কলকাতা, মঙ্গলবার ২৮ মার্চ ২০১৭, ১৪ চৈত্র ১৪২৩

 

রবিবার | রেসিপি | আমরা মেয়েরা | দিনপঞ্জিকা | শেয়ার | রঙ্গভূমি | সিনেমা | নানারকম | টিভি | পাত্র-পাত্রী | জমি-বাড়ি | ম্যাগাজিন

সংসার


অপরের দুঃখ নিবারণে তৎপরতা মহাপুরুষগণের স্বাভাবিক বৃত্তি। না চাহিলেও তাঁহারা সহায়তা করিতে অগ্রসর হন; চন্দ্র যেমন তীব্র সূর্য কিরণে তাপিত পৃথিবীকে নিজের স্নিগ্ধ—কিরণ বর্ষণ দ্বারা তৃপ্ত করেন।
সংসাররূপ দাবানলের দহনজ্বালায় তাপিত এই শরণাগতদাসকে আপনার বচনরূপ কলস হইতে নির্গত ব্রহ্মানন্দরসানুভূতি দ্বারা মধুর, পবিত্র, শান্তিসুখদায়ক, উদার, শ্রবণসুখদায়ক বাক্যামৃত সিঞ্চন দ্বারা তৃপ্ত কর। হে প্রভো, যাহারা ক্ষণকালের জন্যও আপনার কৃপাদৃষ্টি লাভের পাত্র হয় তাহারা ধন্য।
কি উপায়ে আমি এই সংসারসমুদ্র উত্তীর্ণ হইব? এ জগতে আমার কি বা যথার্থ আশ্রয়? [কর্ম, জ্ঞান ও উপাসনার মধ্যে] কোন উপায় আমি সাধনরূপে গ্রহণ করিব? এই সকল কিছুই আমি জানি না। হে প্রভো, দয়া করিয়া আমাকে রক্ষা কর; আমার সংসার দুঃখের নাশ কর।
এই প্রকার উক্তিকারী, সংসারজ্বালায় দগ্ধ, শরণাগত মুমুক্ষু ব্যক্তিকে দর্শন করিয়া মহাপুরুষ গুরু শীঘ্র অভয় প্রদান করেন।
সেই বিদ্বান ব্রহ্মজ্ঞ গুরু সম্যক্‌-রূপে উপদেশ পালনে তৎপর, চাঞ্চল্যরহিত, শমযুক্ত, শরণাগত, মুক্তিকাম তাহাকে কৃপাপরবশ হইয়া (কোন প্রকার লৌকিক লাভের আশা না রাখিয়া) তত্ত্বোপদেশ দেবেন।
হে বিদ্বন, ভয় পাইও না। তোমার আর সংসারে গতাগতি হইবে না। এই সংসার সিন্ধু উত্তীর্ণ হওয়ার উপায় আছে। যে উপায়-অবলম্বনে সাধকগণ ইহার পারে গিয়াছেন তোমাকে সেই উপায়ের উপদেশ দিব।
সংসারভয়নাশক, অবশ্যফলপ্রদ, এক বিশেষ উপায় আছে। সেই উপায় অবলম্বনে সংসারসমুদ্র অতিক্রম করিয়া পরমানন্দ লাভ করিবে।
উপনিষৎসমূহের তাৎপর্য বিচারের দ্বারা সংশয়াদিরহিত জ্ঞান উৎপন্ন হয়। এই জ্ঞানোৎপত্তির সঙ্গে সঙ্গে সংসার দুঃখের সর্বতোভাবে নাশ হয়।
শ্রুতি বলেন—শ্রদ্ধা, ভক্তি এবং ধ্যান—এই তিনটি যোগ মুমুক্ষুর মুক্তিলাভের সাক্ষাৎ হেতু। যিনি চাঞ্চল্য ত্যাগ করিয়া কেবলমাত্র এই সকল সাধনে নিযুক্ত থাকেন, তাঁহার অবিদ্যাকল্পিত দেহ বন্ধন হইতে মুক্তিলাভ হয়। স্বস্বরূপের জ্ঞানের অভাব হইতে বস্তুতঃ পরমাত্মস্বরূপ তোমার অনাত্মায় অর্থাৎ দেহাদি জড় বস্তুতে ‘আমি—আমার-জ্ঞান’ আসিয়াছে। আর সেই জড়ের সহিত সম্বন্ধবশতঃ তোমার জন্মমরণরূপ সংসার দৃষ্ট হইতেছে। আত্মা ও অনাত্মার বিচার হইতে উৎপন্ন আত্মজ্ঞানরূপ অগ্নি অজ্ঞানের সহিত তাহার কার্য অহংকারাদি দগ্ধ করিয়া ফেলিবে।
শিষ্য বলিলেন—প্রভো, আমি এই প্রশ্ন করিতেছি। দয়া করিয়া শুনুন। আপনার মুখ হইতে এই প্রশ্নের উত্তর পাইয়া আমি কৃতার্থ হইব।
বন্ধন বলিয়া যাহাকে বলা হয়, সেই বন্ধনের স্বরূপ কি? সেই বন্ধন কোথা হইতে আসিল? ইহা থাকে কি প্রকারে? ইহা হইতে মুক্তিরই বা কি উপায়? অনাত্মাই বা কি বস্তু? আর আত্মার স্বরূপই বা কি? এই অনাত্মা ও আত্মার পার্থক্য জ্ঞান কোন্‌ উপায়ে লাভ করা যায়?—আমাকে এই প্রশ্ন সমুদয়ের উত্তর দয়া করিয়া দিন।
গুরু বলিলেন: হে শিষ্য, তুমি ধন্য—তুমি কৃতার্থ। তুমি তোমার বংশকে পবিত্র করিলে। অবিদ্যাবন্ধন হইতে মুক্ত হইয়া ব্রহ্মস্বরূপ—উপলব্ধির ইচ্ছা হইতে তুমি ধন্য হইলে।
পুত্রাদি পিতাকে ঋণ হইতে মুক্ত করিতে পারিবেন। কিন্তু অবিদ্যা বন্ধন হইতে মুক্তিদানের কর্তা নিজে ছাড়া আর কেহই নাই।
মাথার উপর স্থাপিত বোঝা হইত যে কষ্ট হয়, সে কষ্ট অপরে দূর করিতে পারে। কিন্তু নিজের ক্ষুধাতৃষ্ণার জ্বালা নিজের চেষ্টা ছাড়া অপরের দ্বারা নিবারিত হয় না। (অপরে খাইলে আমার ক্ষুধাতৃষ্ণা মেটে না।)
যে রোগী নিয়মিতভাবে ঔষধ সেবন ও সুপথগ্রহণ করেন, তাঁহার আরোগ্যলাভ হইয়া থাকে। অপর কেহ ঔষধ—পথ্যাদি গ্রহণ করিলে রোগী নিরাময় হয় না।

শংকরাচার্যের ‘বিবেকচূড়ামণি’ (অনুবাদক স্বামী বেদান্তানন্দ) থেকে



?Copyright Bartaman Pvt Ltd. All rights reserved
6, J.B.S. Haldane Avenue, Kolkata 700 105
 
Editor: Subha Dutta