রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড়ি | ম্যাগাজিন

বিমুদ্রাকরণের পর কালো টাকা উদ্ধার
এবং ভারতের অর্থনীতির চিত্র

দেবনারায়ণ সরকার

গত ৮ নভেম্বর মধ্যরাত থেকে আচমকা পুরানো ৫০০ টাকা ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল করে দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকাংশে স্তব্ধ করে ৯৯ শতাংশেরও বেশি লোককে চরম দুর্দশায় ফেলেছে কেন্দ্রীয় সরকার। ৯০ শতাংশেরও বেশি কালো সম্পদের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ ছাড় দিয়ে কালো সম্পদের উৎসকেই বন্ধ না করে যে যুক্তিহীন জুয়োখেলায় ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মেতেছেন, তাতে ৫০ দিন পরে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সবার প্রশ্ন, কত কালো টাকা উদ্ধার হল? বিমুদ্রাকরণে দেশের লাভ কী হল? ৮ নভেম্বর নোট নাকচের কথা জানানোর সময় তিনি কথা দিয়েছিলেন ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে আমজনতার দুর্ভোগ মিটবে। নইলে চার মাথার মোড়ে দাঁড়িয়ে তাদের সাজা মাথা পেতে নেবেন তিনি। কিন্তু ৩১ ডিসেম্বরের রাতে প্রধানমন্ত্রীর জাতির উদ্দেশে ভাষণে তার কোনও জবাব ছিল না। বরং বর্ষশেষের প্রাপ্তি বলতে শুধু চাষি, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মহিলা ও প্রবীণ নাগরিকদের জন্য গুটিকতক ঘোষণা। যেন উত্তরপ্রদেশ ও পাঞ্জাবের আসন্ন ভোটের আগে এইসব ভোটারের মন জয়ের আপ্রাণ চেষ্টা। অর্থাৎ ৫০ দিনে যে দুর্ভোগ কাটেনি তা তিনি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। অদূর ভবিষ্যতে তা থেকে মুক্তির স্পষ্ট আভাসও তিনি সেদিন দিতে পারেননি। তাই গুটিকয়েক প্রকল্প ঘোষণার মাধ্যমে নোট জটের ক্ষতে কিছুটা মলম লাগানোর যে আপ্রাণ চেষ্টা করলেন তিনি, তাতে প্রধানমন্ত্রীর বর্ষশেষের বক্তব্যকে বাজেট বক্তৃতা বলে ভাবাটাও বিশেষ অসংগত হবে না। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী টুইটে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তো কালো টাকা ও বিমুদ্রাকরণ থেকে সরেই গেলেন। উনি তো অর্থমন্ত্রী হয়ে যেন বাজেট ঘোষণা করলেন। বিমুদ্রাকরণের তথ্য কোথায়? কত কালো টাকা উদ্ধার হল? দেশ কীভাবে লাভবান হল?’
নোট বাতিলের ফল পর্বতের মূষিক প্রসব: নোট বাতিলের ফল যে প্রায় ব্যর্থ তা সরকারের বিভিন্ন বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট। গত ১৩ ডিসেম্বর রিজার্ভ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আর. গান্ধী সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছিলেন যে, ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলিতে ১২ লক্ষ ৪৪ হাজার কোটি টাকা জমা পড়েছে। এটা বাতিলকৃত মোট অর্থের (১৫ লক্ষ ৪৪ হাজার কোটি টাকা) ৮১ শতাংশ। কিন্তু ডিসেম্বরের শেষে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে যে বাতিলকৃত নোটের ৯০ শতাংশের অনেক বেশি (১৪ লক্ষ কোটি টাকার বেশি) টাকা ব্যাংকে জমা পড়েছে। অথচ নোট বাতিলের পর বলা হয়েছিল যে ৩ থেকে ৫ লক্ষ কোটি টাকা আর ব্যাংকে জমা পড়বে না। কারণ যেটা জমা পড়বে না, সেটা মূলত কালো টাকা। কিন্তু বাস্তবে ৯০ শতাংশের অনেক বেশি অর্থ ব্যাংকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে জমা পড়ে গিয়েছে। ১৯৭৮ সালেও প্রায় সম অনুপাতে অর্থ ব্যাংকে জমা পড়েছিল। তাহলে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসবে, বিমুদ্রাকৃত টাকায় কালো টাকা কোথায়?
এখন কেন্দ্রীয় সরকার ও সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যে মুদ্রা ব্যাংকে জমা পড়েছে তার মধ্যে অন্তত ৩ থেকে ৫ লক্ষ কোটি টাকা কালো টাকা। কারণ যাঁরা ব্যাংকে টাকা জমা দিয়েছেন তাঁরা অনেকেই স্বীকার করেছেন যে এই টাকার অনেকাংশ কালো টাকা। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় প্রত্যক্ষ কর পর্ষদের চেয়ারম্যান সুশীল চন্দ্র। গত ১৬ ডিসেম্বর তিনি বলেন যে বাতিলকৃত পুরানো ৫০০ ও ১০০০ টাকার যে নোট ব্যাংকে জমা পড়েছে, তাতে কর ফাঁকির স্বীকারোক্তিতে ২৬০০ (ছাব্বিশশো) কোটি টাকা মিলেছে। অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১৪ লক্ষ কোটি টাকা বাতিলকৃত নোট জমায় শতকরা হিসেবে ১০০ টাকা বাতিল নোট জমায় প্রায় ১৯ পয়সা কর ফাঁকির কথা জনগণ স্বীকার করেছে। মোদ্দা কথা হল, যে টাকা ব্যাংকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত জমা পড়েছিল, সেই জমার প্রায় ৫৩০ ভাগের ১ ভাগ কালো টাকা (যা জনগণ স্বীকার করেছে)। ১৬ ডিসেম্বর সুশীল চন্দ্র আরও বলেন যে, ৮ নভেম্বরের পর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত আয়কর দপ্তর সহ অন্যান্য সরকারি প্রশাসনের তল্লাশির মাধ্যমে নূতন নোট, পুরাতন নোট ও সোনা মিলিয়ে ৩৯৩ কোটি টাকা কালো টাকা উদ্ধার করা গিয়েছে। গত ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫০ দিনের তল্লাশিতে মাত্র ৪৫৮ কোটি কালো টাকা উদ্ধার করা গিয়েছে। তবে জনগণের স্বেচ্ছা স্বীকারোক্তি ও প্রশাসনের তল্লাশি মিলিয়ে যতদূর জানা গিয়েছে নোট বাতিলের ৫০ দিনে সর্বসাকুল্যে ৪ হাজার কোটি টাকার কম (১৪ লক্ষ কোটি টাকার বেশি জমার মধ্যে) কালো টাকা আদায় হয়েছে। ১০০ টাকা জমায় প্রায় ২৮ পয়সা। অর্থাৎ মোট ব্যাংকে জমাকৃত অর্থের ৩৫০ ভাগের ১ ভাগও নয়।
এর পরেও অনেকেই বলতে পারেন এবার আয়কর দপ্তর ও সরকারের অন্যান্য দপ্তর তল্লাশির মাধ্যমে এই জমাকৃত অর্থ থেকে বিপুল পরিমাণে কালো টাকা উদ্ধার হবে। এটাও অনেকটা আলাদিনের প্রদীপের মতো। কারণ নোট বাতিলের ৫০ দিনে তল্লাশির মাধ্যমে কালো টাকা উদ্ধার করা গিয়েছে ৫০০ কোটি টাকারও কম। তাই বর্তমান বছরের শেষে (৩১ মার্চের মধ্যে) বাতিলকৃত ব্যাংকে জমা পড়া নোটে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি কালো টাকা আদায় হওয়া কষ্টসাধ্য। যদি ধরেও নেওয়া হয় নোট বাতিল থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা আদায় করা যাবে তাহলে সরকারি কোষাগারে আসবে মাত্র ২৫ হাজার কোটি টাকা। এখানে উল্লেখ্য যে, গত জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪ মাসের স্বেচ্ছা আয় ঘোষণা প্রকল্পে প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকা কালো টাকা ঘোষিত হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। সে ক্ষেত্রেও সরকারি কোষাগারে আসবে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। তাই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসবে দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্তব্ধ করে সাধারণ মানুষের ওপর এত ভোগান্তি কেন?
অর্থনৈতিক সূচকের অশনি সংকেত বিমুদ্রাকরণের এক মাসেই: দেশ ও বিদেশের প্রতিটি অর্থনৈতিক সমীক্ষা বর্তমান বছরে সমৃদ্ধির হার হ্রাসের ইঙ্গিত নির্দেশ করেছে। এমনকী ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক ইতিমধ্যেই বর্তমান বছরে ০.৫ শতাংশ সমৃদ্ধির হার হ্রাসের সম্ভাবনার আভাস দিলেও বাস্তবে যে তা যে অনেক বেশি হবে সম্প্রতি দেশ ও বিদেশের বেশ কিছু সমীক্ষা ও সূচক থেকে স্পষ্ট। ভারতের সেবাক্ষেত্রে মাসিক সূচকে দেখা যাচ্ছে (Nikkei India Services Business Activity) নোট বাতিলের প্রথম মাসে (২০১৬-এর নভেম্বরে) সূচক হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬.৭। ২০১৬-র অক্টোবরে এই সূচক ছিল ৫৪.৫। এই রিপোর্টে বলা হয়েছে ১ মাসে (অক্টোবর থেকে নভেম্বরে) প্রায় ৮ পয়েন্ট হ্রাস গত ৮ বছরে (২০০৮-এর নভেম্বরের পরে) ঘটেনি। একইভাবে শিল্প ক্ষেত্রে উৎপাদন শিল্পের সূচকও দীর্ঘ ২২ মাস (প্রায় ২ বছর) ক্রমশ ঊর্ধ্বগামী হওয়া সত্ত্বেও নোট বাতিলের ধাক্কায় ২০১৬-এর অক্টোবর থেকে নভেম্বরে যথেষ্ট কমেছে। নোট বাতিলের ধাক্কা গাড়ি বিক্রির বাজারেও। নভেম্বরে মহিন্দ্রা ও মহিন্দ্রার ইউটিলিটি ভেইকেল ও সহযোগী সংস্থা মহিন্দ্রা ভেইকেল ম্যানুফ্যাকচার্সের গাড়ি বিক্রি যথাক্রমে ৩৩.৫৮ ও ২১.৫৮ শতাংশ কমেছে। এই হ্রাসের তালিকায় রয়েছে মারুতি সুজুকি, হন্ডাই মোটর, হন্ডা মোটর, ফোর্ড মোটর ইত্যাদি গাড়ি। বৈদ্যুতিক ভোগ্যপণ্যের শিল্পের বাজারও (ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, এয়ারকন্ডিশনার ইত্যাদি) নোট ধাক্কায় বেসামাল। গোদরেজ, এলজি, সোনি, স্যামসাং, প্যানাসনিক, ভিডিওকন ইত্যাদি বড় সংস্থার বিক্রি নভেম্বরে এক ধাক্কায় ৫০ শতাংশ নেমে গিয়েছিল। নোট বাতিলের ধাক্কায় চাহিদার অভাবে ভুগছে ছোট ও মাঝারি শিল্পও। চাহিদার অভাবে উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে গড়ে ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে ছোট ও মাঝারি শিল্পে। অসংগঠিত ক্ষেত্রে নোট বাতিলের ধাক্কা এসেছে সব থেকে বেশি। এখানে অবশ্যই উল্লেখ্য যে ভারতের জিডিপির প্রায় ৪৫ শতাংশ আসে অসংগঠিত ক্ষেত্র থেকে এবং ভারতে মোট কর্মনিয়োগের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে অসংগঠিত ক্ষেত্র থেকে। নোট বাতিলের প্রথম মাসেই মোট কর্মনিয়োগ ৭০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিও চরম দুর্দশাগ্রস্ত নোট বাতিলের ধাক্কায়। অর্থের অভাবে সময়মতো ফসল তুলতে না পারায় অনেকে রবি চাষ করতে পারেনি। অনেক কৃষকের হাতে চাষের টাকা, বীজ কেনার টাকা নেই। সারা ভারতে সমবায় ব্যাংকগুলি কৃষিতে যেখানে ৩০/৪০ শতাংশ অর্থের জোগান দেয়, নগদের অভাবে সমবায় ব্যাংকগুলি রুগ্ণ। রবি কৃষিতে প্রয়োজনের এক-চতুর্থাংশ নগদ অর্থ তারা জোগান দিতে পারছে না। তাই আগামীতে কৃষি উৎপাদনে ভারতের অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গেও যথেষ্ট অবনতির ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। ব্যাংক থেকে আমানতকারীদের টাকা তোলার ক্ষেত্রেও এখনও চাহিদার তুলনায় জোগান যথেষ্ট কম। সরকারেরই হিসাবমতো ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে প্রচলিত মুদ্রার জোগানের ৪৫/৫০ শতাংশের বেশি জোগান দেওয়া সম্ভব হয়নি। ক্যাশলেস লেনদেন ২০০/৩০০ বাড়ার কথা বললেও তা এখন দেশের মোট লেনদেনের ১০ শতাংশও ছাড়ায়নি।
তাই সামগ্রিকভাবে বিমুদ্রাকরণের ফলে দেশে শতাধিক লোকের মৃত্যু ছাড়াও দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিটি ক্ষেত্রে যথেষ্ট বিপর্যয়ের ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। আচমকা এরূপ বিমুদ্রাকরণ কোনও দেশেই সফল হয়নি। তাই নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বিখ্যাত সাহিত্যিক ও নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ’র উক্তি এ ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। তিনি তাঁর Maxims for Revolutionists (১৯০৩) গ্রন্থে লিখেছিলেন, ‘যুক্তিবাদী লোক নিজেকে বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাওয়ায়। একজন যুক্তিহীন লোক সেই ব্যক্তি যিনি নাছোড়বান্দাভাবে বা জোর করে বিশ্বকেই নিজের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করে।’ ভোট বাক্সে এর সুফল মিললে হয়তো প্রকৃত সত্যটাই উবে যেতে পারে।

 লেখক প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক
 




?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta