রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড়ি | ম্যাগাজিন

মোদিজির ম্যাজিক কি
মমতার বাংলায় খাটবে

মেরুনীল দাশগুপ্ত

রাহুল-অখিলেশ জুটি নেতাজি মুলায়ম বহেনজি মায়াবতী প্রমুখ সকলের সব দাপট কায়দা কৌশল হেলায় তুচ্ছ করে গোটা উত্তরপ্রদেশ জুড়ে অভূতপূর্ব পদ্ম ফুটেছে এবার। এবারের বিধানসভা ভোটে উত্তরপ্রদেশের মাটিতে পদ্ম যে ফুটবে এবং বেশ বড় সংখ্যায় ফুটবে—এটা প্রত্যাশিতই ছিল। কিন্তু, আর সকলের সব বাগান ঝরিয়ে দিয়ে এমন নজিরবিহীন সংখ্যায় এমন অক্লেশে ফুটবে— এটা বোধহয় অতি বড় আশাবাদীও আশা করেননি। ভোট পরবর্তী সমীক্ষার রিপোর্টগুলিকেই তার প্রমাণ হিসাবে দাখিল করা যেতে পারে। ভোটের পর প্রকাশিত বুথ-ফেরত সমীক্ষার ফলগুলোতে কোথাও কি উত্তরপ্রদেশে এমন অভূতপূর্ব ফলের খবর ছিল? ছিল না। বরং, বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্ট থেকে উত্তরপ্রদেশে ত্রিশঙ্কু ফলের আভাসটাই প্রকট হয়ে উঠেছিল! এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বেশিরভাগের কথায় মন্তব্যেও মনে হচ্ছিল এবার উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা ত্রিশঙ্কু দশা পেতে চলেছে। এমনকী যুযুধান পক্ষের অন্যতম সেনাপতি অখিলেশ যাদবও বিশ্বাস করে বসেছিলেন—ত্রিশঙ্কু হতে চলেছে বিধানসভা। না হলে কেন তিনি আগাম বলে বসবেন—রাষ্ট্রপতি শাসনের চেয়ে মায়াবতীর সঙ্গ ভালো! ক্ষমতা থেকে নরেন্দ্র মোদির বিজেপিকে দূরে রাখতে দরকারে সমাজবাদী-কংগ্রেস জোট মায়াবতীর সঙ্গে হাত মেলাতে পারে—এমন পূর্বাভাসও মিলেছিল ইউপির নেতাজিপুত্রের কাছ থেকে!
কিন্তু, রাজনীতির পণ্ডিত মহাজনেদের যাবতীয় অঙ্ক ইতিহাস ভূগোল চূড়ান্ত ভুল প্রমাণ করে কাতারে কাতারে পদ্ম ফুটল উত্তরপ্রদেশের দশদিকে! ঘটনাটাকে কেউ বলছেন মোদি-ঝড়, কেউ বলছেন মোদি-ম্যাজিক—বিধানসভা ভোটে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এই পদ্মপ্লাবনকে আরও কত বিশেষণেই না বিশেষিত করা হচ্ছে। তবে, বিশেষণ যা-ই হোক সবের কেন্দ্রে তিনি, নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি—প্রধানমন্ত্রী এবং একুশ শতকের গেরুয়া শিবিরের শিরোমণি, বিজেপির এক এবং অদ্বিতীয় নেতা ও নায়ক। তাঁর সৌজন্যেই যে এবার উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার রং প্রায় আদ্যন্ত গেরুয়া হয়ে গেল—এটা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই। উত্তরাখণ্ডেও একই অবস্থা। সেখানেও এবার গেরুয়ার নিরঙ্কুশ আধিপত্য। দেশের দুই প্রান্তের দুই ছোট রাজ্য গোয়া আর মণিপুরেও শেষপর্যন্ত গেরুয়া শাসন কায়েম হল। ব্যতিক্রম একমাত্র পাঞ্জাব। পাঁচ রাজ্যের সাম্প্রতিক বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের শিবরাত্রির সলতে বলতে ওই পাঞ্জাব। বাদবাকি চার রাজ্যে কংগ্রেস সমাজবাদী পার্টি সমেত অন্যরা মোদি-ঝড়ই বলুন কি মোদি- ম্যাজিক—তাতে কার্যত উড়ে গিয়েছেন। উত্তরপ্রদেশে ৪০৩ আসনের মধ্যে ৩২৫, উত্তরাখণ্ডে ৭০-এ ৫৭!
কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন, উত্তরপ্রদেশে ফলটা বড় সন্দেহ নেই তবে বিগত লোকসভা থেকে খারাপ! লোকসভার চেয়ে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ভোট পার্সেন্টেজ সামান্য হলেও কমেছে! আমরা ওই অঙ্কের কূটকচালের মধ্যে যাচ্ছি না। তার কারণ, ইউপিতে উত্তরাখণ্ডে মোদিজির গেরুয়া বাহিনী যা করে দেখিয়েছে তাতে আগামী দিনের ভোটযুদ্ধ নিয়ে অবিজেপি রাজ্যগুলোর কপালে যথেষ্ট ভাঁজ পড়বে তাতে সন্দেহ নেই। সার্জিক্যাল স্ট্রাইক দেশ জুড়ে জাতীয়তাবাদ দেশভক্তির নামে সন্ত্রাস খুনোখুনি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অনর্গল মূল্যবৃদ্ধি মধ্যবিত্তের জমা টাকার সুদে কোপ বা ওই ডিমনিটাইজেশন, নোট-বন্দি—কোনও কিছুর কোনও বিরূপ প্রভাব সাধারণের ওপর পড়েছে বা এসবের জন্য তাঁরা দেশের বর্তমান কর্ণধার ও তাঁর দলের ওপর কিছুমাত্র ক্ষুণ্ণ হয়েছেন—এও তো আর বলা যাচ্ছে না। বললেও সাধারণ্যে প্রমাণের অভাবে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না! সবচেয়ে বড় বিপদটা তো সেখানেই!
অনেকেই বলছেন, মোদিকে ঠেকাতে জোট ছাড়া গতি নেই। জাতীয় স্তরে রাহুল গান্ধী বা তাঁর দল কংগ্রেসের ভাবনা যে এর চেয়ে বিশেষ আলদা হবে না উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী অখিলেশ যাদবের সঙ্গে জোট গড়ে নির্বাচন লড়ার মধ্য দিয়ে সেটা মোটের ওপর বুঝিয়েই দিয়েছেন রাহুল গান্ধী। এরপর আগামী লোকসভার আগে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট জোরদার করার চেষ্টা হলে এবং তাতে এমনকী সিপিএম সমেত বামেদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ‘সহযোগিতা’র আহ্বান জানানো হলেও আশ্চর্যের কিছু নেই। এই মুহূর্তে গোটা ভারতের যা চেহারা তাতে নরেন্দ্র মোদি অমিত শাহের গেরুয়া আগ্রাসন থেকে রক্ষা পেতে কংগ্রেসের কাছে বিকল্পই বা কী?! অন্যদিকে, অনেকেই এখন পশ্চিমবঙ্গের কথা তুলছেন। তাঁদের বক্তব্য ইউপিতে বিশাল জয়ের পর রাজ্যসভায় শাসক বিজেপির জোর অনেকটাই বাড়ল। রাজ্যসভায় বিল পাশে স্বনির্ভর হওয়ার ক্ষেত্রেও এগল। এবার যেসব রাজ্যে গেরুয়াবাহিনী এখনও বিশেষ জুত করতে পারেনি সেখানে ঝাঁপাবে। তালিকায় এক নম্বর নাম পশ্চিমবঙ্গ।
ঠিক আছে। কিন্তু, প্রশ্ন হল—মোদিজির ম্যাজিক কি মমতার বাংলায় খাটবে! তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, এই ম্যাজিক দেখানোর মঞ্চ প্রস্তুত করার জন্য দিল্লি কী করতে পারে? অনেক কিছুই পারে। তবে, রাজনৈতিক তথ্যভিজ্ঞমহলের একাংশের ধারণা ‘দুর্নীতি’কে হাতিয়ার করেই তাঁরা ২০১৯-এর মোদি-ম্যাজিকের মঞ্চ তৈরির অভিযানে নামবেন। সারদা নারদা রোজভ্যালি নিয়ে সিবিআই আবার ‘তৎপর’ হবে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অস্বস্তিতে ফেলতে এদিক-সেদিক কয়েকটা ধরপাকড়ও হতে পারে। সঙ্গে অর্থনৈতিক দাবিদাওয়া সংক্রান্ত বঞ্চনা যথারীতি। সিবিআই তদন্তে গতি আনতে ইতিমধ্যেই রাজ্য বিজেপি চাপ বাড়াতে শুরু করেছে! এ রাজ্যের ভারপ্রাপ্ত কৈলাশ বিজয়বর্গীয় অবশ্য বলছেন, সিবিআই নিজের কাজ নিজে করছে, তাদের প্রভাবিত করার প্রশ্নই নেই। সে তো বলবেনই। কিন্তু, আগামী লোকসভা ভোটের আগে রাজ্যবাসীর সামনে মোদিজির দুর্নীতি বিরোধী ‘স্বচ্ছ’ ইমেজ খাড়া করতে সারদা নারদাকে যে ব্যবহার করা হবে তা নিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলের একাংশে বিশেষ সংশয় নেই। মঙ্গলবারের নারদকাণ্ড সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনামার পর এই পূর্বাভাস যে আরও প্রকট দেখাবে তা বলাই বাহুল্য।
সে না হয় হল। তাতে না হয় কিছু মানুষকে কিছুকাল মজানোও গেল। কিন্তু তা দিয়ে কতদূর ভোটসাফল্য পাবে বিজেপি? ভোটটা না হয় একদিনের কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার। কিন্তু, ওই একদিনের জন্য কত দিনের কত কত চেষ্টা পরিশ্রম কাজকর্ম সংগঠন লাগে বলুন তো! তাছাড়া, সাধারণ করেকম্মে খাওয়া মানুষ আগে কী দেখেন—দুর্নীতি না উন্নয়ন? কী দেখেন, কোন নেতামন্ত্রী কত টাকা সরিয়েছেন না তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে সংসারে সমাজে উন্নয়ন উন্নতি সুযোগ সুবিধা কী হল না হল—কোনটা? সোজা কথা, মানুষ দেখেন উন্নয়ন এবং মানুষের প্রথম চাহিদা স্বাচ্ছন্দ্য আর নিত্যদিনের জীবনে অল্পস্বল্প সুযোগসুবিধা। শহরগ্রামের সাধারণ মধ্যবিত্ত কি গরিবগুর্বো—যেই হোন আজও তাঁদের প্রধান চাহিদা ও প্রত্যাশা এটুকুই। সিপিএমের সন্ত্রাস শাসনের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর লড়াই করে, নন্দীগ্রাম সিঙ্গুর নেতাইয়ের মতো অনেক রক্তাক্ত ভয়ংকর ইতিহাস পার হয়ে জীবন পর্যন্ত বাজি রেখে প্রায় একক কৃতিত্বে রাইটার্স থেকে বাম শাসকদের পথে নামিয়ে প্রতিবাদের অগ্নিকন্যা
হিসাবে ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন ক্ষমতায় এসেছিলেন তখনও মানুষের এই চাহিদাটুকুই ছিল। কেবল মুখ্যমন্ত্রী মমতার প্রতি অগাধ বিশ্বাসে সেই চাহিদা পূরণের প্রত্যাশাটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল গগনচুম্বী!
মমতাও সেটা বুঝেছিলেন এবং একেবারে শুরু থেকেই সেই প্রত্যাশা পূরণে সক্রিয় হয়েছিলেন। মমতার সেই সক্রিয়তা কতটা সফল হয়েছে অঢেল সমর্থন জুগিয়ে রাজ্যবাসী তার প্রমাণ রেখেছেন শেষ বিধানসভা ভোটে। শিক্ষা স্বাস্থ্য পঞ্চায়েত জনস্বাস্থ্য কারিগরি সমেত বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন থেকে খাদ্যসাথি কন্যাশ্রীর মতো জনহিতকর প্রকল্প রূপায়ণে তাঁর বিপুল সাফল্য আজ অস্বীকার করবেন কে? এখানেই তো থেমে নেই তিনি—রাজ্যের বেসরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবায় রোগী লাঞ্ছনা ঠেকাতে কী না করছেন! মানুষ সব দেখছেন তো না কি। চারটি দুর্নীতির অভিযোগ আর সিবিআই দিয়ে মানুষের মন থেকে রাজ্যের উন্নয়ন জোয়ারের এই ছবি মুছে দেওয়া যাবে! মুছে দিতে পারবে মোদি-ম্যাজিক! শুধু কি তাই? আজও এতদিন মুখ্যমন্ত্রিত্বের পরও এ রাজ্যে নির্যাতিত নিপীড়িতের পরম বন্ধু তিনি। বিপদাপন্নকে চিকিৎসা সুরক্ষা আর্থিক সহায়তা থেকে চাকরি—তিনি দরাজহস্ত। এর আগে কোনও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাধারণ মানুষজন এত সহজে দেখা করে প্রাণের কথা বলতে পেরেছে? তো, রাজ্যবাসী এসব সব ভুলে যাবে লহমায়! হয়?
বিজেপি শিবির থেকে নাকি শোনা যাচ্ছে মোদিজি অমিতজিরা এই বাংলায় ২০১৯-এ উত্তরপ্রদেশ মডেলে ভোট করবেন। তাহলেই নাকি ইউপির মতো গোটা বাংলা মমতার তেরঙ্গা ফেলে বিজেপির গেরুয়া ধারণ করবে! শ্যামল সবুজ বাংলাকে গেরুয়া ধারণ করাতে নাকি প্রয়োজনে অমিত শাহ বিজয়বর্গীয়রা বাংলার মাটিতে ঘাঁটি গেড়ে দিনের পর দিন পড়ে থাকবেন! ফিরে ফিরে আসবেন, দফায় দফায় মিটিং করবেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিজিও! ভালোই তো। ভোটযুদ্ধ বলে কথা তায় প্রতিপক্ষ মমতা! কিন্তু, মুশকিলটা হল মমতাময় বাংলায় আঁচড় কাটতে হলে যে মমতার ‘উন্নয়ন’কে টেক্কা দিতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে, শুধু বোঝালেই হবে না, বিশ্বাস করাতে হবে রাজ্যের উন্নয়নে মমতার চেয়ে মোদিজি দড় এবং উন্নয়নের লীলাভূমি বলে ঘোষিত স্বচ্ছ-ভারতের সূর্যালোক প্রথম এই পশ্চিমবঙ্গের বুক আলোকিত করবে। পারবেন? পারতেই পারেন। কিন্তু, তাতেও কি প্রার্থিত ফল মিলবে!
রাজনীতির গুণীজনেরা অনেকেই বলছেন, তা সত্ত্বেও ধন্দ আছে বিস্তর। আসলে কি, বাঙালির প্রাণেমনে এখন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। তার ওপর তাঁর সর্বব্যাপী উন্নয়নের জোয়ারে গোটা বাংলা এখন এতটাই মগ্ন অভিভূত যে মমতা ভিন্ন অন্য কারও কথা তাঁদের কানে বিশেষ ঢোকে না। আবেগপ্রবণ বলে বাঙালির ‘সুখ্যাতি’ তো সেজন্যই! তাই, বিজেপির বাণী শেষপর্যন্ত তাঁদের কানে কতটা পৌঁছবে তা নিয়ে খুব পরিষ্কার নন কেউই। তবে, মমতার বাংলায় সিপিএম কংগ্রেসের মতো এ রাজ্যের আদত বিরোধীরা তো প্রায় নিশ্চিহ্ন। আগামী লোকসভা ভোটে তাঁদের এই ম্রিয়মাণ ভূমিকার বিশেষ একটা উন্নতি হবে বলেও কেউ মনে করছেন না। এখন ২০১৯-এর ভোট রণাঙ্গনে বিরোধীদের ওই ফাঁকা জায়গাটা মোদিজি ও তাঁর দল ঠিকঠাক ব্যবহার করতে পারলে আর কিছু না হোক এ রাজ্যে পদ্ম আর ঘাসফুলে একটা ছোটখাট লড়াইটক্কর দেখা গেলেও যেতে পারে—সেটাই বা কম কী!




?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta