রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড়ি | ম্যাগাজিন

পৃথিবী জুড়েই মানুষ আজ মশার টার্গেট
দেবাশিস বিশ্বাস

ঘামের গন্ধে নাক সিটকোয় না এমন কেউ নেই। এমনকী একজন বয়ফ্রেন্ডের ঘামের গন্ধেও মনে মনে বিরক্ত হয় তার নিজের গার্লফ্রেন্ড এবং গার্লফ্রেন্ডেরটায় তার বয়ফ্রেন্ড। মেয়ে মশাদের আবার উলটো কেস। তাদের পছন্দ মানুষের ঘাম। যার যত বেশি ঘাম, মেয়ে মশাদের কাছে তার তত বেশি আকর্ষণ। একজন গড়পড়তা মানুষের দেহ মোড়ানো থাকে ২ বর্গমিটার চামড়ায়, আর সেই চামড়ার বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে থাকে ২০ লক্ষ থেকে ৪০ লক্ষ ঘামের গ্রন্থি। শরীরচর্চা করার সময় একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের দেহ থেকে ১ ঘণ্টায় বেরয় ৮০০ মিলিমিটার থেকে ১৪০০ মিলিমিটার ঘাম। বয়স, দেহের গঠন, ফুড হ্যাবিট, শারীরিক অবস্থা, পরিবেশের তাপমাত্রাসহ আরও অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে কার দেহ থেকে কতটা ঘাম বেরবে তার পরিমাণ। মূলত জল আর সামান্য কিছু পরিমাণ নুন, ল্যাকটিক অ্যাসিড, ইউরিয়া, অ্যামোনিয়া এবং সুগার দিয়ে তৈরি ঘাম এমনিতে গন্ধহীন। দুর্গন্ধের নেপথ্য-কারণ ব্যাকটেরিয়া, চামড়ার ওপরের স্তরে বসবাসকারী দু’ধরনের ব্যাকটেরিয়া, স্ট্যাফাইলোকক্কাস ও করিনেব্যাকটেরিয়া। এই দুই গোষ্ঠীর কমবেশি ১০ লক্ষ মিলিয়ন ব্যাকটেরিয়া বাসা বেঁধে থাকে মানুষের চামড়ার ওপরে। দেহের কোনও অংশ থেকে ঘাম বেরিয়ে চামড়ার ওপরে হাজির হতেই সেই ঘামের সঙ্গে মেশে উপরোক্ত দুই গোষ্ঠীর ব্যাকটেরিয়া, যাদের প্রভাবে ঘামের পচন ঘটে এবং সেই ঘাম থেকে ছড়ায় দুর্গন্ধ।
গবেষণা বলছে, ঘামের সঙ্গে যে ল্যাকটিক অ্যাসিড বেরয়, তার গন্ধে সবথেকে বেশি আকৃষ্ট হয় ডেঙ্গির প্রধান মশা ঈডিস ঈজিপ্টাই। কাজেই নিয়মিত শরীরচর্চা, কায়িক পরিশ্রম, মাঠে দৌড়দৌড়ি, খেলাধুলো, জিম-এ গিয়ে ব্যায়াম করে বিস্তর ঘাম ঝরান যাঁরা, তাঁরা সাবধান! মশলাদার খাবার, ফাস্ট ফুড এবং চা-কফিতে আসক্ত লোকেরা সতর্ক হোন। বেশি ঘাম হওয়া মানেই মেয়ে মশাদের নজরে বেশি পড়া। আর শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় মানুষ যে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে তার গন্ধ ১০ থেকে ৫০ মিটার দূর থেকে টের পায় মশা। ৫ থেকে ১০ মিটার দূর থেকে মানুষকে দেখতে পায় মশা। এবং ২০ সেন্টিমিটার দূর থেকে মশা টের পায় মানুষের দেহের তাপ ও ঘামের গন্ধ। ঘামের গন্ধ লুকোতে অনেকেই আকছার ব্যবহার করে বডি-স্প্রে, সেন্ট, পারফিউম, আতর কিংবা গন্ধতেল। এতে বিপদ আরও বাড়ে, কমে না। এসব সুগন্ধী পদার্থ ব্যবহারে মানুষের প্রতি আরও বেশি করে আকৃষ্ট হয় মেয়ে মশারা। সেন্ট আর পারফিউমের ম-ম করা গন্ধটা যে মশাদেরও খুব প্রিয়। মনে রাখা দরকার সেফ জোন-এ নেই অ্যালকোহল-প্রেমীরাও। কারণ দুটি। এক, মদ খাওয়ার পরে দেহের তাপ বাড়ে। দুই, মদ খাওয়ার পরে দেহ থেকে যে ঘাম বেরয়, তাতে থাকে ইথাইল অ্যালকোহল। মেয়ে মশাদের পছন্দ এই দুটোই। সুতরাং, মদ খাবেন? খান। তবে দেখবেন, মশা যেন বেশি না কামড়ায়।
মশাকে আকর্ষণ করার প্রশ্নে ঘামের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO2)। ৫০ মিটার দূর থেকেও এর গন্ধ টের পায় মশা। অনেকেরই প্রশ্ন, প্রকৃতিতে আরও অনেক উৎস থাকা সত্ত্বেও, মানুষের নাক-মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসা CO2-এর গন্ধেই মশা কেন মানুষের পিছনেই বেশি ছোটে? কারণ ব্যাখ্যায় বিশেষজ্ঞমহলের বক্তব্য, মানুষ যে শ্বাস ত্যাগ করে তাতে শুধু CO2 থাকে না, থাকে আরও অনেক কিছু, বিশেষত ল্যাকটিক অ্যাসিড, অকটেনল, ইউরিক অ্যাসিড এবং ফ্যাটি অ্যাসিড। CO2-এর সঙ্গে এই চার রাসায়নিক পদার্থ মিশে তৈরি হয় এক বিশেষ ধরনের CO2 ককটেল, যার গন্ধে আকৃষ্ট হয়েই মানুষকে টার্গেট করে মশা। যে যত বেশি ছাড়বে CO2, সে তত বেশি খাবে মশার কামড়।
CO2 উৎপাদনের নিরিখে মেয়েদের থেকে একটু এগিয়ে পুরুষেরা। একজন গড়পড়তা পুরুষমানুষ প্রতি ১ মিনিটে ত্যাগ করে ৩০০ মিলি লিটার CO2, একজন মহিলা ত্যাগ করে ২৬০ মিলিলিটার। CO2-এর এই পরিমাণগত হেরফেরের জন্য CO2 ককটেলের পরিমাণও লিঙ্গভেদে হয় একেকরকম। আফ্রিকার ম্যালেরিয়াপ্রবণ গাম্বিয়ায় করা এক গবেষণায় জানা গিয়েছে, শুধুমাত্র প্রেগন্যান্সির কারণে ২১ শতাংশ বেশি CO2 ত্যাগ করে বলে প্রেগন্যান্ট মহিলারা ননপ্রেগন্যান্ট মহিলাদের তুলনায় মশার কামড় খায় দ্বিগুণ বেশি। লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন-এর মশা-বিশেষজ্ঞ ডঃ জেমস লোগন-এর কথায়, লম্বা ও মোটা মানুষদের বিপদ বেশি। কারণ বেঁটে ও রোগাদের তুলনায় CO2 বেশি ত্যাগ করে বলে এরা মশার কামড় খায় বেশি, আর তাতেই বাড়ে তাদের মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা। মোদ্দা কথাটা হল, CO2 ককটেল, ঘামের গন্ধ এবং আরও অনেক কিছুর সৌজন্যে পৃথিবী জুড়েই মানুষ আজ মশার টার্গেট। কোন গন্ধের মানুষের দিকে এগতে হবে আর কোন গন্ধের মানুষের কাছ থেকে পালাতে হবে, তা বুঝতে এতটুকু সময় লাগে না মশাদের। মাথার দু’পাশ থেকে বেরনো চুলের মতো দেখতে দুটো অ্যান্টেনার প্রতিটিতে বসানো আছে গন্ধ ধরার কল (পড়ুন কেমোরিসেপ্টর)। মশার নাক হিসেবে কাজ করে এই কেমোরিসেপ্টর। গন্ধ-সংবেদনশীল কেমোরিসেপ্টর গন্ধ রিসিভ করে সোজা চালান করে দেয় ব্রেন-এ। গন্ধ বিশ্লেষণ করে ব্রেন পাঠায় চূড়ান্ত নির্দেশ, ‘‘ভাগো, ভাগো’’ কিংবা ‘‘অ্যাটাক, অ্যাটাক।’’ মাথার দিকটায় অ্যান্টেনা ছাড়াও ম্যাক্সিলারি পাল্প বলে একটা অংশ থাকে মশার। গন্ধ রিসিভ করার কল বসানো রয়েছে তাতেও।
বেশ কিছুদিন ধরে শুনছি, ও পজিটিভ ব্লাড যাদের, তারা নাকি মশার কামড় খায় বেশি এবং এ পজিটিভ ব্লাড গ্রুপের লোকেরা কম। বিভিন্ন গবেষণায় বিজ্ঞানীদের নজরে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। কারণ বিশ্লেষণের কাজও শুরু হয়েছে। তবে এসব খবর বাজারে ছড়িয়ে পড়ায় জনসাধারণের আতঙ্ক যে ক্রমশ বাড়ছে, তা বলাই বাহুল্য। কাজেই মশা সম্পর্কে উদাসীনতা আর নয়। ভাবুন। মশাকে জানুন। মশার কামড় এড়াতে তৎপর হোন। মশা-অধ্যুষিত এলাকায় কোনও মাঠ কিংবা পার্কের ভেতরে বসে ঘাম শুকোতে যাবেন না কেউ। বিপদে পড়বেন। ঘাম হলেই রুমাল দিয়ে চটপট মুছে নিন। গন্ধহীন সাবান দিয়ে খুব ভালো করে স্নান করুন দিনে একবার, গরমে দুবার, পারলে তিনবার। সুগন্ধী ক্রিম, পারফিউম যত কম ব্যবহার করবেন ততই মঙ্গল। ঘরের দরজা-জানালায় মশা প্রতিরোধী জাল লাগালে বেডরুমে মশা ঢুকবে কম। জাল লাগান, আজই। মশারি টাঙিয়ে শোবেন সবাই। ফাস্টফুড এবং মশলাদার খাবার-এর প্রতি লোভ মোটেই ভালো নয়। সজাগ হোন। চা-কফিতেও চুমুক পড়ুক কম। গরমের সময় চাই হালকা জামাকাপড়। গাঢ় নীল, লাল আর কালো রঙের পোশাক এড়িয়ে চলা ভালো, কারণ এসব রং দেখে মানুষকে টার্গেট করে মশা। মশার কামড় এড়ানোর সবথেকে ভালো উপায় পরিবেশে মশাকে জন্মাতে না দেওয়া। বছরভর সবাই সক্রিয় থাকলে কাজটি সহজ, নইলে বেশ কঠিন।

 লেখক কলকাতা পুরসভার মুখ্য পতঙ্গবিদ




?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta