রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড়ি | ম্যাগাজিন


ক্ষমতা থাকলে তবেই ক্ষমতায়ন সম্ভব। কিন্তু যার হাতে ক্ষমতা নেই তার ক্ষমতায়ন নিয়ে বাদানুবাদ বিতর্ক হওয়া স্বাভাবিক। এটা ঠিক পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় ক্ষমতা যখন পুরুষেরই কুক্ষিগত এবং একচেটিয়া অধিকারভোগের নামান্তরমাত্র তখন নারীকে লড়াই করেই সেই ক্ষমতা দখল করতে হয় অথবা ছিনিয়ে নিতে হয়। ক্ষমতা হস্তান্তরের এই দ্বান্দ্বিক প্রেক্ষাপটে নারী-পুরুষের মধ্যে চোরাস্রোতের মতো অনবরত ঘটে চলেছে এক গোপন সংঘর্ষ। পরিবারের সর্বময় কর্তাটি যেমন অর্থোপার্জনের ক্ষমতায় নারীকে প্রায়শই অবমাননা করতে চায়, তেমনি সমাজে রাষ্ট্রনায়কেরাও চান রাজনৈতিক ক্ষমতায় বলীয়ান হয়ে মহিলা নাগরিকদের যাবতীয় স্বাধীনতা হরণ করতে, তাদের কণ্ঠরোধ করতে। ঘরে-বাইরে এই স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে নারীও চায় তার ক্ষমতা দখল, তার অধিকার আদায়ের সামাজিক স্বীকৃতি। কাজটা কঠিন হলেও নারীর ক্ষমতায়নের প্রক্রিয়া কিন্তু ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। নিঃসন্দেহে এটা একটা সদর্থক দিক। বিশেষত নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বিভিন্ন নারী আন্দোলনের ফলেই সম্ভব হয়েছে। ফলত জাতীয় মহিলা কমিশনসহ বিভিন্ন ধরনের জাতীয় কমিশন ও মহিলা বিষয়ক জাতীয় সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা গঠন। সংবিধানের ৭৩-তম ও ৭৪ সংশোধনীর সূত্রে স্থানীয় ও পৌর স্বায়ত্তশাসনে বিপুল সংখ্যায় নারীদের প্রতিনিধিত্বমূলক প্রবেশাধিকার স্বীকৃত হয়েছে। সংবিধানে ৩৩ শতাংশ মহিলা আসন সংরক্ষণও এ প্রসঙ্গে বিচার্য। ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৮-এ পাটনায় ‘মুখ্যমন্ত্রী কন্যা বিবাহ যোজনা’-র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশের প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতি প্রতিভাদেবী সিং পাতিল যথার্থই বলেছেন—‘জনসংখ্যার অর্ধাংশ জুড়েই রয়েছেন মহিলারা। তাঁরা যেদিন নিজেদের সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারবেন সেদিনই জাতি হিসাবে আমাদের সম্ভাবনাও পূর্ণ বিকশিত হবে। যতদিন না তা সম্ভব হয়, ততদিন পর্যন্ত অর্ধেক প্রতিভা, অর্ধেক অগ্রগতি ও উন্নয়নের অর্ধাংশ হারিয়ে যাবে। এক জাতি হিসাবে আমরা কখনওই তা হতে দিতে পারি না। দুটো চাকা শক্তিশালী না হলে রথ কখনওই এগিয়ে যেতে পারে না। দেশের রথকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে গেলে নারী ও পুরুষ—এই দুটি চাকাকেই শক্তিশালী হতে হবে এবং তাদের একইসঙ্গে পথ চলতে হবে।’ (‘নারীর ক্ষমতায়ন’ বিশেষ সংখ্যা)।
মহিলাদের ক্ষমতায়নের আর একটি বড় উৎস অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ এবং সেক্ষেত্রে তাদের উৎপাদক বা কর্মী (Worker) হিসাবেই অংশ নিতে হবে। কিন্তু একজন দক্ষ উৎপাদক বা কর্মী গঠনের মূল কথাই হল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। যেমন—কৃষিসংক্রান্ত কাজে যদি মহিলাদের অংশ নিতে হয় তবে ভূমি সংরক্ষণ, মাটি পরীক্ষা, রসায়ন ও জৈব সারসহ মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি, কীটনাশক, দুগ্ধ উৎপাদন, উদ্যানচর্চা, পশুপালন, মুরগিপালন, মৎস্যচাষ সহ সমগ্র কৃষি সংক্রান্ত বিষয়ে কর্মী হিসাবে হোক বা ব্যবস্থাপনায় হোক—শিক্ষাগ্রহণ অপরিহার্য। সঙ্গে সঙ্গে এসব শিক্ষিত গ্রামীণ মহিলারা ক্ষমতায়নের অন্যতম দিক ‘স্বনির্ভর গোষ্ঠী’ প্রকল্পেও প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করতে পারে। নোবেলজয়ী বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনই প্রথম দেখালেন যে, খাদ্যবণ্টন থেকে শুরু করে শিক্ষা-সাক্ষরতা, পুষ্টি-স্বাস্থ্য, পারিবারিক ও সামাজিক ভূমিকা—প্রায় সব ক্ষেত্রেই পুরুষদের থেকে নারীরাই ধারাবাহিক বঞ্চনার শিকার। এই প্রবণতাকে তিনি চিহ্নিত করেছেন ‘লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত’ নামে। তাঁর মতে নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে মূলত দুটি পদক্ষেপ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ—(১) নারীদের মধ্যে সাক্ষরতা ও শিক্ষার প্রসার (২) নির্দিষ্ট মজুরি বা মাহিনার বিনিময়ে বৃহত্তর কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এবং সেই সূত্রে আর্থিক স্বয়ম্ভরতা অর্জন। সুপ্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক ভব রায় দেখিয়েছেন কীভাবে নারীর ক্ষমতায়ন আজ এক অত্যন্ত জরুরি এবং প্রাসঙ্গিক তত্ত্বে পরিণত হতে পেরেছে—‘একদা ক্ষমতাহীন নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে ‘ক্ষমতা’কে তিনটি ভিন্ন মাত্রায় উপস্থাপিত করা হত। এগুলি হল—’power to’, ‘power with’ আর ‘power within’. প্রথম ‘power to’ অর্থাৎ নিজের বেঁচে থাকার ক্ষমতা (power to survive) নিজের শ্রমশক্তির সার্থক প্রয়োগ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ইত্যাদি। ‘power with’ হল নারীদের ‘যৌথ ক্ষমতা’ প্রয়োগের দিক। এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে লিঙ্গভিত্তিক আত্মমর্যাদা বিকাশের প্রসঙ্গটি।’ হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ফর এশিয়া (২০০০)-র তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, বিশ্বে মোট কাজের সময়ের ২/৩ অংশ সম্পন্ন করে মহিলারা কিন্তু মোট আয়ের ১/১০ অংশ অর্জন করে মহিলারা আর মোট সম্পত্তির মাত্র ১/১০ অংশের মালিক হয় মহিলারা। লক্ষণীয়, অর্থনৈতিক সাম্য ও স্বাধীনতার প্রশ্নে নারীরা আজও কতখানি বঞ্চিত এবং অবহেলিত। ন্যূনতম মজুরি বা সমকাজে সমমজুরি তো দূর অস্ত, এমনকী মাতৃত্বকালীন ছুটি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি আজও তাদের কাছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আকাশকুসুম ভাবনা ছাড়া কিছুই নয়।

সুমিত তালুকদার

অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে—
নির্মল করো, উজ্জ্বল করো সুন্দর করো হে।
জাগ্রত করো, উদ্যত করো, নির্ভয় করো হে।
মঙ্গল করো, নিরলস নিঃসংশয় করো হে।

নারীর মানবতার জয়গান গেয়েছেন কবি। নারী হল যেন ‘ধৃ’ ধাতুর রূপ। তিনি ধারণ করে রাখেন পরিবারকে, সমাজকে, দেশকে। আজকের এই আলোচনা সভায় স্মরণ করি শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার মহাশয়ের বক্তব্যকে। তিনি বলেছেন, নারী সমাজের মা। তাই পুরুষের উচিত নারীকে সর্বতোভাবে সাহায্য করা। পুরুষ নারীর কাছে বহুলাংশে ঋণী। তাই এটা সন্দেহাতীত যে নারীকে পুরুষের হাত থেকে তার স্বাধিকার পুনরুদ্ধার করতে হবে। নারীর অন্তর্নিহিত বিচ্যুতিগুলিকে করতে হবে দূরীভূত। একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙন, দৈনন্দিন জীবনের প্রতিকূলতা, চাপকে সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে না পারায় বহু নারী হীনমন্যতায় ভোগেন যা শ্রী সরকারের ‘নারী মুক্তি’ নিবন্ধের পাতায় পাতায় রয়েছে। ধরা যাক এই কাচের গ্লাস, প্রশ্ন করা হল আপনি কী দেখতে পাচ্ছেন—কেউ কেউ বললেন, অর্ধেক গ্লাসে জল আছে, আবার কেউ কেউ বললেন, অর্ধেক গ্লাসে জল নেই। কয়েকজন বললেন, অর্ধেক গ্লাসে জল আছে আর অর্ধেক গ্লাসে জল নেই।
যারা শুধু জল দেখেছেন তারা ইতিবাচক দিকেই দেখেন, যারা জল নেই দেখেন তারা নেতিবাচক দিক দেখেন, যারা উভয়ই দেখেন তারা নেতিবাচক+ইতিবাচক দুটি দিকই সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল। চলে আসি শ্রীপ্রভাতরঞ্জন সরকার মহাশয়ের বক্তব্যে। অধিকাংশ মানুষ হয় মহামান্যতা রোগে অথবা হীনমন্যতা রোগে ভোগে।
মানসিক সন্তলন এমনই এক মহৎ গুণ যা প্রতিটি মানুষের অর্জন করা উচিত। সন্তলিত মানসিক অবস্থা এমন একটা স্তর যেখানে মানুষ কোনও কমপ্লেক্স বা মানসিক রোগে ভোগে না, অর্থাৎ যেখানে মানুষের মধ্যে মহামন্যতা বা হীনমন্যতা রোগও নেই, আবার ভীতমন্যতা বা ঘৃণাভাবও নেই। সকলরকম কমপ্লেক্স বা মনোরোগ থেকে মানুষ মুক্ত থাকবে, কোনও প্রকার মনোরোগেই তারা ভুগবে না।
নারীর সঠিক কল্যাণ হবে কীভাবে? প্রভাতরঞ্জন সরকার মহাশয় বলেছেন এই স্তরগুলি হল আধিভৌতিক, আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক।
আধিভৌতিক মানে জগতটা পঞ্চভূত-সঞ্জাত, আধিদৈবিক মানে মন সঞ্জাত তার আধ্যাত্মিক মানে মনস্তত্বের ভাষায় জ্ঞান, প্রেম ও কর্মের মিলনে দেখা দেয় এক অপরূপ সত্তা যা নিত্য থেকে অনিত্যে, ‘রূপ থেকে অরূপে’ বহমান। শ্রীসরকার মহাশয় বলেছেন মন যা চিন্তা করে তাতে পরম পুরুষের সমর্থন আছে এটা বোঝা যায় কেবল একটি অবস্থায়। সেটা কী? মন যখন কোনও ভেদাভেদ না রেখে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি মানুষের কল্যাণে উৎসর্গীকৃত হয় অর্থাৎ যা করব সকল মানুষের জন্য, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কল্যাণের জন্য করব— তখনই বর্ষিত হয় পরমাত্মার পরম আশীর্বাদ। আবার ফিরে আসি কবিগুরুর ছন্দে।
‘বিশ্ব সাথে যোগে যেথায় বিহারো সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারও।। নয়কো বনে, নয় বিজনে, নয়কো আমার আপন মনে—সবার যেবায় আপন তুমি, হে প্রিয়—সেবায় আপনি আমারো’।
শ্রীসরকার মহাশয়ের মতে সেই পরমপুরুষ, সেই নিরাকার সর্বব্যাপী পরম ব্রহ্ম যিনি সব মানুষের সবার আপনার, সবাইকার প্রাণের প্রাণ, সবাইকার একান্ত ঘরের লোকও তাঁকে দূরে রেখে দিয়েছে।
মানুষ যদি শাশ্বতী মুক্তি বা স্থায়ী মুক্তি চায় তবে সবার আগে প্রয়োজন বৌদ্ধিক মুক্তির। বৌদ্ধিক মুক্তি পেতে গেলে চাই চিন্তা আর কল্পনা শক্তির বিকাশ। এই বৌদ্ধিক মুক্তির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন আর পুনর্বিন্যাস।
তাঁর মতে বৌদ্ধিক ক্ষেত্রে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে মানুষের মধ্যে জোর করে ভীতসম্মন্যতা বা fear complex ঢুকিয়ে দিতে হয়। তাঁর বিশ্বাস ভয় না থাকলে প্রেম হয় না। হয়তো বা যুক্তিতে এটা সিদ্ধ নয়। কিন্তু পরমপুরুষকে ভালোবাসতে গেলে তাঁকে ভয় পেতে হবে।
জাগতিক ক্ষেত্রে যেমন দৈনন্দিন জীবনে ভয়, জড়তা মানুষের চিন্তনকে আবদ্ধ করে রাখে, তেমনি এই আধ্যাত্মিক ভাবজড়তা আধ্যাত্মিক বন্ধনের কারণ।
প্রভাতরঞ্জন সরকার মহাশয় বলেছেন নারীর মর্যাদাকে জাগ্রত করতে হলে শুধু নারীবাদ নয়, মানবতাবাদের জয়গান করতে হবে।
যারা চূড়ান্তভাবে নারীবাদে বিশ্বাসী, তারা প্রকারান্তরে নারী জাতিকে শোষণ করে সমগ্র মানব জাতিরই অগ্রগতির পথ অবরুদ্ধ করে রাখতে চায়। নারীর মর্যাদাই নারীকে এনে দেবে মহিমা।
পরিশেষে সেই কবিতায় ফিরে যাই
‘যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে, মুক্ত করো হে বন্ধ।
সঞ্চার করো সকল কর্মে শান্ত তোমার ছন্দ।।
চরণপদ্মে মম চিত নিস্পন্দিত করো হে।
নন্দিত করো, নন্দিত করো, নন্দিত করো হে।।

ড. তিন্নি দত্ত
ছবি: সংশ্লিষ্ট সংস্থার সৌজন্যে

আসল বনাম নকল

পঞ্চাশোর্ধ্ব মণিকাদেবী সাংসারিক কাজকর্মের ফাঁকফোকরে যতটুকু সময় পান ‌ইদানীং তা ব্যয় করেন ‘মুখ বই’ বা ‘ফেস বুকে’। অথচ প্রথম প্রথম পারতেনই না তেমন। মেয়ের উৎসাহেই শেখা। ক্রমশ যেন জড়িয়ে গেলেন কেমন। জীবনটা যেন জাদুকাঠির ছোঁয়ায় বদলে গিয়েছে। খাওয়ার পরে রাঁধা আর রাঁধার পরে খাওয়ার বাইরে এখন এই বয়েসেও দিব্যি পার্লারে ঢুঁ মারছেন। মেয়ে প্রথম চাকরি পাওয়ার পর দেওয়া জিনস আর কুর্তিটা যেটা নাকি একদম বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছিলেন সেটা নেড়েচেড়ে ট্রাই করার কথা সোৎসাহে ভাবছেন। ছবি তুলে পোস্ট করেছেন। কবিতা লিখছেন সেই কলেজ জীবনের মতো। তা টাঙিয়ে দিচ্ছেন নিজের দেওয়ালে। জীবন থেকে দূরে সরে যাওয়া ভালোলাগাগুলোকে নিয়ে প্রবল উদ্যমে বাঁচছেন। এইরকম মণিকা দেবীরা এখন সমাজে প্রচুর। উলটোদিকে পুরুষেরা যাঁরা অবসরগ্রহণের পর কেবল প্রাতঃভ্রমণ আর সান্ধ্যভ্রমণেই জীবনের মোক্ষলাভ ভেবে রেখেছিলেন তাঁরাও দিব্যি ভার্চুয়াল পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাচ্ছেন। কত নতুন নতুন বন্ধু, কত অজনা ঘটনা, হাসি মজা নিয়ে জীবনটাই যেন এক লহমায় বদলে যাওয়া। কোথাও বেড়াতে যাবেন আগেই গুগুল সার্চ করে তথ্যটুকুতে চোখ বুলিয়ে নেওয়া। কর্তা-গিন্নি দু’জনে মিলে মনপসন্দ থাকবার জায়গার সুলুক সন্ধান করা; সব যেন হাতের মুঠোয়। অবসরের পর জীবনটা এখন শুরু হয়। বছরভর ঘঙঘঙে কাশি, গ্রীষ্মে ইয়া বড় কালো ছাতা, শীতে হনুমান টুপি-মাফলারের বাইরেও অনেক কিছু থাকে সেই জীবনে।
ষাটোর্ধ্ব গিন্নিও বেশ খোশ মেজাজে কেনাকাটা সারছেন অনলাইনে। ঘরে বসেই। ছেলে-মেয়ের জন্মদিন বা বিবাহবার্ষিকীর প্রীতি উপহার দিয়ে সবাইকে চমকে দিতেও কসুর নেই এই সময়ের মণিকাদেবীদের। অর্ডার করছেন, পছন্দ না হলে দ্বিধা ঝেড়ে ফেরতও পাঠাচ্ছেন। অনেকটা অল্পেতে স্বাদ মেটে না গোছের ব্যাপার আর কি! এই ভার্চুয়াল জীবনের ভালো যেমন আছে মন্দর তালিকাও কম নয়। কিশোরী কন্যা, বয়েসের উচ্ছ্বাসে বয়ফ্রেন্ডকে বিশ্বাস করে ছবি তুলেছে যুগলে। কিছুদিন মেলমেশার পর কোনও বিষয়ে অপছন্দের কারণ ঘটলে অথবা আপত্তিকর প্রস্তাবে রাজি না হলে সে ছবি— রাতারাতি ছড়িয়ে পড়ছে দেওয়াল থেকে দেওয়ালে। দিশাহারা কন্যে তখন লজ্জায় অপমানে কুঁকড়ে কখনও নিজের জীবনটাকেই শেষ করে দিচ্ছে, কখনও বা গভীর বিষাদে ডুবে যাচ্ছে। এরকম ঘটনাও তো আকছাড়ই ঘটছে। এ ছাড়াও নানা ধরনের প্রতারণাও চলে। যেমন দেওয়ালের একপাশে তরুণী অন্যপাশে ভালো বন্ধু সেজে প্রবীণ কোন মনুষ্যতর জীব েপ্রমের খেলা খেলছেন। পরবর্তী পর্যায় মন ভেঙে দফারফা সদ্য যৌবনে পা দেওয়া তরুণীটির। এমন ধরনের ঘটনার রেশ এতটাই প্রভাব বিস্তার করে যে শেষ পর্যন্ত মনোবিদের শরণাপন্ন হতে হয় অভিভাবকদের। পাশাপাশি এও দেখা যায় উচিত-অনুচিত, ভালো-মন্দের তোয়াক্কা না করে মাঝবয়েসেও অনেকে জড়িয়ে পড়ছেন সম্পর্কে।
সামনা-সামনি দেখা নেই, তেমন জানাই বা কই? অথচ এ যেন এক অমোঘ আকর্ষণ। আসলে ভার্চুয়াল রিলেশনশিপে বা অন্তর্জালের মাধ্যমে তৈরি হওয়া সম্পর্কে অনেকগুলো রং থাকে বলেই রোমাঞ্চটা বেশি। দায়হীন দায়িত্বহীন সম্পর্কের উন্মাদনা যে বেশি হবে এটা তো বলাই বাহুল্য। চিরকাল নতুন কোনও কিছু মানুষকে টানে। একঘেয়ে ম্যাড়মেড়ে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া নির্জীব সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে বর্ণময়, উজ্জ্বল সজীব সম্পর্কের টানে উড়ে বেড়ানো। এখন দেখার বিষয় এটাই যে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দেওয়াল নিয়ে বন্ধুত্ব কতটা উপযোগী। মনে রাখা প্রয়োজন কতটা আমরা নিজেদের ভেতরের গিঁট খুলব, কতটা খুলব না; বন্ধুত্ব বা সম্পর্ককে কতটা এগিয়ে নিয়ে যাব আর কতটা যাব না, একটু রেখে ঢেকে মেলে ধরব নিজেকে নাকি আগল খুলব পুরোটাই। এইসব নিজেকেই বোঝাতে হবে বা বলা ভালো বুঝতে হবে কোনটা ভালোলাগা কোনটা মোহ। দাঁড়ি, কমা, ফুলস্টপ দিতে হবে নিজেকেই। কেন না ফুলস্টপ দিতে না জানলে বিষয়টা কন্টিনিউয়াস বোঝায়। এই ভার্চুয়াল জগতের ভালোমন্দ নিয়ে প্রশ্ন রেখেছিলাম রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের মনোবিজ্ঞানের গবেষক অঙ্কিতা ঘোষের কাছে। জানালেন, দেখুন কেউ যদি তার দৈনন্দিন নিয়মমাফিক কাজে কোনও অসুবিধা না করে নিছক আনন্দ পাওয়া বা একঘেয়েমি থেকে মুক্তির জন্য এই ভার্চুয়াল পৃথিবীকে স্বাগত জানায় সেটার মধ্যে দোষ বা অন্যায় তো কিছু নেই। সাধারণত, একজন গৃহিণীর জীবনটা পুরোটাই সংসারকেন্দ্রিক। সেক্ষেত্রে হাতের মুঠোয় যোগাযোগ সহ নানা সুবিধা থাকলে ক্ষতি কি? সন্তানেরা দূরে থাকলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ, পুরনো বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে বা আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা, কেনাকাটা, ইলেকট্রিক, গ্যাস বুক করা সবই তো এখন এই প্রযুক্তি নির্ভর। আসক্ত হয়ে না পড়লেই হল। আবার কমবয়সীদের ক্ষেত্রেও যদি পড়াশুনা, স্কুল-কলেজ যাওয়ায় ফাঁকি না দিয়ে কিছুটা সময় জানার পরিধি বাড়ানোর জন্য বা সময় কাটানোর জন্য ব্যবহার করে, তাতে তো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এখন কে কীভাবে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছে সেটা দেখা দরকার। সব কিছু ভুলে, রোজকার জীবন হেয় করে সোশাল মিডিয়া নিয়ে সারাক্ষণ পড়ে থাকা, সম্পর্কে জড়ানো সহ এতে নেশা থাকলে তো সমস্যা হবেই। তাই প্রযুিক্তর ব্যবহার করা উচিত তবে মাত্রা রেখে। অঙ্কিতা আরও বলেন, দেখুন আগুন তো আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহার্য আবার আগুন ধ্বংসও ঘটায়। শুধুমাত্র একটা মাধ্যমকে দোষ দিলে হবে না বা তা উচিতও নয়। অনেকেই তো ইন্টারনেট, ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ ব্যবহার করেন তবে সবাই তো আর প্রতারিত হচ্ছেন না, অতএব সতর্ক ও সচেতন থাকা দরকার। এ তো গেল বিশেষজ্ঞের মতামত।
পাশাপাশি এ কথাও তো ঠিক, এখনও কি আমরা সকাল হলেই বিবিধভারতী বা কলকাতা-ক নিয়ম করে শুনি? নাকি পাড়া কাঁপিয়ে ঝনঝন শব্দে ল্যান্ডফোন বাজে নির্দিষ্ট কোন বাড়িতে?
জেঠিমা-ঠাকুরমারা কি আকাশ দেখে ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস দেন? সবগুলোর উত্তরই— ‘না’। দুনিয়া এগচ্ছে। মুক্ত অর্থনীতির বাজারে সবটাই পরিবর্তিত। ভার্চুয়াল ক্লাসরুমের মাধ্যমে আমেরিকা, ইউরোপ সহ নানা দেশে পঠন-পাঠনের সুযোগ-সুবিধা মিলছে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগান্তকারী উদ্ভাবন ও উচ্চমান সারা বিশ্বে সাড়া ফেলছে। অতএব আমার রুচির বাইরেও গোটা পৃথিবীর মানুষজনদের ভালোলাগা মন্দলাগার বিস্তৃতি ঘটেই চলেছে। তাই নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে অন্যের ভিন্নতার মুখোমুখি হওয়াকে স্বাগত না জানিয়ে উপায় কি!

তনুশ্রী কাঞ্জিলাল মাশ্চরক

ইন্টারপ্রেটার

‘মা’— বাংলার এই সর্বজনীন সম্বোধনটাই জার্মান ভাষায় রূপান্তরিত হচ্ছে ‘মুট’। একসময়ে ভালোবেসে জার্মান ভাষা শিখেছিলেন ম্যাক্সমুলার ভবন থেকে। ভাষাটাকে বাস্তবে কাজে লাগাতে পেরে আনন্দিত গীতাঞ্জলি চক্রবর্তী বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাকতা করা ছাড়াও জার্মান ভাষার সঙ্গে সবসময় সম্পর্কটা বজায় রাখতে চেষ্টা করেছেন। অনুবাদের কাজও করেছেন তিনি। আবার দোভাষী বা ইন্টারপ্রেটার হিসেবে কাজ করবার অভিজ্ঞতাও জমা হয়েছে তাঁর ঝুলিতে। যেমন একসময় টানা সপ্তাহখানেক বাড়ির বাইরে থেকে ইন্টারপ্রেটার হিসেবে কাজ করতে হয়েছিল একটি বাণিজ্যিক সংস্থায়। সেখানে যথেষ্ট সংখ্যক পুরুষ সহকর্মীরা ছিলেন। কিন্তু কাজের পরিবেশ, অভিজ্ঞতা খুব ভালো। একসময় অনুবাদের কাজও করেছেন অনলাইনে। পেমেন্টও পেয়েছেন। গুণী কন্যাটি পাহাড়ে ওঠার বেসিক টেনিংও করেছেন, আবার এনজিও একটি সংগঠনের কাজেও যুক্ত।
ফ্রেঞ্চ ভাষা নিয়ে কাজ করেছেন পিংকি তালুকদার। যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন করার পর অ্যালিয়াঁস ফ্রাসেঁ থেকে ফ্রেঞ্চ ভাষাটা রপ্ত করেছেন। সরকারি ‘প্রিয়দর্শিনী’ গাইড ট্রেনিংও করেছেন। লাইসেন্সধারী ট্যুরিস্ট গাইড তিনি। পাশাপাশি বাণিজ্যিক সংস্থায় ইন্টারপ্রেটার হিসেবেও কাজ করেন।
মৈত্রেয়ী ব্রহ্মচারী। সরকারি ট্যুরিস্ট গাইড। তিনি গাইড হিসেবে কাজের সঙ্গে যুক্ত হলেও ট্যুরিস্টদের সঙ্গে মিলেমিশে দোভাষীর কাজটিও করেন। তিনি স্প্যানিশ ভাষা জানেন। সেই ভাষাতেই দোভাষীর কাজটি করেন। স্প্যানিশ ভাষাভাষীদের সঙ্গেও কাজ করেছেন বহু বছর। ২০০৫ সাল থেকে এই কাজে যুক্ত তিনি।
সামার ভেকেশনে বিদেশিরা প্রধানত এদেশে আসেন। এই ভাষার বিদেশি অতিথিদের মধ্যে কমবয়সীরা সংখ্যায় অপ্রতুল। সাধারণত জুন-জুলাই নাগাদই এই বিদেশি পর্যটকদের আগমন হয়। একে বিদেশি তার ওপরে অধিকাংশেরই ইংরেজি ভাষাটা অজানা। তাই পদে পদে এই দেশে এসে গাইডের ওপর নির্ভর করতে ওঁরা বাধ্য হন। ডেলি লাইফে তাই তাঁদের দোভাষী কাম গাইডের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। অভিজ্ঞতার সুবাদে মৈত্রেয়ী জানাচ্ছেন, কলকাতায় এলে এই স্প্যানিশ অতিথিরা পছন্দ করেন কালীঘাট, জৈন মন্দির, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল, মার্বেল প্যালেস, ফ্লাওয়ার মার্কেট ইত্যাদি দেখতে। সেইসঙ্গে মাদার টেরিজার সেবাকার্য বা ভবন দেখতেও তাঁরা বিশেষ আগ্রহী হন। ট্যুরিস্ট গাইড হিসেবে কাজ করাই হোক, অথবা বাণিজ্যিক কোনও সংস্থার হয়ে ব্যাবসা সংক্রান্ত কোনও কাজই হোক কাজটা কিন্তু যথেষ্ট ইন্টারেস্টিং। এই মত ওঁদের সবারই। মেক্সিকানরা ইংরেজিটা বলতে পারলেও স্পেনের মানুষেরা স্প্যানিশটাই বলেন। ইংরেজিটা বলতে পারেন না। গীতাঞ্জলির মতে, অনেক জার্মানও এখন ইংরেজিতে সড়গড় হচ্ছেন। ওঁর মতে বরং চাইনিজ, কোরিয়ান বা জাপানি ভাষায় এখন ইন্টারপ্রেটারের কাজের সুযোগ বেশি পাওয়া যাবে এখানে। এই কাজে আগ্রহী হলে সংশ্লিষ্ট ভাষাটা সম্বন্ধে যথেষ্ট দক্ষ হওয়া দরকার। ফাঁকিবাজি করার কোনও সুযোগই নেই। ইন্টারপ্রেটারের এর কাজটা মূলত ভার্বাল। এই কাজের জন্য যদি কোনও অর্গানাইজেশন বা এজেন্সির ব্যবস্থা থাকত, যার মাধ্যমে কাজের যোগানটা সবসময় থাকত তাহলে সেটা দোভাষীদের পক্ষে আরও সুবিধাজনক হত। উদার মানসিকতা, নানা বিষয়ে জ্ঞানের গভীরতা, মানুষজনের সঙ্গে সপ্রতিভভাবে কথা বলার দক্ষতা, সর্বোপরি দোভাষী কাজটির প্রতি আগ্রহ থাকা এধরনের কাজ করার ক্ষেত্রে বিশেষ প্রয়োজন। এছাড়াও লেগে থাকার ইচ্ছে ও সক্ষমতা এই ইন্টারপ্রেটারের সম্মানজনক পেশার উন্নতির ক্ষেত্রে সহায়ক।

কাকলি বসু



?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta