রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড়ি | ম্যাগাজিন

আইন আদালত বনাম ঐতিহ্য ও আবেগ
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

শব্দটা আগে যে একেবারেই শুনিনি তা নয়। এক দু’বার কানে এসেছে। কোনও একটা সিনেমাতেও শব্দটার সঙ্গে একঝলক একটা দৃশ্য দেখেছি বলেও মনে পড়ছে। কিন্তু সেটা যে ভাবাবেগের এমন এক বিপুল তরঙ্গ ও আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে তা জানা ছিল না।
চেন্নাইয়ের বিখ্যাত মেরিনা সৈকতের ছবি টিভিতে ফুটে উঠছে। এক সমুদ্রের কিনারায় আর এক সমুদ্র। জনসমুদ্র। ক্যামেরা ওপর থেকে প্যান করছে। পিল পিল করছে কালো মাথা। গায়ে গা-লাগিয়ে লাখো মানুষ বসে বা দাঁড়িয়ে। কারও কারও হাতে পোস্টার ও প্ল্যাকার্ড। ক্যামেরা কাছে এসে মানুষের মুখ দেখাচ্ছে। সেই সব মুখে একটা প্রতিজ্ঞার ছাপ লেপ্টে রয়েছে। কেউ কেউ বুক চাপড়ে তামিল ভাষায় যা বলছে চ্যানেলের রিপোর্টার তার ইংরেজি তর্জমা করে দিচ্ছে, ‘জাল্লিকাট্টু আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্য আমরা প্রাণ দিয়ে রক্ষা করব।’
তামিল জাতিসত্তায় আবেগ যে কী প্রবল তা কমবেশি আমাদের জানা। শুধু তামিলনাড়ুতেই নয়, দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও সেই জাতিসত্তা ঢেউ তোলে। শ্রীলঙ্কা তার উদাহরণ। স্বাধীন ইলমের দাবিতে প্রভাকরণের নেতৃত্বে তামিল টাইগারদের আন্দোলন ও যুদ্ধ খুব কাছ থেকে লক্ষ করেছি। হাসতে হাসতে তারা সব কিছু করতে পারে। কাজেই, তারা যখন বলছে, জাল্লিকাট্টুর অধিকার কেড়ে নিতে দেবে না, তখন বোঝা উচিত, তাদের বলা ও করার মধ্যে বিশেষ ফাঁক থাকবে না। এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় প্রয়োজনে জান দিতে তারা পেছপা হবে না। আপাতত চলছে তাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। তামিলনাড়ুতে তো বটেই। রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে রাজধানী দিল্লিতেও তা পৌঁছে গিয়েছে। শ্রীলঙ্কা, ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়াতেও তামিল ভাষাভাষী মানুষ বিক্ষোভ শুরু করেছেন ‘জাল্লিকাট্টু’র সমর্থনে।
জাল্লিকাট্টু। তামিলনাড়ুর সীমানা পেরিয়ে মাত্র ক’দিনেই এই শব্দটা কেমন সর্বজনীন হয়ে গেল তাই ভাবছি। বাংলায় যেমন নবান্ন, অসমে বিহু তেমনই তামিলনাড়ুর ফসল কাটার উৎসব হল পোঙ্গল। জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি চার দিন ধরে এই উৎসবেরই অন্যতম অঙ্গ হল জাল্লিকাট্টু।
জাল্লিকাট্টুর সঠিক অর্থ ঠিক বলতে পারব না। তবে ঘটনাটি বেশ রঙিন এবং পোঙ্গলের চার দিন ধরে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় এই খেলাটা হয়ে থাকে। ঠিক কবে থেকে এই খেলার প্রবর্তন তাও বলা কঠিন। দিল্লিতে ন্যাশনাল মিউজিয়ামে জাল্লিকাট্টুর একটা সিলমোহর রয়েছে যা কিনা সেই সিন্ধু সভ্যতার সময়কার। তামিলনাড়ুর সরকারি মিউজিয়ামেও একটা পাথরের খণ্ডে খোদাই করা জাল্লিকাট্টু রয়েছে। একটা ষাঁড়ের শিং ধরে তাকে বাগে আনার চেষ্টা করছে একজন। এটা নাকি দু’আড়াই হাজার বছর আগেকার নিদর্শন।
ষাঁড়কে বাগে আনার খেলাটাই জাল্লিকাট্টু। এই খেলার জন্য একটা ষাঁড়কে তৈরি করা হয়। কয়েকশো মানুষের ভিড়ে ষাঁড়টাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেই ষাঁড় অত মানুষের প্রবল চিৎকারে পাগলের মতো ছুটতে থাকে। তার চারপাশে ছোটে গ্রামবাসীরা। খেলাটা হল, ষাঁড়টাকে শিং ধরে বাগে আনার। এ জন্য তার ঘাড়ের ওপর থাকা কুঁজটা জাপটে ধরার চেষ্টা করা হয়। একটা সময় ক্লান্ত ষাঁড় বশে আসে। কোথাও কোথাও ষাঁড়ের শিঙে টাকার পুঁটলি বেঁধে দেওয়া হয়। প্রাইজ মানি। এই ষাঁড়গুলি সবই দেশি। জাল্লিকাট্টুতে যে ষাঁড়গুলি অংশ নেয়, গাঁ-গেরামে তাদের খুব ডিম্যান্ড। বছরভর তাদের খুব তোয়াজ করা হয়। কারণ, তারাই নাকি প্রকৃত বীর্যবান।
আমাদের টিভিগুলি যেমন দুর্গাপুজোর লাইভ কভারেজ করে, তামিল টেলিভিশনেও তেমন জাল্লিকাট্টুর কদর খুব। স্পেনের বুলফাইটের সঙ্গে জাল্লিকাট্টুর বিন্দুমাত্র মিল নেই কিন্তু। বুলফাইটে ‘মাতাদর’ ষাঁড়টাকে মেরে ফেলে, জাল্লিকাট্টুকে এসবের বালাই নেই। ষাঁড়কে বাগে আনাই এখানে আসল কাজ।
তামিলনাড়ু খেপে উঠেছে এই জাল্লিকাট্টু নিষিদ্ধ করার প্রশ্নে। মাদ্রাস হাইকোর্ট ২০০৬ সালে এই খেলা প্রথম নিষিদ্ধ করে। তারপর ২০১৪ সালে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্ট। সেই রায় পুনর্বিবেচনার জন্য তামিলনাড়ু সরকার আবেদন জানালে সুপ্রিম কোর্ট তা নাকচ করে দেয়। গত বছর কেন্দ্রীয় সরকার জাল্লিকাট্টু চালু করার জন্য যে-নোটিশ জারি করে, সুপ্রিম কোর্ট তাতে স্থগিতাদেশ দেয়। সর্বোচ্চ আদালতে এই সংক্রান্ত যাবতীয় শুনানি শেষ। এবার রায় দেওয়ার পালা। এই খেলা লিখতে লিখতেই জানা গেল, সুপ্রিম কোর্ট আগামী এক সপ্তাহ এ নিয়ে অন্তর্বর্তী কোনও আদেশ দেবে না বলে জানিয়েছে। আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে রাজ্য সরকার জাল্লিকাট্টু জিইয়ে রাখার জন্য অর্ডিন্যান্স জারি করার কথা ভেবেছে। পাশাপাশি, ‘পেটা’ নামের আন্তর্জাতিক সংগঠন, যাদের পুরো নাম ‘পিপল ফর দ্য এথিক্যাল ট্রিটমেন্ট অব অ্যানিম্যালস’, যারা পশু-প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণের বিরুদ্ধে পৃথিবী জুড়ে আন্দোলন করে ও যারা জাল্লিকাট্টুকে নিষিদ্ধ করার জন্য আদালতের ওপর নিরন্তর চাপ সৃষ্টি করে গিয়েছে, তারা জানিয়েছে, অর্ডিন্যান্স করার চেষ্টা হলে আইনগতভাবে তারা তা রুখবে।
জাল্লিকাট্টুতে ষাঁড়কে মেরে ফেলা হয় না। এটা নিছকই একটা খেলা। তা হলে ‘পেটা’ কেন এর বিরোধিতা করছে? আমি ‘পেটা’র সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারি, ষাঁড় যাতে খ্যাপার মতো দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছোটে সে জন্য তাদের নাকি নিষিদ্ধ ওষুধ খাওয়ানো হয়! তাদের চোখে নাকি মুঠো মুঠো লংকাগুড়ো ছেটানো হয়! সত্য-মিথ্যার বিতর্কে ঢোকার কোনও অভিপ্রায় আমার নেই। আমি অন্য কথা ভাবছি। গোটা তামিলনাড়ুতে তামিল ভাবাবেগের যে ছবি ফুটে উঠেছে, তাতে আইন করে এই খেলাটা কি বন্ধ করা যাবে? দু’আড়াই হাজার বছরের একটা ট্র্যাডিশন এভাবে কি বন্ধ করা সম্ভব? আদালত একটা রায় দিল ভালো কথা। কিন্তু সেই রায় মানা হচ্ছে কি না, না হলে আইন যারা ভাঙছে তাদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে কি না তা দেখার কথা রাষ্ট্রের। সেই রাষ্ট্র, জাল্লিকাট্টুর ক্ষেত্রে তামিলনাড়ু সরকার, যদি চোখ বুজিয়ে থাকে? আইন অমান্য করে গ্রামে গ্রামে হাজারে হাজারে মানুষ যদি জাল্লিকাট্টুতে অংশ নেয়, ক্ষমতা আছে কি রাজ্য পুলিশের তা বন্ধ করার? উত্তরটা সহজ এবং এককথার। নেই। অতএব প্রশ্ন, নেই যখন উত্তর, তখন এই ধরনের রায় কেন দেওয়া হয়?
এ ক্ষেত্রে আইন ও আদালত আরও অসহায় কারণ সমগ্র তামিল জনগণ এই ঐতিহ্যরক্ষায় একজোট হয়ে গিয়েছে। অভিনেতা কামাল হাসান, সংগীত পরিচালক এ আর রহমান, দাবাড়ু বিশ্বনাথন আনন্দ, ক্রিকেটার আর অশ্বীন সহ সব রাজনৈতিক দল এককাট্টা। এক সুরে প্রত্যেকেই বিরোধিতায় সরব। তামিলনাড়ুর স্কুল চলছে না। সরকারি অফিস প্রায় অচল। সামাজিক মাধ্যমগুলি তোলপাড়। প্রায় কোনও মহল থেকেই নিষেধাজ্ঞায় তেমন কোনও সমর্থন নেই। তাহলে কী করে বলবৎ হবে এই নিষেধাজ্ঞা?
এই কথাটাই ভেবে চলেছি। কলকাতা হাইকোর্টের প্রয়াত বিচারপতি অজয়নাথ রায়ের কথা মনে পড়ছে। ধর্মঘট সংক্রান্ত এক জনস্বার্থ মামলার রায় দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, এমন কোনও রায় দেওয়া উচিত নয় যা বলবৎ করা যায় না। তা ছাড়া অন্য কিছু বিষয়ও তো রয়েছে? যেমন, ১৯৮৬ সালে শিশু শ্রমিক বিলোপ আইন পাশ হয়। আইনটা হয়তো আরও আগে হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আইন কি সর্বত্র প্রয়োগ করা যাচ্ছে? এ দেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে এই আইন একশোভাগ বলবৎ করা কি সম্ভব? কাবেরির জল বণ্টন নিয়ে কত জল ঘোলা হচ্ছে। পারা যাচ্ছে কর্ণাটক ও তামিলনাড়ুকে রাজি করাতে? গাদা গাদা এমন আইন এ দেশে চালু আছে যেগুলির প্রয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। জাল্লিকাট্টু নিষিদ্ধ হলে সেই তালিকার বহরই যে বাড়বে তা নয়, আমার আশঙ্কা, সুপ্রিম কোর্টকে থোড়াই কেয়ার করে প্রকাশ্যে সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করতে হাজার হাজার তামিল বুক ফুলিয়ে এগিয়ে আসবে। সর্বোচ্চ আদালতের পক্ষে তা মোটেই সম্মানের হবে না।
তার চেয়ে বরং ঠিক-বেঠিক, ন্যায়-অন্যায়, উচিত-অনুচিত, ভালো-মন্দ সব সামনেই থাকুক। পক্ষে-বিপক্ষে প্রচার থাকুক। মানুষকে বোঝানো হোক কোনটা ঠিক কোনটা খারাপ, কোনটা ভালো কোনটা মন্দ, কোনটা উচিত কোনটা অনুচিত, কোনটা সমর্থনীয় কোনটা বর্জনীয়। অধিকাংশ মানুষ ঠিকই ভালোটাকে বেছে নেবে। 












©Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta