কলকাতা, শনিবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৩

 

রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড়ি | ম্যাগাজিন

শ্রীমা দি মাদার


গত ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল শ্রীমার জন্মদিন।

১৮৭৮-এর ২১ ফেব্রুয়ারি। প্যারিসের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মীরা অালফাসা। বাবা ছিলেন ব্যাংকের মালিক। বিত্তবান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও মীরা জীবন কাটিয়েছিলেন অলৌকিকভাবে। তাঁর জীবনের শুরুটা ছিল বড় অদ্ভুত। তিনি লেখাপড়া শুরুই করেছিলেন সাত বছর বয়েসে। কিন্তু চার বছর বয়স থেকে তিনি যোগব্যায়ামে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। আধ্যাত্মিক প্রবাহ ছিল তাঁর শৈশব থেকে। ছেলেবেলায় তাঁর জন্য একটি ছোট চেয়ার ছিল বসার। তিনি সেই চেয়ারে বসলেই তাঁর সমস্ত শরীরে একটা ভাব তন্ময়তা জাগত। মনে হত তাঁর মাথার ভেতর থেকে একটা আলোকশিখা উঠে আসছে। মাথার ভেতরে ঢেউ উথাল-পাথাল করছে। তখন এইসবের মানে বোঝার ক্ষমতা ছিল না মীরার। পরে বুঝতে পারলেন যে ঈশ্বর তাঁকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন বড় কিছু করার জন্য। শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্য তিনি পৃথিবীতে আসেননি।
বারো বছর বয়সে মীরা বেড়াতে গিয়েছিলেন প্যারিসের কাছাকাছি একটি অরণ্যে। সেখানে দু’হাজার বছরের পুরনো গাছ ছিল। সেই গাছের তলায় বসলে তাঁর জাগতিক চেতনা হারিয়ে যেত। তিনি ধ্যানমগ্ন হয়ে উঠতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁর কেটে যেত ধ্যানে। অরণ্যের সঙ্গে ধ্যানের কী সম্পর্ক তা তিনি বুঝতে পারতেন না। কিন্তু তাঁর চেতনার সঙ্গে গাছের চেতনার মিল খুঁজে পেতেন। তিনি বুঝতে পারতেন এই গাছগুলোর চেয়ে মানুষের আয়ু কত কম। তিনি যখন ধ্যানস্থ হতেন তখন বনের পাখি, কাঠবেড়ালি তাঁর শরীরের ওপর দিয়ে ছোটাছুটি করত।
আলজিরিয়ার ক্লেমসন শহরে তাঁর আধ্যাত্মিকতার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। এই শহরের এক অরণ্যে একটি বিষধর গোখরো সাপকে শুধুমাত্র তাঁর চোখের চাউনি দিয়ে শান্ত করেছিলেন। মীরা যখন ইউরোপ পরিভ্রমণে বেরিয়েছিলেন তখন তাঁর যাত্রাসঙ্গী ছিলেন মঁসিয়ে তেঁও। তিনিও একজন মহাপুরুষ ছিলেন। জাহাজ যখন মাঝসমুদ্রে, তখন হঠাৎ ভয়ংকর সামুদ্রিক ঝড় উঠল। যে কোনও মুহূর্তে জাহাজ ডুবে যেতে পারে। এই অবস্থায় তেঁও মীরাকে বলেছিলেন, এই ঝড় থামাতে। মীরা তেঁও’র কথামতন কেবিনে এসে শুয়ে পড়লেন। নিজের দেহ ছেড়ে মাঝসমুদ্রের উপর বিচরণ করতেই দেখতে পেলেন কতকগুলি অশরীরী আত্মা জাহাজকে ধাক্কা দিচ্ছে। তিনি বিনম্র স্বরে তাদের বললেন, জাহাজের ভীত আতঙ্কিত মানুষদের নিষ্কৃতি দিতে। মীরার কাতর অনুরোধে অবশেষে ঝড় থেমে সমুদ্র শান্ত হয়েছিল। মীরা তখন বুঝতে পেরেছিলেন পৃথিবীর সর্বত্র ঈশ্বর বিরাজমান। ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের মিলন হওয়া সম্ভব।
এই উপলব্ধির পরই মীরার জীবনে নতুন অধ্যায় সূচিত হল। ১৯১৪ সালে তিনি ভারতে আসেন। জন্মসূত্রে তিনি বিদেশিনী হলেও ভারতের মাটি স্পর্শ করার ইচ্ছা তাঁর ছিলই। ভারতে এসে তিনি ঋষি অরবিন্দকে দেখেন। তিনি চেয়েছিলেন শ্রীঅরবিন্দের শিষ্যা হতে। শ্রীঅরবিন্দও প্রথমবার মীরাকে দেখেই বলেছিলেন, ইনি হলেন হোলি মাদার পরম পূজ্য মা। একটি স্বর্ণসেতু। অপূর্ব অনল। পরম অজানার তিনি এক প্রজ্বলিত শিখা। তিনি মহাশক্তি।
মায়ের স্বরূপ উদ্‌ঘাটন করতে গিয়ে শ্রীঅরিবন্দ বলেন, ভগবান যখন মানুষের মধ্যে আসেন, তখন মানুষের রূপেই আসেন। তাই বলে তাঁর ঈশ্বরত্ব ছেড়ে আসেন না। সবই তাঁর মধ্যে থাকে। ধীরে ধীরে কর্মের মাধ্যমে সেই স্বরূপ ফুটে ওঠে। মীরা অালফাসা তেমনই একজন মানুষ। তিনি হলেন সকলের মা। জন্মকাল থেকেই তিনি ‘মা’ বা ‘মাদাম’ হয়ে এসেছেন এই পৃথিবীতে।
শ্রীমায়ের চোখে ঋষি অরবিন্দ ধরা দিয়েছিলেন ‘কৃষ্ণ’রূপে। ভারতে আসার আগে শ্রীমা জাপানে গিয়েছিলেন। সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। রবীন্দ্রনাথের অসাধারণ ব্যক্তিত্বে শ্রীমা অভিভূত হন। শ্রীমাকে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং বলেছিলেন শান্তিনিকেতনের কর্মযজ্ঞের দায়িত্ব নিতে। কিন্তু মা উত্তর দিয়েছিলেন তিনি ভারতে আসবেন কাজ করতে, শান্তিনিকেতনে নয়।
জাপানে থাকার সময় তিনি আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন—‘একক নীরবতার মধ্যে আমি ভগবানের আদেশ শুনতে পেয়েছি—তিনি ফিরে যেতে বলছেন পৃথিবীর দিকে। সর্বত্র যাদের দেখতে পাও, সেই এক এবং অদ্বিতীয়কে— তাঁরা ভগবানের সঙ্গে এই একত্বের চেতনা নিয়ে জেগে উঠবেন।
অরবিন্দ আশ্রমে আসার পর শ্রীমা জড়িয়ে পড়লেন কর্মযজ্ঞে। শ্রীমাকে আশ্রমের তথা বাইরের সবাই মেনে নেবে কি না এই সংশয় থেকে অরবিন্দ ১৯২৮ সালে শ্রীমা’কে নিয়েই একটি বই লিখলেন—‘দি মাদার’। এই বইটিতে তিনি শ্রীমাকে বিশ্ব পরিচালিকা হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে শ্রীমা পার্থিব লীলাকে ধরে কাজ করছেন। তাঁর সামনে চারটি মহারূপ আছে।
শ্রীমায়ের সাংগঠনিক ক্ষমতায় আশ্রম বিস্তৃত হতে থাকে। আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করে। আশ্রমের একেকটি গৃহের স্থাপত্য পরিকল্পনার মধ্যে সুন্দর প্রতীক লুকিয়ে রয়েছে। গৃহে প্রবেশ করলেই অধ্যাত্ম চেতনার অনুভূতি তৈরি হয়ে যায়। আশ্রমের শিক্ষাব্যবস্থায় শ্রীমা চারটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন। শারীর শিক্ষা, মানসিক শিক্ষা, আধ্যাত্মিক শিক্ষা এবং ব্যাবহারিক শিক্ষা। এইভাবে তিনি শিক্ষাকে নব রূপায়ণ করেছেন।
আশ্রমের নিয়ম অনুসারে সকালে প্রতিটি শিক্ষার্থী প্রথমে ধ্যান করবে। তারপর মায়ের সঙ্গে দেখা হবে। মা তখন সবার সঙ্গে দেখা করেন। কথা বলেন। এই সময় মায়ের পাশে একটি রুপোর রেকাবিতে রাখা থাকত নানারকমের সুগন্ধি ফুল। যাঁরা মায়ের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন তাঁদের প্রত্যেকে একটি করে ফুল দিতেন। সন্ধেবেলায় আবার ধ্যানের আসর বসত। ধ্যান শেষ হলে মা গিয়ে দাঁড়াতেন সামনের ব্যালকনিতে। দেখে বোঝা যেত দিব্যভাবের মধ্যে মা রয়েছেন। তাঁর দু’চোখ দিয়ে অলৌকিক আলোক শিখার বিচ্ছুরণ ঘটত।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট মায়ের কাছে ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিন। একই দিনে ভারতবর্ষের স্বাধীনতালাভ এবং ঋষি অরবিন্দের জন্মদিন। ১৯৬৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শ্রীমা ‘অরভিল নগর’ সৃষ্টি করেন। পৃথিবীর ১০০টি দেশের মাটি এনে রাখা হয়েছিল পদ্মকোরকের গর্ভে। তারপর কোরকটির মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর মূল কারণ ছিল, এই নগর কোনও ধর্মজাতি বিশেষের নিজস্ব সম্পত্তি বলে গণ্য হবে না। পৃথিবীর সকল জাতিই বিশ্বনাগরিক বলে স্বীকৃতি পাবে। একমাত্র পরম সত্যকে প্রভু বলে মানবে।
শ্রীমায়ের সেই স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপায়িত হয়েছে। ১৯৭৩ সালে ৭ নভেম্বর শ্রীমা মহাসমাধি লাভ করেন।

কৃষ্ণ হোম রায়
তথ্য সূত্র: পৃথ্বীরাজ সেন

বনশ্রী ছিল আমার বোনের মতো
স্মৃতিচারণে গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়

সকলকেই একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। সুগায়িকা বনশ্রী সেনগুপ্তও চলে গিয়েছে আমাদের ছেড়ে। কিন্তু তার মৃত্যু আমার কাছে এক বড় আঘাত। ও ছিল আমার ছোট বোনের মতো। কত সুন্দর মুহূর্ত কাটিয়েছি ওর সঙ্গে! সেসব ঘটনার কথা এই মুহূর্তে বারবার আমার মনে ঘুরেফিরে আসছে। বনশ্রীর যেটা আমার সবচেয়ে ভালো লাগত তা হল, ওর মিশুকে স্বভাব। বড্ড হাসিখুশি ছিল, আর গল্প করতেও ভীষণ ভালোবাসত। শুধু গান নিয়ে গল্প নয়, সাংসারিক জীবনের অনেক গল্প ওর সঙ্গে আমি শেয়ার করতাম। এমন কিছু কিছু মানুষ আছেন যাঁদের সঙ্গে আমার গল্প করতে ভীষণ ভালো লাগে। তাঁদেরই একজন ছিল বনশ্রী।
সংগীত সহ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে লড়াই করে সকলকেই উঠতে হয়। আমাকেও উঠতে হয়েছে। কেউ কেউ হেরে যান, আবার কেউ কেউ জয়ী হন। বনশ্রীর ক্ষেত্রেও এরকম একটা লড়াই ওকে লড়তে হয়েছিল অনেকটা সময় ধরে। ছোটবেলায় গান শিখত ওর বাবার কাছে। আমাকে ও কতদিন গল্প করতে করতে বলেছে,‘জানো সন্ধ্যাদি, আমি কিন্তু তোমার গান শুনে, তোমার গান গেয়েই বড় হয়েছি।’ এ কথা শুনে আমি যখন ওকে অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিলাম ও উত্তরে বলেছিল, ‘বিভিন্ন ফাংশনে আমি তোমার গান গাইতাম। আর এই যে আমি এখন কিছুটা পরিচিতি পেয়েছি, এখনও তোমার ‘মায়াবতী মেঘে এল তন্দ্রা’গেয়ে ফাংশন শেষ করতে না পারলে আমার মন ভরে না।’ আমার প্রতি, আমার গানের প্রতি বনশ্রীর এই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আমার আজীবন মনে থাকবে।
বিয়ের পর সাধারণত মেয়েদের কী অভিনয়ে, কী গানে কেরিয়ার গড়ে তোলা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে নানা সাংসারিক চাপে। কিন্তু বনশ্রীর বেলায় এর উলটোটা ঘটেছিল। বিয়ের পর ওর স্বামী শ্রীযুক্ত শান্তি সেনগুপ্ত তাকে নানাভাবে উৎসাহ দিয়েছিলেন যাতে সে আগামী দিনে একজন বড় সংগীত শিল্পী হয়ে উঠতে পারে। শান্তিবাবুও অত্যন্ত ভালোমানুষ ছিলেন।
যতদূর জানি, ছয়ের দশকের গোড়ার দিকে বনশ্রী সেই সিঁথিতে গিয়ে আমার নমস্য সংগীত পরিচালক সুধীন দাশগুপ্তর বাড়িতে গিয়ে গান শিখতো। মূলত সুধীনদাই তাকে ‘গ্রুম’ করেছিলেন। তারপর ক্রমশ বনশ্রীর একজন সফল সংগীত শিল্পী হিসেবে এগিয়ে চলা। বনশ্রী আমার বাড়িতে অনেকবার এসেছে। একদিন ও আর আমি বসে গল্প করছি। ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তুমি কী করে প্র্যাকটিস করো বলো তো?’ ও বলল, ‘দিদি তুমি আমাকে একটু বলো না।’ যাই হোক ও গাইছিল, আমিও ওকে একটু বলে দিলাম। ওই একটু গলা সাধা যাকে বলে। যাদের আমি ভালোবাসি তাদের সঙ্গে গান নিয়ে একটু আলাপ-আলোচনা করতে আমার ভালোই লাগে। বনশ্রীর বাড়িতেও আমি গিয়েছি। ও সিনেমা, টিভি, ফাংশন, রেডিও সব জায়গায় যেভাবে দাপটের সঙ্গে গেয়েছে, আমি তার প্রশংসা করি।
বনশ্রী ভাজাভুজি, চপ-কাটলেট খেতে ভীষণ ভালোবাসত। বেশিরভাগ সময় নিজেই বাজার করত। এমনও দিন গিয়েছে ও রাতে ভাত-রুটি না খেয়ে চপ-কাটলেট খেয়েই শুয়ে পড়ত। এবারে গ্রামোফোন কোম্পানির সরস্বতী পুজোয় ওর সঙ্গে আমার শেষ দেখা। আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘সন্ধ্যাদি কেমন আছ?’ তারপর বলল, ‘ও চলে যাওয়ার পর আমার আর কিছুই ভালো লাগে না। জানি না আমি আর গান গাইতে পারব কি না।’ উল্লেখ্য, শান্তিবাবু মারা যাওয়ার পর বনশ্রী খুব ভেঙে পড়েছিল।
বনশ্রীর মিষ্টি সুরেলা গলা ছিল। ওর কয়েকটা গান আমার ভীষণ ভালো লাগে— ‘একদিন সেই দিন’, ‘অন্ধকারকে ভয় করি’, ‘আমার অঙ্গে জ্বলে রংমশাল’, ‘আজ বিকেলের ডাকে তোমার চিঠি পেলাম’, ‘দূর আকাশে তোমার সুর’ প্রভৃতি। শাস্ত্রীয় সংগীতেও ওর চর্চা ছিল। আমি ওর আত্মার চিরশান্তি কামনা করি।
অনুলিখন: সুমন গুপ্ত

অহল্যাবাই হোলকার

আহমেদনগর জেলার আনন্দ রাও সিন্ধিয়ার কন্যা ছিলেন অহল্যাবাই। অহল্যাবাইয়ের স্বামী ছিলেন ইন্দোরের হোলকার বংশের প্রতিষ্ঠাতা মনোহর রাও হোলকারের পুত্র খণ্ডেরাও হোলকার। অহল্যার সঙ্গে মাত্র ষোল বছর দাম্পত্য জীবন স্থাপন করেছিলেন খণ্ডেরাও। এরপর তাঁর মৃত্যু হয়। ১৭৬৬ খ্রিস্টাব্দে অহল্যাবাইয়ের পুত্র মালেরাও সিংহাসনে বসেন। কিন্তু তিনি রাজ্যশাসনে অযোগ্য ছিলেন। সিংহাসনে বসার এক বছরের মধ্যে উন্মাদ অবস্থায় তিনি মারা যান। পুত্রের মৃত্যুর পর অহল্যাবাই নিজেই ইন্দোরের শাসনভার গ্রহণ করেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সুদক্ষ প্রশাসক আর দানশীলতার জন্য প্রসিদ্ধিলাভ করেন। কিন্তু অহল্যাবাইয়ের শাসনভার মেনে নিতে পারেন না গঙ্গাধর যশোবন্ত নামে এক রাজ কর্মচারী। তিনি ষড়যন্ত্রে করে পেশোয়ার পিতৃব্য রঘুনাথ রাওয়ের সাহায্যে ইন্দোর আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু পেশোয়া মাধবরাও ও মহারাষ্ট্রীয় সর্দারদের বিশেষ করে মহাদজি সিন্ধিয়ার সাহায্যে অহল্যাবাই এই ষড়যন্ত্রকারীদের দমন করেন। অহল্যাবাই রাজ্যশাসন ও সৈন্য পরিচালনার সুবিধার জন্য তুকোজি হোলকরকে প্রধান সেনাপতির পদে নিযুক্ত করেন। পরবর্তীকালে তুকোজির বংশধররাই ইন্দোরের সিংহাসনে বসেন। অহল্যাবাইয়ের রাজত্বের শেষভাগে তুকোজি হোলকারের সঙ্গে মহাদজি সিন্ধিয়ার প্রতিপত্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। কিন্তু সিন্ধিয়া মারা যাওয়ার ফলে সেই দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে। সমকালীন রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি আর অসম্ভব প্রশাসনিক দক্ষতা ছিল অহল্যাবাইয়ের। আর এর ফলেই ইন্দোর রাজ্যের গৌরব বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছিল।
এছাড়াও দয়া-দাক্ষিণ্যের জন্য ইতিহাসে তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন। সুষ্ঠুভাবে রাজ্যশাসন করতে যদি প্রয়োজনীয় কঠোরতা অবলম্বন করতে হত, তাতেও তিনি পিছপা হতেন না। ধর্মের প্রতি নিষ্ঠাবতী অহল্যাবাই মালব দেশে প্রজাদের জন্য অনেক মন্দির, অতিথিশালা এবং রাজপথ নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। তাঁর রাজ্যের বাইরে কেদারনাথ, বারাণসী, দ্বারকা, পুরী, গয়া, রামেশ্বরসহ অন্যান্য হিন্দু তীর্থক্ষেত্রে তিনি নানা দান করেছিলেন। এছাড়াও তীর্থযাত্রীদের সুবিধার জন্য বহু যাত্রীনিবাস আর ধর্মশালা নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে প্রায় সত্তর বছর বয়সে অহল্যাবাই মৃত্যুবরণ করেন।

কাকলি পাল বিশ্বাস

নারীর ব্যক্তিত্ব পুরোটাই পজিটিভ

স্বাগত চৌধুরির নতুন ছবি ‘নায়িকার ভূমিকায়’ গতকাল মুক্তি পেয়েছে। ছবিতে মেয়েদের ভূমিকা প্রসঙ্গে নানা কথা জানালেন পরিচালক।
 অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েদের মধ্যে একে অপরের প্রতি বন্ধুত্বের চেয়ে প্রতিহিংসাই বেশি চোখে পড়ে। আপনার ছবির গল্পে দুই মহিলার মধ্যে বন্ধুত্বের পজিটিভ দিক তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন কী?
 অবশ্যই। ছবিতে নায়িকা ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত স্বভূমিকায় অভিনয় করেছেন। ঋতুপর্ণা ও লহনার (ইন্দ্রাণী দত্ত) বন্ধুত্বের মধ্যে পজিটিভ দিক দেখানোর চেষ্টা করেছি। ছবিতে পরবর্তী সময়ে দেখা যাবে যে ঋতুপর্ণা বড় স্টার সেটা কোথাও লহনার নিজের স্বপ্নকে ছোঁয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করে। লহনা এবং ঋতুপর্ণা ছেলেবেলার বন্ধু। কিন্তু এখন তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ না থাকলেও লহনা কিন্তু ঋতুপর্ণার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এইভাবে দুই মহিলার মধ্যে পজিটিভ দিক তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।
 মেয়েদের মধ্যে কিছু একটা করে দেখানোর প্রবণতা আছে। একটা সময়ে চার দেওয়ালের ঘেরাটোপে থাকার দরুন সেই ইচ্ছে প্রকাশের সুযোগ ছিল না। কিন্তু আজ যখন সুযোগ এসেছে সবক্ষেত্রেই মহিলারা নিজেদের প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। যে কোনও বয়সেই যে মেয়েরা জীবনের চ্যালেঞ্জ নিতে সক্ষম সেটা এই ছবির মাধ্যমে কতটা দেখানো হয়েছে?
 একজন মধ্যবয়সি বাঙালি মহিলা যিনি স্বামী, সন্তান, সংসারের প্রতি দায়দায়িত্ব পালন করেন। তার হয়তো অনেক গুণ আছে।
সে ভালো গান গাইতে পারে। কিংবা নাচতে বা অভিনয় করতে জানে। তা সত্ত্বেও সাংসারিক দায়দায়িত্ব সামলিয়ে সেটা আর বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁর কাছে সংসার এখন সবকিছু। লহনার মনে হয় যে ঋতুপর্ণা পারলে আমি কেন পারব না। যদিও এটা কোনও সংলাপে নেই। ছবি দেখলে তা বোঝা যাবে। যদি ইচ্ছে ও আত্মবিশ্বাস থাকে তবে স্বপ্নপূরণ হওয়া অসম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে বয়স কোনও বাধা নয় যা ছবিতে দেখানোর চেষ্টা করেছি।
 মহিলাদের ব্যক্তিত্বের পজিটিভ দিকটা গল্পে কীভাবে ও কতটা ফুটে উঠেছে?
 একজন মহিলার চরিত্রের পজিটিভ দিক নিয়ে এই ছবি। মেয়েরা যদি চান সবকিছু করতে পারেন। লহনার গল্পটাই সেরকম। ছবিতে লহনাকে দেখানো হয়েছে সেভাবে। তার কিছু করার ইচ্ছে আছে। অথচ বাড়িতে তার পরিবার-পরিজন তাকে হেয় করে এই বলে যে লহনা যে স্বপ্ন দেখছে সেটা বাস্তবে সম্ভব নয়। কিন্তু লহনা জেদি।
সে কিছু করতে চায়। লহনার পজিটিভ দিকটাই তার স্বপ্নকে ছুঁতে সাহায্য করে।
 সবাই বলেন যে, জেদ মহিলাদের একটা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। সবক্ষেত্রে সেটা নেগেটিভ নয়। জেদের যে পজিটিভ দিক আছে সেটা ছবিতে কীভাবে আপনি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন?
 লহনার চরিত্রটা পুরোটাই পজিটিভ। আর সেক্ষেত্রে বয়স সত্যি কোনও বাধা নয়। নিজের মধ্যে অদম্য জেদ ও আত্মবিশ্বাস থাকলেই সেটা সম্ভব। একটার পর একটা বাধা পেরিয়ে লহনা কীভাবে স্বপ্নকে ছুঁতে পারে সেটাই ছবিতে দেখা যাবে।
 ছবিতে পেশা হিসেবে নায়িকা বা রূপালি পর্দা বাছলেন কেন? অন্য পেশার কথা ভাবলেন না কেন?
 অন্য পেশা দেখাইনি কারণ, ঋতুপর্ণাকে আমি ঋতুপর্ণা হিসেবেই দেখাতে চেয়েছি। আমরা সবাই জানি ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত এবং ইন্দ্রাণী দত্ত বাস্তবে দু’জন খুব ভালো বন্ধু। সেটাকে নিয়ে যদি ছবি তৈরি করি আমার মনে হয় মানুষের কাছে তা খুব সহজেই গ্রহণযোগ্য হবে। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এমন একটা জগৎ যেখানে কিছু করার ইচ্ছে থাকলেও ব্যাপারটা অনেক সময় খারাপ দিকে চলে যায়। ভালো দিকে যাওয়ার ইচ্ছে যদি থাকে তবে সেদিকে যে যাওয়া যায় ছবিতে তা দেখানোও হয়েছে।
 এই মুহূর্তে সমাজে মেয়েদের অবস্থান কী সেটা ছবিতে কতটা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে?
 না, না। সেভাবে কিছু দেখানোও হয়নি। এটি সম্পূর্ণ লহনার গল্প। লহনার জার্নি দেখানো হয়েছে। ঋতুপর্ণা ও লহনা ছেলেবেলার বন্ধু। স্কুল, কলেজের পর আর তাদের দেখাসাক্ষাৎ হয় না।
দক্ষিণ কলকাতায় ওরা দু’জন বড় হয়েছে। ঋতুপর্ণা এখন একজন বিখ্যাত অভিনেত্রী। লহনার উত্তর কলকাতায় বিয়ে হয়ে গিয়েছে। লহনা সবসময় ঋতুপর্ণার কথা ভাবে। তার মনে হয় যদি ঋতুপর্ণার সঙ্গে একবার দেখা হত। এভাবেই লহনার জার্নি শুরু। কীভাবে সে তার লক্ষ্যে পৌঁছয় তা নিয়েই ছবি।
 ছবিতে কে কে অভিনয় করেছেন?
 ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, ইন্দ্রাণী দত্ত, খরাজ মুখোপাধ্যায়, সাগ্নিক, অভিষেক চট্টোপাধ্যায়, শকুন্তলা বড়ুয়া, অনিন্দ্য প্রমুখ। ছবিটি প্রযোজনা করেছে ‘এম কে মিডিয়া’।

সাক্ষাৎকার: চৈতালি দত্ত

 

 





?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta