কলকাতা, মঙ্গলবার ২৮ মার্চ ২০১৭, ১৪ চৈত্র ১৪২৩

 

রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড়ি | ম্যাগাজিন

নৈতিকতার অবক্ষয়?


‘সত্যিকারের শিক্ষকরা মোমবাতির মতো। নিজেরা শেষ হয়ে অন্যকে আলোর দিশা দেখিয়ে যান।’ প্রত্যেক ৫ সেপ্টেম্বর যাঁর জন্মদিন উপলক্ষে স্কুলে-কলেজে দলে দলে শিক্ষার আবহ তৈরির একটা চেষ্টা চলে, সেই সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণণ বলেছিলেন এ কথা। ছাত্রছাত্রীদের বলেছিলেন, আমার জন্মদিন পালন করতে হবে না। বরং ওই দিনটাকে তোমরা শিক্ষক দিবস হিসাবে পালন করো। সমাজে শিক্ষককে এমনই মর্যাদা দিয়ে এসেছি আমরা। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে গল্প-উপন্যাস—সর্বত্র শিক্ষক শব্দে মাথা নত হয়েছে আট থেকে আশির। এসবই অতীতের কাহিনি। বেশ রূপকথার মতো শোনায়। ২০-২৫ বছর ফ্ল্যাশব্যাকে গেলেও দেখা যায়, কত কম বেতনে দিনের পর দিন কাজ করে গিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা। তখনও শুধুমাত্র পড়ানো এবং ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মানুষ করার টানেই তাঁরা দিনের পর দিন পড়ে থেকেছেন স্কুলে। নিঃস্বার্থভাবে। সেই নীতির সিন্দুকে এখন অবশ্য তালা পড়ে গিয়েছে। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকদের গরহাজিরা এমন স্তরে পৌঁছে গিয়েছে যে, তাঁদের ধরে বেঁধে ক্লাসে নিয়ে আসা পর্যন্ত দুষ্কর। দিনকয়েক আগেই রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় কলেজগুলিতে বায়োমেট্রিক হাজিরার ব্যাপারে জোর দিয়েছিলেন। ইতিমধ্যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই প্রযুক্তি বসলেও স্কুল-কলেজে কিন্তু তার দেখা মেলেনি। আর প্রাথমিক স্কুলে তো শিক্ষকদের হাজিরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাঁধিয়ে রাখার মতো। পরিস্থিতি এখন এমন জায়গায় যে, প্রাথমিকের স্কুলছুট শিক্ষকদের ক্লাস করানোর জন্য এবার বেতন কাটার হুমকি দিতে হচ্ছে। রাজ্যে প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যাই ৫০ হাজারের বেশি। আর তার মধ্যে অধিকাংশ থেকেই অভিযোগ আসে, শিক্ষকদের ক্লাসে দেখা যায় না। কেউ যদিও বা আসেন, হাজিরা খাতায় সই করে, একটা-দুটো ক্লাস করেই নিরুদ্দেশের পথে। কাজেই এবার থেকে তাঁদের মাইনে হাতে পেতে ভরতে হবে একটি ফরম। কী থাকবে তাতে? স্কুল ও শিক্ষকের নাম, দিন পিছু ক’টি ক্লাস বরাদ্দ, তার মধ্যে ক’টি তিনি নিলেন ইত্যাদি। পাশাপাশি যদি কোনও ক্লাস তিনি নিতে না পারেন, তাহলে তার জন্য যথাযোগ্য কারণ দর্শাতে হবে তাঁকে। মাসের শেষে সেই ফরম জমা দিতে হবে প্রধান শিক্ষকের কাছে। তিনি বেতনের রিক্যুইজিশন স্লিপের সঙ্গে ফরমটিকে জুড়ে পাঠিয়ে দেবেন জেলা পরিদর্শকের অফিসে। রীতিমতো স্ক্রুটিনি হবে তার উপর। যদি উচ্চতর কর্তৃপক্ষের মনে হয়, জনৈক শিক্ষক তাঁর কর্তব্যে গাফিলতি করছেন বা সোজা কথায় ফাঁকি দিচ্ছেন, তাহলে তাঁর বেতন কাটা যাবে। অর্থাৎ স্কুলে গেলাম কী গেলাম না, আর মাসের শেষে পুরো মাইনে নিয়ে ড্যাংড্যাং করে টিউশন পড়াতে চলে গেলাম, সেই প্রণবতায় সরাসরি আঘাত হানতে চলেছে শিক্ষাদপ্তর। টিউশন পড়ানো নিয়ে অবশ্য আগেও প্রচুর বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছিল। তাতে কাজের কাজ খুব একটা হয়নি। ফাঁক বুঝে বহু শিক্ষকই সেই পথ খোলাই রেখে দিয়েছেন।
সোজা কথায়, নৈতিকতায় কীভাবে যেন একটা বড়সড় গলদ হয়ে গিয়েছে। আর ঘুণপোকাটা সরাসরি লেগেছে শিকড়ে। সে জন্যই স্কুলে-কলেজে নিয়ম-শৃঙ্খলা শব্দবন্ধ এখন কালেভদ্রে শোনা যায়। যে শিক্ষকের চোখের দিকে তাকিয়ে ছাত্রছাত্রীরা কথা বলতে পারত না, এখন তাঁর উপরই হাত তোলার মতো ঘটনা আকছার ঘটে। পরীক্ষায় নকল করতে না দিলে তুলকালাম হয়। এর দায় কার? শুধুমাত্র ছাত্রছাত্রীদের বাড়ির? নাকি সম্মিলিত সংস্কারের? যার ভিতটা কিন্তু গড়ে দেন শিক্ষক-শিক্ষিকারাই। তাঁদের হাত ধরেই একটা ছোট্ট প্রাণ মানুষের মতো মানুষ হয়ে ওঠে। শিক্ষক সেই মালির মতো, যাঁর পরিচর্যায় ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে জীবনের চারাগাছ। যাঁর দিকে তাকিয়ে আগামী প্রজন্ম শেখে আত্মত্যাগের ভাষা। টাকা কামানোর মেশিন হিসাবে নিজেকে গড়ে তোলার শিক্ষা নয়, যোগ্য হওয়ার সংস্কারের বীজ তিনি বপন করেন নতুনের মনে।
আজ কেন সেই আবহটাই নিখোঁজ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন অভিভাবকরা। পড়ুয়ারাও। কার কাছে মিলবে এর জবাব? উত্তর একটাই, শিক্ষকের কাছে। কারণ, একজন শিক্ষক হারতে পারেন শুধুমাত্র তাঁর নিজের কাছে। আর তা না হলে তো বলতেই হয়, এখনকার মাস্টারমশাইরা সত্যিই কিছু দেখতে পান না।

 



?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta