রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড়ি | ম্যাগাজিন

স্বাস্থ্য-ব্যাবসা: মুখ্যমন্ত্রীর কঠোর বার্তায়
সাধারণ মানুষ বুকে বল পাচ্ছেন
শুভা দত্ত

অভিযোগ বহুদিনের। অভিযোগ বহুবিধ। চিকিৎসায় গাফিলতি, নিচু মানের পরিষেবা, জবরদস্তি গাদা গাদা ‘টেস্ট’ করানো, শেষমেশ মোটা টাকার বিল, সে বিলের ব্যাখ্যা চাইলে রোগীর পরিবারের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং বিলের পাইপয়সা মিটিয়ে দিতে অক্ষম হলে মৃতদেহ আটকে রেখে পরিজনদের চূড়ান্ত হেনস্তা—অভিযোগের অন্ত নেই! বছরের পর বছর এমন ছোট-বড়-মাঝারি মারাত্মক সব অভিযোগ রাজ্যের বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবাকেন্দ্রগুলিতে মাথা কুটেছে কিন্তু কোনও বিচার পায়নি। ঝাঁ-চকচকে বেসরকারি হসপিটাল নার্সিংহোমগুলো রোগী বা তাঁর পরিবারের এইসব অভিযোগে কর্ণপাত করার প্রয়োজন মনে করেনি। বরং, বহু ক্ষেত্রেই পেশেন্ট পার্টির উপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে নিজেদের দাবিমতো টাকা আদায় করে ছেড়েছে। আর রোগীর মুখ চেয়ে তাঁর আপনজনেরা ঘটিবাটি বন্ধক রেখেও ওইসব বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিংহোমের খাঁই মেটাতে বাধ্য হয়েছেন।
মুশকিলটা হল, ওই বিরাট টাকার খাঁই মেটানোর পরও অনেকক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে রোগীর মৃত্যু ঘটেছে। কখনও সে মৃত্যুর খবর এসেছে প্রায় বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো, কখনও ইনিয়ে-বিনিয়ে ঘুরিয়ে বুঝিয়ে একরাশ সন্দেহ সংশয় জিজ্ঞাসার ধোঁয়াশা ছড়িয়ে! বলছি না, চিকিৎসা করাতে এসে রোগীর মৃত্যু কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা। হতেই পারে। মৃত্যুর ঘটনা ঘটতেই পারে। ফাইভ স্টার হোটেলের আদলে গড়া নামজাদা বেসরকারি হাসপাতাল নার্সিংহোমে দিলেই সব রোগী ভালো হয়ে ঘরে ফিরে যাবেন—এমন আবেগ আশা সব পেশেন্ট পার্টিরই থাকে, তবে তাঁরাও জানেন এমন ভাবনা একেবারেই ঠিক নয়। পেশেন্টর শারীরিক অবস্থা, বয়স, রোগ বা আঘাতের গুরুত্ব এসবের উপর চিকিৎসা সাফল্য অনেকটা নির্ভর করে।
কিন্তু সেক্ষেত্রে যদি দেখা যায় গোড়ায় গলদ, তাহলে! যে সর্বাধুনিক চিকিৎসার জন্য মরণাপন্ন রোগীকে বেসরকারি ফাইভ স্টার মার্কা হাসপাতলে ভরতি করা হল, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে টাকার জোগাড় করে হাসপাতালের আগাম বিল মেটানো হল—সেই ‘চিকিৎসাটা’ই যদি রোগী না পান—তখন? যদি দেখা যায় চিকিৎসার অছিলায় নানান প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় টেস্ট রিপোর্ট বানিয়ে বিল বাড়ানোর প্যাঁচ-পয়জারে সময় নষ্ট করার মাশুল হিসাবে জানটাই দিতে হল অসহায় পেশেন্টকে—তাহলে? বা যদি দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও চিকিৎসা কর্মীদের উদাসীনতা, অবহেলা, হাসিঠাট্টা, গল্পআড্ডা, টিফিনটাইম আর থোড়াই কেয়ার ভাবের বলি হতে হল রোগীকে—তাহলে! প্রিয়জনের মৃত্যুকে তখন ক’জন ঠান্ডা মাথায় মেনে নিতে পারেন, পারবেন?
তার উপর এমন একটি মর্মান্তিক মৃত্যুর পর শোকে দিশেহারা পেশেন্ট পার্টির হাতে যদি চিকিৎসার লম্বা ফিরিস্তি এবং বিরাট অঙ্কের একটা বিল ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং সে বিলের মানে মাথা বুঝতে চাইলে তাঁদের চোখরাঙানি দুর্ব্যবহার মায় বাউন্সারের পাল্লায় পড়তে হয়—তাহলে যন্ত্রণাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়? লক্ষ কোটির দামি অত্যাধুনিক বিদেশি যন্ত্রপাতি, চওড়া বিদেশি ডিগ্রিধারী স্যুটেড-বুটেড ডাক্তার, ধোপদুরস্ত নার্স, ধবধবে বিছানা বালিশের সেন্ট্রালি বাতানুকূল বেসরকারি হাসপাতাল বা নার্সিংহোম শহর মহানগরের সৌন্দর্য গরিমা বাড়াতে পারে কিন্তু চিকিৎসার জায়গায় সঠিক চিকিৎসাটা তো চাইবেন রোগী ও তাঁর আত্মীয়পরিজন। সেই চিকিৎসাতেই যদি গলদ গোঁজামিলের লক্ষণ দেখা যায় এবং তার আভাস পেয়ে যান রোগীর আত্মীয়পরিজন—তাহলে সেই স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানের প্রতি কি মানুষের সমীহ শ্রদ্ধা কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে, থাকতে পারে! তখন রোগীমৃত্যুর অনিবার্য ঘটনা ঘটলেও কি সাদা মনে সেই বিয়োগ-ব্যথা সওয়া যায়?
যায় না। কারণ, বহু বছর ধরে নানান ঘটনায় সাধারণ মানুষ একটা ব্যাপার বুঝেছেন, বেসরকারি হাসপাতালে যথেষ্ট উন্নতমানের চিকিৎসাব্যবস্থা থাকলেও সাধারণ গোত্রপরিচয়হীন মানুষ লক্ষ লক্ষ টাকা ঢেলেও অনেক সময়ই তার সুবিধা পুরোপুরি পান না। সেইসঙ্গে, তাঁদের মনে এইসব হাসপাতালের দায়বদ্ধতা স্বচ্ছতা এসব নিয়েও যথেষ্ট প্রশ্ন আছে, অভিযোগ আছে। তবু নিকটজনের বিপদ ঘনালে সব সাময়িকভাবে ভুলে তাঁরা এইসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেরই শরণাপন্ন হন। সরকারি হাসপাতালের প্রতি ভক্তি বিশ্বাসের অভাব যে তার একটা বড় কারণ—তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাম আমলে সিপিএমের রাজনীতিকরণের ঠ্যালায় সরকারি হাসপাতালের পরিষেবার মান কোথায় গিয়ে ঠেকেছিল—ভুক্তভোগী মাত্রেই জানেন। সরকারি হাসপাতালের রন্ধ্রে রন্ধ্রে চুরি, দুর্নীতি, ফাঁকিবাজি এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল যে নিতান্ত অপারগ না হলে মানুষ সরকারি হাসপাতালের দিকে পা বাড়াতেন না।
চূড়ান্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ডাক্তার থেকে সাফাইওয়ালা, নার্স থেকে ওয়ার্ডবয়—বেশিরভাগেরই গয়ংগচ্ছ ভাব দিনভর পার্টিবাজি আর হাসপাতালের গেট থেকে অপারেশন টেবিল, ঘিনঘিনে দালালরাজ—সরকারি হাসপাতাল স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো হয়ে উঠেছিল সাধারণ গরিবগুর্বো রোগী ও তাঁদের পরিজনেদের কাছে আতঙ্ক। একটু সংগতিসম্পন্ন মধ্যবিত্ত এই বেহাল স্বাস্থ্য পরিষেবার হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে চেন্নাই, ব্যাঙ্গালোর, মুম্বই ছুটতে শুরু করেছিলেন। আর সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার এই বেহাল দশা এবং তার প্রতি সাধারণের চরম অবিশ্বাসের সুযোগে এ রাজ্যে একটু একটু করে ছাউনি ফেলতে শুরু করেছিল চকচকে সব বেসরকারি হাসপাতাল নার্সিংহোম। এবং, বাম সরকারের স্বাস্থ্য পরিষেবার দুর্বল হতশ্রী দশায় তিতিবিরক্ত মানুষ পরিপাটি ঝকঝকে বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পেয়ে সুচিকিৎসার আসায় সেদিকেই ছুটেছেন। ফলত, বেসরকারি হাসপাতাল নার্সিংহোমের ব্যাবসা চরচর করে বেড়ে গেল এবং তার সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে শুরু হয়ে গেল তাদের যা ইচ্ছে তাই করার প্রবণতা। চিকিৎসায় গাফিলতি, যথেচ্ছ বিল ইত্যাদি অভিযোগ ওঠা এবং জমা পড়াও শুরু হয়ে গেল পাল্লা দিয়ে। শুরু হয়ে গেল রোগীমৃত্যু বা তেমন গুরুতর কোনও ঘটনা সামনে রেখে রোগীর আত্মীয়স্বজনের ক্ষোভ কাজে লাগিয়ে হাসপাতাল নার্সিংহোমে ক্রুদ্ধ ‘জনতা’র ভাঙচুর মারপিট ইত্যাদি। একটা সময় তো হাসপাতাল নার্সিংহোম ভাঙচুরের ব্যাপারটা নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল!
সেসব নিয়ে সিপিএম জমানায় সরকারি মহলে মন্ত্রীসান্ত্রির আলোচনা বৈঠক যে হয়নি তা নয়। অনেকবার হয়েছে। বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবায় হামলাবাজি রুখতে পুলিশ প্রশাসনের সাময়িক তৎপরতাও দেখা গিয়েছে। এমনকী বাদী-বিবাদি উভয়পক্ষের কাছে মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যমন্ত্রী ‘কড়া’ সতর্কবার্তাও পাঠিয়েছেন। কিন্তু, সে সবকিছুর নিট ফল শেষপর্যন্ত শূন্যই থেকেছে। উপায় কি? সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার তখন যা হাল তা দিয়ে তো তখন রাজ্যের মানুষের চিকিৎসার দাবি মেটানো সম্ভব না। ফলে, বেসরকারি হাসপাতালের জুলুমবাজি বন্ধ করতে সক্রিয় পদক্ষেপ নিদেনপক্ষে একটা হুঁশিয়ারি দেওয়াও দোর্দণ্ড বাম শাসকদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তার উপর সিটু থেকে ডাক্তার, নার্স, হাসপাতাল কর্মচারীদের নানারকমের লাল সংগঠন—তাঁদের চটাবেন কীভাবে জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বা সূর্যকান্ত মিশ্র! তাই, সাধ থাকলেও সাহস জোগাতে পারেননি সিপিএমের নেতামন্ত্রীরা।
সেই সাহসটাই সদর্পে দেখালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ক’দিন আগে টাউন হলে রাজ্যের নামী বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিংহোমের কর্তাদের ডেকে যেভাবে ও যে ভাষায় তিনি চেতাবনি দিলেন তা কেবল অভূতপূর্বই নয়, অভাবনীয়। সত্যি বলতে কী, ওইভাবে এক এক করে কাঠগড়ায় তুলে সরাসরি অভিযোগ দায়ের এবং রায় ঘোষণা—৩৪ বছরের বাম আমলের কোনও স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারবেন কিনা সন্দেহ। মমতার সোজা কথা, স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে ব্যাবসা চলবে না। গরিব সাধারণ মানুষকে চিকিৎসার নামে শোষণ চলবে না। চিকিৎসা ও তার খরচের হিসাবে স্বচ্ছতা ও সামঞ্জস্য আনতে হবে। আর টাকা দিতে না পারলেও কোনও অবস্থাতেই মৃতদেহ আটকে রাখা চলবে না। পাশাপাশি এটাও জানিয়ে দিয়েছেন একবালপুরের হাসপাতালে যে ঘটনা ঘটেছে সেটা তিনি সমর্থন করেন না, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটলে দোষীদের রেয়াত করা হবে না।
শুধু তাই নয়, স্বাস্থ্য বাণিজ্যের ওই রথী-মহারথীদের মুখের উপর অমন কঠিন সব অভিযোগ দায়ের করতে কত হোমওয়ার্ক করতে হয় সেটা ভাবুন! ওখানে হাসপাতালের পক্ষ থেকে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতার একটা কথা একটা অভিযোগও তো তাঁরা খণ্ডন করতে পারলেন না! বরং, সকলেই প্রকারান্তরে মেনে নিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা সঠিক বলেছেন এবং তাঁর কথামতো নিজেদের শুধরে নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও শোনা গেল কারও কারও মুখে! এই না হলে প্রশাসক, এই না হলে রাজধর্ম! এই না হলে মা-মাটি-মানুষের নেত্রী!
সন্দেহ নেই, বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর এই কঠোর অবস্থান ও বার্তায় সাধারণ মানুষ বুকে বল পাচ্ছেন। বিশেষ করে বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার যথেচ্ছাচার নিয়ন্ত্রণে আইন কঠোরতর করার যে উদ্যোগ মুখ্যমন্ত্রী নিয়েছেন এবং চিকিৎসা করাতে এসে সাধারণ রোগী বা তাঁদের স্বজনরা যাতে কোনওভাবেই বঞ্চিত-লাঞ্ছিত-বিপন্ন না হন তা দেখার জন্য দশ সদস্যের যে হেল্‌থ ঩রেগুলেটরি কমিটি তৈরির নিদান দিয়েছেন—তাতে মানুষের আশা-ভরসা আরও জোরালো হয়েছে। কিন্তু, সমস্যা হল, বেসরকারি হাসপাতালগুলো আজ এতই বেপরোয়া যে তাদের অনেকে মুখ্যমন্ত্রীর কথায় কর্ণপাত করারও প্রয়োজন বোধ করছে না। নাহলে, মমতার অমন কড়া বার্তার পরও সঞ্জয় রায়ের পরিবারের সঙ্গে অমন অমানবিক আচরণ করে! চাপে পড়ে হাসপাতাল টাকা ফেরত দিচ্ছে, কিন্তু প্রিয়জনের প্রাণটা ফেরাতে পারবে কি? পারবে না। তাই, অনেকেই বলছেন, বেসরকারির পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী যদি সরকারি হাসপাতালগুলোর ক্ষেত্রেও এমন কঠোর মনোভাব নেন তাহলে আমজনতার চিকিৎসা সমস্যার আরও সুরাহা হয়। এই নির্মম চিকিৎসা হয়রানি থেকেও রেহাই মেলে।












©Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta