রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড়ি | ম্যাগাজিন

বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে সাম্যের পরীক্ষা
কল্যাণ বসু

পরীক্ষা নিয়ে বঙ্কিম চাটুজ্যে মহাশয়ের অনুতাপীয় অভিজ্ঞান: ‘ছাত্রজীবন ছিল সুখের জীবন/ যদি না থাকিত রে একজামিনেশন।’ কথাগুলোর মধ্যে সাহিত্যসম্রাটের স্বভাবসিদ্ধ কোনও বঙ্কিমি অভিঘাত নেই। বরং একটা অতি সরল অকপট বাস্তবোচিত বিবৃতি। আবার পরীক্ষা নিয়ে এই নেতিবাচক উপলব্ধি শুধুমাত্র বাঙালির নয়,—গোটা মানুষ-জাতির, সর্বকালে সর্বদেশে। তা না হলে কী মহামান্য চার্চিল মহাশয় পরীক্ষা বিষয়টিকে আতিথ্যবিমুখ অঞ্চল ('inhospitable region') হিসাবে শনাক্ত করেন?
তবুও পরীক্ষা ছিল, আছে, থাকবে। আর সেক্ষেত্রে বাঙালি সহ অনেকের কাছে মাধ্যমিক পরীক্ষার গুরুত্বই আলাদা। ফুটবলকে নিয়ে সেই গানের মতো বলা যায় সব পরীক্ষার সেরা তুমি মাধ্যমিক পরীক্ষা। একটা ছোট্ট অঙ্গরাজ্যে দশম শ্রেণির চূড়ান্ত পরীক্ষা পরীক্ষার্থীর সংখ্যা দশ লক্ষের বেশি। ভাবা যায়? প্রত্যেক পরিবারে কিংবা আত্মীয় বন্ধু-বান্ধব পাড়া-প্রতিবেশীর ঘরে কেউ না কেউ প্রতি বছর মাধ্যমিকে ‘ক্যান্ডিডেট’। আর তা নিয়ে উদ্বেগ, উত্তেজনা। বারো মাসে তেরো পার্বণের সঙ্গে মাধ্যমিক পরীক্ষাও জীবনে আর একটি পার্বণ যেন। এই পরীক্ষার সুবাদেই প্রথম নিজের স্কুলের বাইরে অন্য স্কুলে গিয়ে সরকারপ্রদত্ত প্রশ্নপত্রের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা, প্রথম ‘বড় পরীক্ষা।’ এরপর উচ্চতর শিক্ষায় নানা ডিগ্রি অর্জনের জন্য একাধিক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হলেও জীবনের শুরুর এই বড় পরীক্ষা ভোলার নয়। শিক্ষকতার আঠাশ বছর অতিক্রম করার পরও ফি-বছর মাধ্যমিক পরীক্ষার আবহে নস্টালজিক হয়ে পড়ি। সেই সঙ্গে প্রতি বছর এই পরীক্ষার সময় একটা অবধারিত প্রশ্নও সামনে এসে দাঁড়ায়। একেবারে মৌলিক, সর্বসমক্ষে ঘটে চলা, চিরবহমান একটা অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন। প্রশ্নটা হল— এই পরীক্ষার মধ্যে বৈষম্যের সঙ্গে সাম্যের এক ধরনের লড়াই কি জারি নেই? বিষয়টা একটু খুলে বলি।
যেই মুহূর্তে একজন অল্পবয়সি পরীক্ষার্থী সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিবেশের কোনও পরীক্ষার হলে ঢুকল সেই মুহূর্তে একটা সাম্যের বৃত্তে তাকে ঘিরে ফেলা হল। একই প্রশ্নপত্র, একই খাতা, একই নির্ধারিত সময় দিয়ে ঘেরা বৃত্ত।
কিন্তু দশ লক্ষাধিক ছাত্রছাত্রী যে কতরকম বৈষম্যমূলক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে এই সাম্যমূলক পরীক্ষার দোরগোড়ায় পৌঁছাল সেই ইতিহাসের খোঁজ বা বিচার আমরা সচরাচর করি কি? কত জনের খোঁজ পাই, কত গভীরতায় তার বিচার করি? কদাচিৎ, অকিঞ্চিৎ। বছরে ওই একবার পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে এবং ফল বেরবার পর কয়েকজন পরীক্ষার্থীর প্রতিবন্ধকতার খতিয়ান, সংগ্রামের সকরুণ দিনলিপি, এককথায় বৈষম্যমূলক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরা হয়। দশ লক্ষের মধ্যে পাঁচ-দশজনের চিত্রায়ণ কোনও হিসাবই নয়। সমুদ্র থেকে এক আঁজলা জল তোলার মতো।
অথচ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই নির্মম অসংগতি নিয়েই আমাদের চলা। যে ছেলে বা মেয়েরা সম্বৎসর আধপেট বা একবেলা খেয়ে, হাড় খাটুনি ‘কাজ’ করে, শীত-গ্রীষ্মের প্রান্তিক পীড়ন সয়ে, শিক্ষার সামগ্রী ও পরিবেশের প্রায়­-শূন্য জোগানের মধ্যে দিয়ে অবশেষে পরীক্ষায় বসার সুযোগ পেল, এমনকী পরীক্ষার দিনগুলিতেও বাড়ি বাড়ি খবরের কাগজ দিয়ে, চায়ের দোকানে খদ্দের সামলে, মাঠে বাবা-মায়ের সঙ্গে চাষের কাজে হাত লাগিয়ে...যখন পরীক্ষায় গিয়ে বসল তখন তারা যে প্রশ্নপত্রের মুখোমুখি হল সেই একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দেবে শীততাপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে পালিত, শরীর ও মগজের পুষ্টিবর্ধক খাদ্যে লালিত, ডজনখানেক প্রাইভেট টিউটর সেবিত আলালের ঘরের দুলাল বা মামণিরা। বৈষম্যের মধ্যে সাম্য! এও একরকম বিবিধের মাঝে মিলন মহান!
জীবন যাপনের বিচিত্র বৈষম্যের প্রেক্ষাপট নিয়ে দশ লক্ষাধিক ছেলেমেয়ে মাধ্যমিকে অবতীর্ণ। এই বিপুল সংখ্যা শিক্ষার একটা সফল-সূচক হিসাবে আমাদের পরিতৃপ্তি দেয়। কিন্তু এর বাইরেও একটা বিপুল সংখ্যার ছেলেমেয়ে নানা বৈষম্য, নানা প্রতিকূলতার কারণে মাধ্যমিকের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারে না। কেন তাদের স্কুল ছাড়তে হয়, কেন জীবনের প্রথম পরীক্ষাটিতে আর বসা হয়ে ওঠে না সে সম্পর্কে বেশ কিছু বছর আগের একটা দুর্দান্ত সমীক্ষা কিছুটা আভাস দেয়। এই অপূর্ণতার অন্যতম প্রধান পাঁচটি কারণের মধ্যে বারবার পরীক্ষায় অসফল হওয়া, শিক্ষায় ব্যয় অত্যধিক, গৃহস্থালির কাজে সাহায্য, শিক্ষায় অনাগ্রহ, বিয়ে হয়ে গিয়েছে সহ নানা বিষয় রয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্যও একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। মাধ্যমিক পরীক্ষাও সেই বৈষম্যের ঊর্ধ্বে নয়। এই পরীক্ষার জন্মলগ্ন থেকেই ছেলে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা মেয়ে পরীক্ষার্থীদের তুলনায় বেশি থাকত। তবে ২০১২ সাল থেকে সেই ট্র্যাডিশনের পরিবর্তন ঘটেছে। পাশের হারে পিছিয়ে থাকলেও মেয়ে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছেলেদের তুলনায় বেড়েছে। এমনকী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পরীক্ষার্থীদের মধ্যেও এই চিত্র দেখা গিয়েছে। মেয়ে পরীক্ষার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি লক্ষ করার সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই মনে রাখতে হবে আর একটি পরিসংখ্যান: ২০১১-র সেনসাস অনুসারে রাজ্যে মহিলাদের শতাংশ (৪৮.৬৩) কিন্তু পুরুষদের শতাংশ (৫১.৩৭) অপেক্ষা কম।
মানব উন্নয়নসূচক (এইচ ডি আই) নির্ধারণে শিক্ষা অন্যতম একটা প্যারামিটার। সেক্ষেত্রে শিক্ষায় নারীর অগ্রগতি সমগ্র জাতির উন্নয়নে অন্যতম এক চালিকাশক্তি। মাধ্যমিকে মেয়েদের বেশি সংখ্যায় উপস্থিতি সেক্ষেত্রে আশার আলো সন্দেহ নেই। সেই আলোয় উদ্ভাসিত হোক পিছিয়ে থাকা মেয়েরাও। আরও, আরও এগিয়ে আসুক জেসমিনা খাতুনের মতো মেয়েরা। কে এই জেসমিনা? মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়া থানার লালনগর গ্রামের দিনমজুর ঘরের মেয়ে জেসমিনা। ১৫ বছর হয়ে যাওয়ায় সমাজের চোখে ‘সোমত্ত’ তকমা পেয়ে যাওয়া মেয়েটির বিয়ের ব্যবস্থা করেছিল ওর বাবা-মা। জেসমিনা পালিয়ে থানায় গিয়ে জানিয়েছিল সে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী, আরও পড়তে চায়। শেষমেশ প্রশাসন তার পাশে দাঁড়িয়েছিল। বৈষ঩ম্যের প্রেক্ষাপটে সাম্যের পরীক্ষার এও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নয় কি?

 




?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta