কলকাতা, শনিবার ২২ অক্টোবর ২০১৬, ৫ কার্তিক ১৪২৩

 

রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড়ি | ম্যাগাজিন

কলকাতা থাক না কলকাতাতেই
গৌরী বন্দ্যোপাধ্যায়

‘অপরের শাঁখা সোনা বাখানোনা, আপনার ক্ষুদ কুঁড়া নিন্দোনা’—প্রবচনটি বাল্যাবধি শুনে শুনে মনে গেঁথে গিয়েছিল কিন্তু ঠিক হৃদয়ঙ্গম হয়নি। বাখানোনা যে ব্যাখ্যান কোরো না এটি বুঝতে মনে হয় সময় লেগেছিল ২৫/৩০ বছর। তবে কথায় আছে না ‘আবৃত্তি সর্ববিদ্যানাম্‌ ঩ বোধোদপি গরীয়সী’ সত্যই তাই। আবৃত্তি সকল বিদ্যা এমনকী বোধের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। তার জোরেই একদিন বোধ হল অন্যের ঐশ্বর্যের ব্যাখ্যা করা ও নিজের সামান্য বস্তুগুলির নিন্দা করা উচিত নয়। এত বড় একটা মুখবন্ধের অবতারণা শুধু বোঝাতে আমাদের নেতা-নেত্রীরা দেশের নানা শহরকে বিদেশের নানা শহরের মতো তৈরি করে দেওয়ার যে চিন্তাভাবনা করছেন ও যা প্রকাশও করছেন তা ভালো নয়। কেউ বলছেন কলকাতাকে লন্ডন করে দেবেন, কেউ বা দিল্লিকে লন্ডন করে দিতে চাইছেন। কেউ মুম্বইকে সাংহাই অথবা বারাণসীকে কিয়োটা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, এতে বড় গৌরবের হানি হচ্ছে। লন্ডনের প্রতি আনুগত্য ও মুগ্ধতা হয়তো সেই শহর আমাদের পূর্বতন প্রভুর শহর বলে। কিন্তু এর ভেতর দিয়ে কোথায় যেন একটা দৈন্যও প্রকাশ পাচ্ছে। তাই এমন স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছা করে না।
এই বিশাল পৃথিবীর প্রায় সাড়ে ছয়শো কোটি মানুষের প্রত্যেকে যেমন তাদের কিছু নিজস্বতার গুণে একে অপরের থেকে আলাদা, ঠিক তেমনই দুনিয়া জুড়ে যত গ্রাম-শহর বা গঞ্জ আছে তাদের প্রত্যেকটি নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যের গুণে একে অপরের থেকে আলাদা। একই পিতামাতার সন্তান হয়েও যেমন দুইজন ভাইবোন একই রকম হয় না, এমনকী যমজ হলেও হয় না, ঠিক তেমনই পাশাপাশি থাকা দুটি শহর বা গ্রামও একটি অন্যটির মতো হয় না। আর দূরের শহর বা অন্য দেশের শহর তো শতভাবে আলাদা হতে বাধ্য। তাই ভারতের অর্থাৎ পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন সভ্যতার এই দেশের কোনও শহর, তা প্রাচীন বা নবীন যেমনই হোক, তাকে অন্য কোনও দেশের কোনও শহরের মতো করে দেওয়ার মধ্যে কোনও গৌরব নেই।
আমাদের এই কলকাতা শহর তার প্রতিটি পাড়ার নিজস্বতা নিয়ে এক নিতান্তই নবীন শহর। এর পথঘাটের বিন্যাস, এই শহরের ভূমির ঢাল-এর বাড়ি-ঘরের ধরন, মানুষজন—অধিবাসীদের মানসিকতা, সামাজিকতা—সবই এই শহরের একান্ত নিজস্ব। কলকাতার বছর জুড়ে নানা ঋতুর আনাগোনা, এখানকার গাছগাছালি, পশুপাখি কখনওই লন্ডনের মতো হতে পারে না। এমনকী এই শহরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ভাগীরথীও লন্ডনের পাশ দিয়ে বয়ে চলা টেমস নদী থেকে নানাভাবে ভিন্ন। এই শহরের প্রাণপ্রাচুর্য, সরল আন্তরিকতা কখনওই লন্ডন আত্মস্থ করতে পারবে না।
এই কলকাতাবাসী সহ সমস্ত ভারতবাসীই নানাভাবে নানা বিষয়ে ঋদ্ধ। আমাদের অনেক আছে। অনেক, অনেক, অনেক আছে। এই ভারতের মাটির তলায় ও মাটির উপরে যে বহু সহস্র বছরের গৌরবময় ইতিহাস ধরা আছে তা পৃথিবীর অন্য কারও নেই। আমাদের মতো এমন আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, চীনের একদেহে লীন হয়ে যাওয়ার বৈশিষ্ট্যও দুনিয়ার আর কোনও দেশের নেই। আমাদের মতো এমন বারো মাস ধরে ছয় ঋতুর আসা-যাওয়া, এমন দিগন্ত জোড়া সুবিশাল কৃষিক্ষেত্র, এমন উর্বর মাটি, বর্ষায় ফুলে-ফেঁপে ওঠা, এমন দুকূল ছাপানো নদ-নদী, ফলভারে নত হয়ে পড়া এমন সব গাছের দেখা কি অন্যত্র মিলতে পারে? ভারতের উত্তর দিগন্ত জুড়ে বিরাজিত নগাধিরাজ যেমন উত্তরের হিমেল হাওয়া থেকে নিজের পক্ষপুটে এই দেশকে রক্ষা করছে, আবার তেমনই সমুদ্র থেকে বয়ে আসা মেঘের পথে বাধা সৃষ্টি করে বৃষ্টি ঘটাচ্ছে, তেমনটি আর পৃথিবীর কোত্থাও নেই।
অন্য সব দেশের সামান্য যা আছে তাকে মনোহারি করে সাজিয়ে-গুছিয়ে তারা তুলে ধরতে জানে, যা দেখে আমরা মুগ্ধ হই। আমাদের মাঠে-ঘাটে, বনে-বাদাড়ে অযত্নে অবহেলায় যে সব সম্পদ পড়ে আছে তার একাংশও যদি আমরা তেমন করে সাজিয়ে-গুছিয়ে তুলে ধরতে পারি তবে তা জগৎকে বিস্ময়ে হতবাক করে দেবে। আমাদের মৃৎশিল্প, হস্তশিল্প, রন্ধন নৈপুণ্য, ঘরে ঘরে মা-বোনেদের হাতের কাজের জাদুকাঠি যে কত অনন্য তার খেয়ালই আমরা করি না। আমাদের সংগীত, নৃত্য-সহ আরও কত বৈশিষ্ট্য যে প্রকাশের অন্তরালে থেকে দিকে দিকে হারিয়ে যাচ্ছে তার হদিশও আমরা রাখি না। যান্ত্রিক আধুনিকতার উত্তুঙ্গ শিখরে ওঠার প্রতিযোগিতার চেয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে নিজেদের বিকশিত করা কি বেশি ভালো নয়?
যান্ত্রিকতা মানুষকে যা দেয় কেড়ে নেয় তার চেয়ে অনেক বেশি। যন্ত্রেরও প্রয়োজন নিশ্চয় আছে কিন্তু প্রাকৃতিকভাবে যেখানে কাজ চলে সেখানে যন্ত্রকে টেনে আনলে দুর্গতিই বাড়ে। উদাহরণস্বরূপ রয়েছে পূর্ব কলকাতার এই জলাভূমি যা ২০০২ সালেই বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে রামগড় অঞ্চলের অন্তর্গত হয়েছে। সেখানে রয়েছে সাড়ে বারো হাজার হেক্টর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ২৭৮টি ভেড়ি সহ নানা জলাশয় ও তার মাঝে থাকা চাষের জমি। সেই জলাশয়গুলিতে নানা খাল ধরে গিয়ে পড়ছে কলকাতা শহরের প্রায় ৬৮ কোটি লিটার অপরিশোধিত নর্দমার জল। সেখানকার সেই জলাশয়ের নানাধরনের অণুকীট ও শৈবালের দল ক্রান্তীয় মণ্ডলের প্রখর সূর্যালোকের সাহায্যে সেই নর্দমার জলকে প্রাকৃতিকভাবে বিয়োজিত করে মাছের খাদ্যের উপযোগী করে দিচ্ছে। সেই জলে পুষ্ট হচ্ছে সেখানকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সবজির খেত। শহর কলকাতা সেখান থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৫০ টনের মতো মাছ ও ১৫০ টনের মতো সবজির জোগান পাচ্ছে। কলকাতা শহর ক্রমশ পূর্বদিকে ঢালু হয়ে যাওয়ায় বর্ষাকালে বৃষ্টির জলও স্বাভাবিকভাবে বয়ে গিয়ে জমা হচ্ছে সেই জলাভূমিতে। সেই জলা কার্বন সিঙ্ক হয়ে বাতাসের অশুদ্ধতা টেনে নিয়ে কলকাতাবাসীর নিঃশ্বাসের বায়ুকেও প্রচুর পরিমাণে শুদ্ধ করছে। এই অঞ্চলে বাস করছে প্রায় ২৮ হাজার পরিবার যার মধ্যে ৬০ শতাংশ মৎস্যজীবী ও বাকিরা কৃষিজীবী। এই সকল পরিবারেরই জীবিকা নির্ভর করে আছে এই জলাভূমির উপরে। এই জলাভূমির উপরে দৃষ্টি পড়েছে জমি মাফিয়াদের। গত কুড়ি বছরে এখানে হারিয়ে গিয়েছে ৬৪টি ভেড়ি, বহু কৃষিজমিতে গড়ে উঠেছে বহুতল আবাসন। প্রতিদিনই এই বহিরাগতদের আঘাতের ফলে এই জলাভূমি ক্রমশ বিলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে। কলকাতার এই অনন্য সম্পদটিকে যথাযথভাবে রক্ষা করে এর নিজস্বতার ছাপটিকে বাঁচিয়ে রাখাই রাজ্যের শাসকদের বিচার্য হওয়া উচিত। শহর কলকাতাকে বর্জ্য থেকে মুক্তি দেওয়ার এই প্রাকৃতিক উপায়টিকে সর্বতোভাবে রক্ষা করার কাজে সরকার দায়বদ্ধ হোক। কলকাতাকে কলকাতা করেই রাখুক।
এই জলাভূমিতে বহু কারখানার বর্জ্য ও তার সঙ্গে নানা ভারী খনিজ ও ধাতু এসে পড়ছে। ধাপায় একটি জল শোধনের ব্যবস্থা রয়েছে ঠিকই তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই নগণ্য। তাই শোধনব্যবস্থার বিস্তার ঘটিয়ে এই অঞ্চলকে দুর্গন্ধমুক্ত করলেই এই অঞ্চল পর্যটকদেরও আকৃষ্ট করবে। কলকাতার এই অতুলনীয় সম্পদটি যাতে অক্ষয় হয় তার জন্য সবাইকেই সজাগ থাকতে হবে। আমাদের মন্ত্রী, সান্ত্রি, কোটাল—সবাইকেই কলকাতার আখেরটি বুঝতে হবে।
কয়েকদিন আগেই খবরে ছিল বিমানবন্দরগুলির পরিষেবার মান অনুযায়ী ২০১৬ সালের বিবরণীতে দক্ষিণ কোরিয়ার ইঞ্চিয়ন বিমানবন্দর বিশ্বে প্রথম স্থানে ও দিল্লির আইজিআই বিমানবন্দর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। দিল্লিকে লন্ডন করতে গেলে সদ্যঘোষিত এই বিমানবন্দরের মান যেমন অবনয়ন করতে হবে তেমনই ইন্দ্রপ্রস্থের প্রাচীনতারও একটা বিহিত করতে হবে। দিল্লিতে লু বওয়া চলবে না ও সেখানে শুধু বর্ষা বা শীতের কিছু সময় নয় সারা বছর ধরেই বৃষ্টির ব্যবস্থা করতে হবে। এরকম আরও বহু পরিবর্তন চাই যা সাধ্যাতীত বটে ও কাম্যও নয়। তাই দিল্লি দিল্লিতেই থাক ও কলকাতা থাক কলকাতাতেই।

লেখিকা কলকাতায় যোগমায়া দেবী কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা




?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta