রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড়ি | ম্যাগাজিন

কেন্দ্রীয় বাজেটে আগামী বর্ষে মোট ব্যয়বৃদ্ধি চলতি বর্ষের তুলনায় অনেক কম
দেবনারায়ণ সরকার

গত ১ ফেব্রুয়ারি অর্থমন্ত্রী ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষের কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করার পরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন ‘‘অরুণ জেটলি একটি উত্তম বাজেট পেশ করেছেন, কারণ এতে গরিবের হাত শ ক্ত হয়েছে।’’ বলা হচ্ছে, বর্তমান বাজেটে কৃষি ও গ্রামোন্নয়নে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। বরাদ্দ বেড়েছে আগের তুলনায় অনেক বেশি। এমনকী জোর দেওয়া হয়েছে পরিকাঠামোতে, যা সর্বকালীন রেকর্ড। তবে এটা ঘটনা যে প্রতি বছর ইউনিয়ন বাজেটে তার পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় বাজেট বরাদ্দ স্বাভাবিকভাবে বেশি থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই সরকারের আমলে আগত বছরের বাজেটে বরাদ্দ কি আগের তুলনায় অনেক বেশি বাড়ল? বাজেটের প্রকৃত পরিসংখ্যান থেকেই এর সত্যতা বিচার করা যাক।
মোট ব্যয়বৃদ্ধি প্রায় ৪০ শতাংশ কম
প্রতি বছরের বাজেটে কোন খাতে কত বরাদ্দ বাড়ানো হল তা প্রকৃতপক্ষে নির্ভর করে মোট ব্যয় ওই বছরের বাজেটে পূর্ববর্তী বছরের বাজেটের তুলনায় কতখানি বাড়ল তার উপর। এই সরকারের আমলে ২০১৫-১৬-এর তুলনায় ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষের অনুমিত বাজেটে (Budget estimate) মোট ব্যয় বৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ২ লক্ষ ৫৮৩ কোটি টাকা (বৃদ্ধির হার ১১.২৮ শতাংশ)। ২০১৫-১৬-এর তুলনায় ২০১৬-১৭-র সংশোধিত বাজেটে (Revised estimate) মোট ব্যয় আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লক্ষ ২৯ হাজার ১৬ কোটি টাকা (বৃদ্ধির হার ১২.৮৩ শতাংশ)। এমনকী ২০১৫-১৬ অর্থবর্ষের প্রকৃত (Actual) বাজেটে মোট খরচের তুলনায় ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষের সংশোধিত বাজেটে মোট ব্যয়ের বৃদ্ধি ধরা হয়েছে ২ লক্ষ ২৩ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা (বৃদ্ধির হার ১২.৪৯ শতাংশ)।
পক্ষান্তরে ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষের মোট ব্যয়ের (অনুমিত বাজেট হোক অথবা সংশোধিত বাজেট হোক) বৃদ্ধির তুলনায় ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষের অনুমিত বাজেটে মোট ব্যয় বৃদ্ধি অনেকাংশে কম। ২০১৬-১৭-এর তুলনায় ২০১৭-১৮-র অনুমিত বাজেটে মোট ব্যয় বৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১ লক্ষ ৬৮ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা (বৃদ্ধির হার ৮.৫ শতাংশ)। অথচ ২০১৫-১৬-এর তুলনায় ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষে অনুমিত হিসাবে এই বৃদ্ধি ছিল ২ লক্ষ ৫৮৩ কোটি টাকা (বৃদ্ধির হার ১১.২৮ শতাংশ)। অর্থাৎ আগত বছরের (২০১৭-১৮) বাজেটে মোট ব্যয়ের বৃদ্ধি তার পূর্ববর্তী বছরের মোট ব্যয় বৃদ্ধির তুলনায় মোট অর্থে এবং বৃদ্ধির হারে উভয়ক্ষেত্রেই যথেষ্ট কম। এমনকী, ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষের অনুমিত বাজেটে মোট ব্যয়ের বৃদ্ধি তার পূর্ববর্তী বছরের মোট ব্যয়ের বৃদ্ধির তুলনায় আরও কম।
২০১৭-১৮ অর্থবর্ষের বাজেটে (অনুমিত বাজেটে) মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২১ লক্ষ ৪৬ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা। অথচ ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষের সংশোধিত বাজেটে খরচ হয়েছে ২০ লক্ষ ১৪ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০১৬-১৭-র সংশোধিত খরচের তুলনায় আগত অর্থবর্ষের বাজেটে মোট ব্যয় বেড়েছে মাত্র ১ লক্ষ ৩২ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা (বৃদ্ধির হার ৬.৫৭ শতাংশ)। কিন্তু ২০১৫-১৬ অর্থবর্ষের সংশোধিত খরচ বা প্রকৃত খরচের তুলনায় ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষের সংশোধিত বাজেটে মোট খরচের বৃদ্ধির তুলনায় আগত বছরের (২০১৭-১৮) মোট ব্যয় বৃদ্ধি প্রায় ৪০ শতাংশ কম। অর্থাৎ ২০১৫-১৬ বাজেটের সংশোধিত খরচ ও প্রকৃত খরচের তুলনায় যেখানে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের সংশোধিত খরচ বেড়েছে যথাক্রমে ২,২৩,৬২৪ কোটি টাকা ও ২,২৯,০১৬ কোটি টাকা, সেখানে ২০১৬-১৭-র সংশোধিত খরচের তুলনায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে অনুমিত বাজেটে অতিরিক্ত বৃদ্ধি মাত্র ১,৩২,৩২৮ কোটি টাকা (পূর্ববর্তী বছরের বৃদ্ধির তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম)। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে বলা যায়, যেখানে ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষের মোট ব্যয়ের অতিরিক্ত বৃদ্ধির তুলনায় আগত অর্থবর্ষের (২০১৭-১৮) মোট ব্যয় অতিরিক্ত বৃদ্ধি প্রায় ৪০ শতাংশ কম। সেখানে কৃষি, গ্রামোন্নয়ন, পরিকাঠামো ইত্যাদি ক্ষেত্রে এই বাজেটে তুলনামূলকভাবে অতীতের তুলনায় বরাদ্দের মাত্রা রেকর্ড বেশি এই যুক্তি খাটে না। একে একে ক্ষেত্রগুলিতে আসা যাক।
মূলধনী খাতে ব্যয় বৃদ্ধির হার প্রায় সমান
২০১৭-১৮-র ইউনিয়ন বাজেটের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এই বাজেটে চিরাচরিত পরিকল্পনা ও পরিকল্পনা বহির্ভূত ব্যয়ের পরিবর্তে রাজস্ব ও মূলধনী খাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে। যদিও বাজেটে ২০১৬-১৭-এর তুলনায় আগামী অর্থবর্ষে মূলধনী খাতে ২৫.৪ শতাংশ ব্যয়বৃদ্ধির উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে ২০১৬-১৭-র সংশোধিত বাজেটের তুলনায় আগামী অর্থবর্ষের বাজেটে মূলধনী খাতে ব্যয় বৃদ্ধি ঘটছে মাত্র ১০.৭ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে মূলধনী খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩,০৯,৮০১ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষে এই খাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২,৪৭,০২৩ কোটি টাকা। কিন্তু বর্তমান অর্থবর্ষের শেষে দেখা যাচ্ছে ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষের সংশোধিত বাজেটে এই খাতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,৭৯,৮৪৭ কোটি টাকা। যদিও ২০১৬-১৭ সালের অনুমিত বাজেটের তুলনায় ২০১৭-১৮ সালের অনুমিত বাজেটে বৃদ্ধির হার ২৫.৪ শতাংশ, কিন্তু ২০১৬-১৭-র সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে ব্যয় বৃদ্ধি মাত্র ১০.৭ শতাংশ (অতিরিক্ত ২৯,৯৫৪ কোটি টাকা)।
কিন্তু ২০১৫-১৬ অর্থবর্ষে মূলধনী খাতে মোট খরচের (২,৫৩,০২২ কোটি টাকা) তুলনায় ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষের সংশোধিত বাজেটে এই খাতে ব্যয় বৃদ্ধি ১০.৬ শতাংশ (অতিরিক্ত ২৬,৮২৫ কোটি টাকা)। তাই বাজেটে মূলধনী খাতে আগামী বছর মূলধনী খাতে রেকর্ড পরিমাণ ব্যয় বৃদ্ধির কথা বলা হলেও ২০১৬-১৭-র সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এই বৃদ্ধি অনেক কম। এমনকী ২০১৬-১৭-তে যেখানে এই খাতে বৃদ্ধির অনুপাত ছিল ১০.৬ শতাংশ (অতিরিক্ত ২৬,৮২৫ কোটি টাকা), সেখানে আগামী অর্থবর্ষে এই খাতে বৃদ্ধির অনুপাতে ১০.৭ শতাংশ (অতিরিক্ত ২৯,৯৫৪ কোটি টাকা)। ফলে আগামী বছর পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বরাদ্দ রেকর্ড বেড়েছে এই যুক্তি খাটে না।
কৃষি ও গ্রামোন্নয়নে ব্যয়বৃদ্ধি ৩০ শতাংশ কম
২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে কৃষি ও গ্রামোন্নয়ন খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১,৮৫,৫৫২ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭-র সংশোধিত বাজেটে এই খাতে ব্যয় ১,৬৮,৭৫৩ কোটি টাকা। বৃদ্ধির হার ৯.৯৫ শতাংশ (অতিরিক্ত বৃদ্ধি ১৬,৭৯৯ কোটি টাকা)। কিন্তু ২০১৫-১৬ অর্থবর্ষে এই খাতে প্রকৃত খরচ হয়েছিল ১,১৩,৯২৯ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬-র তুলনায় ২০১৬-১৭ সংশোধিত বাজেটে এই খাতে বৃদ্ধির হার ৪৮.১২ শতাংশ (অতিরিক্ত বৃদ্ধি ৫৪,৮২৪ কোটি টাকা)। ফলে ২০১৬-১৭-র তুলনায় এই খাতে ব্যয় বৃদ্ধি প্রায় ৩০ শতাংশ কম।
বেশ কিছু ফ্ল্যাগশিপ প্রোগ্রামে ব্যয় বৃদ্ধি যথেষ্ট কম
১০০ দিনের প্রকল্পে বলা হয়েছে ২০১৬-১৭-র তুলনায় আগামী অর্থবর্ষে প্রায় ২৫ শতাংশ ব্যয় বরাদ্দ বাড়ছে (৩৮,৫০০ কোটি থেকে ৪৮,০০০ কোটি টাকা)। কিন্তু ২০১৬-১৭-র সংশোধিত বাজেটে এই খাতে খরচ দেখানো হয়েছে ৪৭,৪৯৯ কোটি টাকা। ফলে আগামী অর্থবর্ষে এই খাতে বৃদ্ধির হার মাত্র ১ শতাংশ (অতিরিক্ত ৫০১ কোটি টাকা)। একইভাবে জাতীয় শিক্ষা মিশনে বরাদ্দ বৃদ্ধি মাত্র ৪.৬ শতাংশ (অতিরিক্ত ১৩০৫ কোটি টাকা)। সর্বশিক্ষা অভিযানে ও মিড ডে মিলে বরাদ্দ বৃদ্ধির হার যথাক্রমে ৪.৪ শতাংশ (অতিরিক্ত ১০০০ কোটি টাকা) ও ৩ শতাংশ (অতিরিক্ত মাত্র ৩০০ কোটি টাকা)।
সরকারি তথ্যেই স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে ২০১৬-১৭ সংশোধিত বাজেটে দেশের জিডিপির অনুপাতে বাজেটের মোট খরচ ১৩.৪ শতাংশ থেকে ২০১৭-১৮-তে নেমে ১২.৭ শতাংশে দাঁড়াবে। পক্ষান্তরে একই সময়কালে জিডিপি-র অনুপাতে সামগ্রিক কর সংগ্রহ ১১.৩ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকবে। তাহলে স্বাভাবিকভাবে মোট ব্যয় হ্রাসের সঙ্গে এ প্রশ্নও উঠছে নোট বাতিলের ফলে কর আদায় বাড়ল কই?

 লেখক প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অবঃ অধ্যাপক




?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta