রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড়ি | ম্যাগাজিন

শেষ হাসি কে হাসে সেই অপেক্ষায়
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

এখনও অন্তর থেকে কংগ্রেস করে যাচ্ছেন আমার এমন বন্ধুরা শুনলে কষ্ট পাবেন, কিন্তু সত্যি বলছি, উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসের হাল দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। একটা মুখ দেখলাম না যেখানে আগামী দিনে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতির ঝিলিক আছে। আরও খারাপ লাগল রাহুলের জন্য। এত চেষ্টা করেও উত্তরপ্রদেশে দলটাকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে পারছেন না। কংগ্রেসের কাছে এই রাজ্যটাও ধীরে ধীরে বিহার হয়ে গিয়েছে!
অথচ সাতাশ বছর আগেও উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসের কী রমরমাটাই না ছিল!
এই সেদিন, বৃহস্পতিবার, রায়বেরিলি, ফতেপুর, এলাহাবাদ, বান্দা, ঝাঁসিতে যেদিন চতুর্থ দফার ভোট হচ্ছে, সেদিন ভরদুপুরে লখনউয়ের মল রোডে কংগ্রেসের সদর দফতরে আচমকাই যেন ঝুপঝুপ করে সন্ধে নেমে এল। এই সেই নেহরু ভবন, যেখান থেকে জওহরলাল নেহরু ‘ন্যাশনাল হেরাল্ড’ কাগজ বের করেছিলেন। এখন অবিশ্যি মিডিয়া জগতে খবরের কাগজ ঠিক দুয়োরানির ছেলে। টিভির কাছে পাত্তাই পায় না। নেহরু ভবনের ঘরে ঘরে সেই টিভি গাঁক গাঁক করছে। মহারাষ্ট্র থেকে একটার পর একটা পুরসভার ভোটের ফল আসছে, পণ্ডিতেরা প্যানেল আলোচনায় বসে উত্তরপ্রদেশের ভোটের নিরিখে সেই ফলের বিশ্লেষণ করছেন, আর স্থানীয় নেতা ও কর্মীদের চিবুকগুলো ঝুলে বুকের ওপর এসে থেমে যাচ্ছে। সেই মুখে কেমন একটা অবিশ্বাসের ছোঁয়া! দৃষ্টিতে বিস্ময়! তবে কি দেশের মানুষ নোটবন্দিকে অন্তর থেকে সমর্থন করছে? মোদি-শাহ জুটি এই যেভাবে নোট বাতিলের মাহাত্ম্য বর্ণনা করছেন, বলছেন, একমাত্র তাঁরাই কালো টাকার বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছেন আর বাকিরা কালো টাকার পক্ষে, মানুষ কি তাহলে তা বিশ্বাস করছে? ভবিষ্যতে ভালো হবে এই বিশ্বাসে সাময়িক কষ্ট সহ্য করছে? না হলে নোটবন্দির পর সারা দেশে যতগুলো ভোট হল, সবকটাতেই কেন বিজেপি-র জয়জয়কার? একটা দুটো রাজ্যেও তো হারতে পারত?
নোটবন্দির ঘোষণা হয়েছিল ৮ নভেম্বর। সেই মাসেই চন্ডীগড় পুরসভার ভোটে কংগ্রেস ও আম আদমি পার্টিকে দুরমুশ করে বিজেপি জেতে ২৮টির মধ্যে ২০টি আসন। একটা পায় অকালি দল। ছয় রাজ্যে ৪ লোকসভা ও ৮ বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচন হল। রেজাল্ট হল যে-যেখানে-দাঁড়িয়ের মতো। যে-রাজ্যে যে-আসন যার দখলে ছিল তারই থাকল। তারই মধ্যে বিজেপি ভোট বাড়াল ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে। ভোট হল রাজস্থান ও গুজরাতের পুরসভার। গুজরাতে বিজেপি পেল ৩১টার মধ্যে ২৩, রাজস্থানে ৩৭টির মধ্যে ১৯টি। নোটবন্দির ঠিক উনিশ দিনের মাথায় মহারাষ্ট্রে তিন দফার ভোট হয়। প্রথম দফার ভোটে ১৪৭ প্রেসিডেন্ট কাউন্সিল পদের মধ্যে বিজেপি জেতে ৫১টিতে, দ্বিতীয় দফার ভোটে ১৪র মধ্যে ৫টিতে। তৃতীয় দফায় কংগ্রেস টেক্কা দিলেও মোট হিসেবে দেখা যায় বিজেপি-র কর্পোরেটরদের সংখ্যা ২৫ থেকে বেড়ে হয়েছে ১১৯, কংগ্রেস নেমে এসেছে ১৫০ থেকে ১২৬-এ। উত্তরপ্রদেশের বিধান পরিষদের ভোটেও বিজেপি-র জয়জয়কার। আর এবার তো মহারাষ্ট্রের দশটা পুরসভার মধ্যে বিজেপি দখলে নিল আটটা! তাও কীভাবে? না, শিবসেনার জোট ও ভোট ভেঙে! একা লড়ে! পাশাপাশি আরও বিস্ময় ধেয়ে এল ওড়িশা থেকে। নবীন পট্টনায়কের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে সে রাজ্যে বিজেপি ৩০০টা জেলা পরিষদের আসন জিতেছে। ২০১২ সালে তারা জিতেছিল মাত্র ৩৬টা আসন। পাঁচ বছর আগে নবীনবাবুর বিজু জনতা দল জিতেছিল ৬৫০, এবার তার চেয়ে কমে গেল ১৯০টা আসন! চারবারের মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়কের কপালে ভাঁজ পড়ারই কথা।
আর কংগ্রেস? যত কম বলা যায় ততই ভালো। ওড়িশার ঝড়সুগুড়া ছাড়া সব জেলা থেকেই কংগ্রেস ধুয়েমুছে সাফ!
উত্তরপ্রদেশে আমেথি ও রায়বেরিলি জেলা দুটোকে কংগ্রেসের মরূদ্যান বলে মনে করা হত। রাজ্যের যে কোনও জেলার সঙ্গে এই দুইয়ের তফাতটা কোথায় তা সেখানে যাঁরা গিয়েছেন তাঁরাই জানেন। লখনউ থেকে রায়বেরিলি যেতে হলে যে জাতীয় সড়কে গাড়ি ছোটাতে হয়, তা ডবল লেনের। গাড়ি ছুটবে সাঁই সাঁই করে। এই সড়কটা চলে গিয়েছে সোজা এলাহাবাদ। কিন্তু রায়বেরিলি যেই পেরিয়ে গেল, ডবল লেন রাস্তা হয়ে গেল সিঙ্গল লেন। এই যে ডবল লেন, সে গান্ধী পরিবারের কৃপায়। রায়বেরিলি হয়ে আমেথি যান, স্টেট হাইওয়ে খানাখন্দে ভরা কখনও দেখবেন না। মসৃণ, মোলায়েম পরিক্রমা। সৌজন্যে সেই গান্ধী পরিবার। এই তল্লাটে রাস্তার ধারে ধারে চোখে পড়বে উন্নয়নের ঝলক। শুরু করেছিলেন ইন্দিরা-রাজীব, সোনিয়া-রাহুল তার রেশ ধরে রেখেছেন। সব প্রকল্প যে চালু রয়েছে তা নয়। বন্ধও হয়ে গিয়েছে কিছু। কিছু আবার নতুন সাজে আরও বড় আকারে ফেরত এসেছে। যেমন, রাজীব গান্ধী ইনস্টিটিউট অব পেট্রোলিয়াম টেকনোলজি। দেখলে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। সুয়োরানি-দুয়োরানির পার্থক্যটা যে কেমন, এই দুই জেলার পাশাপাশি অন্য জেলাগুলো দেখলে তা বোঝা যায়। কিন্তু সেই মরূদ্যানেও কংগ্রেস আজ কেমন যেন এলেবেলে হয়ে গিয়েছে। কংগ্রেসিরা নিজেদের ওপর বিশ্বাসই হারিয়ে ফেলেছে। ছ-সাত মাস আগেও এই দলটার কর্মীদের মধ্যে যে-চনমনে ভাবটা ছিল, অখিলেশের সাইকেলের সওয়ারি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা উধাও! গোটা রাজ্যেই দলটা কী অদ্ভুতভাবে করুণার পাত্র হয়ে গিয়েছে।
তবে লড়ছেন বটে অখিলেশ সিং যাদব। চরকি ঘোরা ঘুরছেন রাজ্যের এমুড়ো থেকে ওমুড়ো। এই প্রথম দেখা গেল সমাজবাদী পার্টি জাতপাতের বিষয়টা ঊহ্য রেখে প্রচারের ভঙ্গিটাই পালটে দিয়েছে। অখিলেশের বয়স মাত্র ৪৩। ভোটের বাজারে যে-প্লেয়াররা ময়দানে নেমেছেন, তাঁদের সবার চেয়ে বয়সে তিনি ছোট। অখিলেশ জানেন, নিজের জাতের ভোট তিনি পাবেন। মুসলমান ভোটও। এই দুই দিকে নজর তাঁর যে নেই মোটেই তা নয়।
প্রবলভাবে আছে, তবে প্রচ্ছন্ন। তিনি জোর দিচ্ছেন উন্নয়ন, আধুনিক মনস্কতা, প্রগতি ও নবীনদের ওপর। আঠারো থেকে পঁয়ত্রিশ বছরের ছেলে-মেয়েদের তিনি টার্গেট করেছেন। স্লোগান একটাই, ‘কাম বোলতা হ্যায়।’ শো-কেস করছেন তাঁর পাঁচ বছরের কাজগুলো। যেমন, মেট্রো রেল, লখনউ টু আগ্রা সুপার ফাস্ট হাইওয়ে যার ওপর কিছুদিন আগে ফাইটার প্লেন ল্যান্ড করানো হল, বিদ্যুৎ উৎপাদন। লোকসভা ভোটের সময় নরেন্দ্র মোদি যেভাবে স্বপ্নের ফেরিওয়ালা হয়ে উঠেছিলেন, অখিলেশ ঠিক সেইভাবে নিজেকে তুলে ধরতে চাইছেন এবার। তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য জিততে চাইছেন যাতে সম্পূর্ণ নিজের বিচারবুদ্ধি অনুযায়ী রাজ্যটা শাসন করতে পারেন। ‘ফোর অ্যান্ড আ হাফ সিএম’-এর তকমা ঝেড়ে ফেলে ‘ওয়ান অ্যান্ড ওনলি সিএম’ হতে চান।
উত্তরপ্রদেশের যেকোনও প্রান্তে গেলে খোলা চোখে বোঝা যাচ্ছে লড়াইটা মোদির সঙ্গে অখিলেশের। কিন্তু দু’জনের কেউই মায়াবতীকে উপেক্ষা করতে পারছেন না। বছর কুড়ি-পঁচিশ আগে সিপিএমের ক্যাডারেরা যেমন ডেডিকেটেড ছিলেন, মায়াবতীর ক্যাডারেরা ঠিক তেমন। মুখ বুজে প্রত্যেকেই নিজের কাজটুকু নিঃসাড়ে করে যান। কোনও ঢাকঢোল পেটানো নেই, কোনও হইচই নেই, মায়বতী ছাড়া কোনও বড় জনসভার আয়োজনও নেই। এই একটা দল, আজ পর্যন্ত নির্বাচনী ইস্তেহারে বিশ্বাস করেনি, নেত্রীর ওপর আস্থাও হারায়নি। কিছু না করলেও এই দলের সমর্থকেরা দলকে খালি হাতে ফেরায় না। তিন বছর আগের লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যে ২০ শতাংশ ভোট পেয়েছিল বহুজন সমাজ পার্টি। যদিও আসন পায়নি একটাও।
মোদি ও অখিলেশের দ্বৈরথে অদৃশ্য তৃতীয় ব্যক্তি এই মায়াবতীই। অখিলেশের কাছ থেকে তিনি যেমন মুসলমান ভোট ছিনিয়ে নিতে চাইছেন, মোদি তেমন চাইছেন মায়াবতীর খপ্পর থেকে পাসি, কোরি, মাল্লা, বাল্মীকি, সোনকরদের মতো অ-জাটভ দলিত সমর্থন টেনে লোকসভা ভোটের মতোই বাজিমাত করতে। এমন টানটান লড়াই উত্তরপ্রদেশ অনেকদিন দেখেনি।
উত্তরপ্রদেশের ভোটে এই প্রথম নকড়া ছকড়া হয়ে রইলেন মুলায়ম সিং যাদব। সমাজবাদী পার্টি পোস্টার-হোর্ডিংয়ে অখিলেশের পাশে তিনি স্রেফ ছবি হয়ে রয়েছেন! ভাই শিবপাল ও পুত্রবধূ অপর্ণার দুটি সভা ছাড়া তিনি অ-প্রকাশ্য রইলেন। এই প্রথম গোটা ভোট-পর্বে নিভৃত-অন্তঃপুরবাসিনী হয়ে রইলেন সোনিয়া গান্ধীও! বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রী দেশের প্রাচীনতম গণতান্ত্রিক দলের কর্ণধারের শারীরিক অবস্থা ঠিক কী, তা জানার গণতান্ত্রিক অধিকারটুকু তাঁর দলীয় কর্মী-সমর্থকদের নেই! হতাশ করলেন প্রিয়াঙ্কাও। মা-মেয়ের আশায় চাতক পাখির মতো চেয়ে চেয়ে ক্লান্ত ও বিভ্রান্ত কংগ্রেসিরা এখন সমাজবাদীদের করুণা-প্রত্যাশী! পরিত্যক্ত ও আহত শিবপাল গোপনে শান দিচ্ছেন ছুরিতে। অখিলেশের পাকা ধানে মই দিতে শতাধিক গোঁজ প্রার্থী তাঁর মদতে প্রস্তুত। এবারের লড়াই তাঁর কাছেও বেঁচে থাকার।
শেষ হাসিটা কে হাসবে সেই ভাবনার কূলকিনারা এখনও ঝাপসা। অথচ কী অসম্ভব রঙিন এবার উত্তরপ্রদেশের ভোট-চরাচর।




?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta