রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড়ি | ম্যাগাজিন

রাষ্ট্রীয় বিমা সংস্থার শেয়ার
কার স্বার্থে ছাড়া হচ্ছে?

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

একটা ভয়ংকর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। মুক্ত বাজারের নীতিতে দেশের আর্থিক ক্ষেত্রের সংস্কার করতে গিয়ে সরকার অত্যন্ত লাভজনক ও দেশ গঠনের সহায়ক সংস্থাগুলিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বেসরকারি পুঁজিকে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমা সংস্থায় প্রবেশের অধিকার দিয়ে সরকার কার্যত রাষ্ট্রীয় বিমা ক্ষেত্রটিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এতে ক্ষতি সংস্থাগুলির, ক্ষতি সাধারণ বিমাকারীর, এমনকী দেশ ও সমাজের। রাষ্ট্রায়ত্ত বিমা সংস্থার ২৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রির জন্য সরকারের প্রস্তাব নিয়ে এই কথাগুলি বলতে হল আরও একবার।
‘আরও একবার’ শব্দবন্ধটি বলতে হল এই কারণে যে ইতিপূর্বে বিমা ও পেনশন ক্ষেত্রে বেসরকারি পুঁজি-বিদেশি লগ্নির প্রবেশ ও ক্রমশ তার ঊর্ধ্বসীমা বাড়িয়ে দেওয়ায় এমন আশঙ্কা বারবার প্রকাশ করা হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে। আশঙ্কা যে অমূলক ছিল না, তা প্রমাণও হয়েছে। দেশে উদার নীতি চালু হওয়ার পর যখন এই ক্ষেত্রেও বেসরকারি পুঁজিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, তখন প্রথম আশঙ্কা ছিল বিপদে পড়ার পর মানুষ শেষ পর্যন্ত বিমার টাকাটা ওইসব বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকে ফেরত পাবে তো? ইনসিওরেন্স রেগুলেটরি ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (আইআরডিএ) অধীনে ন্যূনতম সিকিওরিটি জমার বাঁধনে সংস্থাগুলিকে বেঁধে রাখা হয়। তবুও দেখা গেল, সাধারণ মানুষ কার্যত ঘুরিয়ে ‘প্রতারিত’ হয়েছেন বিমার টাকা শেয়ার বাজারে খাটানোর কারণে। ইউলিপ স্কিমের নামে টাকা নিয়ে মানুষকে বিমার সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে সামান্যই—৮৫ শতাংশ জমা অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে শেয়ার বাজারে। শেয়ারের দাম বাড়লে প্রচুর মুনাফা হবে—এমন গালভরা আশ্বাস শুনিয়ে সাধারণ মানুষের টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু, মেয়াদ শেষে দেখা যায় মোট ফেরত টাকা আসল জমার চাইতেও কমে গিয়েছে। কারণ, শেয়ার বাজারে মন্দা।
এমনই অভিজ্ঞতার কারণে দেশের দেশি-বিদেশি পুঁজির বেসরকারি বিমা সংস্থাগুলি কোনওভাবে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। রাষ্ট্রীয় বিমা সংস্থাগুলিই হল দেশের মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য। সরকার সংস্কারের নামে সেগুলিতে বেসরকারি পুঁজি ঢুকিয়ে ঘুরপথে ওই সংস্থাগুলির উপর বেসরকারি নিয়ন্ত্রণের পথ তৈরি করছে এবং তাদের মুনাফা করার বন্দোবস্ত করে দিচ্ছে। কিন্তু কেন? এতে কার লাভ? রাষ্ট্রীয় বিমা সংস্থাগুলি সরকারের কোষাগারে প্রচুর রাজস্ব দেয়, মানুষকে সময়মতো অর্থ ফিরিয়ে দেয়, সমস্ত জমা টাকা সাধারণ মানুষের স্বার্থে দেশের উন্নয়নে বিনিয়োগ করে। প্রিমিয়াম হিসাবে যে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা তারা সংগ্রহ করে তা দেশেরই উন্নয়নে লগ্নি করে সরকারেরই হাত শক্ত করে। হঠাৎ সেখানে ২৫ শতাংশ শেয়ার বেসরকারি হাতে দেওয়ার প্রয়োজন হল কেন? সরকারের এই প্রস্তাবে বেসরকারি বিমা সংস্থাগুলি রাষ্ট্রীয় বিমা সংস্থার শেয়ার রাজার থেকে নিয়ে নিজেদের ব্যাবসা সুসংগঠিত করার সুযোগ পাবে। কিন্তু, তাতে রাষ্ট্রীয় বিমা সংস্থাগুলির কোনও লাভ নেই।
সাধারণত শেয়ার বাজারে কোনও সংস্থার শেয়ার ছাড়া হয় কেন এবং তা কখন হয়? কোনও কারণে যখন অতিরিক্ত লগ্নির জন্য অর্থের প্রয়োজন হয়। সরকারের ভাষ্য হল—রাষ্ট্রায়ত্ত বিমা সংস্থাগুলির বৃদ্ধি (গ্রোথ) এবং দক্ষতা বাড়ানোর জন্য এই পদক্ষেপ করা হচ্ছে। সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন কথা। যে চারটি সরকারি সংস্থার শেয়ার বাজারে ছাড়ার কথা বলা হচ্ছে, তাদের মিলিত পুঁজির পরিমাণ এক লক্ষ কোটি টাকারও বেশি । এদের ব্যবসায়িক কাজ বা নতুন সম্প্রসারণের জন্য যে পরিমাণ রিজার্ভ রয়েছে তা যথেষ্টই।
প্রতিটি সংস্থাই লাভে চলে। কর দেওয়ার পর মুনাফা বৃদ্ধির হিসাবে নিউ ইন্ডিয়া অ্যাসুরেন্স ও ন্যাশনাল ইনসিওরেন্সের অ্যাবসোলিউট গ্রোথ রেট যথাক্রমে ৩১.৪৩ শতাংশ ও ১৭.৫৩ শতাংশ। ২০১৩-১৪ অর্থবর্ষের তুলনায় ২০১৪-১৫-তে এই বৃদ্ধি ঘটেছে। এই সময় পর্বে কেবলমাত্র ওরিয়েন্টাল ইনসিওরেন্স ও ইউনাইটেড ইনসিওরেন্সের নিট মুনাফা কমেছে। নিট মুনাফা কমলেও সংস্থার আর্থিক অবস্থা এমন নয় যে তার মূলধন জোগাড়ের জন্য শেয়ার বাজারে যেতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, নতুন করে যে-কোনও প্রয়োজনে বা ব্যাবসা সম্প্রসারণের জন্য যদি মূলধন লাগে তাহলে সেটা বাজার থেকে ডিবেঞ্চার বা বন্ড ছেড়েই তোলার পথ রয়েছে। সরকারকে সেই কথা বলেছিল সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটি। তাদের সুপারিশ ছিল, প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় সব সাধারণ বিমা সংস্থাগুলিকে মিলিয়ে মিশিয়ে দিয়ে ভারতীয় জীবন বিমার (এলআইসি) মতো একটি কর্পোরেশন গড়া হোক। প্রতিযোগিতার বাজারে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলি তাহলে মিলিত শক্তি নিয়ে অপ্রতিরোধ্য হয়ে থাকতে পারবে। স্ট্যান্ডিং কমিটির সুপারি কার্যকর না করে সরকার চুপ করে আছে।
রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে শক্তিশালী না করে তাহলে তাদের শেয়ার বাজারে ছাড়া হচ্ছে কেন? অভাবী লোক যখন বাজারে সোনা বেচতে যায়, তখন নিশ্চয় সোনাটা পিতলে পরিণত হচ্ছে বলে বেচে না কিংবা সোনাটাকে আরও চকচকে করার জন্য কেউ বেচতে যায় না। রাষ্ট্রীয় বিমা সংস্থার শেয়ার বেচার ক্ষেত্রে মোদি সরকারের যুক্তি শুনে এই কথাই বলতে হচ্ছে। আসলে মানুষ সেটা বেচতে বাধ্য হওয়ার সময়েই বেচে। তাহলে প্রশ্ন, মোদি সরকারের কী এমন পরিস্থিতি হল যে সত্যিই তারা এমন পদক্ষেপ করতে বাধ্য হচ্ছে? আসলে বিজেপি রাজনৈতিকভাবে ঠিক করে রেখেছে যে, বেসরকারি পুঁজির বিকাশ ঘটানোর জন্য সরকারি উদ্যোগগুলিকে ক্রমশ গুটিয়ে আনবে। এটাই তাদের ঘোষিত অবস্থান। বিলগ্নিকরণ মন্ত্রক খুলে অটল বিহারি বাজপেয়ির সরকারও এটা করেছিল। পরে মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে ইউপিএ সরকার এসে ঠিক এভাবেই সংস্কারের নামে রাষ্ট্রীয় বিমা সংস্থাগুলিকে এক প্রকার বেচে দেওয়ার জন্য রাজ্যসভায় নতুন করে বিমা আইনের সংশোধনী পেশ করে। ঠিক তখন বিজেপি বেসরকারি পুঁজির পক্ষে সওয়াল করে তাতে সমর্থন জানিয়েছিল।
এখন সেই বিজেপিই ক্ষমতায়। খুব স্বাভাবিকভাবেই তাই তারা লাভজনক রাষ্ট্রীয় বিমা সংস্থায় বেসরকারি পুঁজি ঢুকিয়ে তাদের পুরানো অ্যাজেন্ডা কার্যকর করছে। কিন্তু কেন? তারা কি জানে না যে বেসরকারি বিমা সংস্থাগুলি যেখানে বিমাকারীদের ১১ শতাংশ দাবি সফলভাবে মেটাতে পেরেছে গত অর্থবর্ষে, সেখানে জীবন বিমার মতো রাষ্ট্রীয় সংস্থা ৯৯ শতাংশ দাবি মিটিয়েছে কোনও রকম বিবাদ ছাড়াই। এ তথ্য আইআরডিএ-র। আরও মারাত্মক হল, বেসরকারি সংস্থাগুলির পলিসি এমনই যে তাদের বিভিন্ন পলিসিতে ৪৭-৭৭ শতাংশ বিমাকারী একবার প্রিমিয়াম দিয়ে আর তা দিতে পারেন না! এজেন্টদের কথায় শুরু করেও তা চালাতে তাঁরা ব্যর্থ হন। বিমা ব্যাবসার পরিভাষায় যাকে বলে ‘ল্যাপস রেট’। এতে চরম ক্ষতি হয় বিমাকারী মানুষটির। কারণ, তিনি তাঁর জমা দেওয়া টাকাটা আর ফেরত পান না। কিন্তু, পুরোটাই লাভ হয়ে যায় বিমাকারী সংস্থার। ‘ল্যাপস রেট’ যত বেশি, আর দাবি না-মেটানোর হার যত বেশি, বিমা সংস্থার লুকানো মুনাফার সুযোগও তত বেশি। এভাবেই বেসরকারি বিমা সংস্থাগুলি ফুলেফেঁপে ওঠে। কিন্তু, অল্প ক্ষমতার বিমাকারী সাধারণ মানুষ ওইসব সংস্থার শর্তে পেরে ওঠেন না। সেই তুলনায় রাষ্ট্রীয় বিমা সংস্থাগুলি যে প্রকৃতই বিামকারী মানুষের ‘রক্ষাকবচ’ দেশের সব মানুষই তা তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে জানেন।
তাহলে সরকার কেন এইভাবে সাধারণ মানুষের রক্ষাকারী রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে? সরকার সব জেনেই এটা করছে এবং হিসাব কষে। প্রথম হিসাব—তারা বাজেটের প্রস্তাবিত ঘাটতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। বজায় রাখতে চায় দেশের বৃদ্ধির হারটিকেও (৭.৫ শতাংশের কাছাকাছি)। আর্থিক বৃদ্ধির তুলনায় বাজেট ঘাটতির হারটিও নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। লক্ষ্য হল, মুদ্রাস্ফীতিকেও নিয়ন্ত্রণে রেখে সুদের হার কমিয়ে রাখা। বেসরকারি পুঁজির এটাই দাবি। তাতে বেসরকারি শিল্পপুঁজি লগ্নির ভালো পরিবেশ পায়। গত বাজেটের সময় বলা হয়েছিল, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার শেয়ার বিক্রি করে ৫৬,৫০০ কোটি টাকা আয় হবে। আর মাত্র দু’সপ্তাহ বাকি নেই নতুন বাজেটের। এখনও পর্যন্ত এসেছে মাত্র ২৭,৫০০ কোটি টাকা। এখন তাই দেশের লাভজনক সংস্থাগুলিতে শেয়ার বিক্রির ধুম পড়েছে। এই সুযোগে বেসরকারি সংস্থাগুলি ওইসব শেয়ার হস্তগত করে লাভজনক রাষ্ট্রীয় সংস্থায় প্রবেশের চেষ্টা করবে। এই পদক্ষেপের পিছনে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যটি আরও বিপজ্জনক। মূলধন পর্যাপ্ততার আনুপাতিক হিসাবে (ক্যাপিটাল অ্যাডিকিউয়েসি রেশিও) রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলিতে এই পদক্ষেপে সরকার পক্ষ দুর্বল হয়ে যাবে।
সরকার চাইছে, বিমা সংস্থার টাকা আরও বেশি করে শেয়ার বাজারে যাক। কিন্তু, শেয়ার বাজারের পতন হলে বিমাকারীর টাকার পরিণতি কী হবে? মারাত্মক অবস্থা হবে সাধারণ মানুষের। তাছাড়া সরকার চাইছে, শেয়ার হস্তান্তরের মাধ্যমে (তা প্রকারান্তরে) কর্পোরেট লগ্নিতে সাহায্য করুক। গণতন্ত্রে একটি নির্বাচিত সরকারের পক্ষে জনস্বার্থ উপেক্ষা করে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনুচিত। রাষ্ট্রায়ত্ত বিমা সংস্থাকে দুর্বল করে এইভাবে শিল্পমহলকে অক্সিজেন জোগানো নৈতিকভাবেই প্রবল আপত্তিকর। সরকার কার? দেশের? জনগণের? না কি বেসরকারি পুঁজির? এই প্রশ্নটিই এখন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। ২০০৮ সালে বেসরকারি মার্কিন অর্থলগ্নি সংস্থাগুলি মুখ থুবড়ে পড়ার পর ভারত সেই যাত্রায় রক্ষা পেয়েছিল শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় অর্থলগ্নি ও বিমা, ব্যাংক সংস্থাগুলির বাঁধনে। সেই রাষ্ট্রীয় আর্থিক ক্ষেত্রকেই সরকার দুর্বল করে দিচ্ছে বেসরকারি পুঁজিকে উৎসাহ জোগাতে। প্রশ্নটি তাই স্বাভাবিক—কার স্বার্থে? 




?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta