রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড়ি | ম্যাগাজিন

নারদকাণ্ডে দুর্নীতির তত্ত্বতালাশের চেয়ে রাজনীতির লড়াইটাই কি বড় হয়ে উঠছে?
শুভা দত্ত


নরেন্দ্র মোদির পরবর্তী লক্ষ্য পশ্চিমবঙ্গ কি না তা নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে। কিন্তু, এ রাজ্যের সিপিএম-কংগ্রেসের মূল টার্গেট যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তা নিয়ে তো সন্দেহ নেই। আর সেজন্যই হয়তো সুপ্রিম কোর্টের গত মঙ্গলবারের রায়ে বিজেপি যতটা সন্তুষ্ট, তার চেয়ে অনেক বেশি উৎফুল্ল দেখাচ্ছে সিপিএম এবং কংগ্রেসকে। সিপিএম কংগ্রেসের নেতা-নেত্রীদের অনেকের ভাবগতিক দেখলে মনে হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তাঁরা মমতাকে ঘায়েল করার একটা জবরদস্ত অস্ত্র পেয়ে গিয়েছেন। শুধু মমতাকে ঘায়েল করাই নয়, সেই অস্ত্র সম্বল করে তাঁদের অনেকেই রাজ্য-রাজনীতিতে নিজেদের হারানো গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা ফেরানোর স্বপ্নও দেখছেন! তাঁদের ধারণা, বিজেপি যত তেড়েফুঁড়েই উঠুক, উত্তরপ্রদেশে যত সাফল্যই পাক, এই বাংলার মাটিতে আপাতত বিশেষ সুবিধে করতে পারবে না। বাংলার মানুষের সামনে মমতার মূল বিরোধী ও বিকল্প বলতে সেই সিপিএম-কংগ্রেস।
আর এই ভাবনা থেকেই নাকি আশার আলো দেখতে শুরু করেছে সিপিএমের একাংশ এবং সেজন্যই নাকি নারদকাণ্ড নতুন করে জেগে উঠতেই বিশেষ করে সিপিএমের গলায় একটু চড়া সুর লেগেছে। নারদকাণ্ডকে হাতিয়ার করে খোদ সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র এই ঘটনার আইনি প্যাঁচে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জড়াবার মতো নানান দাবি তুলতে শুরু করেছেন! মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট নারদকাণ্ডে সিবিআই তদন্ত বহাল রাখার পর আরও একধাপ এগিয়ে সূর্যবাবু দাবি করেছেন—মুখ্যমন্ত্রীর প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া উচিত! কিন্তু, নারদকাণ্ডে সিবিআই তদন্ত বহাল থাকলে কেন মুখ্যমন্ত্রীকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে তা অবশ্য সূর্যবাবুর বক্তব্য থেকে খুব পরিষ্কার নয়। সিপিএমের মুখপত্র গণশক্তিতে প্রকাশিত সূর্যবাবুর এ সংক্রান্ত বক্তব্য থেকে মনে হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট যেহেতু সিবিআই তদন্ত বহাল রেখেছে এবং রাজ্যের আইনজীবীকে ভর্ৎসনা করেছে সেজন্য মুখ্যমন্ত্রীকে ক্ষমা চাইতে হবে!
কী আশ্চর্য কথা! মহামান্য আদালত আইনের পরিসরে যে কোনও সিদ্ধান্ত ও প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন। সে সিদ্ধান্ত ও প্রতিক্রিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আইনবুদ্ধি মতে ব্যবস্থা নেবে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা—মুখ্যমন্ত্রী খামোখা ক্ষমা চাইতে যাবেন কেন! সূর্যবাবুদের আমলে আদালতের অবমাননা মায় মহামান্য বিচারপতি অবমাননার মতো ঘটনাও তো আকছার ঘটেছে। এক বিশিষ্ট বিচারপতির উদ্দেশে সিপিএমের তখনকার এক দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতার ব্যঙ্গ ‘লালা, বাংলা ছেড়ে পালা’— আজও আশা করি অনেকের মনে আছে। দেশের নির্বাচন কমিশনার, তিনিও তো মর্যাদায় একজন বিচারপতির চেয়ে কম নন—তাঁকে ‘পাগল’ বলে বিদ্রুপ অপমান করা হয়েছে। এসব ঘটনায় অনেক সময় আদালতে ধমকধামকও খেতে হয়েছে রাজ্যের পক্ষের আইনজীবীকে। তাই বলে সেই বাম রাজত্বে কবে সিপিএমের কোন মুখ্যমন্ত্রী এসবের জন্য প্রকাশ্যে কি গোপনে ক্ষমা চেয়েছেন!? স্বয়ং জ্যোতি বসুও তো মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বানতলা ইত্যাদির মতো গুরুতর ঘটনায় বেফাঁস মন্তব্য করে বিতর্কে জড়িয়েছেন। ক্ষমা চেয়েছেন কখনও? নন্দীগ্রামে অত বড় ঘটনা ঘটার পরও কি তখনকার সিপিএম মুখ্যমন্ত্রী ক্ষমা চেয়েছিলেন? তাহলে, আজ হঠাৎ মুখ্যমন্ত্রী মমতার ক্ষমা চাওয়ার দাবি উঠছে কেন!
যে ব্যাপারটা নিয়ে এত হইচই—সে তো আজকের ঘটনা নয়। বেশ কয়েক বছর আগের কিছু ভিডিও ক্লিপ। তাতে দেখা যাচ্ছে রাজ্যের বর্তমান শাসকদলের কয়েকজন নেতা মন্ত্রী সংসদ সদস্য, বিধায়ক এবং এক পুলিশ কর্তা কোনও একজনের (যাকে দেখা যাচ্ছে না) কাছ থেকে কিছু টাকা নিচ্ছেন। বলা হচ্ছে, সেটা ‘ঘুষ’। কিন্তু, কেন ঘুষ, কী জন্য ঘুষ তা পরিষ্কার নয়। তাছাড়া, আমরা যারা আইন বিশারদ নই তারাও কি জানি না—ঘুষ নেওয়া অপরাধ হলে ঘুষ দেওয়াও অপরাধ? তাহলে ঘটনাটা যদি ঘুষ দেওয়া-নেওয়ারই হয় তবে কেবল এক পক্ষকে নিয়ে কেন? অন্য পক্ষ নয় কেন? তার চেয়েও বড় কথা যখন গোটা ব্যাপারটা অভিযোগের স্তরে আছে অভিযুক্তদের নামে ‘চোর’ ইত্যাদি গালি কি ন্যায়সংগত! বিশেষত, অভিযুক্তদের মধ্যে যখন বিশিষ্ট জনপ্রতিনিধি এমনকী রাজ্যের জনপ্রিয় মন্ত্রীরা রয়েছেন তখন! কিন্তু সিপিএম সমেত বিরোধী শিবিরের অনেক নেতা তো গালিটা দিয়েই চলেছেন! এটা আইনের দিক থেকে অন্যায় নয়!? সেদিক থেকে আমরা তো বলব বিজেপি অনেক সংযত এবং সাবধানী। তাঁরাও যা মনে আসছে বলছেন, তবে একটু হলেও রেখে ঢেকে আইন বাঁচিয়ে। আশা করি, মহামান্য আদালতের নির্দেশে সক্রিয় সিবিআই তাঁদের তদন্তে অভিযুক্ত এবং অভিযোগকারী—উভয় পক্ষকেই সমান নজরে দেখবে।
তা না হলে কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠবে—দুর্নীতি দমন নাকি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ—লক্ষ্য কোনটা? সারদা, রোজভ্যালিতেও তো কেন্দ্রীয় বাহিনী লেগেছে। লাগার পর অনেকদিন কেটেও গিয়েছে। তৃণমূলের দু’জন সংসদ সদস্য সমেত কয়েকজন জেলে আছেন। অনেকে সাময়িক মুক্তিও পেয়েছেন। কিন্তু, শেষপর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে হলটা কি? সারদা, রোজভ্যালিতে প্রতারিতরা টাকা পেলেন? ক’জন পেলেন? যতদূর খবর সামান্য ক’জন পেয়েছেন এবং তাঁদের টাকাটা ফেরত হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতার উদ্যোগেই। এবার নারদকাণ্ড। কী হবে? তার আগে তো প্রশ্ন—যে টাকাগুলো দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওগুলো কার টাকা? আশি লাখ টাকা কে এমন কাজে খরচ করল? তার উদ্দেশ্যটাই বা কী? নিশ্চয় সিবিআই এবং মহামান্য আদালত তা খতিয়ে দেখবে।
কিন্তু, ধন্দটা অন্যত্র। প্রশ্নটা ইতিমধ্যে অনেকেই তুলেছেন। আমি ফের একবার তুলছি। ছবি তোলার পর অতদিন বসে থেকে হঠাৎ রাজ্যের ভোটের ঠিক আগে তা প্রকাশ করা হল কেন!? দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং তার প্রতিবিধানই যদি উদ্দেশ্য হয় তবে তো প্রমাণ হাতে আসার সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা। তা না করে ভোটের আগে কেন? এক্ষেত্রে একটা যুক্তি দেখানো হচ্ছে—সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক নাকি ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। অত বড় বড় মাথা, তাঁদের টাকা নেওয়ার ছবি বাজারে ছাড়লে নিরাপত্তার অভাব ঘটতে পারে। কিন্তু, এখানেও প্রশ্ন আছে। এই কাজটা তো হুট করে করা নয়। বরং ঘটনা পরম্পরা খেয়াল করলেই বোঝা যায় রীতিমতো পরিকল্পনা করে ভেবেচিন্তে আটঘাট বেঁধেই করা। তো সেই ভাবনায় সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চিন্তাটা আসেনি! কিন্তু আমরা তো শুনেছি যে সাংবাদিক আজ নারদকাণ্ডের জেরে শিরোনামে এসেছেন তিনি যথেষ্ট দক্ষ এবং অভিজ্ঞ। তাছাড়া, এই কাণ্ডের জন্য অতগুলো টাকা যিনি জুগিয়েছেন তাঁর সঙ্গেও সাংবাদিকের এই ঝুঁকি নিয়ে কথা হয়নি! এমন কথা শোনার পর ‘ভয়ে’র ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে একটু অসুবিধে হয় না কি? তাছাড়া, এই ভয় এড়িয়ে যখন ভিডিওটা প্রকাশ করা হয় তখন ভোট সামনে মানে রাজ্যের পরিস্থিতি আরও গরম এবং স্পর্শকাতর! সেটা আমাদের বিশ্বাস করার শক্তিটাকে আরও দুর্বল করে দেয় নাকি? নারদকাণ্ডের তদন্তে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা নিশ্চয় এদিকগুলোও খতিয়ে দেখবেন।
বলতে কী, এই দিকগুলো নজর করেই অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে—নারদকাণ্ডে দুর্নীতির তত্ত্বতালাশের চেয়ে রাজনীতির লড়াইটাই কি বড় হ঩য়ে উঠছে? চাপের রাজনীতি? এই রাজ্যে রাজনৈতিক লড়াইতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সিপিএম-কংগ্রেস কি বিজেপি কেউই যে ঠিকমতো এঁটে উঠতে পারছে না—সেটা তো বহুদিন ধরেই সত্যি। এমনকী নোটকাণ্ডের মতো ইস্যুতে মমতা যে দিল্লিকেও নাড়িয়ে দিতে পারেন সেটাও প্রমাণ হয়ে গিয়েছে। এহেন একজন রাজনৈতিক নেত্রীকে জব্দ করতে নারদকাণ্ডের চেয়ে ভালো অস্ত্র আর কী হতে পারে? কিন্তু মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের রায় বেরনোর পর সে রায়কে ইতিবাচক বলে সেই অস্ত্রও খানিকটা ভোঁতা করে দিয়েছেন মমতা। কিন্তু, রাজ্যের বিরোধীরা তাতে লাগাতার শান দিতেও ছাড়ছেন না। গত বুধবার দেখা গেল কংগ্রেসের অধীর চৌধুরি বলছেন, মুখ্যমন্ত্রীর নৈতিকতা থাকলে নারদে অভিযুক্তদের দূরে রাখবেন। এই কাণ্ড নিয়ে সিপিএমের সূর্যকান্ত মিশ্র, সুজন চক্রবর্তীদের টীকা-টিপ্পনীও অব্যাহত ছিল। পাশাপাশি নারদকাণ্ড নিয়ে বিজেপি কলকাতায় মিছিল করছে। দলের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের দাবি, বর্তমান সরকার দুর্নীতিগ্রস্ত। এই সরকারকে বরখাস্ত করার জন্য রাজ্যপাল যাতে কেন্দ্রের কাছে সুপারিশ করেন তার আবেদন জানাবেন তাঁরা! তবে, এর পালটাও আসছে শাসক শিবির থেকে। পশ্চিমবঙ্গকে বিজেপি টার্গেট করছে বলে যে খবর রটেছে তার জবাবে রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ও ব্যঙ্গ মিশিয়ে সোজাসাপটা বলে দিচ্ছেন, করুক, করুক। আমরাও দিল্লিকে টার্গেট করছি। অন্যদিকে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতাও রীতিমতো তোপ দেগে শুক্রবার বুঝিয়ে দিয়েছেন—সিবিআই দিয়ে বা তাঁর মন্ত্রী বিধায়ক সাংসদদের জেলে পুরে তাঁকে ভয় দেখানো যাবে না।
সব মিলিয়ে একটা ব্যাপার পরিষ্কার—লড়াই জমে উঠেছে। নারদকাণ্ড নিয়ে পারদ যত চড়ছে তত তাতে সিবিআই তদন্ত দুর্নীতি ইত্যাদির চেয়ে ঝাঁজ বাড়ছে রাজনীতির। মমতা বনাম তামাম বিরোধী। তবে মূল লড়াইটা (মণিপুরের সাম্প্রতিক ভোট রাজনীতির কথা মনে রেখেই বলছি) আপাতত ঘাসফুল পদ্মফুলে— কলকাতার সঙ্গে দিল্লির। কাস্তে হাতুড়ি বা হাত ছাপ তেরঙ্গা সেখানে নিতান্তই তাল ঠোকা পার্টি। সাধারণ মানুষও দেখছি নারদকাণ্ডে সিবিআই তদন্তের চেয়ে এই রাজনৈতিক লড়াইটাতেই বেশি মজেছেন। নারদ নারদ করতে করতে বাংলার রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে মমতা না মোদি—২০১৯-এর লক্ষ্যে শেষপর্যন্ত কে এগিয়ে যান তা দেখতেই যেন জনতার যত আগ্রহ, যত কৌতূহল জল্পনাকল্পনা। বলতে কী, তাঁদের এই কৌতূহল জল্পনাকল্পনার চোটে নারদকাণ্ডের মূল ভিডিও-বিতর্কটাকেই এখন যেন কেমন ফিকে ফিকে লাগছে—তাই না?




?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta