওয়ার মতো ক্ষতি হচ্ছে। তাই দিল্লি দূষণরোধে যেমন চাই প্রশাসনিক উদ্যোগ, তেমনই চাই জনসচেতনতা বৃদ্ধি।





?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta