রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড়ি | ম্যাগাজিন

প্রথম নলজাতক শিশুর জনক আজ বিস্মৃতপ্রায়
মৃন্ময় চন্দ

১৬ জানুয়ারি ছিল তাঁর জন্মদিন। জন্ম তাঁর হাজারিবাগে, মাতুলালয়ে। স্বাধীনতোত্তর ভারতে সি ভি রমনের পর তাঁর গবেষণার হাত ধরে দূর দিগন্তে উন্মেষিত হচ্ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল প্রাইজের ফিকে এক ঝিকিমিকি। অর্বাচীন বামফ্রন্ট সরকার, অর্থগৃধ্নু এক দল স্ত্রীরোগ-ধাত্রীবিদ ও কূপমণ্ডূক অজ্ঞ অশিক্ষিত একরাশ চাটুকার অধ্যাপক-বিজ্ঞানীর অতলস্পর্শী অজ্ঞতা ও অন্তঃসারশূন্য বিদ্বেষ-অহমিকার নিষ্ফল আস্ফালনে অকালে হাতছাড়া হল নোবেল প্রাইজের অর্ধপ্রস্ফুটিত অথচ অমিত এক সম্ভাবনা! আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মতোই এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর পিএইচডি অর্জন, প্রফুল্লচন্দ্রের মতো তিনিও ছিলেন দৃঢ়চেতা, অকুতোভয়, নিজের ক্ষমতা আত্মবিশ্বাসের দার্ঢ্যে বলীয়ান ও গরীয়ান। কর্মোদ্যোগী। অক্লান্ত পরিশ্রমী। অসামান্য প্রতিভাধর। ক্রান্তদর্শী। নিজ সময়ের থেকে অগ্রগণ্য। তিনি ডা. সুভাষ মুখোপাধ্যায়, স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ও ধাত্রীবিদ।
কেন ডা. সুভাষ মুখোপাধ্যায় অনন্যসাধারণ—:
বহুধাবিস্তৃত কাজের মধ্যে থেকে মাত্র ৪টি বিষয়ে কিঞ্চিৎ আলোকপাতেই তাঁর ব্যতিক্রমী প্রতিভার স্বাক্ষর মিলবে। এই ৪টি বিষয় স্ত্রীরোগ সংক্রান্ত হলেও ৪টিতেই ডা. মুখোপাধ্যায় পৃথিবীতে সর্বাগ্রগণ্য। মহিলাদের বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় পুরুষ হরমোন ‘টেস্টোস্টেরন’ দারুণ ফলপ্রদ—প্রথম তিনিই বলেছিলেন। প্রখ্যাত স্ত্রীরোগ বিশারদ ডা. অমিয় বোস যা ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর অভূতপূর্ব আবিষ্কার চতুষ্টয়—:
তিনি প্রথম দেখালেন মহিলাদের রজঃনিবৃত্তির পর তাদের মূত্র-নিঃসৃত হরমোন (HMG) থেকে সংগৃহীত গোনাডোট্রপিন বা যৌন হরমোন ডিম্বাশয়ের সক্রিয়তা বাড়ায় ও ডিম্বাণু নিঃসরণে সহায়তা করে। ডারউইনের ‘সারভাইভাল অফ ফিটে’র তত্ত্বানুসারে সবসময়ই একাধিক ডিম্বাণু ফলপ্রদ নিষেকের পক্ষে শ্রেয়। যুগান্তকারী হল তাঁর আবিষ্কৃত HCG বা হিউম্যান কোরিওনিক গোনাডোট্রপিন, গর্ভবতী মহিলাদের মূত্রে যার প্রভূত প্রাচুর্য। শারীরবিদ্যার পাঠ্যপুস্তকে এতকাল লেখা ছিল ‘ট্রোফোব্লাস্ট সেল’ থেকে এইচসিজি মেলে কিন্তু তিনি প্রথম প্রমাণ করলেন জরায়ুগাত্র বা এন্ডোমেট্রিয়াম বা ‘ডেসিডুয়াল সেল’ থেকেই নিঃসৃত হয় এইচসিজি। দুটিই IVF (ইন-ভিট্রো-ফার্টিলাইজেশনে) বা কৃত্রিম গর্ভধারণে কালজয়ী আবিষ্কার। রজঃনিবৃত্তির পরও যে একটি হরমোন মহিলাশরীর থেকে নিঃসৃত হতে পারে বা জরায়ুগাত্র থেকেই এইচসিজি খুব সহজে মেলে এবং তা যে মহিলাদের বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় অত্যন্ত কার্যকর তখন তা ছিল কল্পনাতীত। ১৯৭৫ সালে এক বৈজ্ঞানিক নিবন্ধে ডা. মুখোপাধ্যায় প্রথম বিষয়টিতে আলোকপাত করেন। নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল Indian Journal of Physiology & Allied Sciences (Vol-20, No.-2)-এ। ৫ বছর পরে বিষয়টিতে সারা পৃথিবীব্যাপী স্বীকৃতি মেলে। অত্যধিক মানসিক চাপ, তজ্জনিত কারণে বহু মহিলাদের স্টেন-লেভিয়ান্থাল সিনড্রোম ও PCO বা পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও তিনি এই সময়েই জনসমক্ষে আনেন।
’৭০-র দশকে আল্ট্রাসাউন্ডের যখন প্রচলন হয়নি তখন তিনি যোনিপথে একটি প্রোবের সাহায্যে (কল্পোটমি) ডিম্বাশয় থেকে নিখুঁত দক্ষতায় সফলভাবে ডিম্বাণু সংগ্রহ করে প্রথম সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। বর্তমানে IVF-এর ডিম্বাণু সংগৃহীত হয় কিন্তু তাঁর প্রদর্শিত পথেই। কারণ পদ্ধতিটি সহজ ও নিরাপদ।
প্রথম মানব-ভ্রূণকে (ব্লাস্টোসিস্ট) ড্রাই আইস (কঠিন কার্বনডাই-অক্সাইড) ও তরল নাইট্রোজেনে হিমায়িতকরণের পদ্ধতি ছিল তাঁরই আবিষ্কার। বিজ্ঞানের ভাষায় যা ক্রায়োপ্রিজার্ভ (Cryopreserve) নামে পরিচিত। তিনি যখন গবেষণাগারে কাজ করছেন তখন ডিজিটাল রেফ্রিজারেটরের অস্তিত্ব ছিল না। ড্রাই আইস -১০৯.৩° ফারেনহাইট বা -৭৮.৫° সেন্টিগ্রেডে কোনও বস্তুকে হিমায়িত করতে পারে। ড্রাই আইস ও তরল নাইট্রোজেন নির্দিষ্ট সময় অন্তর পরিবর্তন আবশ্যক। নাহলে সঠিক তাপমান বজায় রাখা সম্ভব নয়। ’৭৮ সালে জ্যোতি বসুর সরকার মধ্যগগনে, তীব্র লোডশেডিং তখন বামফ্রন্ট সরকারের অঙ্গভূষণ। বহু প্রথিতযশা স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ নিদান দিয়েছিলেন ৫৩ দিন হিমায়িতকরণে ভ্রূণ নাকি ৮ ইঞ্চি লম্বা হয়ে যাবে, এমনকী এক প্রখ্যাত জীব রসায়নবিদ গণনা করে বলেছিলেন হিমায়িত ভ্রূণে জিনের চরিত্র পালটে যাবে! একমাত্র হিমায়িতকরণেই জিনের ধর্ম বা চরিত্র থাকে অটুট-অপরিবর্তিত।
তিনি প্রথম প্রমাণ করলেন নিষিক্ত ভ্রূণ জরায়ুতে সবথেকে ভালোভাবে পরিপোষিত হয় যদি দ্বিতীয় বা তদপরবর্তী চক্রে ৮টি কোষের ভ্রূণটিকে (ব্লাস্টোসিস্ট) প্রোথিত করা যায়। অর্থাৎ যে রজঃচক্রে ডিম্বাণুটি সংগৃহীত হল সেই চক্রেই নিষিক্ত ভ্রূণটিকে স্থাপিত না করে পরবর্তী চক্রে স্থাপন। তাতে কিছু স্ত্রী-হরমোনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া যেমন হ্রাস পায় তেমনি ভ্রূণটির স্বাভাবিক বৃদ্ধিও ত্বরান্বিত হয়। বর্তমান দীর্ঘকাল ভ্রূণ হিমায়িতকরণের পর তা প্রোথিত করা হচ্ছে জরায়ুতে। এমনকী ভাবী মায়ের পছন্দ/ সময়/ ইচ্ছানুযায়ীও। অর্থাৎ এক্ষেত্রেও পথ প্রদর্শক ডা. সুভাষ মুখোপাধ্যায়।
তাঁর সমস্ত আবিষ্কার সারা পৃথিবীর সন্তানধারণে অক্ষম মা-বাবাকে নিরন্তর সাহায্য করছে আদিগন্ত বিস্তৃত অপ্রাপ্তির তমিস্রা থেকে অনুপম এক হাস্যকরোজ্জ্বল প্রাপ্তির সাতরঙা রামধনুর জ্যোতির্ময়তায় উদ্ভাসিত হতে। কিন্তু তাঁর নিজের জীবনটা ছিল অপ্রাপ্তি, হতাশা, স্বপ্নভঙ্গ, বঞ্চনা ও তঞ্চকতার গরলে টইটম্বুর!
কেন এত ঈর্ষা, অসূয়া ও ষড়যন্ত্র?
২৮ জুলাই ১৯৭৮, কেমব্রিজে জীব-প্রজননবিদ ডঃ রবার্ট জি এডওয়ার্ড ও প্রখ্যাত স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. প্যাট্রিক স্টেপটোর তত্ত্বাবধানে বিশ্বের প্রথম নলজাতক শিশু লুই ব্রাউনের জন্ম। তার ঠিক ৬৭ দিন পরে, ১৯৭৮ সালের ৩ অক্টোবর ভারতের প্রথম নলজাতক শিশু দুর্গা বা কানুপ্রিয়া ভূমিষ্ঠ হল ডা. সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে। সরকারিভাবে স্বীকৃত ভারতের প্রথম টেস্ট টিউব বেবির জন্ম হয়েছিল কিন্তু ১৯৮৬ সালে, ডা. টি সি আনন্দ কুমারের নেতৃত্বে। ডা. কুমার আইসিএমআর-এর অধীনস্থ বম্বের ইনস্টিটিউট অফ রিসার্চ ইন রিপ্রোডাকশনের অধিকর্তা ছিলেন। ১৯৭৮-এর ১৯ অক্টোবর ডা. মুখোপাধ্যায় তাঁর নলজাতক শিশুর জন্মের সাফল্য কাহিনি বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক অনুষঙ্গসহ স্বাস্থ্যমন্ত্রকে পাঠালেন, সরকারি নথিভুক্তির জন্য। ডা. মুখোপাধ্যায়ের বয়ান কতটা সত্যি জানতে জ্যোতি বসুর সরকার ‘দাশগুপ্ত কমিটি’ গড়লেন। কমিটিতে ছিলেন ডঃ মৃণালকান্তি দাশগুপ্ত (রেডিও ফিজিক্স অ্যান্ড ইলেট্রনিক্স ডিপার্টমেন্ট, ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি), প্রোঃ ডঃ ডি এন কুণ্ডু (ডিরেক্টর, সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স), ডা. জে সি চট্টোপাধ্যায় (স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ), ডা. কৃপা মিনা (স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ), প্রোঃ অজিত মাইতি (নিউরোফিজিওলজিস্ট, ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি) ও প্রোঃ. অচিন্ত্য মুখোপাধ্যায় (প্রেসিডেন্সি কলেজ)। কমিটি রিপোর্ট পরীক্ষা করে সমস্বরে জানাল সব বুজরুকি! [সত্যি বললে যে গোটা স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ মহল, আমলা, মন্ত্রী ও সরকার— সকলের মুখে চুনকালি পড়ত!] তাঁরা রিপোর্ট সুভাষিত করলেন দুটি বিশেষণে: Unbelievable ও Absurd। বামফ্রন্ট সরকারের ধ্যাষ্টামো বা ভীমরতির সঙ্গে রাজ্যের মানুষ পরিচিত। কিন্তু একদল বিজ্ঞানী-অধ্যাপক, তাঁরাও কি তাঁদের অবিমৃশ্যকারিতার জন্য নিজেদের অপারঙ্গমতা, অদূরদর্শিতা, অজ্ঞানতা ও বেওকুফিকে দায়ী করবেন না? পেশাদারিত্বের এই যুগে রেডিও ফিজিক্স বা হাই এনার্জি ফিজিক্সের একজন বিজ্ঞানী বা অধ্যাপকের পক্ষে দক্ষতা, পারদর্শিতা বা নৈপুণ্যের উৎকর্ষের নিরিখে স্ত্রীরোগ বা ধাত্রীবিদ্যার অ-আ-ক-খ’ও কি জানা সম্ভব? তবে তাঁরা কেন রাজি হলেন সরকারের আজ্ঞাবহ দাস হওয়ার? নিজেদের শিক্ষা-অধ্যবসায়ের পায়ে কুড়ুল মেরে! ফলত অকাল আত্মহননে (১৯ জুন ১৯৮১) চিরবিদায় নিতে হল আজীবন মানবকল্যাণে ব্রতী এই বিজ্ঞানীকে।
২০ বছর পরে ডা. আনন্দ কুমার ওই একই রিপোর্ট পড়ে বিস্ময় বিমূঢ় ও অতিশয় লজ্জিত হলেন। কারণ প্রথম সফল নলজাতকের রূপকার বলে ভারতে ততদিনে তিনি সুপ্রসিদ্ধ। তিনি সর্বসমক্ষে ঘোষণা করলেন ভারতে সফল নলজাতকের প্রথম রূপকার ডা. সুভাষ মুখোপাধ্যায়, তিনি নন। এবং সার্বিক পাপস্খলনে সোচ্চারে বললেন ২০ বছর আগে ডা. মুখোপাধ্যায় যে পদ্ধতিতে সাফল্য পেয়েছিলেন, সারা পৃথিবী, মায় তিনিও সেই পথেরই যাত্রী। শুধু বলেই থেমে থাকেননি মহামতি ডা. আনন্দ কুমার; তিনি ১৯৯৭-এর ১০ এপ্রিল Current Science Journal (Vol-72, No.-7)-এ একটি নিবন্ধ লিখলেন: Architect of India’s First Test Tube Baby— Dr. Subhas Mukherjee. ২০ বছর বাদে ডাঃ আনন্দ কুমারের সৌজন্যে ভারতে প্রথম নলজাতক শিশুর রূপকার বলে সরকারি সিলমোহর জুটল ডা. মুখোপাধ্যায়ের কপালে। এরকম অজস্র, যুগপৎ অবিশ্বাস্য ও মর্মন্তুদ ঘটনা লিপিবদ্ধ আছে ‘‘সুভাষ-নমিতা-সুনীতের উপকথা’’ বইটিতে। লেখক ডা. মুখোপাধ্যায়ের অন্তরঙ্গ সুহৃদ প্রফেসর সুনীত মুখোপাধ্যায় (প্রকাশক- ডা. সুভাষ মুখোপাধ্যায় মেমোরিয়াল রিপ্রোডাকটিভ বায়োলজি রিসার্চ সেন্টার, ফোন-: ০৩৩-২৩৯৬৮৭৯১)। যে সমস্ত কুটিল পণ্ডিতম্মন্যরা তাঁর পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁরা আজ আস্তাকুঁড়ে, কিন্তু ‘ডিকশনারি অফ মেডিক্যাল বায়োগ্রাফি’তে ২৫০০ বছরের ইতিহাসে স্যার রোনাল্ড রস, ইউ এন ব্রহ্মচারীর সঙ্গে যে বাঙালি বিজ্ঞানীর নামটি স্বর্ণাক্ষরে জাজ্বল্যমান তিনি— ডা. সুভাষ মুখোপাধ্যায়।
ঋণ স্বীকার—: জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে ডা. সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রাতঃস্মরণীয় গবেষণার ন্যায্য স্বীকৃতি আদায়ের অক্লান্ত জেহাদি প্রফেসর সুনীত মুখোপাধ্যায়।




?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta