কলকাতা, শনিবার ২২ অক্টোবর ২০১৬, ৫ কার্তিক ১৪২৩

 

রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড়ি | ম্যাগাজিন

আলু নিয়ে দরকার আগাম পরিকল্পনা
নিমাই দে

একদিকে অত্যন্ত অর্থকরী ফসল। কতকটা রেস খেলা বা শেয়ার বাজারের মতো। একবার ভাগ্য খুলে গেলে আর রক্ষে নেই। লাখপতি হওয়া স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু অন্যদিকে এটিই নাকি যত অনর্থের মূল। ভাগ্য যদি সুপ্রসন্ন না হয়, তাহলে ঘটি-বাটি বিকিয়ে নিঃস্ব হয়ে পথের ভিখিরি করে ছেড়ে দেয়।
গ্রাম বাংলার অর্থনীতির একটা বড় জায়গা এভাবেই দখল করে রয়েছে যে জিনিসটি, তা হল নিত্য ব্যবহার্য আলু। বছরের পর বছর এই মরশুমে আলুর দামের ওঠানামা নিয়ে কম লেখালিখি হয় না। সরকারি স্তরেও নানা পরিকল্পনার কথা শোনা যায়। আলু যেখানে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষিত থাকে, সেই হিমঘর খোলা-বন্ধ, হিমঘরে আলু রাখার খরচ ইত্যাদিও নানা সময় খবরের শিরোনামে থাকে।
কিন্তু এতকিছুর পরেও পরিস্থিতি কি বদলেছে? নাকি সরকারি নানা পরিকল্পনা স্রেফ খাতায়-কলমেই রয়ে গিয়েছে? এর উত্তর এক কথায় দেওয়া খুবই কঠিন। তবে এটুকু বলা যায়, আলু নিয়ে সাধারণ চাষি বা ক্রেতাদের মধ্যে অস্থিরতা, ক্ষোভ বা অসন্তোষ এতটুকু কমেনি। যেমনটা হতে চলেছে এই বছরেও।
গত মরশুমের শেষে, মাত্র কিছুদিন আগেও হিমঘরে প্রচুর আলু মজুত হয়ে পড়েছিল। এমন অবস্থা দাঁড়াল যে, হিমঘর বন্ধের সময় বাড়িয়েও সব আলু বের করা গেল না। অনেকটাই অবিক্রিত অবস্থায় কার্যত নষ্ট হয়ে গেল। অথচ খুচরো বাজারে মানুষকে আলু সেই চড়া দামেই, ২০ টাকার আশপাশে কিনে খেতে হল। জোগান বেশি অথচ চাহিদা সেই তুলনায় কম থাকলে তো দাম কমার কথা। অথচ অর্থনীতির সহজ এবং সরল সমীকরণ এখানে খাটেনি। কারণটা তাহলে কী? অভিজ্ঞ মহলে কথা বলে জানা গেল, আলুর ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট এবং দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়া বাজারচলতি আর পাঁচটা জিনিসের থেকে একেবারেই আলাদা। আলু উৎপাদন করেন চাষিরা। দিনান্ত পরিশ্রম করে, মাঠে পড়ে থেকে, ঘাম ঝরিয়ে, একইসঙ্গে একরাশ দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে গ্রামবাংলায়, বিশেষত হুগলি, বর্ধমান, মেদিনীপুর প্রভৃতি জেলায় সেই চাষ ব্যাপকহারে হয়ে আসছে। যাঁদের আর্থিক সামর্থ্য কম, তাঁরা চাষ করার জন্য সোনাদানা বন্ধক রেখে বা বাজার থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতেও বাধ্য হন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমবায়ও ঋণ দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, এত সময় নষ্ট করে যে জিনিসটি তিনি উৎপাদন করলেন, তার দাম নির্ধারণ করার ক্ষমতা তাঁর নেই।
একটি উদাহরণ দিলে পার্থক্যের বিষয়টি পরিষ্কার হবে। কলকারখানায় যে জিনিসটি উৎপন্ন হয়, তার দাম নির্ধারণ করেন মালিক। এটি করতে গিয়ে তিনি প্রথমেই দেখেন, কাঁচামাল, শ্রমিক, বিদ্যুৎ, পরিবহণ ইত্যাদি নানা খাতে মোট কত খরচ হয়েছে। সব ধরনের খরচ যোগ করে জিনিসটির যা দাম দাঁড়ায়, তার উপর লাভের অঙ্ক ধরেই তিনি চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ করেন। শুধু একই জিনিসের গুণমান বা কলকারখানার আকার-আয়তনেই যা দাম কমবেশি হয়ে থাকে। তাই একটি সাবান বা যে কোনও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ব্র্যান্ড বিশেষে বাজারে ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি হয়ে থাকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও দামটি নির্ধারণ করেন কিন্তু উৎপাদক বা মালিকই।
কিন্তু আলুর ক্ষেত্রে বিষয়টা একেবারেই আলদা। এবছরের কথাই ধরা যাক। এবার প্রায় ১১০ থেকে ১১৫ লক্ষ টন আলু উৎপন্ন হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। গত বছর এই পরিমাণটা ছিল ১০০ লক্ষ টনের মধ্যে। অর্থাৎ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ উৎপাদন বৃদ্ধি হয়েছে এবার। এই বিশাল আলু যাঁরা উৎপাদন করলেন, দাম বেঁধে দেওয়ার ক্ষমতা কিন্তু তাঁদের নেই। আর তাই ঘটছে উলটো ঘটনা। আলুর আজ বা কাল কত দাম হবে, তা বাজারে চাহিদা এবং জোগানের সমীকরণে আপনা থেকেই নির্ধারিত হয়ে যায়। সকালে উঠে চাষি গভীর উৎকণ্ঠার সঙ্গে খোঁজ ঩নিয়ে জানতে পারেন, বিঘার পর বিঘা জমিতে আলু ফলিয়ে যে খরচ তাঁরা করে বসে আছেন, এখন বিক্রি করতে গিয়ে শুধুই লোকসানের বোঝা বইতে হবে। ফলে ঘরে কিছু আসা তো দূরের কথা, হাজার হাজার টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে, আলুর এই অনিশ্চিত বাজার নিয়ন্ত্রণে কার ভূমিকা কতখানি। যে কোনও জিনিস উৎপাদন করলেই তো হল না। বিক্রি করতে পারলে তবেই পয়সা। এখানেই এই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে দিচ্ছে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী বা ফড়েরা। আমি ইচ্ছা করলে কিনব, না ইচ্ছা হলে কিনব না। আমি কিনতে নামলে চাহিদা বাড়বে। আলুর দামও বাড়বে। আমি বসে গেলে আলুর দামও তলানিতে এসে ঠেকবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের ভাবখানা এমনই। যেমনটি ঘটেছে গত মরশুমের শেষে। হিমঘরে আলু থাকা সত্ত্বেও বাড়তি মুনাফার লোভেই তা ব্যবসায়ীরা বের করেননি, যার জেরে মানুষকে বেশি দামে আলু কিনে খেতে হয়েছে। এবার আলু ওঠার সময়ও খানিকটা একইরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মাঠে আলু উঠতে শুরু করেছে অনেকদিন হয়ে গেল। কিন্তু ক্রেতাই সেভাবে নেই। ফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে। দাম তলানিতে। চাষিদের আলুর উৎপাদন খরচই উঠছে না। কেউ বলছেন, নোটবাতিলের জেরে উদ্ভুত পরিস্থিতিই এর জন্য দায়ী।
কিন্তু সত্যিই কি তাই? আর বছরের পর বছর কি এরকমই চলবে? উত্তরটা দেওয়ার মতো সময় এখনও আসেনি, এমনটাই বলছেন এই কারবারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। কারণ, তাঁদের যুক্তি, হিমঘর খুলবে ১ মার্চ থেকে। যাঁরা সেখানে আলু মজুত করতে চান ভবিষ্যতে বাড়তি মুনাফা করার আশায়, তাঁরা এখনও ময়দানে সেভাবে নামেননি। কিন্তু তাঁরা যদি নামেনও, সংকটটা অন্য জায়গায় থেকেই যাবে। কারণ, এবার উৎপাদন একধাক্কায় অনেকটাই বেশি হয়েছে। এমনিতেই রাজ্যের মানুষের জন্য বছরে উৎপাদনের মাত্র অর্ধেক আলুর প্রয়োজন হয়। হিমঘরগুলিতে আলু মজুত করা যায় অর্ধেকের কিছু বেশি। রাজ্যের মানুষের ব্যবহারের বাইরে যে আলু পড়ে থাকে, স্বাভাবিকভাবেই তার সদ্ব্যবহারের উপরই বাজার অনেকটা নির্ভর করে। যেমন এক সময় পশ্চিমবঙ্গের আলু প্রচুর পরিমাণে যেত অসম, বিহার, উত্তরপ্রদেশে। মাঝে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বাইরে আলু যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করায় হিতে বিপরীত হয়েছে বলেই অনেকে মনে করছেন। ওইসব রাজ্য আগের তুলনায় অনেকটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথে এগচ্ছে। এবারও যেমন উত্তরপ্রদেশে আলু যথেষ্ট ভালোই হয়েছে। অর্থাৎ এ রাজ্য থেকে যে রাশি রাশি আলু বাইরের রাজ্যের ব্যবসায়ীরা এসে কিনে নিয়ে যাবেন, আর তার জেরে বাজার গা ঝাড়া দিয়ে উঠবে, সেই আশা এখনও থাকলেও তার মধ্যে একটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। অন্যদিকে, হিমঘরের ক্ষমতাও সীমিত। ফলে বাড়তি আলু তাহলে যাবে কোথায়? অর্থনীতির নিয়মেই তার দাম কমতে বাধ্য। যেমনটা ঘটছে।
অনেকেরই বক্তব্য, দুটি ভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যায়, এবং সেটা করতে পারে একমাত্র সরকারই। একদিকে আলুর ব্যবহার বাড়ানো। অর্থাৎ উৎপাদিত আলুর একটা বড় অংশ যাতে মানুষের ব্যবহারে লেগে যায়, তার জন্য উদ্যোগ নেওয়া। দুই, যেভাবে ধানের অভাবী বিক্রি ঠেকাতে সরকার জেলায় জেলায় সহায়ক মূল্যে ধান কিনতে নেমেছে, যেভাবে ধান বিক্রিতে ভুক্তভোগী মানুষকে সাহায্য করতে নিয়মেরও সরলীকরণ করা হয়েছে, সেভাবে আলু নিয়েও আগেভাগে মাঠে নামতে হবে সরকারকে। এখন তো স্কুলে স্কুলে মিড ডে মিলের খাবারে আলুর ব্যবহার অনেক বেড়েছে। সেক্ষেত্রে সরকার তো নিজেই ভরতুকি দিয়ে সহায়ক মূল্য ঘোষণা করে আলু কিনতে মাঠে নামতে পারে। তাতে আর যাই হোক না কেন, মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের বাড়া ভাতে ছাই পড়তে বাধ্য। ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, গ্রামীণ অর্থনীতি যে জিনিসটির উপর নির্ভর করে ওলট পালট হয়ে যাচ্ছে, তার জন্য সরকার আগাম চিন্তাভাবনা করবে না কেন? এ ব্যাপারে যে উদ্যোগ শুরু হয়নি, তা নয়। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা নিতান্তই কম, যা এতবড় একটা সংকটের অবসান ঘটাতে ব্যর্থ।
শুধু আলু বিক্রির ক্ষেত্রে নয়। খুচরো বাজারে আলুর দাম নিয়েও সরকারি ক্ষেত্রে তেমন উদ্যোগ কিন্তু চোখে পড়েনি। সরকার টাস্ক ফোর্স গঠন করেছে নিত্যপণ্যের দামের উপর নজরদারি চালাতে। কিন্তু আলুর দাম যখন বেড়েই গিয়েছে, সেই টাস্ক ফোর্সের কাজকর্ম কার্যত চোখেই পড়েনি। অনেক সময়ই স্রেফ ছবি তোলার জন্য দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা আচমকা (বাস্তবে জানিয়েই) পাইকারি বাজারে হানা দিয়েছেন। সরকারি উদ্যোগে কম দামে আলু বিক্রিও করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন সেই একটাই। সমস্যার যা ব্যাপকতা, সরকারি স্তরে এই ধরনের উদ্যোগ তা সমাধানে কতখানি কার্যকর হয়েছে?
আরও একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। দেশের মধ্যে আলু উৎপাদনে উত্তরপ্রদেশের পরই পশ্চিমবঙ্গের স্থান। দেশে আলুর মোট যা উৎপাদন, তার অন্তত ২৫ শতাংশই হয় পশ্চিমবঙ্গে। অথচ আলুর বীজের জন্য রাজ্যকে এখনও বহুলাংশে নির্ভর করতে হচ্ছে পাঞ্জাবের উপর। এতদিনেও এই সমস্যার সমাধানে রাজ্য সরকার কেন কোনও কার্যকর পদক্ষেপ করতে পারল না, সেই উত্তরও অজানা।
তাই সব মিলিয়ে যা পরিস্থিতি, তাতে আলু নিয়ে সমস্যা বছরের পর বছর ফিরেই আসছে। কিন্তু তার মোকাবিলায় আগাম পরিকল্পনার অভাবও ফি বছরই প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে। সাময়িক সমাধানের জন্য কিছু পদক্ষেপ করা হলেও তা এতবড় একটা সমস্যার স্থায়ী সমাধান এনে দিতে পারছে না। সাধারণ চাষি বা ক্রেতাদের মুখ চেয়ে তাই দরকার আগাম সুসংহত পরিকল্পনা।




?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta