রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড়ি | ম্যাগাজিন

দুর্নীতির জিরো টলারেন্স ও কিছু প্রশ্ন
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

খবরে এখন জাঁকিয়ে বসেছেন চুয়াল্লিশ বছরের মুণ্ডিত মস্তক গেরুয়াধারী যোগী আদিত্যনাথ, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী।
যেদিন তাঁর নাম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ঘোষিত হল, সেদিন থেকেই খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় তাঁর জায়গা বাঁধা। প্রথম প্রথম দিনকয়েক তো বিস্ময়ের পালা। কেন আদিত্যনাথ? ভোটের আগে থেকে ফল বেরনো পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নাম পাঁচ মাইলের মধ্যেও ছিল না। আচমকা নেপো সেজে তিনি দইটা খেয়ে গেলেন! শুরু হল আমাদের সবার বিস্ময়ের পালা। এই সময় নানা জনের নানা ধরনের তত্ত্ব জানা গেল। বিস্ময়টা থিতোতে না থিতোতে রাজ্যজুড়ে শুরু হল উগ্র হিন্দুদের তাণ্ডব। কয়েকটা মাংসর দোকান জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেওয়া হল। কসাইখানাগুলোয় তালা ঝোলানো হল। রোমিও রুখতে থানায় থানায় চটজলদি বাহিনী তৈরি করা হল। তাদের কেউ কেউ ‘মরাল পোলিসিং’ শুরু করে দিল। আদিত্যনাথ মন্ত্রীদের দফতর বণ্টন করলেন। নিজের হাতে প্রায় ৩৫টার মতো দফতর রেখে দিলেন। হুট করে একদিন থানা দেখতে চলে গেলেন। হুকুম দিলেন, সরকারি অফিসে সরকারি কর্মীরা পান ও পান-মশালা জাতীয় কিছু খেতে পারবেন না। কারণ, ‘পানাসক্তরা’ যত্রতত্র পানের পিক ফেলেন। এতে সরকারি সম্পত্তি নষ্ট তো হয়ই, তার চেয়েও বড় কথা, প্রধানমন্ত্রীর স্বচ্ছ ভারতের আইডিয়ার সঙ্গে পানের পিক মেলে না।
এখনও দু’সপ্তাহ কাটেনি। কাজেই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আদিত্যনাথের মূল্যায়নের প্রশ্ন ওঠে না। সেটা করার অভিপ্রায়ও এই মুহূর্তে নেই। তবু আদিত্যনাথকে নিয়ে এই লেখা শুরু করলাম অন্য এক কারণে। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি জানিয়ে দেন, রাজ্যের সব মন্ত্রী ও সব সরকারি অফিসারকে পনেরো দিনের মধ্যে আয় ও সম্পত্তির হিসেব দাখিল করতে হবে। আমলাদের বৈঠক ডেকে বলে দেন, তাঁর সরকারে দুর্নীতিগ্রস্তদের কোনও স্থান হবে না। দুর্নীতি নিয়ে তাঁর সরকারের ভূমিকা হবে ‘জিরো টলারেন্স’।
আদিত্যনাথের এই কথাটা শুনতে খুব ভালো লাগারই কথা। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন কেই বা না চায়? কিন্তু প্রশ্ন হল, এতে কাজের কাজ আদৌ কি কিছু হবে?
এই তো সেদিন একটা খবর পড়ে চোখ প্রায় কপালে ওঠার জো। অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুর ছেলে নারা লোকেশের সম্পত্তি মাত্র পাঁচ মাসে ২৩ গুণ বেড়ে গিয়েছে! নারা লোকেশ রাজ্য বিধান পরিষদের নির্বাচনে দাঁড়াবেন বলে নির্বাচন কমিশনে যে-মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন, তার সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামায় এই উল্লেখ করেছেন।
নারা লোকেশ ‘স্বচ্ছ রাজনীতিতে’ বিশ্বাস করেন বলে গত বছরের অক্টোবরে তাঁর সম্পত্তির খতিয়ান নিজেই জানিয়েছিলেন। সেই হিসেব অনুযায়ী তাঁর সম্পত্তি ছিল সাড়ে ১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় চার কোটি টাকার শেয়ার ছিল, একটা গাড়ি ছিল প্রায় এক কোটি টাকা দামের, আর ছিল প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকার ঋণ। এই সম্পত্তি বেড়ে হয়েছে ৩৩০ কোটি টাকা। নারা লোকেশের ব্যাখ্যা হল, পাঁচ মাস আগে তিনি শুধু শেয়ারের মূল্যের উল্লেখ করেছিলেন, পাঁচ মাস পর শেয়ারের বাজারমূল্য কত তা জানিয়েছেন। এর মধ্যে কোনও হেরাফেরি নেই।
হেরাফেরি আছে কি নেই সেই বিচারে যাচ্ছি না। আমার প্রশ্ন একটু অন্য ধরনের। ভোটে দাঁড়াতে হলে নির্বাচন কমিশনের কাছে সম্পত্তির হিসেব দেওয়া বাধ্যতামূলক। কমিশন এটা প্রকাশও করে দেয়, যাতে পাবলিক জানতে পারে যাকে সে ভোট দেবে সে কত সম্পদের মালিক। তা ছাড়া পরের বার ভোটে দাঁড়ানোর সময় প্রার্থীর সম্পত্তি বাড়ল না কমল, বাড়লে বা কমলে তার পরিমাণ কী, পাবলিক এসবও যাচাই করতে পারে।
নির্বাচন কমিশন প্রথম যখন এই নিয়মটা চালু করে, তখনও এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। কমিশনের বক্তব্য ছিল, সার্বিক নির্বাচন সংস্কারের এটি একটা পর্ব। এতে নির্বাচন কিছুটা স্বচ্ছ হবে। সেই সময় পালটা যুক্তি ছিল, এটা করে প্রার্থীর সম্পত্তির পরিমাণ জানা যেতে পারে, কিন্তু কী উপায়ে ওই সম্পত্তি অর্জিত তা তো অজানাই থাকবে? কমিশনের তাই উচিত দাখিল করা এই হিসেব আয়কর বিভাগের কাছে পাঠানো যাতে আয়কর বিভাগ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাগজপত্র যাচাই করে কমিশনকে রিপোর্ট দিতে পারে। সেই রিপোর্টে অসংগতি থাকলে কমিশন ব্যবস্থা নিতে পারবে। প্রার্থীপদ বা নির্বাচন বাতিল করে দেওয়ার ক্ষমতাও কমিশনের থাকবে। এই ক্ষমতা বা অধিকার কমিশনের থাকলে সেটা বরং কাজের কাজ হত। রাতারাতি রাজনীতিকদের আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে ওঠার প্রবণতাও কমতে পারত। কিন্তু সে সব কিছুই হল না। ভোট-প্রার্থীদের সম্পত্তির হিসেব দাখিলও রুটিনমাফিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্পত্তি নিয়ে আদিত্যনাথ যে হুকুমটা জারি করেছেন, সেই নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও দিয়েছিলেন। দল সভাপতি অমিত শাহর কাছে হিসেব জমা দেওয়ার কথা তিনি জানিয়েছিলেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই। তিনটে বছর কেটে গিয়েছে। সাংসদ-মন্ত্রীরা কে কী জমা দিয়েছেন আমজনতা তা জানতে পারেনি। জানতে পারেনি, সেই সম্পত্তি বৈধ না অবৈধ কীভাবে হয়েছে। অবৈধভাবে সম্পত্তি অর্জনের দরুন কোনও মন্ত্রী-সান্ত্রির চাকরি গিয়েছে বা তার নির্বাচন বাতিল হয়েছে এই খবরও কেউ পায়নি। জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে নানারকম প্রশ্ন কিন্তু উঠছেই। এই যেমন সেদিন সরকার ও লোকসভা-রাজ্যসভার সচিবালয়ের কাছে সুপ্রিম কোর্ট জানতে চাইল, প্রাক্তন এমপি ও এমএলএদের পেনশন সহ যেসব সুযোগ-সুবিধে দেওয়া হয় তার যৌক্তিকতা কী, কেনই বা তা বাতিল করে দেওয়া হবে না।
বাতিলের প্রশ্নটা সর্বোচ্চ আদালতের কাছে তুলেছে ‘লোক প্রহরী’ নামে একটা এনজিও। এই সংগঠনের অ্যাডভোকেট কামিনী জয়সোয়ালের যুক্তি, সরকারি কর্মীদের পেনশন যে- তহবিল থেকে দেওয়া হয় তাতে সংশ্লিষ্ট কর্মীরও অবদান থাকে। কিন্তু প্রাক্তন এমপি-এমএলএদের পেনশন দেওয়া হয় সরকারের তহবিল থেকে যা কিনা দেশের করদাতাদের অবদান। মহামান্য আদালতের কাছে তাঁর আর্জি, ৮০ শতাংশ প্রাক্তন জনপ্রতিনিধি কোটি কোটি টাকার মালিক। তাঁদের পেনশনের কোনও প্রয়োজনই নেই। প্রয়োজন নেই অন্যান্য সুবিধারও।
আদালতকে কামিনী জয়সোয়াল জানান, প্রাক্তন এমপিদের পেনশন দেওয়ার প্রশ্নটি কন্সটিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলিতে আলোচিত হওয়ার পর অগ্রাহ্য হয়েছিল। সংবিধান প্রণেতারা এই প্রস্তাব যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেননি। তাছাড়া, আগে নিয়ম ছিল, চার বছর জনপ্রতিনিধি থাকলে কেউ পেনশন পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হতেন। এখন একদিনের জন্য এমপি হলেও পেনশন পাওয়া যায়। আদালতকে তিনি বলেন, পেনশন দেওয়ার এই আইন সুপ্রিম কোর্ট ১৯৭৬ সালে বহাল রেখেছিল। কিন্তু তারপর থেকে বহুবার সংশ্লিষ্ট আইনে বহু অযৌক্তিক সংশোধন আনা হয়। তাঁর আর্জি, ৭৬ সালের পর আইনের সব পরিবর্তন বাতিল করা হোক। কামিনী জয়সোয়ালের আবেদন গ্রাহ্য করে দুই বিচারপতি জে চেলামেশ্বর ও এস আবদুল নাজির সরকারকে নোটিশ দেন।
এমপিদের সরকার যেসব সুযোগ-সুবিধে দিয়ে আসছে তা-ও চোখ কপালে ওঠারই মতো। এ নিয়ে বহুবার বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এই এক বিষয়ে সব দলের সব পক্ষের সব সাংসদই প্রায় এককাট্টা। সাংসদদের বেতন বাড়ানোর বিষয়টিও তাঁরাই ঠিক করেন। এই রীতিও অভিনব। সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় লোকসভার স্পিকার থাকাকালীন এ নিয়ে কিছুটা আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু তা ধোপে টেকেনি। এমপিরা তাঁদের কেন্দ্রের উন্নতির জন্য যে টাকা পান তা দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও কম প্রশ্ন ওঠেনি। কিন্তু সেই টাকার পরিমাণ বন্ধ হওয়া তো দূরের কথা, বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে। এ নিয়ে দুর্নীতির ভূরি ভূরি অভিযোগও আছে। কিন্তু সাংসদদের জন্য একবার কিছু চালু হয়ে গেলে তা ফেরানো বা প্রত্যাহার কঠিনই শুধু নয়, অসম্ভবও।
প্রাক্তন সাংসদদের পেনশন ও অন্য সুযোগ-সুবিধে নিয়ে এই যে প্রশ্নটা সর্বোচ্চ আদালতের দরজায় কড়া নেড়েছে, তার ন্যায্য বিচার মহামান্য বিচারপতিরা নিশ্চিতই করবেন। কিন্তু জনস্বার্থ বিষয়ক এই প্রশ্নটা যে উঠতে পারল, তার জন্য এক শ্রেণির সাংসদই কিন্তু দায়ী। দিনের পর দিন, অধিবেশনের পর অধিবেশন সংসদ কক্ষে তাঁরা যে-আচরণ করে চলেছেন, যেভাবে তাঁদের বৈভব ও সম্পত্তি চড়চড় করে বেড়ে চলেছে এবং সাধারণ মানুষ যে-তিমিরে ছিলেন সেই তিমিরেই গুমরে মরছেন, তাতে জনমনও বিষিয়ে উঠছে। নারা লোকেশরা চক্রবৃদ্ধিহারে সম্পত্তির বৃদ্ধি নিয়ে যে-যুক্তিই জাহির করুন, জনতার দরবারে তা কিন্তু গ্রাহ্য হয় না। নারা লোকেশদের মতো নেতা ভোটে বারবার জিতেও যান। কিন্তু ভোটে জেতার অর্থ সব কালিমা ঘোচা নয়। সেই জয় সন্দেহের ঊর্ধ্বেও তাঁদের অধিষ্ঠান স্থাপন করে না।
সম্পত্তির ঘোষণাই সব নয়। নির্বাচন কমিশনকে নতুন ভাবে চিন্তা করতে হবে। প্রাক্তন সাংসদদের পেনশন ও সুবিধে নিয়ে সুপ্রিম কোর্টও নিশ্চয় নানা যুক্তি খতিয়ে দেখবেন। এটা যেমন ঠিক, বৈভবে গা ভাসানো সাংসদদের পেনশনের কোনও প্রয়োজনই নেই, তেমন এটাও সত্য, এখনও এ দেশের কিছু সাংসদ-বিধায়কের হাঁড়ি ওই পেনশনের টাকাতেই চলে। যদিও তাঁরা বিরল প্রজাতির প্রজাপতির মতো ক্রমেই বিলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছেন।
 




?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta