কলকাতা, রবিবার ২২ জানুয়ারি ২০১৭, ৮ মাঘ ১৪২৩

রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড় | ম্যাগাজিন

গুজব ছড়ানো বরদাস্ত নয়

অর্ধসত্য ক্ষেত্রবিশেষে সত্যের চেয়ে ক্ষমতাধর। আর গুজব? ক্ষতিকর অথবা ভয়ংকর পরিণতি ঘটানোর ক্ষেত্রে সে তো কোনও সীমানাই মানে না। সত্য সরল। ডালপালাহীন। তীরের মতো সোজাপথে ধাবিত হয়। কিন্তু গুজবের সহস্র ডানা গজাতে সময় নেয় না। গুজবের জেরে নানা সময়ে বিশ্বের নানা জায়গায় বহু ভয়ংকর ঘটনা ঘটে গিয়েছে। একবার একটি গুজব দুটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ পর্যন্ত বাধিয়ে দিয়েছিল। গুজবের জেরে বহু নিরপরাধ মানুষকে কঠিন মূল্য দিতে হয়েছে। কাউকে প্রাণের বিনিময়ে, কাউকে-বা সম্পদ-সম্পত্তি অথবা মানমর্যাদা খুইয়ে। গুজবের জেরে সুখের সংসার পর্যন্ত ভেসে যেতে পারে। দেশে জ্বলে উঠতে পারে অশান্তির আগুন।
সোশ্যাল মিডিয়ার রমরমা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একশ্রেণির লোকজন এর অপব্যবহারে উঠেপড়ে লেগেছে। তার ফলও ফলতে শুরু করেছে। এই শ্রেণির লোকজন কখনও বিশেষ অসৎ উদ্দেশ্যে, আবার নেহাত উত্তেজনা সৃষ্টির লক্ষ্যেই ওই মিডিয়ার মাধ্যমে নানা ধরনের গুজব ছড়ানো ক্রমশ বাড়িয়ে চলেছে। আপাতত এই ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তেমন জোরদার আইন কার্যকর না থাকায় তারা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। গত কয়েক মাস যাবৎ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিবেশিত হরেকরকম ‘তথ্যে’র উপর নজর করলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়।
ইদানীং একশ্রেণির সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর ভূমিকা দেখে মনে হয় তাঁরা রাজ্যে অশান্তি আমদানি করার ব্রত নিয়েছে। এই উদ্দেশ্যে এমন অনেক গুজবকে ‘তথ্যের মোড়কে’ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছে যাতে হাজার হাজার মানুষ অকারণে উত্তেজিত হয়ে ভয়ংকর কাণ্ডকারখানা ঘটিয়ে ফেলতে পারে। আশঙ্কা প্রবল। এই আশঙ্কা যে অমূলক নয় তার প্রমাণও মিলল গত কয়েকদিনে। কয়েকদিন আগে একটি সোশ্যাল মিডিয়ায় কে বা কারা নদীয়া জেলার কিছু এলাকায় জঙ্গি ঢুকে পড়ার গুজব রটিয়ে দেয়। ওই গুজব পল্লবিত হয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বহু মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ফল ফলতেও দেরি হয় না। হরিণঘাটা থেকে শুরু করে রানাঘাট, শান্তিপুর প্রভৃতি এলাকায় বেশ কয়েকজন নিরীহ সাধারণ মানুষ এবং ভবঘুরে অকারণে ব্যাপক মারধরের শিকার হন। ব্যাপারটা আরও ভয়াবহ আকার নেয় শুক্রবার বর্ধমানের কালনায়। ওই এলাকায় দু’ জায়গায় মোট সাতজন নিরীহ মানুষকে ব্যাপক গণপিটুনি দেওয়া হয়। এদের প্রত্যেকেই খেটে খাওয়া মানুষ। অন্য জেলার বাসিন্দা। পেটের তাগিদেই তাঁরা ওই এলাকায় গিয়েছিলেন। গুজবের জেরে গণপিটুনিতে তাঁদের একজনকে প্রাণ পর্যন্ত হারাতে হয়েছে। অন্যরা জখম হয়েছেন। ওই ঘটনায় আক্রান্ত হয়েছে পুলিশও। লাঠি, কাঁদানে গ্যাস চলেছে। বর্ধমনেই ওই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় শনিবারও নদীয়ার একটি এলাকায় অশান্তি ছড়াল।
গুজবের এই অবাধ গতিতে অবিলম্বে লাগাম টানতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে গোটা সমাজকেই কঠিন মূল্য দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। গুজব এক অর্থে আগুনের মতোই সর্বগ্রাসী। গুজবের আগুন ছড়িয়ে আজ অন্যের ঘর পোড়ানোর আনন্দে কেউ মশগুল হয়ে থাকলে একদিন নিজের ঘরটুকুও অক্ষত থাকবে না। আগুন যেমন শত্রু-মিত্র বাছবিচার করে না, নাগালে যা পায় তাকেই গ্রাস করে, গুজবও তাই। কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। আজ না হোক কাল- একদিন তা মালুম হবেই।
আর একটা কথা। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের সিংহভাগই তথাকথিত শিক্ষিত মানুষ। কথায় বলে, একটা নিরক্ষর মানুষের হাতের তলোয়ার যত মানুষকে হত্যা করতে পারে, একজন শিক্ষিত ও ক্ষমতাধর মানুষের অশুভ প্রয়াস অনেক কম সময়ে শতগুণ মানুষের জীবনের আলো নিভিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তাই, নৈতিকতা, সততা, সামাজিক দায়বদ্ধতার মতো মানবিক বৈশিষ্ট্যগুলিকে শিকেয় তুলে কেবল বিশেষ স্বার্থপূরণ অথবা মজা পাওয়ার লক্ষ্যে গুজব ছড়ানো ক্ষমাহীন অপরাধ। এই অপরাধ রোখার প্রধান দায়িত্বও তথাকথিত শিক্ষিত সমাজকেই নিতে হবে। সজাগ থাকতে হবে প্রশাসনকেও। এক্ষেত্রে যে কোনও রকম বেয়াদপি দেখলেই যাতে কড়া হাতে দমন যায় তার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্তরকম উদ্যোগ নিতে হবে। নইলে ভবিষ্যৎ ক্ষমা করবে না।






?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta