রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড়ি | ম্যাগাজিন

টেট রাজনীতি
মেরুনীল দাশগুপ্ত

শিক্ষামন্ত্রী তো বলছেন, অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তা সত্ত্বেও সব কোর্টে চলে গেল! লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়ের চাকরি আটকে দিল! আরে আমার ঘরের ক্যান্ডিডেটই পায়নি। পরীক্ষায় পারেনি, তাই পায়নি। তাতে কী? আমার চেনাজানা অনেকেই পেয়েছে। তারা কেউ রাজনীতি-টিতি করে না। সাধারণ ঘরের সাধারণ ছেলেমেয়ে। তাও পেয়েছে। তার মানে নিশ্চয় যোগ্যতায় পেয়েছে। কিন্তু, পেয়েও পাবে না। চাকরি হবে না। কেস হয়ে গেছে। ভাবুন একবার, লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়ের চাকরি আটকে গেল প্রাথমিক স্কুলগুলোতে লাখ লাখ পদ খালি পড়ে রইল—হুঁশ নেই কারও! এ কোন ধরনের রাজনীতি! আর কোনও রাজ্যে এমনটা হবে?! সেখানেও তো বিরোধীরা আছে, সিপিএম কংগ্রেস আছে—তারা কেউ এভাবে আন্দোলনে উসকানি দিয়ে কোর্ট-কাছারি করে নিজের রাজ্যের লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়ের সর্বনাশে এমন পরোক্ষ মদত দেবে? অসম্ভব।
হচ্ছিল নাটক নিয়ে কথা। দেবশঙ্কর সুরজিৎ—কার গিরিশ কত ভালো, কার অভিনয়ে চরিত্র আগে, কার অভিনয়ে ‘আমাকে দেখুন’ ভাব ইত্যাদি হরেক বিষয় নিয়ে চলছিল আলোচনা। চমৎকার বলছিলেন ভদ্রলোক। গত সপ্তাহে মেট্রো যাত্রার একটি খারাপ অভিজ্ঞতার শোনা-কথা লিখেছিলাম। কিন্তু, সৌভাগ্য হলে, সেই ভিড়ঠাসা মেট্রোতেই যে কখনও-সখনও মনোরম সাংস্কৃতিক আলোচনার অংশীদারিত্বও মিলে যেতে পারে—গত সোমবার তার প্রমাণও পেলাম। কিন্তু, মূল আলোচক গন্তব্যে নেমে যেতেই কথায় কথায় কথা ঘুরে গেল প্রাথমিক টেটে! এবং ওপরের মন্তব্যগুলো শোনা গেল এক প্রৌঢ় কণ্ঠে। লক্ষ করলাম, কলকাতা দূরদর্শনের কর্মী বিরাটির একটি আবাসনের বাসিন্দা ভদ্রলোক যখন এক তোড়ে এবং বেশ অসন্তোষের সঙ্গে কথাগুলো বলে চলেছেন—আশপাশের অনেক ঘাড়ই সম্মতিতে দুলছে। কেবল এক গাঁট্টাগোঁট্টা নেমে যাওয়ার মুখে ছুঁড়ে দিয়ে গেলেন—সব যখন স্বচ্ছ তখন লিস্টটা কেন বার করছেন না শিক্ষামন্ত্রী! শিক্ষামন্ত্রী! টেট পরীক্ষায় লিস্ট বার করবেন শিক্ষামন্ত্রী! ওই ভদ্রলোক এবং তাঁর সহযাত্রীদের অনেকের মুখেই দেখলাম ঈষৎ হাসির রেখা! সেই হাসি যে নিছক খুশির হাসি নয় তা বোধকরি বলাই বাহুল্য।
কিন্তু, যেরকম হাসিই হোক প্রাথমিক টেট পরীক্ষা এবং তার মেধাতালিকা নিয়ে যা চলছে তা মোটেই হাসির ব্যাপার নয়। কারণ, টেট নিয়ে গত কয়েকদিনের ‘আন্দোলন’ ‘প্রতিবাদে’র ধরনধারণ দেখে মনে হচ্ছে না যে এসব কেবল পরীক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া। নিশ্চয়ই এইসব ঘটনার সিংহভাগ জুড়ে তাঁদেরই দেখা যাচ্ছে কিন্তু, খবর হল—তাঁদের সংগঠিত করে কলকাতা সল্টলেক থেকে রাজ্যের জেলায় জেলায় অশান্তি’র আবহ তৈরি করার ইন্ধন ও উসকানি আসছে বিরোধী শিবিরের মন্ত্রণালয় থেকে। এবং ক্রমশ ক্রমশ টেট পরীক্ষা মেধাতালিকা সংক্রান্ত ভুলভ্রান্তি সমস্যা ইত্যাদি ছাপিয়ে প্রকট হয়ে উঠছে টেট-রাজনীতি। শুধু তাই নয়, এই রাজনীতির পাকেচক্রে জড়িয়ে অনেক প্রতিবাদীই এখন বিভ্রান্ত, হতাশ, দিশাহীন! তাঁদের বক্তব্য, টেট আন্দোলন শুরুতে যতটা স্বতঃস্ফূর্ত ছিল এখন ততটা নেই। তাঁদের দাবিদাওয়ার যতটা গুরুত্ব ছিল সেটাও নাকি পদচ্যুত হয়ে এখন শিখণ্ডীর ভূমিকায়। এই শিখণ্ডীকে সামনে রেখে সিপিএম কংগ্রেসের মতো বিরোধীরা আড়াল থেকে রাজনীতি করে যাচ্ছে! এই টেট রাজনীতির একমাত্র লক্ষ্য নাকি প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ ঠেকানো। প্রাথমিক শিক্ষক-শিক্ষিকার লক্ষ লক্ষ শূন্যপদ পূরণের কৃতিত্ব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার যাতে কোনওভাবেই না পায় তার জন্যই নাকি টেট-বিক্ষুব্ধদের ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিবাদ আন্দোলনের নামে রাজ্য জুড়ে অশান্তির একটা বাতাবরণ তৈরির চেষ্টা চলছে।
অভিযোগ বা বিশ্বাস যে যা-ই করুন, একথা অনস্বীকার্য প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষার বিধিব্যবস্থা নিয়ে ভুলভ্রান্তি আছে। হতে পারে সে ত্রুটি কোথাও পদ্ধতি প্রয়োগে কোথাও অনবধানবশত। কিন্তু, শেষকথা ত্রুটি আছে। সেই ত্রুটি নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে আদালতে মামলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বেশ কিছু অভিযোগও জমা পড়েছে। মহামান্য আদালত বিচার-বিবেচনা করছেন। বিধানসভায় শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ও ঘটনার গুরুত্ব অস্বীকার করেননি। বরং, জানিয়েছেন, হাজার পাঁচেক অভিযোগ তিনি পেয়েছেন এবং সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোর প্রতিবিধানের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আধিকারিকদের নির্দেশ দিয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রী এও জানিয়েছেন যে, প্রাপ্ত অভিযোগগুলির মধ্যে অধিকাংশই ভিত্তিহীন। কিন্তু, যেসব ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীর দাবি সংগত সেসব ক্ষেত্রে শিক্ষাদপ্তর যথাযথ ব্যবস্থাও নিচ্ছে। শুধু তাই নয়, এরপরও যেসব অভিযোগ উঠছে সেসব খতিয়ে দেখে দ্রুততার সঙ্গে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে আশ্বাসও শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে মিলেছে। এখন কথা হল, রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের এহেন আশ্বাসের পরও আন্দোলন কেন! আদালত কেন! শুধু তো প্রাথমিক নয়, উচ্চপ্রাথমিক এমনকী উচ্চশ্রেণির বিদ্যালয়গুলোতেও তো শিক্ষক নিয়োগ করতে পারবে না সরকার। মনেপ্রাণে চাইলেও পারবে না। কারণ ‘কেস’ হয়ে গেছে যে, তার ফয়সালা না হওয়া অবধি নিয়োগ বন্ধ! আবার ফয়সালার পর অন্য কোনও কারণে যদি ফের কেস হয়ে যায়, আবার বন্ধ। এবং, এমন চললে শিক্ষক-শিক্ষিকার অভাবে রাজ্যের স্কুলগুলোর পঠনপাঠনের কী দশা হবে, রাজ্যের লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত যোগ্য বেকার ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ কী হবে—সেটা কি বলার অপেক্ষা রাখে?
কিন্তু, এ রাজ্যের বিরোধী রাজনীতির হোতা কর্তাদের সেসব ভাবার টাইম কোথায়? আরে বাপু, যে সে ব্যাপার তো নয়, অস্তিত্ব রক্ষার মামলা! গত দুই বিধানসভা ভোটের ধাক্কায় সিপিএম এক থেকে তিন নম্বর। অতলে তলিয়ে যাওয়া প্রদেশ কংগ্রেস গত ভোটে তবু একটু মুখ তুলেছে, হাঁফ ছাড়তে পেরেছে। আর বিজেপি সমেত বাদবাকিরা তো এখনও বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগে আটকে! এমন রাজ্যে একতরফা সব সাফল্য সব রেকর্ড লুটে নিয়ে যাবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অ্যান্ড কোং সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দিনের পর দিন সে দৃশ্য দেখতে সিপিএম কংগ্রেসের কি ভালো লাগে! তার ওপর ইস্যুর এখন যা ক্রাইসিস! পাহাড় থেকে জঙ্গলমহল যাদবপুর থেকে মেদিনীপুর—মমতার ঝটিকা সফর আর হাইস্পিড সমাধানের সামনে ইস্যু তৈরি মাত্রেই ভ্যানিস! কিন্তু, জল ছাড়া যেমন মাছ বাঁচে না এ রাজ্যের বিরোধীরা ইস্যু ছাড়া বাঁচে না! নোট বাতিলটা এসেছিল ইস্যু হয়ে ক’দিন আগে। বাম কংগ্রেসের হাতে পেনসিল ধরিয়ে সেও তো ছোঁ মেরে নিয়ে গেলেন মমতা! অগত্যা উপায়? শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় অধ্যাপকদের ‘দুষ্টু গোরু’ বলেছেন! লাও, ধরো ধরো! ধরা হল ফোঁস ফোঁস, ভোঁস ভোঁসও খানিক হল। কিন্তু সে ইস্যুও ধোপে টিকল না। কারণ শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় তাঁরই দপ্তরের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকমণ্ডলীকে দুষ্ট চতুষ্পদ বলে ‘অপমান’ করবেন—এটা ওই গুটিকয় বিরোধী ও তাঁদের সাঙ্গোপাঙ্গ ছাড়া কেউ বিশ্বাসই করলেন না! উলটে তিনি সেদিন কাদের উদ্দেশে ওই মন্তব্য করেছিলেন সেটা সংশ্লিষ্ট থেকে সাধারণ সকলেই বুঝলেন। তাছাড়া, বাংলার মানুষ জানেন, দুষ্টু গোরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো—প্রবাদ প্রবচনের পরিসরে পড়ে এবং প্রবাদে-প্রবচনে শব্দের আভিধানিক অর্থ নয় ব্যঙ্গার্থটাই প্রধান। ডাক্তারদের মধ্যে অনেক ‘ব্ল্যাক শিপ’ আছে শুনলে কেউ কি হাসপাতাল বা চেম্বারের চেয়ারে গলায় স্টেথো ঝোলানো কালো ভেড়া প্রত্যাশা করেন! নাকি ‘অসৎ’ চিকিৎসক বিষয়ে সতর্ক হবেন?
সুতরাং, গেল সে ইস্যুও। এবার এল হাতে গরম টেটফল! কেন এসএমএসে, কেন মেলে অ্যাড্রেসে? কেন পূর্ণাঙ্গ মেধাতালিকা নেই? এবং সেইসঙ্গেই উঠে গেল কোটি কোটির দুর্নীতি! চাকুরি প্রার্থীরা নাকি কোটি কোটি দিয়েছেন নাম তুলতে। এবংবিধ হরেক অভিযোগে টেট পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার প্রতিবাদ ও শেষত মামলা হয়ে গেল। হতেই পারে। তার যাথার্থ্য নিয়ে আমাদের কিছু বলার নেই। কারণ, আপাতত তা আদালতের বিচার্য বিষয়। মহামান্য আদালতের রায় আমাদের শিরোধার্য করতেই হবে। আমার বক্তব্য ভিন্ন। পথচলতি সাক্ষাতে টেটের কয়েকজন ‘আন্দোলনকারী’র যে প্রতিক্রিয়া (যা কিছু আগেই লিখেছি) পেয়েছিলাম—তা কী সর্বৈব অসত্য? ভিত্তিহীন? ওই ছেলেমেয়েদের ম্লান মুখগুলোর দিকে চেয়ে কিন্তু একবারের জন্যও মনে হয়নি তা। বরং তাদের কথা শুনে মনে হয়েছে তাদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন প্রতিবাদে রাজনীতি ঢুকে পড়েছে ভালোভাবেই। মুখ্যমন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রীর মুণ্ডপাত করার রাজনীতি, শিক্ষক নিয়োগ আটকে দিয়ে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় ছন্দপতন ঘটানোর রাজনীতি—টেট রাজনীতি। কারণ, এক লপ্তে চল্লিশ লক্ষের কর্মসংস্থানের বিপুল যজ্ঞে কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি যে অস্বাভাবিক নয়—সেটা আর পাঁচজনের মতো ওরাও বোঝে। সঙ্গে এটাও বেশ ভালোই বুঝতে পারছে শেষপর্যন্ত তাদের ভাঙিয়ে ফায়দা লুটে চলে যাবে ওই রাজনীতির কারবারিরা আর তাদের সমস্যা যে তিমিরে সেই তিমিরেই পড়ে থাকবে। কারণ, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাও ইন্ধনদাতাদের নেই। আছে শিক্ষামন্ত্রীর। এবং শিক্ষামন্ত্রী সেই সদিচ্ছার কথা বারবার বলছেন। তাহলে আন্দোলন কেন? ওদের বক্তব্য, ঝাঁকের বাধ্যবাধকতা! ওঁদের বোঝানো হয়েছে ঝাঁকে দলবদ্ধভাবে না থাকলে কিছুই পাবে না!
সন্দেহ নেই—রাজ্যের বিরোধী রাজনীতির এ এক বিপজ্জনক প্রবণতা। ব্রাত্য বসু’র আমলে শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষার সময় এই রাজনীতি দেখা গিয়েছিল। সামান্য ভগ্নাংশের অসুবিধাকে সামনে এনে গোটা পরীক্ষাব্যবস্থাটাই ভণ্ডুল করার চেষ্টা হয়েছিল। পিছনে ছিল বিরোধী রাজনীতি। এবারও সেই এক ব্যাপার সেই রাজনীতি—পাঁচ শতাংশের জন্য পঁচানব্বই শতাংশের নিয়োগপথ বন্ধ! মহামান্য আদালতের রায়ের দিকে চেয়ে থাকা ছাড়া আপাতত উপায় নেই কোনও। কেবল প্রাথমিক নয়, উচ্চ প্রাথমিক ও উচ্চতর শ্রেণির নিয়োগপথেও আজ অনিশ্চয়তার গভীর ধোঁয়াশা। সমস্যা মেটাতে সর্বান্ত চেষ্টা চালাচ্ছেন শিক্ষামন্ত্রী। আদালতের আনুকূল্য পেলে সমস্যা মিটেও যাবে। কিন্তু, লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকারের স্বপ্ন নিয়ে বিরোধীদের এই রাজনীতি রাজ্যের জনদরবারে শেষ অবধি মান্যতা পাবে তো? বিরোধীরা একটু ভাবুন।




?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta