রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড়ি | ম্যাগাজিন

জলাশয় সংরক্ষণ— অত্যন্ত জরুরি বিষয়
বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায়

পশ্চিমবঙ্গের এমন কোনও পৌর বা পঞ্চায়েত এলাকা খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে জলাভূমি বা পুকুরের অস্তিত্ব নেই। জলাভূমি সংরক্ষণ পরিবেশগত ভাবে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এই গুরুত্ব অনুধাবন করেই পশ্চিমবঙ্গের বুকে বহুবিধ আইন তৈরি হয়েছে। যথাক্রমে ১৯৭৪ সালে জলদূষণ নিবারণ ও নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫৬ সালে ভূমি সংক্রান্ত আইন ও মৎস্য দপ্তর কর্তৃক ফিশারিস অ্যাক্ট প্রণীত হয়েছে। প্রত্যেকটি আইন জলাভূমি সংরক্ষণের জন্য প্রণীত হয়েছে এবং কলকাতা হাইকোর্ট সহ রাজ্যস্তরের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়েছে যে, কোনওভাবেই জলাভূমি নষ্ট করা যাবে না বা তাকে বন্ধ করা যাবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে যে, সর্বত্র নিরবচ্ছিন্নভাবে জলাভূমি, পুকুর, দিঘি এমনকী নদীও বুজিয়ে ফেলা হচ্ছে সর্বসমক্ষে। তার অন্যতম উদাহরণ উত্তর ২৪ পরগনাতে সোনাই নদী প্রায় সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে এবং হুগলি ও হাওড়াতে অতীতের বিখ্যাত সরস্বতী নদী আজ প্রায় ইতিহাসে স্থান নিয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন, গঙ্গা নদীও ডাকাতির কবল থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গে গঙ্গা চুরির ঘটনা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। গঙ্গা বুজিয়ে বাড়িঘর হচ্ছে, ইটখোলা হচ্ছে, বালি তোলা হচ্ছে আর পুরএলাকার সমস্ত আবর্জনা ফেলে দিয়ে গঙ্গা ভরাট চলছে।
কলকাতার পাশেই বিস্তৃত জলাভূমির অবস্থান, যা পূর্ব কলকাতার জলাভূমি হিসাবে খ্যাত, আজ তা মারাত্মকভাবে আক্রান্ত। পৃথিবীর কোনও বৃহত্তম শহরের নিকট এতবড় জলাভূমির অস্তিত্ব নেই। পূর্ব কলকাতার জলাভূমি প্রকৃতির এক অনন্য দান। এই জলাভূমি রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে এবং বহুদিন আগে কলকাতা হাইকোর্ট পূর্ব কলকাতার জলাভূমিকে রক্ষা করার কথা ঘোষণা করেছেন। আইন আছে, আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত আছে, বিচার বিভাগের নির্দেশ আছে কিন্তু কলকাতার জলাভূমি ক্রমাগত গ্রাস করা হচ্ছে বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে যা প্রকৃতপক্ষে বাঞ্ছনীয় নয় বা বেআইনি। পূর্ব কলকাতার জলাভূমি রক্ষা করার জন্যে একটি বিশেষ আইন তৈরি করা হয়েছে যথাক্রমে The East Kolkata Wetlands (Conservation and Management) Act, 2006. এই আইনের দ্বারা পূর্ব কলকাতার জলাভূমি সংরক্ষণ এবং তার পাশের জমির চরিত্র রক্ষা করার কথা বলা হলেও ক্রমাগত পূর্ব কলকাতার জলাভূমি বুজিয়ে বহুতল বাড়ি তৈরি হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন শিল্পসহ ব্যাবসায়িক কাজকর্ম। বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে। সাম্প্রতিক কালে পূর্ব কলকাতার জলাভূমি সংরক্ষণের আইনটির কিছু পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে পরিবেশকর্মীরা প্রতিবাদ জানাচ্ছে। পূর্ব কলকাতার জলাভূমি ধ্বংস করার প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়েছে এই শতাব্দীর জন্মলগ্ন থেকে। পরিবেশের কথা বা জলাশয় সংরক্ষণের কথা রাজনৈতিক প্রশাসকরা মুখে বললেও কার্যত তাদেরই ছত্রছায়ায় পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে জলাশয় বা নদী ভরাট চলছে। স্থানীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন মৎস্য দপ্তর ও পরিবেশ দপ্তর সবকিছু জেনেও বিশেষ কোনও ভূমিকা পালন করতে পারছে না, কারণ রাজনৈতিক প্রশাসকদের সদিচ্ছার অভাব। অতীতে কলকাতা হাইকোর্ট পূর্ব কলকাতার জলাভূমিতে নির্মিত বেশ কয়েকটি বহুতলভবন ও শিল্প সংস্থা বন্ধের নির্দেশ দেন। এমনকী দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদও পূর্ব কলকাতার জলাভূমিতে নির্মিত শিল্প সংস্থাগুলি বন্ধের নির্দেশ দেয়। কিন্তু অদ্ভুতভাবে পূর্ব কলকাতার জলাভূমি রক্ষার জন্যে সরকারি কমিটি তাদের ছাড়পত্র দেয়, সুতরাং আইন আছে প্রয়োগ নেই।
কেবলমাত্র পূর্ব কলকাতার জলাভূমি নয়, হাওড়ার জলাভূমি, ডানকুনির জলাভূমি, উত্তর ২৪ পরগনার ঘোলা থানার অন্তর্গত জলাভূমি ক্রমান্বয়ে ভরাট করা হচ্ছে এবং এই ভরাটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে হাওড়ার তপন দত্ত খুন হলেন এবং খুনিরা সাক্ষীর অভাবে বা পুলিশের অদক্ষতার জন্য বেকসুর খালাস হয়ে গেল। এটা আমাদের মহা পরিতাপের বিষয়। তবুও আন্দোলন জারি থাকে। চন্দননগরের বুকে পাদ্রীপাড়ায় জলাভূমি বুজিয়ে ফেলার বিরুদ্ধে প্রান্তিক ঘরের মানুষরা জীবন বাজি রেখে লড়াই করছেন। সাম্প্রতিক কালে হিন্দমোটর কারখানার পাশে অবস্থিত জলাভূমি বুজিয়ে ফেলার বিরুদ্ধেও নাগরিক আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে এবং কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা হয়েছে। বর্তমানে কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, ২৪ পরগনার উত্তর এবং দক্ষিণে জলাভূমি বা পুকুর ভরাটের খবর নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতকিছু সত্ত্বেও উত্তরপাড়ার গণ উদ্যোগের মতন কিছু সংস্থা বা সুনীল চক্রবর্ত্তী বা তপন দত্তের মতো কিছু মানুষ জলাভূমি সংরক্ষণের জন্য জীবনকে বিপন্ন করে আন্দোলন করে যাচ্ছেন। এই আন্দোলনই একমাত্র আশা যে জলাভূমি রক্ষিত হবে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে জলাভূমি সংরক্ষণের ওপরেই নির্ভর করছে মাটির অভ্যন্তরে জলের স্তর রক্ষা করা এবং গ্রীষ্ম বা অন্যান্য সময় জলাভূমি বা পুকুরের জলই জীবজগৎকে তৃষ্ণা থেকে মুক্তি দেয়। পশ্চিমবঙ্গের জলাভূমির অবস্থানের উপর নির্ভর করছে মৎস্য চাষ। পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ লক্ষ মানুষ মৎস্য চাষের সঙ্গে যুক্ত। মৎস্যজীবী সম্প্রদায়রা জলাভূমি সংরক্ষণ বা নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তারা বিশেষ কোনও উদ্যোগ গ্রহণ করেনি, কারণ তাদের মধ্যে এই চেতনা যথেষ্ট পরিমাণে সম্প্রসারিত নয় যে জলাভূমি, পুকুর বা নদীর সংরক্ষণের ওপরে তাদের জীবিকা নির্ভরশীল।
পূর্ব কলকাতার জলাভূমি সংরক্ষণে বা মুদিয়ালীর মৎস্যজীবীরা জলাভূমি সংরক্ষণের ব্যাপারে আন্দোলনের অগ্রণী সৈনিক হলেও তার ব্যাপ্তি পশ্চিমবঙ্গের মৎস্যজীবীদের মধ্যে প্রসারিত হয়নি। নদীর ভাসমান সন্তান মৎস্যজীবীরা যদি সচেতনভাবে জলাভূমি সংরক্ষণের ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করেন তাহলে আন্দোলনের মাত্রা এমন একটি স্তরে উন্নীত হবে যা জলাভূমি সংরক্ষণ বা নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এক কার্যকরী ভূমিকা নেবে।

লেখক প্রাক্তন মুখ্য আইনাধিকারিক, দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ, পশ্চিমবঙ্গ।




?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta